ফরায়েজ নিয়ে বিভ্রান্তির নিরসন ।: কুরআনের "গাণিতিক ভুল" নাকি ইসলামি আইনশাস্ত্রের স্বাভাবিক পদ্ধতি?

সারসংক্ষেপসূরা আন-নিসার উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত আয়াত (৪ : ১১, ৪ : ১২ ও ৪ : ১৭৬) নিয়ে আধুনিক সময়ে একটি প্রচলিত অভিযোগ হলো, কিছু বাস্তব পরিস্থিতিতে কুরআনে নির্ধারিত অংশগুলোর যোগফল সম্পত্তির চেয়ে বেশি হয়ে যায়; ফলে কুরআনে নাকি "গাণিতিক ভুল" রয়েছে। এই নিবন্ধে উক্ত অভিযোগকে ইসলামী আইনশাস্ত্র, উসূলুল-ফিকহ এবং সাহাবিদের ইজতিহাদের আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রথমে অভিযোগটির প্রকৃতি ও এর অন্তর্নিহিত পূর্বধারণা পর্যালোচনা করা হয়েছে। এরপর দেখানো হয়েছে যে, একাধিক কুরআনি অংশ একই সঙ্গে প্রযোজ্য হলে বাস্তব বণ্টনের প্রশ্নটি ইসলামী ফিকহে আউল (عول) নীতির মাধ্যমে সমাধান করা হয়েছে। পাশাপাশি বিপরীত পরিস্থিতি—যখন নির্ধারিত অংশগুলোর যোগফল একের কম হয়—সেখানে রাদ (رد) নীতির প্রয়োগও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নিবন্ধে ইবনে আব্বাস (রা.)-এর সম্মানজনক ভিন্নমত, ইমাম আল-জাসসাস (রহ.)-এর জবাব এবং সাহাবিদের ইজমার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আলোচনার ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া হয়েছে যে, আউল ও রাদ কুরআনের সংশোধন নয়; বরং কুরআনে নির্ধারিত উত্তরাধিকার-অধিকারসমূহকে জটিল বাস্তব পরিস্থিতিতে কার্যকর করার স্বীকৃত ফিকহি পদ্ধতি। অতএব, আলোচ্য বিষয়টি কোনো গাণিতিক ত্রুটির নয়; বরং কুরআনের আইনগত বিধান বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ হবে, সেই আইনগত ও ফিকহি ব্যাখ্যার বিষয়। |
|---|
গবেষণা-পদ্ধতিএই নিবন্ধে মূলত গুণগত (qualitative) ও গ্রন্থভিত্তিক (library-based) বিশ্লেষণ-পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। গবেষণার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে—
বিশ্লেষণে প্রথমে সমালোচকদের উপস্থাপিত আপত্তি যথাসম্ভব নিরপেক্ষভাবে পুনর্গঠন করা হয়েছে। এরপর আউল ও রাদ নীতির ফিকহি ভিত্তি, সাহাবিদের মতপার্থক্য, ইজমা এবং উসূলুল-ফিকহের আলোকে বিষয়টির মূল্যায়ন করা হয়েছে। নিবন্ধটির উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে আক্রমণ করা নয়; বরং ইসলামী আইনশাস্ত্রে আলোচ্য বিষয়ে গৃহীত ব্যাখ্যা ও যুক্তিগুলো প্রামাণ্য সূত্রের আলোকে উপস্থাপন করা। |
|---|
ভূমিকা
ইসলামী শরিয়তে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি নির্ধারিত বিধান অনুযায়ী উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টনের শাস্ত্রকে ফারায়েজ (الفرائض) বলা হয়। ইসলামী আইনশাস্ত্রের অন্যতম সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ণ শাখা হিসেবে এটি চৌদ্দ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে মুসলিম সমাজে কার্যকর রয়েছে। তবুও আধুনিক সময়ে একটি বহুল আলোচিত আপত্তি হলো—সূরা আন-নিসার উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত আয়াতগুলো (বিশেষত ৪ : ১১ ও ৪ : ১২) একত্রে প্রয়োগ করলে নাকি কখনও কখনও ওয়ারিসদের নির্ধারিত অংশের যোগফল সম্পত্তির চেয়ে বেশি হয়ে যায়; ফলে কুরআনে "গাণিতিক ভুল" রয়েছে।
এই নিবন্ধে উক্ত আপত্তিটি ইসলামী আইনশাস্ত্র, সাহাবিদের ইজতিহাদ এবং সুন্নি ফিকহের আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে আউল (عول) ও রাদ (رد) নীতির মাধ্যমে দেখানো হয়েছে যে আলোচ্য বিষয়টি মূলত কোনো গাণিতিক ত্রুটির নয়; বরং একাধিক বৈধ আইনগত অধিকারের বাস্তব প্রয়োগ ও সমন্বয়ের প্রশ্ন।
দুটি আয়াত ও তাদের বিধান
কিছু সমালোচক দাবি করেন, কুরআনের দুটি আয়াত (সূরা আন-নিসা ৪ : ১১ ও ৪ : ১২) একসাথে মেলালে একটি "গাণিতিক ভুল" ধরা পড়ে। নিচে বিষয়টি ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা করা হলো।
প্রথম আয়াত :
An-Nisa' 4 : 11
يُوصِيكُمُ ٱللَّهُ فِىٓ أَوْلَٰدِكُمْۖ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ ٱلْأُنثَيَيْنِۚ فَإِن كُنَّ نِسَآءً فَوْقَ ٱثْنَتَيْنِ فَلَهُنَّ ثُلُثَا مَا تَرَكَۖ وَإِن كَانَتْ وَٰحِدَةً فَلَهَا ٱلنِّصْفُۚ وَلِأَبَوَيْهِ لِكُلِّ وَٰحِدٍ مِّنْهُمَا ٱلسُّدُسُ مِمَّا تَرَكَ إِن كَانَ لَهُۥ وَلَدٌۚ فَإِن لَّمْ يَكُن لَّهُۥ وَلَدٌ وَوَرِثَهُۥٓ أَبَوَاهُ فَلِأُمِّهِ ٱلثُّلُثُۚ فَإِن كَانَ لَهُۥٓ إِخْوَةٌ فَلِأُمِّهِ ٱلسُّدُسُۚ مِنۢ بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصِى بِهَآ أَوْ دَيْنٍۗ ءَابَآؤُكُمْ وَأَبْنَآؤُكُمْ لَا تَدْرُونَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ لَكُمْ نَفْعًاۚ فَرِيضَةً مِّنَ ٱللَّهِۗ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا
(সম্ভাব্য ভাবানুবাদ)
আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে নির্দেশ দিচ্ছেন, এক ছেলের জন্য দুই মেয়ের অংশের সমপরিমাণ। তবে যদি তারা দুইয়ের অধিক মেয়ে হয়, তাহলে তাদের জন্য হবে, যা সে রেখে গেছে তার তিন ভাগের দুই ভাগ; আর যদি একজন মেয়ে হয় তখন তার জন্য অর্ধেক। আর তার মাতা পিতা উভয়ের প্রত্যেকের জন্য ছয় ভাগের এক ভাগ সে যা রেখে গেছে তা থেকে, যদি তার সন্তান থাকে। আর যদি তার সন্তান না থাকে এবং তার ওয়ারিছ হয় তার মাতা পিতা তখন তার মাতার জন্য তিন ভাগের এক ভাগ। আর যদি তার ভাই-বোন থাকে তবে তার মায়ের জন্য ছয় ভাগের এক ভাগ। অসিয়ত পালনের পর, যা দ্বারা সে অসিয়ত করেছে অথবা ঋণ পরিশোধের পর। তোমাদের মাতা পিতা ও তোমাদের সন্তান-সন্ততিদের মধ্য থেকে তোমাদের উপকারে কে অধিক নিকটবর্তী তা তোমরা জান না। আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
প্রথম আয়াতের বন্টনগুলো নিম্নরুপ :
পুত্র সন্তান একজন কন্যা সন্তানের দ্বিগুণ অংশ পাবে।
কন্যা সন্তান দুই বা ততোধিক হলে তারা একত্রে সম্পত্তির ২/৩ অংশ পাবে (আরবি পাঠে "দুইয়ের অধিক" বলা হলেও হাদিস দ্বারা স্পষ্ট হয়েছে, দুইজন কন্যা হলেও এই একই বিধান প্রযোজ্য — অনেকটা সালাত-যাকাতের মতোই, যার খুঁটিনাটি সুন্নাহ দ্বারা স্পষ্ট হয়েছে)।
কন্যা সন্তান একজন হলে সে অর্ধেক (১/২) অংশ পাবে।
মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে পিতা ও মাতা প্রত্যেকে ১/৬ অংশ করে পাবেন।
মৃত ব্যক্তির সন্তান না থাকলে এবং কেবল পিতা-মাতাই ওয়ারিস হলে, মাতা পাবেন ১/৩ অংশ।
মৃত ব্যক্তির একাধিক ভাই-বোন থাকলে মাতা পাবেন ১/৬ অংশ।
এবার দ্বিতীয় আয়াতটি দেখি :
An-Nisa' 4 : 12
وَلَكُمْ نِصْفُ مَا تَرَكَ أَزْوَٰجُكُمْ إِن لَّمْ يَكُن لَّهُنَّ وَلَدٌۚ فَإِن كَانَ لَهُنَّ وَلَدٌ فَلَكُمُ ٱلرُّبُعُ مِمَّا تَرَكْنَۚ مِنۢ بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصِينَ بِهَآ أَوْ دَيْنٍۚ وَلَهُنَّ ٱلرُّبُعُ مِمَّا تَرَكْتُمْ إِن لَّمْ يَكُن لَّكُمْ وَلَدٌۚ فَإِن كَانَ لَكُمْ وَلَدٌ فَلَهُنَّ ٱلثُّمُنُ مِمَّا تَرَكْتُمۚ مِّنۢ بَعْدِ وَصِيَّةٍ تُوصُونَ بِهَآ أَوْ دَيْنٍۗ وَإِن كَانَ رَجُلٌ يُورَثُ كَلَٰلَةً أَوِ ٱمْرَأَةٌ وَلَهُۥٓ أَخٌ أَوْ أُخْتٌ فَلِكُلِّ وَٰحِدٍ مِّنْهُمَا ٱلسُّدُسُۚ فَإِن كَانُوٓا۟ أَكْثَرَ مِن ذَٰلِكَ فَهُمْ شُرَكَآءُ فِى ٱلثُّلُثِۚ مِنۢ بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصَىٰ بِهَآ أَوْ دَيْنٍ غَيْرَ مُضَآرٍّۚ وَصِيَّةً مِّنَ ٱللَّهِۗ وَٱللَّهُ عَلِيمٌ حَلِيمٌ
(সম্ভাব্য ভাবানুবাদ)
আর তোমাদের জন্য তোমাদের স্ত্রীগণ যা রেখে গেছে তার অর্ধেক, যদি তাদের কোন সন্তান না থাকে। আর যদি তাদের সন্তান থাকে, তবে তারা যা রেখে গেছে তা থেকে তোমাদের জন্য চার ভাগের এক ভাগ। তারা যে অসিয়ত করে গেছে তা পালনের পর অথবা ঋণ পরিশোধের পর। আর স্ত্রীদের জন্য তোমরা যা রেখে গিয়েছ তা থেকে চার ভাগের একভাগ, যদি তোমাদের কোন সন্তান না থাকে। আর যদি তোমাদের সন্তান থাকে তাহলে তাদের জন্য আট ভাগের এক ভাগ, তোমরা যা রেখে গিয়েছে তা থেকে। তোমরা যে অসিয়ত করেছ তা পালন অথবা ঋণ পরিশোধের পর। আর যদি মা বাবা এবং সন্তান-সন্ততি নাই এমন কোন পুরুষ বা মহিলা মারা যায় এবং তার থাকে এক ভাই অথবা এক বোন, তখন তাদের প্রত্যেকের জন্য ছয় ভাগের একভাগ। আর যদি তারা এর থেকে অধিক হয় তবে তারা সবাই তিন ভাগের এক ভাগের মধ্যে সমঅংশীদার হবে, যে অসিয়ত করা হয়েছে তা পালনের পর অথবা ঋণ পরিশোধের পর। কারো কোন ক্ষতি না করে। আল্লাহর পক্ষ থেকে অসিয়তস্বরূপ। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সহনশীল।
দ্বিতীয় আয়াতের বন্টনগুলো নিম্নরুপ :
স্ত্রীর সন্তান না থাকলে স্বামী স্ত্রীর সম্পত্তির ১/২ অংশ পাবেন।
স্ত্রীর সন্তান থাকলে স্বামী পাবেন ১/৪ অংশ।
স্বামীর সন্তান না থাকলে স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তির ১/৪ অংশ পাবেন।
স্বামীর সন্তান থাকলে স্ত্রী পাবেন ১/৮ অংশ।
মৃত ব্যক্তির (পুরুষ বা নারী) পিতা-মাতা ও সন্তান-সন্ততি কেউ না থাকলে, তবে এক ভাই বা এক বোন থাকলে, প্রত্যেকে পাবেন ১/৬ অংশ।
এমন ভাই-বোন একাধিক হলে তারা সবাই একত্রে ১/৩ অংশে সমঅংশীদার হবেন।
অভিযোগটি আসলে কী?
লক্ষ করুন — একটিমাত্র আয়াতের নিজের ভেতরেই যদি একাধিক শর্ত মেলে (যেমন দুই বা ততোধিক কন্যা + পিতা-মাতা), তাহলে কোনো সমস্যা নেই: কন্যাগণ ২/৩, পিতা-মাতা একত্রে (১/৬+১/৬)=১/৩। যোগফল = ২/৩+১/৩ = ১। নিখুঁত।
সমালোচকদের অভিযোগ তৈরি হয় তখনই, যখন ৪:১১-এর কন্যাদের অংশ (২/৩) ও পিতা-মাতার অংশ (১/৩) — এই দুটোর সাথে সম্পূর্ণ ভিন্ন আয়াত ৪:১২-এর স্ত্রীর অংশ (১/৮) জোর করে একত্রে যোগ করা হয়:
২/৩ + ১/৩ + ১/৮ = ২৭/২৪ (১-এর বেশি)
এখান থেকেই "গাণিতিক ভুল"-এর দাবি ওঠে — দাবিটা এই যে, একজন মৃত ব্যক্তির যদি একাধিক কন্যা, পিতা-মাতা এবং স্ত্রী — সবাই একসাথে জীবিত থাকেন (যা বাস্তবে অস্বাভাবিক কিছু নয়, বরং অত্যন্ত সাধারণ), তাহলে কুরআনের নির্দেশিত অংশগুলো মেনে চললে সম্পত্তির চেয়ে বেশি বিতরণ করতে হয়ে যায়।
কেন এটি প্রকৃত ভুল নয়
এই আয়াতগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল তৎকালীন প্রচলিত আরব উত্তরাধিকার প্রথায় পরিবর্তন এনে কন্যা, মাতা-পিতা ও স্ত্রীর জন্য নির্দিষ্ট, প্রাপ্য অংশ প্রতিষ্ঠা করা — যেখানে ইসলাম-পূর্ব আরবে নারী ও শিশুরা প্রায়ই সম্পত্তি থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত থাকতেন। সম্পত্তি গণনা ও বণ্টনের গাণিতিক পদ্ধতি আগে থেকেই প্রচলিত ছিল; কুরআন সেই পদ্ধতির মধ্যেই নতুন অধিকারীদের অন্তর্ভুক্ত করে দিয়েছে।
অর্থাৎ এই আয়াতগুলো প্রতিটি সম্ভাব্য সংমিশ্রণ পরিস্থিতির জন্য আলাদা আলাদা চূড়ান্ত সংখ্যা বলে দেয়নি — বরং প্রত্যেক শ্রেণীর ওয়ারিসের আপেক্ষিক অধিকার ও গুরুত্ব নির্ধারণ করে দিয়েছে। ফলে বাস্তবে যখন একাধিক শ্রেণীর ওয়ারিস (কন্যা, পিতা-মাতা, স্ত্রী) একসাথে উপস্থিত থাকেন, তখন প্রত্যেকের অংশ আলাদাভাবে হিসাব করলে যোগফল ১-এর বেশি হয়ে যেতে পারে। এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়, বরং প্রত্যাশিতই। প্রশ্ন হলো — এমন বাস্তব সংমিশ্রণ পরিস্থিতিতে করণীয় কী?
সমাধান : "আউল" নীতি
সাহাবি যুগে যখন বাস্তবে এমন পরিস্থিতি এলো যেখানে ওয়ারিসদের প্রাপ্য অংশের যোগফল ১-এর বেশি হয়ে যাচ্ছিল, তখন একটি সমাধান দেওয়া হয় : প্রতিটি ওয়ারিসের আপেক্ষিক অনুপাত অক্ষুণ্ণ রেখে সবার অংশ সমান হারে কমিয়ে যোগফল ঠিক ১-এ নিয়ে আসা। এই পদ্ধতির নাম "আউল" নীতি, যা ফারায়েজ শাস্ত্রে সুপরিচিত। এটি কারো ব্যক্তিগত খেয়ালখুশির সিদ্ধান্ত ছিল না। ইসলামি আইনশাস্ত্রে (উসূল আল-ফিকহ) বিধান নির্ণয়ের একটি সুস্পষ্ট ক্রম আছে: প্রথমে কুরআনের স্পষ্ট নির্দেশ (নস্), তারপর রাসূলুল্লাহ (স)-এর সুন্নাহ, তারপর সাহাবিদের ইজমা (ঐকমত্য) ও ইজতিহাদ, তারপর কিয়াস (analogical reasoning)। ইমাম আবু হানিফা (রহ) নিজের পদ্ধতি সম্পর্কে বলেছেন —ইমাম আবু হানিফা (রহ) নিজের পদ্ধতি সম্পর্কে বলেছেন :
"আমি কুরআনের উপর নির্ভর করি। কুরআনে যা পাই না, তার জন্য রাসূলুল্লাহ (স)-এর সুন্নাহর উপর নির্ভর করি। কুরআন-সুন্নাহ কোথাও না পেলে সাহাবিদের মতামত ও শিক্ষার উপর নির্ভর করি, তার বাইরে যাই না।" [?]
এই পদ্ধতি কোনো মানবসৃষ্ট সংযোজন নয় — কুরআন নিজেই সাহাবিদের ঐকমত্যকে স্বীকৃতি ও প্রশংসা দিয়েছে [?]সালাত, যাকাত ও রোযার ক্ষেত্রেও ঠিক এই একই প্যাটার্ন দেখা যায় — কুরআন পালনের নির্দেশ দিয়েছে, কিন্তু নামাজের রাকাতসংখ্যা, যাকাতের নিসাব-হার, রোযার খুঁটিনাটি — এসব সুন্নাহর মাধ্যমে এসেছে। কেউ এটাকে কুরআনের "ভুল" বলে না, কারণ কুরআন কখনো দাবি করেনি যে ওই খুঁটিনাটিও তার নিজের টেক্সটেই থাকবে।
রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, তাঁর উম্মতের মধ্যে ফারায়েজ শাস্ত্রে সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তি হলেন যায়েদ বিন সাবিত (রা) [?]। হযরত আলী (রা)-ও এক জুমুআর খুতবায় যায়েদ বিন সাবিতের অনুরূপ ফতোয়া প্রদান করেন [?]। আমীরুল মুমিনীন উমর (রা)সহ প্রায় সকল সাহাবি এই ইজতিহাদ সমর্থন করেন, এবং সাহাবিদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে এটি ইজমা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়[?] ।
উদাহরণ : দুই কন্যা, পিতা-মাতা ও স্ত্রী
আউল নীতি প্রয়োগ করলে এই পরিস্থিতিতে বণ্টন দাঁড়ায় :
ওয়ারিস | প্রাপ্ত অংশ |
|---|---|
স্ত্রী | ৩/২৭ |
পিতা | ৪/২৭ |
মাতা | ৪/২৭ |
কন্যাগণ (একত্রে) | ১৬/২৭ |
যোগফল : ৩/২৭ + ৪/২৭ + ৪/২৭ + ১৬/২৭ = ২৭/২৭ = ১
অর্থাৎ সম্পূর্ণ সম্পত্তিই যথাযথভাবে বণ্টিত হয়ে যায় — কোনো ঘাটতি বা উদ্বৃত্ত থাকে না। মূল আয়াতে উল্লেখিত অনুপাত (যেমন স্ত্রীর ১/৮, পিতা-মাতার ১/৬ করে, কন্যাদের ২/৩) অক্ষুণ্ণ রেখে কেবল হর (denominator) সমন্বয় করা হয়েছে, যাতে প্রত্যেকের পারস্পরিক অনুপাত ঠিক থাকে।
রাদ (رد) নীতি : যোগফল ১-এর কম হলে কী হয়?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়। সমালোচকেরা সাধারণত শুধু সেই পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেন যেখানে নির্ধারিত অংশগুলোর যোগফল ১-এর বেশি হয়ে যায় (আউল)। কিন্তু ইসলামী ফারায়েজে এর ঠিক বিপরীত একটি পরিস্থিতিও রয়েছে, যেখানে নির্ধারিত অংশগুলোর যোগফল ১-এর কম হয় এবং সম্পত্তির একটি অংশ অবশিষ্ট থেকে যায়। এই অবস্থায় প্রযোজ্য নীতিকে বলা হয় রাদ (رد)।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো মৃত ব্যক্তি যদি একজন কন্যা এবং মাকে রেখে যান, তবে কন্যা কুরআন অনুযায়ী পাবে ১/২ এবং মাতা পাবে ১/৬। মোট যোগফল দাঁড়ায় ২/৩। অর্থাৎ সম্পত্তির ১/৩ অংশ অবশিষ্ট থাকে। যদি সেখানে কোনো আসাবা (অবশিষ্টাংশের অধিকারী) না থাকে, তাহলে এই অবশিষ্ট অংশ কার কাছে যাবে—কুরআনে এই নির্দিষ্ট পরিস্থিতির জন্য আলাদা করে বলা হয়নি। সাহাবিগণ ও পরবর্তী ফকীহরা কুরআন ও সুন্নাহর সাধারণ নীতির আলোকে সিদ্ধান্ত দেন যে, অবশিষ্ট অংশও নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে ফরয অংশের ওয়ারিসদের মধ্যেই তাদের অনুপাতে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এই নীতিই রাদ নামে পরিচিত।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, আউল ও রাদ—উভয়ই একই আইনগত বাস্তবতার দুটি ভিন্ন দিক। এক ক্ষেত্রে বৈধ দাবির যোগফল সম্পত্তির চেয়ে বেশি হয়ে যায়, অন্য ক্ষেত্রে কম হয়ে যায়। উভয় অবস্থাতেই প্রশ্নটি হলো, কুরআনে নির্ধারিত অংশগুলো বাস্তবে কীভাবে কার্যকর করা হবে। সাহাবিদের ইজতিহাদ ও পরবর্তী ফিকহি ঐতিহ্য এই দুই ধরনের পরিস্থিতিরই সমাধান প্রদান করেছে। যদি আউলকে "কুরআনের অসম্পূর্ণতা" বলা হয়, তাহলে একই যুক্তিতে রাদকেও "অসম্পূর্ণতা" বলতে হবে। অথচ বাস্তবে ইসলামী আইনশাস্ত্রে আউল ও রাদ—উভয়কেই কুরআনের নির্ধারিত অধিকারগুলোর বাস্তব প্রয়োগের স্বীকৃত পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কুরআনের সংশোধন হিসেবে নয়।
উদাহরণ: স্ত্রী ও এক বোন
কল্পনা করুন, একজন পুরুষ মারা গেলেন, রেখে গেলেন স্ত্রী ও একজন (সহোদর) বোন — সন্তান, পিতা-মাতা, ভাই কেউই নেই।
স্ত্রীর অংশ (৪:১২, সন্তান না থাকায়) = ১/৪
একক বোনের অংশ (কালালাহ, ৪:১৭৬) = ১/২
যোগফল = ১/৪ + ১/২ = ৩/৪ — সম্পত্তির চেয়ে কম, ঘাটতি ১/৪। কোনো আসাবা নেই এই ঘাটতি নেওয়ার জন্য। এখানে প্রশ্ন: বাকি ১/৪ কোথায় যাবে?
পক্ষ | নামমাত্র অংশ | রাদের পর (স্ত্রী বাদে) |
|---|---|---|
স্ত্রী | ১/৪ | ১/৪ (অপরিবর্তিত) |
বোন | ১/২ | ৩/৪ (ঘাটতি শোষণ করে) |
যোগফল | ৩/৪ (<১) | ১ |

এটি কি কুরআন সংশোধনের চেষ্টা?
না। ২+ কন্যা, পিতা-মাতা ও স্ত্রী একত্রে থাকার এই নির্দিষ্ট সম্মিলিত পরিস্থিতি নিয়ে কুরআনে সরাসরি কোনো চূড়ান্ত সংখ্যা উল্লেখ নেই — তাই এখানে "ভুল সংশোধন"-এর প্রশ্নই আসে না। সাহাবিগণ কুরআনের মূলনীতির আলোকে একটি হিসাব বের করেছেন মাত্র। ইসলামি আইনশাস্ত্রে (উসূল আল-ফিকহ) বিধান নির্ণয়ের একটি সুস্পষ্ট ক্রম আছে : প্রথমে কুরআনের স্পষ্ট নির্দেশ (নস্), তারপর রাসূলুল্লাহ (স)-এর সুন্নাহ, তারপর সাহাবিদের ইজমা (ঐকমত্য) ও ইজতিহাদ, তারপর কিয়াস (analogical reasoning)। সাহাবী রা গন এই পদ্ধিতিই অনুসরণ করেছেন ।
এর তুলনা করা যায় সালাত, যাকাত ও রোযার সাথে — কুরআনে এগুলো পালনের নির্দেশ আছে, কিন্তু বিস্তারিত পদ্ধতি বলা নেই। রাসূলুল্লাহ (স) সুন্নাহর মাধ্যমে সেই বিস্তারিত পদ্ধতি শিখিয়েছেন, সুন্নাহ পর ফিকহের মাধ্যমে এগুলো আরো বিস্তারিত হয়েছে । এটাকে কেউ কুরআনের "ভুল" বলে না — ঠিক তেমনি ফারায়েজেও এমন হয়েছে ।
এখানে একটি মৌলিক বিষয় বোঝা জরুরি। কুরআন যখন কোনো ওয়ারিসের জন্য "অর্ধেক", "দুই-তৃতীয়াংশ" বা "এক-ষষ্ঠাংশ" নির্ধারণ করে, তখন তা মূলত তার আইনগত প্রাপ্য (legal entitlement) নির্ধারণ করছে। কিন্তু একাধিক বৈধ প্রাপ্য একই সম্পত্তির উপর একযোগে প্রযোজ্য হলে সেগুলো কীভাবে বাস্তবে কার্যকর (enforcement) হবে, সেটি একটি পৃথক প্রশ্ন। আইনশাস্ত্রে অধিকার নির্ধারণ (determination of rights) এবং সেই অধিকার বাস্তবায়নের পদ্ধতি (mode of enforcement) এক বিষয় নয়। আউল নীতি এই দ্বিতীয় স্তরের একটি প্রয়োগমূলক নীতি; এটি কুরআনে নির্ধারিত অধিকার বাতিল বা সংশোধন করে না,বরং সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগের পদ্ধতি নির্ধারণ করে এবং বৈধ দাবিকে একই সঙ্গে কার্যকর করার একটি ন্যায়সংগত পদ্ধতি প্রদান করে।
সুতরাং আমাদের কাছে স্পষ্টত হলো এখানে কোন গাণিতিক ভুল নেই। ১৪০০ বছর ধরে এই পদ্ধিতে সম্পত্তির বন্টন চলে আসছে, কোথায় কেউ তো বলল না, কুরআন অনুযায়ী সম্পত্তির হিসাব করা যাচ্ছে না! এতে গাণিতিক ভুল আছে?
নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সহনশীল।
এখানে একেক অবস্থায় একেকভাবে বণ্টন দেখা যাবে। এখানে এই লিঙ্কে [?]। সেই বিস্তৃতি লক্ষ্য করা যাবে। ইসলামী আইনে ফারায়েজ (فرائض) হচ্ছে একটি ব্যাপক অঙ্গন। বলা হয় এটি ইসলামী জ্ঞানের অর্ধেক। এটি বিশেষজ্ঞ বিষয়। আলোচ্য প্রসঙ্গে ৪ : ১১/৪ : ১১ আয়াত ফারায়িদের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত বিষয় নয় বরং এতে সম্পদে মেয়েদের এবং স্ত্রীর অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয় এসেছে। এখানে আরবের প্রচলিত আইনে পরিবর্তন আনা হয়েছে। অংক কষার নিয়ম আগেই ছিল এবং সেই নিয়মেই পরিবর্তনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। হিসাবে, মূল অধিকারীদের ক্যাটাগরি বা ক্ষেত্র স্থির করা, অর্থাৎ অংশের সমষ্টিকে নির্ধারণ করা, এই নীতির ভিত্তিতে যে, সমষ্টি যদি ১ এর ঊর্ধ্বে ওঠে, তবে অংশগুলোকে আনুপাতিকভাবে কমিয়ে ১ করা হবে এবং বিতরণ করা হবে। এর উপরে সাহাবা রা : গণ একমত হয়েছেন এবং এই সিস্টেম এখনো কাজ করে। উপরে দেয়া লিঙ্কে সেই নিয়মই কাজ করছে।
ইবনে আব্বাস (রা)-এর দ্বিমত : আউল নীতি নিয়ে একমাত্র উল্লেখযোগ্য ভিন্নমত
পূর্ববর্তী আলোচনায় বলা হয়েছিল, আউল নীতির ব্যাপারে সাহাবিগণ ঐকমত্যে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু এখানে সৎ ও স্বচ্ছ থাকা জরুরি — এই ঐকমত্য সম্পূর্ণরূপে সর্বসম্মত ছিল না শুরুতে। উম্মাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহাবি, "তারজুমানুল কুরআন" (কুরআনের ব্যাখ্যাকার) খ্যাত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) একাই এই নীতির বিরোধিতা করেছিলেন। সমালোচকরা প্রায়ই এই ঘটনাকে ব্যবহার করে বলে থাকেন — "খোদ একজন শীর্ষস্থানীয় সাহাবিই যখন বলেছেন এটি কুরআনবিরোধী, তখন নিশ্চয়ই উমর (রা) কুরআন সংশোধন করেছিলেন।" এই দাবিটি বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
ইবনে আব্বাস (রা) কে ছিলেন?
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর চাচাতো ভাই এবং তাঁর চাচা আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রা)-এর পুত্র। তিনি উম্মাহর মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী মুফাসসির হিসেবে স্বীকৃত এবং তাঁকে "হিবরুল উম্মাহ" (উম্মাহর জ্ঞান-সাগর) উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তাঁর মর্যাদা ও পাণ্ডিত্য নিয়ে উম্মাহর মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই। ঠিক এই কারণেই তাঁর দ্বিমতটি গুরুত্বসহকারে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন — এটি কোনো দুর্বল বা অজ্ঞতাপ্রসূত মতামত ছিল না, বরং একজন শীর্ষস্থানীয় মুজতাহিদের ইজতিহাদ।
মজার বিষয় হলো, ইতিহাসের একটি সূক্ষ্ম দিক প্রায়ই উপেক্ষিত হয় : ইমাম সারাখসী (রহ) তাঁর বিখ্যাত আল-মাবসূত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, আউল নীতি সর্বপ্রথম প্রস্তাব করেছিলেন খোদ ইবনে আব্বাসের পিতা আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রা) — যিনি উমর (রা)-কে বলেছিলেন, "আউল প্রয়োগ করুন।" অর্থাৎ পিতা আউল নীতির প্রবর্তক, আর পুত্র (ইবনে আব্বাস) তাঁর নিজস্ব ইজতিহাদের ভিত্তিতে এর বিরোধিতা করেন [?]।
মূল ঘটনা : যেখান থেকে বিতর্কের সূত্রপাত
উমর (রা)-এর খিলাফতের প্রথম দিকে একটি ঘটনা ঘটে — এক নারী মারা যান, রেখে যান একজন স্বামী ও দুই বোন (সন্তান বা পিতা-মাতা কেউই জীবিত ছিলেন না)।
স্বামীর অংশ (সূরা নিসা ৪ : ১২ অনুযায়ী, সন্তান না থাকলে) = ১/২
দুই বোনের অংশ একত্রে (কালালাহ সংক্রান্ত আয়াত অনুযায়ী) = ২/৩
সূরা আন-নিসার শেষ আয়াতে বলা হয়েছে :
يَسْتَفْتُونَكَ قُلِ اللَّهُ يُفْتِيكُمْ فِي الْكَلَالَةِ ۚ إِنِ امْرُؤٌ هَلَكَ لَيْسَ لَهُ وَلَدٌ وَلَهُ أُخْتٌ فَلَهَا نِصْفُ مَا تَرَكَ ۚ وَهُوَ يَرِثُهَا إِن لَّمْ يَكُن لَّهَا وَلَدٌ ۚ فَإِن كَانَتَا اثْنَتَيْنِ فَلَهُمَا الثُّلُثَانِ مِمَّا تَرَكَ ۚ وَإِن كَانُوا إِخْوَةً رِّجَالًا وَنِسَاءً فَلِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنثَيَيْنِ ۗ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمْ أَن تَضِلُّوا ۗ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ (৪ : ১৭৬)
অনুবাদ : লোকেরা তোমার কাছে ফতোয়া জিজ্ঞেস করে। বল, আল্লাহ তোমাদেরকে কালালাহ্ (নিঃসন্তান ও পিতৃহীন ব্যক্তি) সম্পর্কে ফতোয়া দিচ্ছেন। কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তার সন্তান না থাকলে কিন্তু বোন থাকলে, সে যা রেখে গেছে তার অর্ধেক সে পাবে... আর যদি তারা দুইজন হয় তবে তারা যা রেখে গেছে তার দুই-তৃতীয়াংশ তারা পাবে...
এই দুটি অংশ (১/২ + ২/৩) একত্রে যোগ করলে দাঁড়ায় ৭/৬—অর্থাৎ সম্পত্তির পরিমাণের চেয়ে বেশি। এই পরিস্থিতিতে হযরত উমর (রা.) সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। তিনি বলেন, কুরআনে এমন কোনো নির্দেশ তিনি পাচ্ছেন না, যেখানে এই নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এক ওয়ারিসকে অন্য ওয়ারিসের উপর অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। তখন আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রা.) একটি ঋণের উপমা (debt analogy) পেশ করেন : যেমন একজন ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির সম্পদের তুলনায় পাওনাদারদের বৈধ দাবি বেশি হলে সবার দাবি আনুপাতিকভাবে সমন্বয় করা হয়, তেমনি এখানেও সব বৈধ ফরয অংশকে আনুপাতিকভাবে সমন্বয় করা উচিত। অধিকাংশ সাহাবি এই নীতিকে গ্রহণ করেন, যা পরবর্তীকালে আউল নামে পরিচিত হয়। তবে তবে তাঁর পুত্র আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এই পদ্ধতির সঙ্গে একমত হননি; তিনি ভিন্ন একটি ইজতিহাদ পেশ করেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) র অবস্থান কী ছিল?
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা)-এর যুক্তি ছিল, ফরয অংশগুলোর মধ্যে সবগুলো সমান মর্যাদার নয়। তাঁর মতে, কিছু ওয়ারিসের অংশ (যেমন স্বামী/স্ত্রী, পিতা-মাতা) কুরআনে সম্পূর্ণ নির্দিষ্ট ও চূড়ান্তভাবে বলা হয়েছে — সন্তান থাকা বা না-থাকার উপর ভিত্তি করে তাদের একটিমাত্র সুনির্দিষ্ট মান আছে (যেমন স্বামীর জন্য ১/২ অথবা ১/৪, আর কিছু নয়), আর এই মান কখনোই আরও কমানো যাবে না। অন্যদিকে কন্যা বা বোনদের ২/৩ অংশটিকে তিনি একটি "ঊর্ধ্বসীমা" হিসেবে দেখতেন — কারণ ভাই থাকলে তারা নির্দিষ্ট অংশীদার (সাহিবুল ফরয) থেকে অবশিষ্টাংশীদার (আসাবা)-এ রূপান্তরিত হয়। তাই ঘাটতি দেখা দিলে, এই "নমনীয়" শ্রেণীই তা বহন করবে — নির্দিষ্ট-মানের ওয়ারিসরা নয়।
এই নীতি প্রয়োগ করলে মূল ঘটনায় ফলাফল দাঁড়াতো এরকম :
পক্ষ | নামমাত্র অংশ | আউল পদ্ধতিতে (উমর ও জমহুরের মত) | ইবনে আব্বাসের পদ্ধতিতে |
|---|---|---|---|
স্বামী | ১/২ | ৩/৭ | ১/২ (অপরিবর্তিত) |
দুই বোন (একত্রে) | ২/৩ | ৪/৭ | ১/২ (হ্রাসকৃত, অর্থাৎ প্রত্যেকে ১/৪) |
যোগফল | ৭/৬ (>১) | ১ | ১ |
লক্ষণীয় বিষয় হলো, ইবনে আব্বাসের পদ্ধতিতেও বোনদের অংশ তাদের নামমাত্র ২/৩ থেকে কমে ১/২-এ নেমে আসছে। এই পর্যবেক্ষণটি পরবর্তীতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ইমাম আল-জাসসাসের জবাব : কেন এই যুক্তি ধোপে টেকে না
ইমাম আল-জাসসাসের জবাব
ইমাম আবু বকর আল-জাসসাস (রহ) তাঁর আহকামুল কুরআনে চারটি মূল যুক্তিতে জবাব দেন:
১. অগ্রাধিকারের নীতি ভুল ক্ষেত্রে প্রযুক্ত, এবং কুরআনে কোনো অগ্রাধিকার-ক্রম নেই। কাউকে অন্যের চেয়ে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি কেবল আসাবা-ব্যবস্থায় প্রযোজ্য, ফরয-ব্যবস্থায় নয়। আল্লাহ বোনের অংশ যতটা স্পষ্ট বলেছেন, স্বামী-মাতার অংশও ততটাই স্পষ্ট — কোনটা "কম গুরুত্বপূর্ণ" তার টেক্সটীয় ইঙ্গিত নেই। সংঘর্ষপূর্ণ পরিস্থিতিতে কার অংশ আগে অক্ষত থাকবে, কার পরে কমবে — তার জন্য কুরআনি বা সুন্নাহগত কোনো সুস্পষ্ট দলিলও নেই।
২. ঋণ-সদৃশ আনুপাতিক হ্রাস অধিক যুক্তিসঙ্গত ও সর্বজনস্বীকৃত। একাধিক বৈধ দাবি সীমিত সম্পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে, প্রত্যেকের দাবি আনুপাতিক হারে কমানোই সর্বজনস্বীকৃত নীতি, কাউকে সম্পূর্ণ বাদ না দিয়ে। কুরআন নিজে এই সংঘর্ষের জন্য অগ্রাধিকার-ক্রম বলেনি, তাই এই সাধারণ নীতিই স্বাভাবিকভাবে প্রযোজ্য — এটা কুরআনের সংশোধন নয়, নীরবতা পূরণ।
৩. নির্বাচনী হ্রাসে সমতা বিঘ্নিত হয়। ইবনে আব্বাসের পদ্ধতিতে কিছু ওয়ারিস নামমাত্র অংশ সম্পূর্ণ পান, অন্যদের অংশ একতরফা কমে — অথচ উভয়ের দাবিই কুরআনে সমান মর্যাদার ফরয। সুস্পষ্ট দলিল ছাড়া এক শ্রেণীকে অক্ষত রেখে অন্য শ্রেণীর উপর পুরো ঘাটতি চাপানো ন্যায়সংগত নয়।
৪. পুত্র-কন্যার উদাহরণেই একই নীতি বিদ্যমান। একা পুত্র সম্পূর্ণ সম্পত্তি (আসাবা) পায়; একা কন্যা অর্ধেক (ফরয) পায়। একত্রে থাকলে কেউই নিজের "একক অবস্থার" পূর্ণ অংশ পায় না — ২:১ অনুপাতে ভাগ হয়। এটাও এক ধরনের "আউল"-সদৃশ সমন্বয়, অথচ কেউ এটাকে ভুল বলে না।[?]
সাহাবাদের ইজমা ও পরবর্তী মাযহাবসমূহের অবস্থান :
উমর (রা)-এর এই সিদ্ধান্তে আলী (রা), উসমান (রা), যায়েদ বিন সাবিত (রা) সহ প্রায় সকল প্রথম সারির সাহাবি সমর্থন জানান। ইবনুল আরাবি (রহ) ও ইবনে কুদামা (রহ) — উভয়েই নিশ্চিত করেছেন যে পরবর্তীতে উম্মাহ উমর (রা)-এর সিদ্ধান্তের উপর ইজমায় (ঐকমত্যে) পৌঁছেছিল [?]। ইমাম ইবনে কুদামা (রহ) তাঁর আল-মুগনী গ্রন্থে স্পষ্ট করেন যে আউল কেবল তখনই প্রযোজ্য যখন কুরআনে নির্ধারিত ফরয অংশগুলো একত্রে সম্পত্তির চেয়ে বেশি দাবি করে বসে — অর্থাৎ অংশগুলো নিজেরাই কুরআনের, আউল শুধু সেগুলোর ভিত্তিতে হিসাব করার একটি পদ্ধতি মাত্র, কোনো প্রতিস্থাপন নয় [?]।
চার সুন্নি মাযহাবই (হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী, হাম্বলী) পরবর্তীতে আউল নীতি সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করে। বর্তমানে ফিকহের ইতিহাসে এমন কোনো পরিচিত আলিম নেই যিনি ইবনে আব্বাসের এই নির্দিষ্ট অবস্থান অনুসরণ করেন। (উল্লেখ্য, পরবর্তীতে শিয়া জাফরি ফিকহ তাদের নিজস্ব উসূলের ভিত্তিতে একটি ভিন্ন ব্যবস্থা গড়ে তোলে, যার সাথে ইবনে আব্বাসের যুক্তির কাঠামোগত মিল রয়েছে — কিন্তু এটি সুন্নি মূলধারার ইজমা থেকে সম্পূর্ণ পৃথক একটি বিষয়, ভিন্ন উসূলুল ফিকহ নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত।)

তাহলে কি উমর (রা) প্রকৃতপক্ষে কুরআন সংশোধন করেছিলেন?
এখানেই মূল প্রশ্নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জবাবটি নিহিত। লক্ষ করুন — ইবনে আব্বাস (রা) নিজেও তো "নামমাত্র" অংশগুলো হুবহু পরিশোধ করার প্রস্তাব দেননি। তাঁর পদ্ধতিতেও দুই বোনের প্রাপ্য ২/৩ কমে ১/২-এ নেমে এসেছে (উপরের সারণি দ্রষ্টব্য)। অর্থাৎ, উমর (রা) এবং ইবনে আব্বাস (রা) — উভয়েই স্বীকার করেছিলেন যে, একাধিক ফরয অংশ একত্রে সম্পত্তির চেয়ে বেশি দাবি করলে কোনো-না-কোনো সমন্বয় প্রক্রিয়া অপরিহার্য। কেউই বলেননি, "যা লেখা আছে তা-ই আক্ষরিকভাবে দিতে হবে, তা ১-এর বেশি হলেও।"
তাঁদের মতভেদ ছিল শুধু কোন নীতি অনুযায়ী এই সমন্বয় হবে তা নিয়ে — উমর ও অধিকাংশ সাহাবি বলেছেন আনুপাতিক হ্রাস (ঋণের উপমায়), ইবনে আব্বাস বলেছেন নির্বাচনী অগ্রাধিকার। দুটোই ছিল ইজতিহাদ — কুরআন যে নির্দিষ্ট সংঘর্ষপূর্ণ পরিস্থিতির জন্য সরাসরি সংখ্যা বলে দেয়নি, সেই শূন্যস্থান পূরণের প্রচেষ্টা। সুতরাং "ইবনে আব্বাসও স্বীকার করেছেন উমর কুরআন সংশোধন করেছেন" — এই দাবিটি বিভ্রান্তিকর। বরং সঠিক চিত্র হলো : দুইজন মুজতাহিদ সাহাবি একই সমস্যার দুটি ভিন্ন সমাধান প্রস্তাব করেছিলেন, আর উম্মাহ ইজমার মাধ্যমে অধিক যুক্তিসঙ্গত সমাধানটি গ্রহণ করেছে। এটি কুরআনে ভুল থাকার প্রমাণ নয়; বরং এটি প্রমাণ করে যে conflicting শর্তগুলোকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে বাড়তি একটি নীতির প্রয়োজন ছিল, যা সুন্নাহ ও ইজতিহাদের মাধ্যমে পূরণ হয়েছে — ঠিক যেমনটি পূর্ববর্তী অধ্যায়ে সালাত-যাকাতের উদাহরণে বলা হয়েছিল।
আগের উদাহরণে প্রয়োগ করলে
পূর্ববর্তী অধ্যায়ে আলোচিত "দুই কন্যা, পিতা-মাতা ও স্ত্রী"-র ঘটনায় ইবনে আব্বাসের নীতিটি (যৌক্তিক সম্প্রসারণ হিসেবে) প্রয়োগ করলে ফলাফল দাঁড়াতো এরকম :
পক্ষ | নামমাত্র অংশ | আউল পদ্ধতিতে (জমহুর) | ইবনে আব্বাসের নীতি প্রয়োগে |
|---|---|---|---|
স্ত্রী | ১/৮ | ৩/২৭ | ১/৮ (=৩/২৪, অপরিবর্তিত) |
পিতা | ১/৬ | ৪/২৭ | ১/৬ (=৪/২৪, অপরিবর্তিত) |
মাতা | ১/৬ | ৪/২৭ | ১/৬ (=৪/২৪, অপরিবর্তিত) |
কন্যাগণ (একত্রে) | ২/৩ | ১৬/২৭ | ১৩/২৪ (হ্রাসকৃত) |
যোগফল | >১ | ১ | ১ |
উভয় পদ্ধতিতেই যোগফল ঠিক ১-এ পৌঁছায় — শুধু ভেতরের বণ্টন-অনুপাত ভিন্ন। এটি আরও স্পষ্ট করে যে মূল বিতর্কটি "কুরআন সঠিক না ভুল" তা নিয়ে নয়, বরং "একাধিক বৈধ শর্ত একত্রে মিললে কোন নীতিতে সমন্বয় হবে" তা নিয়ে।
একটা বিষয় নিয়ে আরেকটু বিস্তারিত আলোচনা করার দরকার মনে করছি ,
আপত্তি : "যদি পরে আউল নীতি প্রয়োগ করতেই হয়, তবে কি এটি প্রমাণ করে না যে কুরআনের বণ্টন অসম্পূর্ণ ছিল?"
এটি সমালোচকদের অন্যতম আপত্তি। তাদের বক্তব্য হলো—যদি কুরআনে নির্ধারিত অংশগুলো কোনো কোনো ক্ষেত্রে একত্রে যোগ করলে সম্পত্তির চেয়ে বেশি হয়ে যায় এবং পরে সাহাবিদের "আউল" নামে একটি অতিরিক্ত নীতি তৈরি করতে হয়, তাহলে কি এটি প্রমাণ করে না যে কুরআনের বিধান অসম্পূর্ণ ছিল?
প্রথমেই লক্ষ্য করা দরকার, সমালোচকদের যুক্তির অন্তর্নিহিত পূর্বধারণা হলো, কুরআনে বর্ণিত অংশগুলো এমনভাবে নির্ধারিত যে সেগুলো প্রত্যেক সম্ভাব্য উত্তরাধিকার পরিস্থিতিতে কোনো অতিরিক্ত ব্যাখ্যা বা প্রয়োগমূলক নীতি ছাড়াই সরাসরি কার্যকর হওয়া উচিত। এই পূর্বধারণার ভিত্তিতেই তারা আউল নীতির প্রয়োজনীয়তাকে কুরআনের অসম্পূর্ণতার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেন। এই পূর্বধারণাটিই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। সমালোচকরা ধরে নেন, কুরআনের প্রতিটি নির্ধারিত অংশ সব পরিস্থিতিতে আক্ষরিকভাবে অপরিবর্তিত থাকবে। কিন্তু উসূলুল-ফিকহ অনুযায়ী, এই অংশগুলো উত্তরাধিকারীদের মূল আইনগত অধিকার নির্ধারণ করে; একাধিক বৈধ অধিকার একই সঙ্গে সংঘর্ষে এলে সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগের জন্য একটি নীতির প্রয়োজন হয়। আউল সেই নীতিরই নাম। অতএব বিতর্কটি গণিতের নয়; বরং আইনগত ব্যাখ্যা (legal interpretation) ও প্রয়োগ-পদ্ধতির। কিন্তু কুরআনের ভাষা ও উপস্থাপনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আয়াতগুলোর উদ্দেশ্য ছিল নির্দিষ্ট শ্রেণির ওয়ারিসদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং তাদের অংশ নির্ধারণ করা; প্রতিটি সম্ভাব্য বাস্তব পরিস্থিতির জন্য আলাদা চূড়ান্ত হিসাবের তালিকা দেওয়া নয়।
আধুনিক গণিত, অর্থনীতি ও আইনেও কি আউল-সদৃশ নীতি রয়েছে?
কিছু সমালোচক মনে করেন, যখন ওয়ারিসদের নির্ধারিত অংশের যোগফল সম্পত্তির চেয়ে বেশি হয়ে যায় এবং সবার অংশ আনুপাতিকভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়, তখন এটি নাকি একটি "পরবর্তী উদ্ভাবন"। কিন্তু আধুনিক গণিত, অর্থনীতি ও আইনশাস্ত্রের আলোকে বিষয়টি বিবেচনা করলে দেখা যায়, এটি কোনো অস্বাভাবিক বা ব্যতিক্রমী পদ্ধতি নয়; বরং সীমিত সম্পদের বিপরীতে একাধিক বৈধ দাবির ক্ষেত্রে বহুল স্বীকৃত একটি সমাধান।
আধুনিক গণিত ও অর্থনীতিতে এই ধরনের সমস্যাকে সাধারণত Claims Problem বা Bankruptcy Problem বলা হয়। এর মূল প্রশ্ন হলো : যখন একটি নির্দিষ্ট সম্পদের উপর একাধিক ব্যক্তির বৈধ দাবি থাকে, কিন্তু সেই দাবিগুলোর মোট পরিমাণ উপলব্ধ সম্পদের চেয়ে বেশি হয়, তখন সম্পদ কীভাবে ন্যায্যভাবে বণ্টন করা হবে?
উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যক্তি দেউলিয়া হয়ে ১০০ টাকা সম্পদ রেখে গেলেন, কিন্তু তাঁর তিনজন পাওনাদারের বৈধ দাবি যথাক্রমে ৬০, ৫০ এবং ৪০ টাকা। মোট দাবি দাঁড়ায় ১৫০ টাকা, অথচ সম্পদ মাত্র ১০০ টাকা। এখানে গাণিতিকভাবে সব দাবি পূরণ করা অসম্ভব। তাই আধুনিক আইন ও অর্থনীতিতে বিভিন্ন বণ্টন-পদ্ধতি (allocation rules) ব্যবহৃত হয়।
এসব পদ্ধতির মধ্যে অন্যতম হলো Proportional Allocation Rule (আনুপাতিক বণ্টন নীতি)। এই নীতিতে প্রত্যেক দাবিদারের দাবি একই অনুপাতে কমিয়ে দেওয়া হয়, যাতে সবাই তাদের দাবির আনুপাতিক অংশ পান এবং মোট বণ্টন উপলব্ধ সম্পদের সীমার মধ্যে থাকে। এর ফলে কোনো দাবিদারকে সম্পূর্ণ অগ্রাধিকার দেওয়া হয় না এবং কোনো দাবিদারকে সম্পূর্ণ বঞ্চিতও করা হয় না; বরং প্রত্যেক বৈধ দাবিকে সমান মর্যাদা দিয়ে সীমিত সম্পদের মধ্যে ন্যায়সংগত সমন্বয় করা হয়।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, ইসলামী ফারায়েজের আউল নীতিও ধারণাগতভাবে একই ধরনের একটি আনুপাতিক সমন্বয়। যখন কুরআনে নির্ধারিত একাধিক ফরয অংশের যোগফল সম্পত্তির চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তখন প্রত্যেক ওয়ারিসের আপেক্ষিক অনুপাত অক্ষুণ্ণ রেখে সবার অংশ একই অনুপাতে সমন্বয় করা হয়। অর্থাৎ এখানে কারও আইনগত দাবি বাতিল করা হয় না; বরং সীমিত সম্পদের বাস্তবতায় সব বৈধ দাবিকে যতদূর সম্ভব কার্যকর করা হয়।
অবশ্যই মনে রাখতে হবে, আধুনিক Proportional Allocation Rule এবং ইসলামী আউল এক জিনিস নয়। তাদের উৎস, উদ্দেশ্য ও আইনগত ভিত্তি ভিন্ন। আউল একটি শরয়ি ও ফিকহি নীতি, যা সাহাবিদের ইজতিহাদ ও পরবর্তী ইজমার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অন্যদিকে আধুনিক আনুপাতিক বণ্টন নীতি গণিত, অর্থনীতি ও দেওয়ানি আইনের গবেষণার ফল। তবে উভয়ের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগত মিল রয়েছে—যখন সীমিত সম্পদের বিপরীতে একাধিক বৈধ দাবি একযোগে পূরণ করা সম্ভব হয় না, তখন আনুপাতিক সমন্বয় একটি যুক্তিসঙ্গত, ন্যায়সংগত এবং দীর্ঘদিন ধরে স্বীকৃত সমাধান হতে পারে।
এই কারণেই আউলকে "গাণিতিক ভুল ঢাকার জন্য পরবর্তী উদ্ভাবন" হিসেবে উপস্থাপন করা যথার্থ নয়। বরং এটি এমন একটি সমাধান, যা সীমিত সম্পদের বিপরীতে একাধিক বৈধ দাবির সমন্বয় করার একটি সুসংহত আইনগত নীতির প্রতিনিধিত্ব করে। আধুনিক গণিত ও অর্থনীতির ভাষায় একে proportional allocation-এর সঙ্গে ধারণাগতভাবে তুলনা করা যায়, যদিও উভয়ের ঐতিহাসিক ও আইনগত ভিত্তি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র।
আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও এটি একটি পরিচিত বিষয়। একটি মূল আইন (statute) সাধারণ নীতি ও অধিকার নির্ধারণ করে, আর সেই নীতিগুলো জটিল বাস্তব পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রয়োগ হবে তা বিচারিক ব্যাখ্যা (interpretation) ও আইনগত নীতিমালার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। ইসলামী ফিকহও একই পদ্ধতিতে বিকশিত হয়েছে। কুরআন মূল নীতিমালা দিয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) সুন্নাহর মাধ্যমে তার ব্যাখ্যা করেছেন, আর যেসব নতুন পরিস্থিতি সরাসরি পাঠ্যে উল্লেখিত ছিল না, সেগুলোর সমাধানে সাহাবিগণ কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ইজতিহাদ করেছেন।
আউল নীতিও ঠিক এমন একটি প্রয়োগমূলক নীতি। এটি নতুন কোনো উত্তরাধিকারী সৃষ্টি করে না, কারও অংশ বাতিল করে না এবং কুরআনে নির্ধারিত অনুপাত পরিবর্তনও করে না। বরং যখন একাধিক বৈধ ফরয অংশ একই সম্পত্তির উপর প্রতিযোগী দাবি সৃষ্টি করে, তখন প্রত্যেকের আপেক্ষিক অনুপাত অক্ষুণ্ণ রেখে সবার অংশ আনুপাতিকভাবে সমন্বয় করা হয়। অর্থাৎ আউল কুরআনের বিকল্প নয়; বরং কুরআনে নির্ধারিত অংশগুলো বাস্তবে কার্যকর করার একটি হিসাবগত পদ্ধতি।
গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণীয় বিষয়
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়। ইবনে আব্বাস (রা.), যিনি আউল নীতির বিরোধিতা করেছিলেন, তিনিও কখনো বলেননি যে প্রত্যেক ওয়ারিসকে তাদের নামমাত্র অংশ অপরিবর্তিত অবস্থায় দিয়ে দেওয়া হবে, যদিও যোগফল সম্পত্তির চেয়ে বেশি হয়ে যায়। বরং তিনিও একটি ভিন্ন সমন্বয়-পদ্ধতি প্রস্তাব করেছিলেন, যেখানে কিছু ওয়ারিসের অংশ অপরিবর্তিত রেখে অন্যদের অংশ কমানো হবে। অর্থাৎ তিনিও স্বীকার করেছিলেন যে বাস্তব সংঘর্ষপূর্ণ অবস্থায় কোনো না কোনো সমন্বয় নীতি অপরিহার্য। তাঁর ও উমর (রা.)-এর মধ্যে মতভেদ ছিল কেবল সমন্বয়ের পদ্ধতি নিয়ে; সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নয়। অতএব প্রকৃত প্রশ্নটি "কুরআনে গাণিতিক ভুল আছে কি না"—এটি নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, কুরআনে নির্ধারিত একাধিক বৈধ অধিকার একই সঙ্গে কার্যকর করতে হলে কোন নীতিতে সমন্বয় করা হবে। সাহাবিদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.), আলী (রা.), উসমান (রা.) এবং উমর (রা.)-এর নেতৃত্বে আনুপাতিক সমন্বয় বা আউল নীতিকে গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীকালে ফিকহে সেটিই ইজমার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। |
আইন পড়াশুনা না করে, চায়ের দোকানে বসে, আইনের উপর ঝগড়া করা যেমন হাস্যকর তেমনি ফারায়িদ বিষয়ে না জেনে তর্ক-বিতর্ক করাও একই পর্যায়ের। হাজার বছর ধরে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় আমলাগণ এই অঙ্গনে চাকুরি করেছেন, বিশেষজ্ঞ আইনবিদরা কাজ করেছেন, এরা ম্যাথমেটিশানও ছিলেন। এমন ধরণের একটি বিষয়কে কিছু অত্যুৎসাহী নাস্তিক, খৃষ্টিয়ান, হিন্দু বা অন্যদের কাছ থেকে গিলে যখন রাস্তাঘাটে, ফেসবুকে, ব্লগে ইতাদিতে প্রশ্ন করে বেড়ায়, তখন তাদের মূর্খতাই হাস্যকর দেখায়। এটা যে যেকোনো লোকের বিষয় নয় এবং কোনো নাস্তিকের মাথায় শিং গজিয়ে উঠলে তাকে যে বিশেষজ্ঞের সাথে গিয়ে আলোচনা করতে হবে –এই সাধারণ জ্ঞানটিও আসে না। ৩ মেয়ে, মা-বাপ, স্ত্রী –এই প্রশ্নটি নাস্তিকদের সাইটে গত কয়েক বছর ধরে তাদের নিজেদের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। তারা এখানে সেখানে গিয়ে এই টেক্সট কোট করে আসছে। |
ইবনে আব্বাস (রা)-এর দ্বিমত ইসলামি আইনশাস্ত্রের ইতিহাসে একটি স্বাভাবিক ও সম্মানজনক ইখতিলাফ (মতপার্থক্য)। রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, "কোনো বিচারক ইজতিহাদ করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছালে সে দুটি সওয়াব পায়, আর ইজতিহাদ করে ভুল করলেও সে একটি সওয়াব পায়" [?]। এই নীতি অনুযায়ী, ইবনে আব্বাস (রা)-এর ইজতিহাদ তাঁর জন্য পুরস্কারযোগ্য একটি আন্তরিক পাণ্ডিত্যপূর্ণ প্রচেষ্টা ছিল, যদিও উম্মাহ শেষ পর্যন্ত ভিন্ন সিদ্ধান্তে ঐকমত্যে পৌঁছেছে। তাঁর দ্বিমতের অস্তিত্ব প্রমাণ করে না যে কুরআনে গাণিতিক ভুল আছে। বরং এটি প্রমাণ করে, সাহাবিদের মতো গভীর জ্ঞানী ব্যক্তিরাও একটি নির্দিষ্ট, জটিল বাস্তব পরিস্থিতিতে (যা কুরআনে সরাসরি সমাধান করা নেই) সাধারণ নীতিমালা কীভাবে প্রয়োগ হবে তা নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করতে পারতেন — ঠিক যেমন আজও ফিকহের অসংখ্য বিষয়ে চার মাযহাবের মধ্যে ভিন্নমত বিদ্যমান, অথচ কেউই বলে না যে এর ফলে কুরআন বা সুন্নাহ ত্রুটিপূর্ণ। ইমাম আল-জাসসাসের যুক্তিসঙ্গত জবাব ও সাহাবিদের ইজমার মাধ্যমে অধিকতর সুসংগত ও নীতিনিষ্ঠ সমাধানটিই — আউল — চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। |
উপসংহার
আলোচনার সারসংক্ষেপে দেখা যায় যে, সূরা আন-নিসার উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত আয়াতগুলো নিয়ে উত্থাপিত "গাণিতিক ভুল"-এর অভিযোগ মূলত কুরআনের নির্ধারিত অংশগুলোর আইনগত প্রকৃতি এবং সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট পূর্বধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত। সাহাবিদের যুগ থেকেই এই ধরনের বাস্তব পরিস্থিতি মোকাবিলায় আউল ও রাদ নীতির মাধ্যমে সমাধান গৃহীত হয়েছে এবং পরবর্তীকালে সুন্নি ফিকহে তা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
উমর (রা.) ও ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতপার্থক্যও এই বিষয়টি স্পষ্ট করে যে বিতর্কটি কুরআনের সত্যতা বা গাণিতিক নির্ভুলতা নিয়ে নয়; বরং একাধিক বৈধ কুরআনি অংশ একই সঙ্গে প্রযোজ্য হলে কোন নীতিতে সেগুলোর বাস্তব সমন্বয় করা হবে—তা নিয়ে। উম্মাহ শেষ পর্যন্ত ইজমার মাধ্যমে আউল নীতিকে গ্রহণ করেছে এবং একইভাবে রাদ নীতির মাধ্যমেও বিপরীত ধরনের পরিস্থিতির সমাধান নির্ধারণ করেছে।
অতএব, ইসলামী আইনশাস্ত্রের নিজস্ব পদ্ধতি, উসূলুল-ফিকহ এবং ঐতিহাসিক প্রয়োগ বিবেচনায় নিলে আউল ও রাদ কুরআনের সংশোধন নয়; বরং কুরআনে নির্ধারিত অধিকারগুলোর বাস্তবায়নের স্বীকৃত ফিকহি পদ্ধতি।
পরিশিষ্ট
◼️ ক. পরিভাষা
পরিভাষা | সংক্ষিপ্ত অর্থ |
|---|---|
ফারায়েজ | কুরআন-নির্ধারিত পদ্ধতিতে উত্তরাধিকার বণ্টনের শাস্ত্র |
ফরয (এখানে) | কুরআনে নির্দিষ্ট ভগ্নাংশে বর্ণিত অংশ |
জওয়িল ফুরুদ | যাদের অংশ কুরআনে নির্দিষ্ট ভগ্নাংশে বলা আছে |
আসাবা | অবশিষ্টাংশীদার |
কালালাহ | নিঃসন্তান ও পিতৃহীন মৃত ব্যক্তি |
আউল | নামমাত্র অংশের যোগফল ১-এর বেশি হলে আনুপাতিক হ্রাস |
রাদ | যোগফল ১-এর কম ও আসাবা না থাকলে আনুপাতিক বৃদ্ধি |
ইজতিহাদ | নস্-এ সরাসরি নেই এমন প্রশ্নে যোগ্য আলিমের স্বাধীন সিদ্ধান্ত |
ইজমা | কোনো প্রশ্নে যোগ্য মুজতাহিদদের ঐকমত্য |
কিয়াস | স্বীকৃত নীতির সাদৃশ্য-ভিত্তিক নতুন প্রয়োগ |
নস্ | কুরআন-হাদিসের স্পষ্ট বিধান |
উসূল আল-ফিকহ | ইসলামি আইন নির্ণয়ের পদ্ধতিগত মূলনীতি |
বাইতুল মাল | রাষ্ট্রীয় কোষাগার |
Bankruptcy / Claims Problem | সীমিত সম্পদে একাধিক বৈধ দাবির সংঘর্ষ মেটানোর গাণিতিক তত্ত্ব |
◼️ খ. তথ্যসূত্র
সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৫৪; তিরমিযি: ৩৭৯০-৩৭৯১
সহীহ বুখারী: ৭৩৫২; সহীহ মুসলিম: ১৭১৬
ইবনু শু'বাহ, খণ্ড ৩, পৃ. ১৯, রেওয়ায়েত নং ৩৪
আহকামুল কুরআন, ইবনুল আরাবি, খণ্ড ১, পৃ. ৪৫৭
আল-মাবসূত, সারাখসী, কিতাবুল ফারায়েজ, বাবুল আউল, ২৯/১৬১
আহকামুল কুরআন, আল-জাসসাস সুরা নিসার ১১ ও ১২ নং আয়াতের তাফসির ।
আল-মুগনী, ইবনে কুদামা, কিতাবুল ফারায়েজ, বাবু উসূলি সিহামিল ফারায়েজিল্লাতি তাউল, ৬/১৭৮
আল-ইনতিকা, ইবনে আব্দুল বার, পৃ. ১৪২-১৪৩
কুরআন ৪২:৩৮, ৯:১০০, ৫৭:১০, ৪৯:৭, ৪৮:১৮, ৫৯:১০; এবং ৩৩:৬
O'Neill, B. (1982). "A Problem of Rights Arbitration from the Talmud." Mathematical Social Sciences, 2, 345–371.
Aumann, R.J. & Maschler, M. (1985). "Game Theoretic Analysis of a Bankruptcy Problem from the Talmud." Journal of Economic Theory, 36, 195–213.
সদালাপ ব্লগ, রিজভী আহমেদ খান - ফায়রয়েজ নিয়ে বিভ্রান্তি নিরসন ।
বিস্তারিত সম্মিলিত-পরিস্থিতি হিসাব: http://inheritance.ilmsummit.org/projects/inheritance/testcasespage.aspx
◼️ গ. দ্রুত রেফারেন্স: কুরআনি নির্ধারিত অংশসমূহ
ওয়ারিস | অংশ | শর্ত |
|---|---|---|
স্বামী | ১/২ | সন্তান না থাকলে |
স্বামী | ১/৪ | সন্তান থাকলে |
স্ত্রী | ১/৪ | সন্তান না থাকলে |
স্ত্রী | ১/৮ | সন্তান থাকলে |
কন্যা (একজন) | ১/২ | — |
কন্যা (দুই+) | ২/৩ (একত্রে) | — |
পিতা | ১/৬ | সন্তান থাকলে |
মাতা | ১/৬ | সন্তান থাকলে, বা একাধিক ভাইবোন থাকলে |
মাতা | ১/৩ | সন্তান না ও একাধিক ভাইবোন না থাকলে |
ভাই/বোন (মাতৃসূত্রে, একজন) | ১/৬ | পিতা, সন্তান না থাকলে |
ভাই/বোন (মাতৃসূত্রে, দুই+) | ১/৩ (একত্রে) | — |
বোন (সহোদর, একজন) | ১/২ | পিতা, সন্তান না থাকলে |
বোন (সহোদর, দুই+) | ২/৩ (একত্রে) | — |
কৃতজ্ঞতা : সদালাপ ব্লগ । -রিজভী আহমেদ খান
আল-ইনতিকা, ইবনে আব্দুল বার, পৃ. ১৪২-১৪৩
সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৫৪; তিরমিযি : ৩৭৯০-৩৭৯১।
ইবনু শু'বাহ, খণ্ড ৩, পৃ. ১৯, রেওয়ায়েত নং ৩৪ ।
আহকামুল কুরআন, ইবনুল আরাবি, খণ্ড ১, পৃ. ৪৫৭ ।
আল কুরআন, আয়াত - ৪২ : ৩৮, ৯ : ১০০, ৫৭ : ১০, ৪৯ : ৭, ৪৮ : ১৮, ৫৯ : ১০।
আল-মুগনী, কিতাবুল ফারায়েজ, বাবু উসূলি সিহামিল ফারায়েজিল্লাতি তাউল, ৬/১৭৮ ।
সহীহ বুখারী : ৭৩৫২, সহীহ মুসলিম : ১৭১৬
http : //inheritance.ilmsummit.org/projects/inheritance/testcasespage.aspx
আল-মাবসূত, কিতাবুল ফারায়েজ, বাবুল আউল, ২৯/১৬১ ।
আহকামুল কুরআন, আল-জাসসাস সুরা নিসার ১১ ও ১২ নং আয়াতের তাফসির ।
মন্তব্য