কুরআন বিজ্ঞানবিজ্ঞান ইসলাম ও বিজ্ঞানদর্শন কুযুক্তিবিবিধ ইসলাম বিদ্বেষীদের অপনোদন

ফরায়েজ নিয়ে বিভ্রান্তির নিরসন ।



💠ফরায়েজ বিদ্যাঃ
 ইসলামী শাস্ত্র অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি উত্তরাধীকারীদের মাঝে নির্ধারিত অংশ অনুযায়ী ভাগ দেওয়াকে ফরায়েজ বলে।

১৪০০ বছর ধরে ইসলামী এই শাস্ত্র অনুযায়ী উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তির বন্টন করা হচ্ছে। এত বছর ধরে মুসলমানরা সম্পত্তির বন্টন করে আসছে, তারা কোনো গাণিতিক ভুল পেল না? 

বিদ্বেষীরা দুইটি আয়াত দিয়ে যুক্তি প্রদান করেছে।তাদের দাবি করা আয়াতসমূহ নিচে উল্লেখ করছি:

💠An-Nisa' 4:11
يُوصِيكُمُ ٱللَّهُ فِىٓ أَوْلَٰدِكُمْۖ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ ٱلْأُنثَيَيْنِۚ فَإِن كُنَّ نِسَآءً فَوْقَ ٱثْنَتَيْنِ فَلَهُنَّ ثُلُثَا مَا تَرَكَۖ وَإِن كَانَتْ وَٰحِدَةً فَلَهَا ٱلنِّصْفُۚ وَلِأَبَوَيْهِ لِكُلِّ وَٰحِدٍ مِّنْهُمَا ٱلسُّدُسُ مِمَّا تَرَكَ إِن كَانَ لَهُۥ وَلَدٌۚ فَإِن لَّمْ يَكُن لَّهُۥ وَلَدٌ وَوَرِثَهُۥٓ أَبَوَاهُ فَلِأُمِّهِ ٱلثُّلُثُۚ فَإِن كَانَ لَهُۥٓ إِخْوَةٌ فَلِأُمِّهِ ٱلسُّدُسُۚ مِنۢ بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصِى بِهَآ أَوْ دَيْنٍۗ ءَابَآؤُكُمْ وَأَبْنَآؤُكُمْ لَا تَدْرُونَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ لَكُمْ نَفْعًاۚ فَرِيضَةً مِّنَ ٱللَّهِۗ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا
۝
(সম্ভাব্য ভাবানুবাদ)
আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন, এক ছেলের জন্য দুই মেয়ের অংশের সমপরিমাণ। তবে যদি তারা দুইয়ের অধিক মেয়ে হয়, তাহলে তাদের জন্য হবে, যা সে রেখে গেছে তার তিন ভাগের দুই ভাগ; আর যদি একজন মেয়ে হয় তখন তার জন্য অর্ধেক। আর তার মাতা পিতা উভয়ের প্রত্যেকের জন্য ছয় ভাগের এক ভাগ সে যা রেখে গেছে তা থেকে, যদি তার সন্তান থাকে। আর যদি তার সন্তান না থাকে এবং তার ওয়ারিছ হয় তার মাতা পিতা তখন তার মাতার জন্য তিন ভাগের এক ভাগ। আর যদি তার ভাই-বোন থাকে তবে তার মায়ের জন্য ছয় ভাগের এক ভাগ। অসিয়ত পালনের পর, যা দ্বারা সে অসিয়ত করেছে অথবা ঋণ পরিশোধের পর। তোমাদের মাতা পিতা ও তোমাদের সন্তান-সন্ততিদের মধ্য থেকে তোমাদের উপকারে কে অধিক নিকটবর্তী তা তোমরা জান না। আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
(Nearby English Translation)
Allah instructs you concerning your children: for the male, what is equal to the share of two females. But if there are [only] daughters, two or more, for them is two thirds of one's estate. And if there is only one, for her is half. And for one's parents, to each one of them is a sixth of his estate if he left children. But if he had no children and the parents [alone] inherit from him, then for his mother is one third. And if he had brothers [or sisters], for his mother is a sixth, after any bequest he [may have] made or debt. Your parents or your children - you know not which of them are nearest to you in benefit. [These shares are] an obligation [imposed] by Allah . Indeed, Allah is ever Knowing and Wise.

উক্ত আয়াতের বন্টনগুলো নিম্নরুপ:
১. পুত্র সন্তান একজন কন্যা সন্তানের দ্বিগুণ অংশ পাবে।
২. কন্যা সন্তান দুই বা ততোধিক হলে তারা একত্রে সম্পত্তির ২/৩ অংশ পাবে (আরবি পাঠে "দুইয়ের অধিক" বলা হলেও হাদিস দ্বারা স্পষ্ট হয়েছে, দুইজন কন্যা হলেও এই একই বিধান প্রযোজ্য — অনেকটা সালাত-যাকাতের মতোই, যার খুঁটিনাটি সুন্নাহ দ্বারা স্পষ্ট হয়েছে)।
৩. কন্যা সন্তান একজন হলে সে অর্ধেক (১/২) অংশ পাবে।
৪. মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে পিতা ও মাতা প্রত্যেকে ১/৬ অংশ করে পাবেন।
৫. মৃত ব্যক্তির সন্তান না থাকলে এবং কেবল পিতা-মাতাই ওয়ারিস হলে, মাতা পাবেন ১/৩ অংশ।
৬. মৃত ব্যক্তির একাধিক ভাই-বোন থাকলে মাতা পাবেন ১/৬ অংশ।

এবার দ্বিতীয় আয়াতটি দেখি:

💠An-Nisa' 4:12
وَلَكُمْ نِصْفُ مَا تَرَكَ أَزْوَٰجُكُمْ إِن لَّمْ يَكُن لَّهُنَّ وَلَدٌۚ فَإِن كَانَ لَهُنَّ وَلَدٌ فَلَكُمُ ٱلرُّبُعُ مِمَّا تَرَكْنَۚ مِنۢ بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصِينَ بِهَآ أَوْ دَيْنٍۚ وَلَهُنَّ ٱلرُّبُعُ مِمَّا تَرَكْتُمْ إِن لَّمْ يَكُن لَّكُمْ وَلَدٌۚ فَإِن كَانَ لَكُمْ وَلَدٌ فَلَهُنَّ ٱلثُّمُنُ مِمَّا تَرَكْتُمۚ مِّنۢ بَعْدِ وَصِيَّةٍ تُوصُونَ بِهَآ أَوْ دَيْنٍۗ وَإِن كَانَ رَجُلٌ يُورَثُ كَلَٰلَةً أَوِ ٱمْرَأَةٌ وَلَهُۥٓ أَخٌ أَوْ أُخْتٌ فَلِكُلِّ وَٰحِدٍ مِّنْهُمَا ٱلسُّدُسُۚ فَإِن كَانُوٓا۟ أَكْثَرَ مِن ذَٰلِكَ فَهُمْ شُرَكَآءُ فِى ٱلثُّلُثِۚ مِنۢ بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصَىٰ بِهَآ أَوْ دَيْنٍ غَيْرَ مُضَآرٍّۚ وَصِيَّةً مِّنَ ٱللَّهِۗ وَٱللَّهُ عَلِيمٌ حَلِيمٌ
۝
(সম্ভাব্য ভাবানুবাদ)
আর তোমাদের জন্য তোমাদের স্ত্রীগণ যা রেখে গেছে তার অর্ধেক, যদি তাদের কোন সন্তান না থাকে। আর যদি তাদের সন্তান থাকে, তবে তারা যা রেখে গেছে তা থেকে তোমাদের জন্য চার ভাগের এক ভাগ। তারা যে অসিয়ত করে গেছে তা পালনের পর অথবা ঋণ পরিশোধের পর। আর স্ত্রীদের জন্য তোমরা যা রেখে গিয়েছ তা থেকে চার ভাগের একভাগ, যদি তোমাদের কোন সন্তান না থাকে। আর যদি তোমাদের সন্তান থাকে তাহলে তাদের জন্য আট ভাগের এক ভাগ, তোমরা যা রেখে গিয়েছে তা থেকে। তোমরা যে অসিয়ত করেছ তা পালন অথবা ঋণ পরিশোধের পর। আর যদি মা বাবা এবং সন্তান-সন্ততি নাই এমন কোন পুরুষ বা মহিলা মারা যায় এবং তার থাকে এক ভাই অথবা এক বোন, তখন তাদের প্রত্যেকের জন্য ছয় ভাগের একভাগ। আর যদি তারা এর থেকে অধিক হয় তবে তারা সবাই তিন ভাগের এক ভাগের মধ্যে সমঅংশীদার হবে, যে অসিয়ত করা হয়েছে তা পালনের পর অথবা ঋণ পরিশোধের পর। কারো কোন ক্ষতি না করে। আল্লাহর পক্ষ থেকে অসিয়তস্বরূপ। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সহনশীল।
(Nearby English Translation)
And for you is half of what your wives leave if they have no child. But if they have a child, for you is one fourth of what they leave, after any bequest they [may have] made or debt. And for the wives is one fourth if you leave no child. But if you leave a child, then for them is an eighth of what you leave, after any bequest you [may have] made or debt. And if a man or woman leaves neither ascendants nor descendants but has a brother or a sister, then for each one of them is a sixth. But if they are more than two, they share a third, after any bequest which was made or debt, as long as there is no detriment [caused]. [This is] an ordinance from Allah, and Allah is Knowing and Forbearing.

উক্ত আয়াতের বন্টনগুলো নিম্নরুপ:

১. স্ত্রীর সন্তান না থাকলে স্বামী স্ত্রীর সম্পত্তির ১/২ অংশ পাবেন।
২. স্ত্রীর সন্তান থাকলে স্বামী পাবেন ১/৪ অংশ।
৩. স্বামীর সন্তান না থাকলে স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তির ১/৪ অংশ পাবেন।
৪. স্বামীর সন্তান থাকলে স্ত্রী পাবেন ১/৮ অংশ।
৫. মৃত ব্যক্তির (পুরুষ বা নারী) পিতা-মাতা ও সন্তান-সন্ততি কেউ না থাকলে, তবে এক ভাই বা এক বোন থাকলে, প্রত্যেকে পাবেন ১/৬ অংশ।
৬. এমন ভাই-বোন একাধিক হলে তারা সবাই একত্রে ১/৩ অংশে সমঅংশীদার হবেন।

অভিযোগটি আসলে কী?

লক্ষ করুন — প্রতিটি শর্ত পরস্পর থেকে স্বতন্ত্র। যেমন দুইয়ের অধিক কন্যা সন্তান ও পিতা-মাতা একসাথে থাকলে: কন্যাগণ পাবেন ২/৩, আর পিতা-মাতা মিলে পাবেন (১/৬+১/৬)=১/৩। যোগফল = ২/৩+১/৩ = । এখানে কোনো সমস্যা নেই।

কিন্তু সমালোচকরা ৪:১১ আয়াতের কন্যা সন্তানের অংশ (২/৩), পিতা-মাতার অংশ (১/৩) এবং ৪:১২ আয়াতের স্ত্রীর অংশ (১/৮) — এই তিনটি একত্রে যোগ করে দেখান:

২/৩ + ১/৩ + ১/৮ = ২৭/২৪ (যা ১-এর চেয়ে বেশি)

এখান থেকেই "গাণিতিক ভুল"-এর অভিযোগ ওঠে।

কেন এটি প্রকৃত ভুল নয়

এই আয়াতগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল তৎকালীন প্রচলিত আরব উত্তরাধিকার প্রথায় পরিবর্তন এনে কন্যা, মাতা-পিতা ও স্ত্রীর জন্য নির্দিষ্ট, প্রাপ্য অংশ প্রতিষ্ঠা করা — যেখানে ইসলাম-পূর্ব আরবে নারী ও শিশুরা প্রায়ই সম্পত্তি থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত থাকতেন। সম্পত্তি গণনা ও বণ্টনের গাণিতিক পদ্ধতি আগে থেকেই প্রচলিত ছিল; কুরআন সেই পদ্ধতির মধ্যেই নতুন অধিকারীদের অন্তর্ভুক্ত করে দিয়েছে।

অর্থাৎ এই আয়াতগুলো প্রতিটি সম্ভাব্য সংমিশ্রণ পরিস্থিতির জন্য আলাদা আলাদা চূড়ান্ত সংখ্যা বলে দেয়নি — বরং প্রত্যেক শ্রেণীর ওয়ারিসের আপেক্ষিক অধিকার ও গুরুত্ব নির্ধারণ করে দিয়েছে। ফলে বাস্তবে যখন একাধিক শ্রেণীর ওয়ারিস (কন্যা, পিতা-মাতা, স্ত্রী) একসাথে উপস্থিত থাকেন, তখন প্রত্যেকের অংশ আলাদাভাবে হিসাব করলে যোগফল ১-এর বেশি হয়ে যেতে পারে। এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়, বরং প্রত্যাশিতই। প্রশ্ন হলো — এমন বাস্তব সংমিশ্রণ পরিস্থিতিতে করণীয় কী?


সাহাবি যুগে যখন বাস্তবে এমন পরিস্থিতি এলো যেখানে ওয়ারিসদের প্রাপ্য অংশের যোগফল ১-এর বেশি হয়ে যাচ্ছিল, তখন একটি সমাধান দেওয়া হয়: প্রতিটি ওয়ারিসের আপেক্ষিক অনুপাত অক্ষুণ্ণ রেখে সবার অংশ সমান হারে কমিয়ে যোগফল ঠিক ১-এ নিয়ে আসা। এই পদ্ধতির নাম "আউল" নীতি, যা ফারায়েজ শাস্ত্রে সুপরিচিত।

এটি কারো ব্যক্তিগত খেয়ালখুশির সিদ্ধান্ত ছিল না। রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, তাঁর উম্মতের মধ্যে ফারায়েজ শাস্ত্রে সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তি হলেন যায়েদ বিন সাবিত (রা) [সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৫৪; তিরমিযি: ৩৭৯০-৩৭৯১]। হযরত আলী (রা)-ও এক জুমুআর খুতবায় যায়েদ বিন সাবিতের অনুরূপ ফতোয়া প্রদান করেন [ইবনু শু'বাহ, খণ্ড ৩, পৃ. ১৯, রেওয়ায়েত নং ৩৪]। আমীরুল মুমিনীন উমর (রা)সহ প্রায় সকল সাহাবি এই ইজতিহাদ সমর্থন করেন, এবং সাহাবিদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে এটি ইজমা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় [আহকামুল কুরআন, ইবনুল আরাবি, খণ্ড ১, পৃ. ৪৫৭]।
উদাহরণ: দুই কন্যা, পিতা-মাতা ও স্ত্রী

আউল নীতি প্রয়োগ করলে এই পরিস্থিতিতে বণ্টন দাঁড়ায়:

ওয়ারিস

প্রাপ্ত অংশ

স্ত্রী

৩/২৭

পিতা

৪/২৭

মাতা

৪/২৭

কন্যাগণ (একত্রে)

১৬/২৭

যোগফল: ৩/২৭ + ৪/২৭ + ৪/২৭ + ১৬/২৭ = ২৭/২৭ =

অর্থাৎ সম্পূর্ণ সম্পত্তিই যথাযথভাবে বণ্টিত হয়ে যায় — কোনো ঘাটতি বা উদ্বৃত্ত থাকে না। মূল আয়াতে উল্লেখিত অনুপাত (যেমন স্ত্রীর ১/৮, পিতা-মাতার ১/৬ করে, কন্যাদের ২/৩) অক্ষুণ্ণ রেখে কেবল হর (denominator) সমন্বয় করা হয়েছে, যাতে প্রত্যেকের পারস্পরিক অনুপাত ঠিক থাকে।

এটি কি কুরআন সংশোধনের চেষ্টা?

না। ২+ কন্যা, পিতা-মাতা ও স্ত্রী একত্রে থাকার এই নির্দিষ্ট সম্মিলিত পরিস্থিতি নিয়ে কুরআনে সরাসরি কোনো চূড়ান্ত সংখ্যা উল্লেখ নেই — তাই এখানে "ভুল সংশোধন"-এর প্রশ্নই আসে না। সাহাবিগণ কুরআনের মূলনীতির আলোকে একটি হিসাব বের করেছেন মাত্র।

এর তুলনা করা যায় সালাত, যাকাত ও রোযার সাথে — কুরআনে এগুলো পালনের নির্দেশ আছে, কিন্তু বিস্তারিত পদ্ধতি বলা নেই। রাসূলুল্লাহ (স) সুন্নাহর মাধ্যমে সেই বিস্তারিত পদ্ধতি শিখিয়েছেন, সুন্নাহ পর ফিকহের মাধ্যমে এগুলো আরো বিস্তারিত হয়েছে । এটাকে কেউ কুরআনের "ভুল" বলে না — ঠিক তেমনি ফারায়েজেও এমন হয়েছে ।
এখানে একটি মৌলিক বিষয় বোঝা জরুরি। কুরআন যখন কোনো ওয়ারিসের জন্য "অর্ধেক", "দুই-তৃতীয়াংশ" বা "এক-ষষ্ঠাংশ" নির্ধারণ করে, তখন তা মূলত তার আইনগত প্রাপ্য (legal entitlement) নির্ধারণ করছে। কিন্তু একাধিক বৈধ প্রাপ্য একই সম্পত্তির উপর একযোগে প্রযোজ্য হলে সেগুলো কীভাবে বাস্তবে কার্যকর (enforcement) হবে, সেটি একটি পৃথক প্রশ্ন। আইনশাস্ত্রে অধিকার নির্ধারণ (determination of rights) এবং সেই অধিকার বাস্তবায়নের পদ্ধতি (mode of enforcement) এক বিষয় নয়। আউল নীতি এই দ্বিতীয় স্তরের একটি প্রয়োগমূলক নীতি; এটি কুরআনে নির্ধারিত অধিকার বাতিল বা সংশোধন করে না, বরং সব বৈধ দাবিকে একই সঙ্গে কার্যকর করার একটি ন্যায়সংগত পদ্ধতি প্রদান করে।

ইমাম আবু হানিফা (রহ) নিজের পদ্ধতি সম্পর্কে বলেছেন:

"আমি কুরআনের উপর নির্ভর করি। কুরআনে যা পাই না, তার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর সুন্নাহর উপর নির্ভর করি। কুরআন-সুন্নাহ কোথাও না পেলে সাহাবিদের মতামত ও শিক্ষার উপর নির্ভর করি, তার বাইরে যাই না।" [আল-ইনতিকা, ইবনে আব্দুল বার, পৃ. ১৪২-১৪৩]

কুরআনেও সাহাবিদের ইজমাকে স্বীকৃতি ও প্রশংসা করা হয়েছে (৪২:৩৮, ৯:১০০, ৫৭:১০, ৪৯:৭, ৪৮:১৮, ৫৯:১০ ইত্যাদি)।

সুতরাং আমাদের কাছে স্পষ্টত হলো এখানে কোন গাণিতিক ভুল নেই। ১৪০০ বছর ধরে এই পদ্ধিতে সম্পত্তির বন্টন চলে আসছে, কোথায় কেউ তো বলল না, কুরআন অনুযায়ী সম্পত্তির হিসাব করা যাচ্ছে না! এতে গাণিতিক ভুল আছে?
নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সহনশীল।

এখানে একেক অবস্থায় একেকভাবে বণ্টন দেখা যাবে। এখানে এই লিঙ্কে ( http://inheritance.ilmsummit.org/projects/inheritance/testcasespage.aspx ) সেই বিস্তৃতি লক্ষ্য করা যাবে। ইসলামী আইনে ফারায়েজ (فرائض) হচ্ছে একটি ব্যাপক অঙ্গন। বলা হয় এটি ইসলামী জ্ঞানের অর্ধেক। এটি বিশেষজ্ঞ বিষয়। আলোচ্য প্রসঙ্গে 4:11/4:11 আয়াত ফারায়িদের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত বিষয় নয় বরং এতে সম্পদে মেয়েদের এবং স্ত্রীর অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয় এসেছে। এখানে আরবের প্রচলিত আইনে পরিবর্তন আনা হয়েছে। অংক কষার নিয়ম আগেই ছিল এবং সেই নিয়মেই পরিবর্তনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। হিসাবে, মূল অধিকারীদের ক্যাটাগরি বা ক্ষেত্র স্থির করা, অর্থাৎ অংশের সমষ্টিকে নির্ধারণ করা, এই নীতির ভিত্তিতে যে, সমষ্টি যদি ১ এর ঊর্ধ্বে ওঠে, তবে অংশগুলোকে আনুপাতিকভাবে কমিয়ে ১ করা হবে এবং বিতরণ করা হবে। এর উপরে সাহাবা রা:গণ একমত হয়েছেন এবং  এই সিস্টেম এখনো কাজ করে। উপরে দেয়া লিঙ্কে সেই নিয়মই কাজ করছে। 

রাসুলুল্লাহ(স) বলেছেন,আমার উম্মতের মাঝে ফারায়েজ শাস্ত্রে সর্বাধিক জ্ঞানী হলো যায়েদ বিন সাবিত(রা) [সুনানে ইবনে মাজাহ/১৫৪, তিরমিযি/৩৭৯০-৩৭৯১]। এছাড়া হযরত আলী(রা)ও একদা জুমুআর নামাজের খুতবা দেয়ার সময় যায়েদ বিন সাবিত(রা) এর মতেরই অনুরূপ ফতোয়া প্রদান করেন [ইবনু শু'বাহ,খন্ড:০৩,পৃ:১৯,রেওয়ায়েত নং-৩৪]।

আমীরুল মুমিনীন উমর(রা)সহ প্রায় সকল সাহাবিই তাঁদের ইজতিহাদটি সমর্থন করেন এবং সাহাবাগণের ঐকমত্যের ভিত্তিতে ইজতিহাদটি ইজমা হিসেবে সাব্যস্ত হয়ে যায় [আহকামুল কুরআন লি ইবনুল আরাবি,খন্ড:০১,পৃ:৪৫৭]

এবং এটি এটি ফারায়েজ শাস্ত্রে "আঊল নীতি" নামে প্রসিদ্ধ।


ইবনে আব্বাস (রা)-এর দ্বিমত: আউল নীতি নিয়ে একমাত্র উল্লেখযোগ্য ভিন্নমত

পূর্ববর্তী আলোচনায় বলা হয়েছিল, আউল নীতির ব্যাপারে সাহাবিগণ ঐকমত্যে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু এখানে সৎ ও স্বচ্ছ থাকা জরুরি — এই ঐকমত্য সম্পূর্ণরূপে সর্বসম্মত ছিল না শুরুতে। উম্মাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহাবি, "তারজুমানুল কুরআন" (কুরআনের ব্যাখ্যাকার) খ্যাত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) একাই এই নীতির বিরোধিতা করেছিলেন। সমালোচকরা প্রায়ই এই ঘটনাকে ব্যবহার করে বলে থাকেন — "খোদ একজন শীর্ষস্থানীয় সাহাবিই যখন বলেছেন এটি কুরআনবিরোধী, তখন নিশ্চয়ই উমর (রা) কুরআন সংশোধন করেছিলেন।" এই দাবিটি বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

ইবনে আব্বাস (রা) কে ছিলেন?

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর চাচাতো ভাই এবং তাঁর চাচা আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রা)-এর পুত্র। তিনি উম্মাহর মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী মুফাসসির হিসেবে স্বীকৃত এবং তাঁকে "হিবরুল উম্মাহ" (উম্মাহর জ্ঞান-সাগর) উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তাঁর মর্যাদা ও পাণ্ডিত্য নিয়ে উম্মাহর মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই। ঠিক এই কারণেই তাঁর দ্বিমতটি গুরুত্বসহকারে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন — এটি কোনো দুর্বল বা অজ্ঞতাপ্রসূত মতামত ছিল না, বরং একজন শীর্ষস্থানীয় মুজতাহিদের ইজতিহাদ।

মজার বিষয় হলো, ইতিহাসের একটি সূক্ষ্ম দিক প্রায়ই উপেক্ষিত হয়: ইমাম সারাখসী (রহ) তাঁর বিখ্যাত আল-মাবসূত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, আউল নীতি সর্বপ্রথম প্রস্তাব করেছিলেন খোদ ইবনে আব্বাসের পিতা আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রা) — যিনি উমর (রা)-কে বলেছিলেন, "আউল প্রয়োগ করুন।" অর্থাৎ পিতা আউল নীতির প্রবর্তক, আর পুত্র (ইবনে আব্বাস) তাঁর নিজস্ব ইজতিহাদের ভিত্তিতে এর বিরোধিতা করেন [আল-মাবসূত, কিতাবুল ফারায়েজ, বাবুল আউল, ২৯/১৬১]।

মূল ঘটনা: যেখান থেকে বিতর্কের সূত্রপাত

উমর (রা)-এর খিলাফতের প্রথম দিকে একটি ঘটনা ঘটে — এক নারী মারা যান, রেখে যান একজন স্বামী ও দুই বোন (সন্তান বা পিতা-মাতা কেউই জীবিত ছিলেন না)।

  • স্বামীর অংশ (সূরা নিসা ৪:১২ অনুযায়ী, সন্তান না থাকলে) = ১/২

  • দুই বোনের অংশ একত্রে (কালালাহ সংক্রান্ত আয়াত অনুযায়ী) = ২/৩

সূরা আন-নিসার শেষ আয়াতে বলা হয়েছে:

يَسْتَفْتُونَكَ قُلِ اللَّهُ يُفْتِيكُمْ فِي الْكَلَالَةِ ۚ إِنِ امْرُؤٌ هَلَكَ لَيْسَ لَهُ وَلَدٌ وَلَهُ أُخْتٌ فَلَهَا نِصْفُ مَا تَرَكَ ۚ وَهُوَ يَرِثُهَا إِن لَّمْ يَكُن لَّهَا وَلَدٌ ۚ فَإِن كَانَتَا اثْنَتَيْنِ فَلَهُمَا الثُّلُثَانِ مِمَّا تَرَكَ ۚ وَإِن كَانُوا إِخْوَةً رِّجَالًا وَنِسَاءً فَلِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنثَيَيْنِ ۗ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ أَن تَضِلُّوا ۗ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ۝ (৪:১৭৬)

অনুবাদ: লোকেরা তোমার কাছে ফতোয়া জিজ্ঞেস করে। বল, আল্লাহ তোমাদেরকে কালালাহ্‌ (নিঃসন্তান ও পিতৃহীন ব্যক্তি) সম্পর্কে ফতোয়া দিচ্ছেন। কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তার সন্তান না থাকলে কিন্তু বোন থাকলে, সে যা রেখে গেছে তার অর্ধেক সে পাবে... আর যদি তারা দুইজন হয় তবে তারা যা রেখে গেছে তার দুই-তৃতীয়াংশ তারা পাবে...

এই দুটি অংশ (১/২ + ২/৩) একত্রে যোগ করলে দাঁড়ায় ৭/৬ — অর্থাৎ সম্পত্তির চেয়ে বেশি। উমর (রা) সাহাবিদের সাথে পরামর্শ করে বলেছিলেন, তিনি বুঝতে পারছেন না আল্লাহ কাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন যে তাকে আগে দেবেন, আর কাকে পরে রেখেছেন যে তাকে পরে দেবেন। অধিকাংশ সাহাবি (আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের প্রস্তাবিত ঋণ-উপমার ভিত্তিতে) আউল নীতিতে একমত হন। ইবনে আব্বাস (রা) একাই এর তীব্র বিরোধিতা করেন।

ইবনে আব্বাসের অবস্থান কী ছিল?

ইবনে আব্বাস (রা)-এর যুক্তি ছিল, ফরয অংশগুলোর মধ্যে সবগুলো সমান মর্যাদার নয়। তাঁর মতে, কিছু ওয়ারিসের অংশ (যেমন স্বামী/স্ত্রী, পিতা-মাতা) কুরআনে সম্পূর্ণ নির্দিষ্ট ও চূড়ান্তভাবে বলা হয়েছে — সন্তান থাকা বা না-থাকার উপর ভিত্তি করে তাদের একটিমাত্র সুনির্দিষ্ট মান আছে (যেমন স্বামীর জন্য ১/২ অথবা ১/৪, আর কিছু নয়), আর এই মান কখনোই আরও কমানো যাবে না। অন্যদিকে কন্যা বা বোনদের ২/৩ অংশটিকে তিনি একটি "ঊর্ধ্বসীমা" হিসেবে দেখতেন — কারণ ভাই থাকলে তারা নির্দিষ্ট অংশীদার (সাহিবুল ফরয) থেকে অবশিষ্টাংশীদার (আসাবা)-এ রূপান্তরিত হয়। তাই ঘাটতি দেখা দিলে, এই "নমনীয়" শ্রেণীই তা বহন করবে — নির্দিষ্ট-মানের ওয়ারিসরা নয়।

এই নীতি প্রয়োগ করলে মূল ঘটনায় ফলাফল দাঁড়াতো এরকম:

পক্ষ

নামমাত্র অংশ

আউল পদ্ধতিতে (উমর ও জমহুরের মত)

ইবনে আব্বাসের পদ্ধতিতে

স্বামী

১/২

৩/৭

১/২ (অপরিবর্তিত)

দুই বোন (একত্রে)

২/৩

৪/৭

১/২ (হ্রাসকৃত, অর্থাৎ প্রত্যেকে ১/৪)

যোগফল

৭/৬ (>১)

লক্ষণীয় বিষয় হলো, ইবনে আব্বাসের পদ্ধতিতেও বোনদের অংশ তাদের নামমাত্র ২/৩ থেকে কমে ১/২-এ নেমে আসছে। এই পর্যবেক্ষণটি পরবর্তীতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ইমাম আল-জাসসাসের জবাব: কেন এই যুক্তি ধোপে টেকে না

অন্যতম প্রচীন মুফাসসির ইমাম আবু বকর আল-জাসসাস (রহ) তাঁর আহকামুল কুরআন গ্রন্থে ইবনে আব্বাসে রা: ‘র অবস্থানের একটি বিস্তারিত জবাব দিয়েছেন। তাঁর যুক্তিগুলো নিম্নরূপ:

১. "অগ্রাধিকার" নীতিটি ভুল ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছে। কোনো একজন ওয়ারিসকে অন্যের চেয়ে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি কেবল আসাবা (অবশিষ্টাংশীদার) ব্যবস্থার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য — যেখানে নিকটতর পুরুষ আত্মীয় দূরবর্তীকে বাদ দেন। কিন্তু ফরয (নির্দিষ্ট কুরআনি অংশ) ব্যবস্থায় এমন কোনো ধারাবাহিকতা নেই। আল্লাহ বোনের অংশ যতটা স্পষ্টভাবে বলেছেন, স্বামী বা মাতার অংশও ঠিক ততটাই স্পষ্টভাবে বলেছেন। কোনো একটি অংশকে অন্যটির চেয়ে "কম গুরুত্বপূর্ণ" বলে পিছিয়ে দেওয়ার জন্য টেক্সটে কোনো ইঙ্গিত নেই।

২. ঋণের উপমা অধিক যুক্তিসঙ্গত ও সর্বজনস্বীকৃত। যখন একাধিক বৈধ দাবি একটি সীমিত সম্পদের উপর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে (যেমন একজন দেউলিয়া ব্যক্তির একাধিক পাওনাদার), তখন ইসলামি আইনশাস্ত্রের সর্বজনস্বীকৃত নীতি হলো — প্রত্যেকের দাবি আনুপাতিক হারে কমিয়ে বণ্টন করা, কাউকে সম্পূর্ণ বাদ না দেওয়া। যেহেতু কুরআন নিজে এই নির্দিষ্ট সংঘর্ষপূর্ণ পরিস্থিতির জন্য কোনো অগ্রাধিকার-ক্রম বলে দেয়নি, তাই এই সাধারণ, স্বীকৃত আইনগত নীতিই স্বাভাবিকভাবে প্রযোজ্য হয় — এটি কুরআনের "সংশোধন" নয়, বরং কুরআনের নীরবতা পূরণ করা একটি সুপ্রতিষ্ঠিত পদ্ধতিতে।

৩. পুত্র-কন্যার উদাহরণেই একই নীতি বিদ্যমান। আল-জাসসাস একটি চমৎকার উদাহরণ দেন — একজন পুত্র একা থাকলে সে সম্পূর্ণ সম্পত্তি (আসাবা হিসেবে) পায়; একজন কন্যা একা থাকলে সে অর্ধেক (ফরয হিসেবে) পায়। কিন্তু পুত্র ও কন্যা একত্রে থাকলে, কেউই তাদের "একক অবস্থায় প্রাপ্য" পূর্ণ অংশ পায় না — বরং উভয়ে মিলে ২:১ অনুপাতে (পুত্র ২/৩, কন্যা ১/৩) ভাগ করে নেয়। এটিও এক ধরনের "আউল"-সদৃশ সমন্বয়, অথচ কেউ এটিকে কুরআনের ভুল বলে না। কারণ একাধিক ওয়ারিস একত্রে থাকলে প্রত্যেকের একক-অবস্থার অংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী সমন্বিত হবে — এটিই ফারায়েজ শাস্ত্রের স্বাভাবিক নিয়ম, নতুন কোনো উদ্ভাবন নয়।

সাহাবাদের ইজমা ও পরবর্তী মাযহাবসমূহের অবস্থান

উমর (রা)-এর এই সিদ্ধান্তে আলী (রা), উসমান (রা), যায়েদ বিন সাবিত (রা) সহ প্রায় সকল প্রথম সারির সাহাবি সমর্থন জানান। ইবনুল আরাবি (রহ) ও ইবনে কুদামা (রহ) — উভয়েই নিশ্চিত করেছেন যে পরবর্তীতে উম্মাহ উমর (রা)-এর সিদ্ধান্তের উপর ইজমায় (ঐকমত্যে) পৌঁছেছিল [আহকামুল কুরআন লি ইবনুল আরাবি, খন্ড: ১, পৃ: ৪৫৭]। ইমাম ইবনে কুদামা (রহ) তাঁর আল-মুগনী গ্রন্থে স্পষ্ট করেন যে আউল কেবল তখনই প্রযোজ্য যখন কুরআনে নির্ধারিত ফরয অংশগুলো একত্রে সম্পত্তির চেয়ে বেশি দাবি করে বসে — অর্থাৎ অংশগুলো নিজেরাই কুরআনের, আউল শুধু সেগুলোর ভিত্তিতে হিসাব করার একটি পদ্ধতি মাত্র, কোনো প্রতিস্থাপন নয় [আল-মুগনী, কিতাবুল ফারায়েজ, বাবু উসূলি সিহামিল ফারায়েজিল্লাতি তাউল, ৬/১৭৮]।

চার সুন্নি মাযহাবই (হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী, হাম্বলী) পরবর্তীতে আউল নীতি সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করে। বর্তমানে সুন্নি ফিকহের ইতিহাসে এমন কোনো পরিচিত আলিম নেই যিনি ইবনে আব্বাসের এই নির্দিষ্ট অবস্থান অনুসরণ করেন। (উল্লেখ্য, পরবর্তীতে শিয়া জাফরি ফিকহ তাদের নিজস্ব উসূলের ভিত্তিতে একটি ভিন্ন ব্যবস্থা গড়ে তোলে, যার সাথে ইবনে আব্বাসের যুক্তির কাঠামোগত মিল রয়েছে — কিন্তু এটি সুন্নি মূলধারার ইজমা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক একটি বিষয়, ভিন্ন উসূলুল ফিকহ নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত।)

তাহলে কি উমর (রা) প্রকৃতপক্ষে কুরআন সংশোধন করেছিলেন?

এখানেই মূল প্রশ্নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জবাবটি নিহিত। লক্ষ করুন — ইবনে আব্বাস (রা) নিজেও তো "নামমাত্র" অংশগুলো হুবহু পরিশোধ করার প্রস্তাব দেননি। তাঁর পদ্ধতিতেও দুই বোনের প্রাপ্য ২/৩ কমে ১/২-এ নেমে এসেছে (উপরের সারণি দ্রষ্টব্য)। অর্থাৎ, উমর (রা) এবং ইবনে আব্বাস (রা) — উভয়েই স্বীকার করেছিলেন যে, একাধিক ফরয অংশ একত্রে সম্পত্তির চেয়ে বেশি দাবি করলে কোনো-না-কোনো সমন্বয় প্রক্রিয়া অপরিহার্য। কেউই বলেননি, "যা লেখা আছে তা-ই আক্ষরিকভাবে দিতে হবে, তা ১-এর বেশি হলেও।"

তাঁদের মতভেদ ছিল শুধু কোন নীতি অনুযায়ী এই সমন্বয় হবে তা নিয়ে — উমর ও অধিকাংশ সাহাবি বলেছেন আনুপাতিক হ্রাস (ঋণের উপমায়), ইবনে আব্বাস বলেছেন নির্বাচনী অগ্রাধিকার। দুটোই ছিল ইজতিহাদ — কুরআন যে নির্দিষ্ট সংঘর্ষপূর্ণ পরিস্থিতির জন্য সরাসরি সংখ্যা বলে দেয়নি, সেই শূন্যস্থান পূরণের প্রচেষ্টা। সুতরাং "ইবনে আব্বাসও স্বীকার করেছেন উমর কুরআন সংশোধন করেছেন" — এই দাবিটি বিভ্রান্তিকর। বরং সঠিক চিত্র হলো: দুইজন মুজতাহিদ সাহাবি একই সমস্যার দুটি ভিন্ন সমাধান প্রস্তাব করেছিলেন, আর উম্মাহ ইজমার মাধ্যমে অধিক যুক্তিসঙ্গত সমাধানটি গ্রহণ করেছে। এটি কুরআনে ভুল থাকার প্রমাণ নয়; বরং এটি প্রমাণ করে যে conflicting শর্তগুলোকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে বাড়তি একটি নীতির প্রয়োজন ছিল, যা সুন্নাহ ও ইজতিহাদের মাধ্যমে পূরণ হয়েছে — ঠিক যেমনটি পূর্ববর্তী অধ্যায়ে সালাত-যাকাতের উদাহরণে বলা হয়েছিল।

আগের উদাহরণে প্রয়োগ করলে

পূর্ববর্তী অধ্যায়ে আলোচিত "দুই কন্যা, পিতা-মাতা ও স্ত্রী"-র ঘটনায় ইবনে আব্বাসের নীতিটি (যৌক্তিক সম্প্রসারণ হিসেবে) প্রয়োগ করলে ফলাফল দাঁড়াতো এরকম:

পক্ষ

নামমাত্র অংশ

আউল পদ্ধতিতে (জমহুর)

ইবনে আব্বাসের নীতি প্রয়োগে

স্ত্রী

১/৮

৩/২৭

১/৮ (=৩/২৪, অপরিবর্তিত)

পিতা

১/৬

৪/২৭

১/৬ (=৪/২৪, অপরিবর্তিত)

মাতা

১/৬

৪/২৭

১/৬ (=৪/২৪, অপরিবর্তিত)

কন্যাগণ (একত্রে)

২/৩

১৬/২৭

১৩/২৪ (হ্রাসকৃত)

যোগফল

>১

উভয় পদ্ধতিতেই যোগফল ঠিক ১-এ পৌঁছায় — শুধু ভেতরের বণ্টন-অনুপাত ভিন্ন। এটি আরও স্পষ্ট করে যে মূল বিতর্কটি "কুরআন সঠিক না ভুল" তা নিয়ে নয়, বরং "একাধিক বৈধ শর্ত একত্রে মিললে কোন নীতিতে সমন্বয় হবে" তা নিয়ে।

একটা বিষয় নিয়ে আরেকটু বিস্তারিত আলোচনা করার দরকার মনে করছি , ‌


আপত্তি: "যদি পরে আউল নীতি প্রয়োগ করতেই হয়, তবে কি এটি প্রমাণ করে না যে কুরআনের বণ্টন অসম্পূর্ণ ছিল?"

এটি সমালোচকদের অন্যতম শক্তিশালী আপত্তি। তাদের বক্তব্য হলো—যদি কুরআনে নির্ধারিত অংশগুলো কোনো কোনো ক্ষেত্রে একত্রে যোগ করলে সম্পত্তির চেয়ে বেশি হয়ে যায় এবং পরে সাহাবিদের "আউল" নামে একটি অতিরিক্ত নীতি তৈরি করতে হয়, তাহলে কি এটি প্রমাণ করে না যে কুরআনের বিধান অসম্পূর্ণ ছিল?

প্রথমেই লক্ষ্য করা দরকার, সমালোচকদের যুক্তির অন্তর্নিহিত পূর্বধারণা হলো, কুরআনে বর্ণিত অংশগুলো এমনভাবে নির্ধারিত যে সেগুলো প্রত্যেক সম্ভাব্য উত্তরাধিকার পরিস্থিতিতে কোনো অতিরিক্ত ব্যাখ্যা বা প্রয়োগমূলক নীতি ছাড়াই সরাসরি কার্যকর হওয়া উচিত। এই পূর্বধারণার ভিত্তিতেই তারা আউল নীতির প্রয়োজনীয়তাকে কুরআনের অসম্পূর্ণতার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেন। এই পূর্বধারণাটিই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। সমালোচকরা ধরে নেন, কুরআনের প্রতিটি নির্ধারিত অংশ সব পরিস্থিতিতে আক্ষরিকভাবে অপরিবর্তিত থাকবে। কিন্তু সুন্নি উসূলুল-ফিকহ অনুযায়ী, এই অংশগুলো উত্তরাধিকারীদের মূল আইনগত অধিকার নির্ধারণ করে; একাধিক বৈধ অধিকার একই সঙ্গে সংঘর্ষে এলে সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগের জন্য একটি নীতির প্রয়োজন হয়। আউল সেই নীতিরই নাম। অতএব বিতর্কটি গণিতের নয়; বরং আইনগত ব্যাখ্যা (legal interpretation) ও প্রয়োগ-পদ্ধতির। কিন্তু কুরআনের ভাষা ও উপস্থাপনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আয়াতগুলোর উদ্দেশ্য ছিল নির্দিষ্ট শ্রেণির ওয়ারিসদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং তাদের অংশ নির্ধারণ করা; প্রতিটি সম্ভাব্য বাস্তব পরিস্থিতির জন্য আলাদা চূড়ান্ত হিসাবের তালিকা দেওয়া নয়।

আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও এটি একটি পরিচিত বিষয়। একটি মূল আইন (statute) সাধারণ নীতি ও অধিকার নির্ধারণ করে, আর সেই নীতিগুলো জটিল বাস্তব পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রয়োগ হবে তা বিচারিক ব্যাখ্যা (interpretation) ও আইনগত নীতিমালার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। ইসলামী ফিকহও একই পদ্ধতিতে বিকশিত হয়েছে। কুরআন মূল নীতিমালা দিয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) সুন্নাহর মাধ্যমে তার ব্যাখ্যা করেছেন, আর যেসব নতুন পরিস্থিতি সরাসরি পাঠ্যে উল্লেখিত ছিল না, সেগুলোর সমাধানে সাহাবিগণ কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ইজতিহাদ করেছেন।

আউল নীতিও ঠিক এমন একটি প্রয়োগমূলক নীতি। এটি নতুন কোনো উত্তরাধিকারী সৃষ্টি করে না, কারও অংশ বাতিল করে না এবং কুরআনে নির্ধারিত অনুপাত পরিবর্তনও করে না। বরং যখন একাধিক বৈধ ফরয অংশ একই সম্পত্তির উপর প্রতিযোগী দাবি সৃষ্টি করে, তখন প্রত্যেকের আপেক্ষিক অনুপাত অক্ষুণ্ণ রেখে সবার অংশ আনুপাতিকভাবে সমন্বয় করা হয়। অর্থাৎ আউল কুরআনের বিকল্প নয়; বরং কুরআনে নির্ধারিত অংশগুলো বাস্তবে কার্যকর করার একটি হিসাবগত পদ্ধতি।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়। ইবনে আব্বাস (রা.), যিনি আউল নীতির বিরোধিতা করেছিলেন, তিনিও কখনো বলেননি যে প্রত্যেক ওয়ারিসকে তাদের নামমাত্র অংশ অপরিবর্তিত অবস্থায় দিয়ে দেওয়া হবে, যদিও যোগফল সম্পত্তির চেয়ে বেশি হয়ে যায়। বরং তিনিও একটি ভিন্ন সমন্বয়-পদ্ধতি প্রস্তাব করেছিলেন, যেখানে কিছু ওয়ারিসের অংশ অপরিবর্তিত রেখে অন্যদের অংশ কমানো হবে। অর্থাৎ তিনিও স্বীকার করেছিলেন যে বাস্তব সংঘর্ষপূর্ণ অবস্থায় কোনো না কোনো সমন্বয় নীতি অপরিহার্য। তাঁর ও উমর (রা.)-এর মধ্যে মতভেদ ছিল কেবল সমন্বয়ের পদ্ধতি নিয়ে; সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নয়।

অতএব প্রকৃত প্রশ্নটি "কুরআনে গাণিতিক ভুল আছে কি না"—এটি নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, কুরআনে নির্ধারিত একাধিক বৈধ অধিকার একই সঙ্গে কার্যকর করতে হলে কোন নীতিতে সমন্বয় করা হবে। সাহাবিদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.), আলী (রা.), উসমান (রা.) এবং উমর (রা.)-এর নেতৃত্বে আনুপাতিক সমন্বয় বা আউল নীতিকে গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীকালে সুন্নি ফিকহে সেটিই ইজমার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়।
আধুনিক যুগের একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি আরও পরিষ্কার করা যায় । কোনো ব্যক্তি যদি দেউলিয়া হয়ে যায় এবং তার মোট সম্পদের চেয়ে পাওনাদারদের বৈধ দাবি বেশি হয়, তাহলে আদালত সাধারণত প্রত্যেক পাওনাদারের দাবি বাতিল করে না; বরং সবার বৈধ দাবি স্বীকার রেখে আনুপাতিকভাবে বণ্টন করে। এতে কারও দাবি অবৈধ হয়ে যায় না, বরং সীমিত সম্পদের মধ্যে সব বৈধ দাবিকে ন্যায্যভাবে কার্যকর করা হয়। ফারায়েজে আউল নীতিও একই ধরনের একটি হিসাবগত সমন্বয়; এটি কুরআনের নির্ধারিত অধিকার পরিবর্তন নয়, বরং সেগুলোর বাস্তবায়নের একটি পদ্ধতি।

সুতরাং আউলের অস্তিত্ব কুরআনের গাণিতিক ভুলের প্রমাণ নয়; বরং এটি দেখায় যে কুরআন উত্তরাধিকারীদের মৌলিক অধিকার নির্ধারণ করেছে, আর জটিল বাস্তব পরিস্থিতিতে সেই অধিকারগুলোর ন্যায়সংগত বাস্তবায়নের জন্য ইসলামী আইনশাস্ত্র একটি সুনির্দিষ্ট ও নীতিনিষ্ঠ প্রয়োগ-পদ্ধতি বিকশিত করেছে। ঠিক যেমন বহু আইনগত ব্যবস্থায় মূল আইনের পাশাপাশি বিচারিক ব্যাখ্যা ও প্রয়োগমূলক নীতিমালা অপরিহার্য হয়, তেমনি ফারায়েজেও আউল সেই প্রয়োগমূলক নীতিরই একটি অংশ।

আইন পড়াশুনা না করে, চায়ের দোকানে বসে, আইনের উপর ঝগড়া করা যেমন হাস্যকর তেমনি ফারায়িদ বিষয়ে না জেনে তর্ক-বিতর্ক করাও একই পর্যায়ের। হাজার বছর ধরে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় আমলাগণ এই অঙ্গনে চাকুরী করেছেন, বিশেষজ্ঞ আইনবিদরা কাজ করেছেন, এরা ম্যাথমেটিশানও ছিলেন। এমন ধরণের একটি বিষয়কে কিছু অত্যুৎসাহী নাস্তিক, খৃষ্টিয়ান, হিন্দু বা অন্যদের কাছ থেকে গিলে যখন রাস্তাঘাটে, ফেসবুকে, ব্লগে ইতাদিতে প্রশ্ন করে বেড়ায়, তখন তাদের মূর্খতাই হাস্যকর দেখায়। এটা যে যেকোনো লোকের বিষয় নয় এবং কোনো নাস্তিকের মাথায় শিং গজিয়ে উঠলে তাকে যে বিশেষজ্ঞের সাথে গিয়ে আলোচনা করতে হবে –এই সাধারণ জ্ঞানটিও আসে না। ৩ মেয়ে, মা-বাপ, স্ত্রী –এই প্রশ্নটি নাস্তিকদের সাইটে গত কয়েক বছর ধরে তাদের নিজেদের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। তারা এখানে সেখানে গিয়ে এই টেক্সট কোট করে আসছে।
ইবনে আব্বাস (রা)-এর দ্বিমত ইসলামি আইনশাস্ত্রের ইতিহাসে একটি স্বাভাবিক ও সম্মানজনক ইখতিলাফ (মতপার্থক্য)। রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, "কোনো বিচারক ইজতিহাদ করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছালে সে দুটি সওয়াব পায়, আর ইজতিহাদ করে ভুল করলেও সে একটি সওয়াব পায়" [সহীহ বুখারী: ৭৩৫২, সহীহ মুসলিম: ১৭১৬]। এই নীতি অনুযায়ী, ইবনে আব্বাস (রা)-এর ইজতিহাদ তাঁর জন্য পুরস্কারযোগ্য একটি আন্তরিক পাণ্ডিত্যপূর্ণ প্রচেষ্টা ছিল, যদিও উম্মাহ শেষ পর্যন্ত ভিন্ন সিদ্ধান্তে ঐকমত্যে পৌঁছেছে।

তাঁর দ্বিমতের অস্তিত্ব প্রমাণ করে না যে কুরআনে গাণিতিক ভুল আছে। বরং এটি প্রমাণ করে, সাহাবিদের মতো গভীর জ্ঞানী ব্যক্তিরাও একটি নির্দিষ্ট, জটিল বাস্তব পরিস্থিতিতে (যা কুরআনে সরাসরি সমাধান করা নেই) সাধারণ নীতিমালা কীভাবে প্রয়োগ হবে তা নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করতে পারতেন — ঠিক যেমন আজও ফিকহের অসংখ্য বিষয়ে চার মাযহাবের মধ্যে ভিন্নমত বিদ্যমান, অথচ কেউই বলে না যে এর ফলে কুরআন বা সুন্নাহ ত্রুটিপূর্ণ। ইমাম আল-জাসসাসের যুক্তিসঙ্গত জবাব ও সাহাবিদের ইজমার মাধ্যমে অধিকতর সুসংগত ও নীতিনিষ্ঠ সমাধানটিই — আউল — চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

কৃতজ্ঞতা: সদালাপ ব্লগ । -রিজভী আহমেদ খান 

মন্তব্য

  • এখনো কোনো মন্তব্য নেই