কুরআন ফিকহহাদিস ফিকহদর্শন কুযুক্তি

রজমের বিধান: কুরআন, হাদিস ও ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বের আলোকে একটি একাডেমিক বিশ্লেষণ

সারসংক্ষেপ

রজমের (পাথর মেরে হত্যার) শাস্তি ইসলামি ফিকহের অন্যতম বহুল আলোচিত বিষয়। আধুনিক সংস্কারবাদীরা দাবি করেন যে রজম কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক, কারণ সূরা নূর ২ নং আয়াতে ব্যভিচারের শাস্তি হিসেবে কেবল একশত বেত্রাঘাতের কথা উল্লেখ আছে। এই প্রবন্ধে আরবি ভাষাতত্ত্ব, উসুলুল ফিকহ, সাহাবাদের ঐতিহাসিক ইজমা এবং ইসলামি জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকে বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে যে সংস্কারবাদীদের দাবি ভাষাগত, ঐতিহাসিক ও পদ্ধতিগতভাবে অগ্রহণযোগ্য।

১. ভূমিকা:

রজমের বিধান ইসলামি আইনের ইতিহাসে সর্বদা প্রতিষ্ঠিত ছিল। তবে বিশেষত বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত কিছু মুসলিম স্কলার এই বিধানকে কুরআনবিরোধী বলে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। এ বিতর্কটি মূলত তিনটি প্রশ্নকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়:

  • সূরা নূর ২ নং আয়াতের ভাষাতাত্ত্বিক পরিসর কতটুকু?

  • হাদিস কি কুরআনের বিধানকে বিশেষায়িত (তাখসিস) করতে পারে?

  • সাহাবাদের ইজমা ও ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে তার মর্যাদা কী?

এই প্রবন্ধে উক্ত তিনটি প্রশ্নের একাডেমিক উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

২. কুরআনের আয়াতের ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

২.১ সূরা নূর, আয়াত ২

اَلزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ

"ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী — তাদের প্রত্যেককে একশত বেত্রাঘাত করো।" (সূরা নূর: ২)

২.২ মূল আরবি শব্দের ব্যাকরণিক বিশ্লেষণ:

আরবি শব্দ

বাংলা অর্থ

ব্যাকরণিক বিভাগ

পরিসর

الزَّانِيَةُ

ব্যভিচারিণী

নির্দিষ্ট বিশেষ্য (আল সহ)

সকল ব্যভিচারিণী

الزَّانِي

ব্যভিচারী

নির্দিষ্ট বিশেষ্য (আল সহ)

সকল ব্যভিচারী

كُلَّ وَاحِدٍ

প্রত্যেককে

সর্বসমেত বিশেষণ

কোনো ব্যতিক্রম নেই

مِائَةَ جَلْدَةٍ

একশত বেত্রাঘাত

সংখ্যাবাচক বিশেষ্য

নির্দিষ্ট সংখ্যা

২.৩ আল-ইসতিগরাক: আরবি ভাষার সাধারণীকরণ নীতি:

আরবি ব্যাকরণে 'আল' (ال) যুক্ত বিশেষ্য দুই ধরনের হয়: (১) আল-আহদিয়্যা — নির্দিষ্ট কাউকে বোঝায়, এবং (২) আল-ইসতিগরাক — সমগ্র শ্রেণিকে বোঝায়। সূরা নূর ২-তে 'আল-জানিয়াহ' ও 'আল-জানি' শব্দদ্বয়ে 'আল' ব্যবহৃত হয়েছে ইসতিগরাক অর্থে, অর্থাৎ সকল ব্যভিচারী — বিবাহিত বা অবিবাহিত যাই হোক।

ইমাম সিবাওয়াইহি (মৃ. ১৭৭ হি.) তাঁর 'আল-কিতাব'-এ এই নিয়ম সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। ইমাম আল-জারজানি 'দালাইলুল ই'জায'-এ একইভাবে বলেছেন যে এ ধরনের 'আল' সমগ্র শ্রেণিকে অন্তর্ভুক্ত করে। ভাষাতাত্ত্বিকভাবে আয়াতটি সার্বজনীন। এতে বিবাহিত-অবিবাহিত কোনো পার্থক্য নেই।

৩. তাখসিস: হাদিস দ্বারা কুরআনের বিধান বিশেষায়িত করা

৩.১ তাখসিস কী?

উসুলুল ফিকহের পরিভাষায় তাখসিস (التخصيص) হলো কোনো সাধারণ বিধানকে বিশেষ দলিলের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ করা। এটি ইসলামি আইনের একটি স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি।

৩.২ হাদিস দ্বারা তাখসিসের উদাহরণ:

কুরআনে অনেক বিধান সাধারণভাবে বর্ণিত হয়েছে যা হাদিস দ্বারা বিশেষায়িত হয়েছে। উদাহরণ:

কুরআনের সাধারণ বিধান

হাদিসের বিশেষায়ন

উৎস

নামাজ কায়েম করো

প্রতিদিন ৫ ওয়াক্ত, নির্দিষ্ট রাকাতে

বুখারি, মুসলিম

যাকাত দাও

নিসাব পরিমাণ সম্পদে, ২.৫% হারে

আবু দাউদ, তিরমিজি

ব্যভিচারীকে শাস্তি দাও (নূর:২)

বিবাহিতের জন্য রজম

বুখারি, মুসলিম

উত্তরাধিকার দাও (নিসা:১১)

হত্যাকারী পাবে না

তিরমিজি

ইমাম আল-আমিদি (মৃ. ৬৩১ হি.) তাঁর 'আল-ইহকাম ফি উসুলিল আহকাম'-এ বলেছেন: হাদিসে মুতাওয়াতির বা মশহুর পর্যায়ের হাদিস দ্বারা কুরআনের আম বিধানের তাখসিস করা সম্পূর্ণ বৈধ এবং এটি চার মাযহাবের সর্বসম্মত অবস্থান।

৪. রজমের হাদিস: প্রামাণিকতা ও ব্যাপকতা:

৪.১ সহিহ হাদিস থেকে রজমের প্রমাণ

রজমের বিধান সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম সহ প্রধান হাদিস গ্রন্থগুলোতে বিভিন্ন সাহাবা থেকে মুতাওয়াতির পর্যায়ে বর্ণিত হয়েছে।

হাদিস গ্রন্থ

বর্ণনাকারী সাহাবি

ঘটনা

রেফারেন্স

সহিহ বুখারি

উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)

রজমের বিধান ঘোষণা ও বাস্তবায়ন

কিতাবুল হুদুদ, ৬৮২৯

সহিহ মুসলিম

আবু হুরায়রা ও জায়েদ ইবন খালিদ (রা.)

ব্যভিচারীকে রজম

কিতাবুল হুদুদ, ১৬৯৮

সহিহ বুখারি

জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা.)

মাইয যামির ঘটনা

কিতাবুল হুদুদ, ৬৮১৪

সুনান আবু দাউদ

ইবন আব্বাস (রা.)

নবী (সা.)-এর রজম কার্যকর

কিতাবুল হুদুদ, ৪৪২৬

সহিহ মুসলিম

বুরাইদা (রা.)

গামিদিয়্যা নারীর রজম

কিতাবুল হুদুদ, ১৬৯৫

৪.২ উমর (রা.)-এর ঐতিহাসিক ভাষণ

"আল্লাহর কসম, যদি মানুষ না বলত যে উমর আল্লাহর কিতাবে এমন কিছু যোগ করেছে যা তাতে নেই, তাহলে আমি রজমের আয়াত লিখে দিতাম। কারণ আমরা তা পাঠ করেছি। আল্লাহর রাসূল (সা.) রজম কার্যকর করেছেন, আমরাও করেছি।"

— উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.), সহিহ বুখারি, কিতাবুল হুদুদ, হাদিস ৬৮২৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬৯১

৫. সাহাবাদের ইজমা ও ইসলামি জ্ঞানতত্ত্ব

৫.১ ইজমা কী এবং এর মর্যাদা কতটুকু?

ইজমা (الإجماع) হলো কোনো যুগের মুজতাহিদ আলেমদের সর্বসম্মত ঐকমত্য। উসুলুল ফিকহের দৃষ্টিতে ইজমা হলো কুরআন ও সুন্নাহর পরে ইসলামি আইনের তৃতীয় সর্বোচ্চ দলিল।

ইমাম আল-শাফিঈ (মৃ. ২০৪ হি.) তাঁর 'আর-রিসালা'-য় বলেছেন: সাহাবাদের ইজমা শরিয়তের অকাট্য দলিল, কারণ তারা নবী (সা.)-এর সরাসরি শিষ্য ছিলেন এবং কুরআনের ব্যাখ্যা সরাসরি তাঁর কাছ থেকে শিখেছিলেন।

৫.২ রজমের প্রশ্নে সাহাবাদের অবস্থান

সাহাবি

অবস্থান ও কার্যক্রম

উৎস

উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)

খলিফা হিসেবে রজম কার্যকর করেছেন, মিম্বরে ঘোষণা দিয়েছেন

বুখারি ৬৮২৯, মুসলিম ১৬৯১

আলী ইবন আবি তালিব (রা.)

রজম কার্যকর করেছেন এবং বেত্রাঘাতের বিধানটি অবিবাহিতের জন্য বলেছেন

বুখারি ৬৮১২

আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.)

রজমকে সুন্নাতে মুতাওয়াতিরা বলেছেন

মুসান্নাফ ইবন আবি শায়বা

আবু হুরায়রা (রা.)

রজমের হাদিস বর্ণনা করেছেন

মুসলিম ১৬৯৮

ইবন আব্বাস (রা.)

রজমের বিধান বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন

আবু দাউদ ৪৪১৫

গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ: একজনও সাহাবি রজমের বিরোধিতা করেননি। এটি ইজমা আস-সাহাবা — সাহাবাদের সর্বসম্মত ঐকমত্য।

৬. ইসলামি জ্ঞানতত্ত্ব: কে বেশি বুঝবেন?

৬.১ ইসলামি জ্ঞানের উৎসক্রম

ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে কুরআন বোঝার ক্রম নির্ধারিত আছে:

৬.২ সাহাবারা কেন বেশি বুঝবেন?

  • তারা ছিলেন নেটিভ আরব — কুরআনের ভাষা তাদের মাতৃভাষা

  • তারা নবী (সা.)-এর কাছ থেকে সরাসরি তাফসির শুনেছেন

  • আয়াতের নুযুলের (অবতরণের) প্রেক্ষাপট তারা চোখে দেখেছেন

  • কুরআনের ভাষাগত সূক্ষ্মতা তারা স্বভাবগতভাবেই বুঝতেন

  • ইমাম মালিক (মৃ. ১৭৯ হি.) বলেছেন: যে সাহাবাদের বিরুদ্ধে মত দেয়, সে বিপথগামী। (আল-মুওয়াত্তা, ভূমিকা)

৬.৩ সংস্কারবাদীদের পদ্ধতিগত সমস্যা

আধুনিক সংস্কারবাদীরা মূলত দাবি করছেন: "আমরা ১৪০০ বছর পরে, ভিন্ন ভাষায়, বইয়ের মাধ্যমে শিখে সাহাবাদের চেয়ে কুরআন ভালো বুঝতে পারি।" ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বের দৃষ্টিতে এটি একটি অযৌক্তিক দাবি।

ইমাম ইবন তাইমিয়া (মৃ. ৭২৮ হি.) তাঁর 'মাজমুউল ফাতাওয়া'-তে বলেছেন: যে ব্যক্তি সাহাবাদের বোঝাপড়ার বিরুদ্ধে কুরআনের ব্যাখ্যা করে, সে মূলত নিজের মতকে ওহির উপরে স্থান দিচ্ছে।

৭. সংস্কারবাদী যুক্তিগুলোর মূল্যায়ন

সংস্কারবাদী যুক্তি

একাডেমিক খণ্ডন

কুরআনে রজমের কথা নেই, তাই বৈধ নয়।

কুরআনে নামাজের রাকাত, যাকাতের নিসাবও নেই — এগুলোও কি অবৈধ? হাদিস কুরআনের সম্পূরক।

সূরা নূর:২ সকলের জন্য প্রযোজ্য।

ঠিকই আছে — কিন্তু এটি প্রমাণ করে রজম কুরআনবিরোধী নয়, বরং হাদিস অতিরিক্ত বিধান দিয়েছে।

রজমের আয়াত কুরআনে ছিল না।

উমর (রা.) ও একাধিক সাহাবি বলেছেন তারা তা পাঠ করেছেন (নাসখুত তিলাওয়া)।

মানবাধিকারের দৃষ্টিতে রজম অগ্রহণযোগ্য।

এটি ধর্মতাত্ত্বিক নয়, রাজনৈতিক যুক্তি। ইসলামের বিধান যুগের মানদণ্ডে নয়, ওহির ভিত্তিতে নির্ধারিত।


৭.১ আরোকয়েকটি সারনী ও চিত্র :

সারণি–১: সূরা আন-নূর (২৪:২)-এর ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

আরবি শব্দ

ব্যাকরণিক পরিচয়

আক্ষরিক অর্থ

ভাষাতাত্ত্বিক তাৎপর্য

الزانية

معرفة (ال) যুক্ত বিশেষ্য

ব্যভিচারিণী

সাধারণ (عام) শ্রেণি নির্দেশ করে

الزاني

معرفة (ال) যুক্ত বিশেষ্য

ব্যভিচারী

সাধারণ (عام) শ্রেণি নির্দেশ করে

كل واحد

সর্বসমেত বিশেষণ

প্রত্যেক ব্যক্তি

অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রকাশ

مائة جلدة

সংখ্যাবাচক বিশেষ্য

একশত বেত্রাঘাত

নির্দিষ্ট শাস্তি


সারণি–২: কুরআনের সাধারণ বিধান ও সুন্নাহ কর্তৃক বিশেষায়নের (تخصيص) উদাহরণ

কুরআনের সাধারণ নির্দেশ

সুন্নাহর ব্যাখ্যা/বিশেষায়ন

উৎস

নামাজ প্রতিষ্ঠা করো

পাঁচ ওয়াক্ত, নির্দিষ্ট রাকাত

সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম

যাকাত প্রদান করো

নিসাব ও হার নির্ধারণ

সুনান আবু দাউদ, তিরমিজি

হজ পালন করো

হজের বিস্তারিত পদ্ধতি

সহিহ মুসলিম

ব্যভিচারীর শাস্তি

মুহসান ও গায়রে মুহসানের পৃথক বিধান

সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম

সারণি–৩: রজম সম্পর্কিত প্রধান সহিহ হাদিস

হাদিস গ্রন্থ

হাদিস নম্বর

ঘটনা

মূল বিষয়

সহিহ বুখারি

৬৮১৪

মা'ইয (রা.)

রজম কার্যকর

সহিহ মুসলিম

১৬৯৫

গামিদিয়্যা নারী

রজম কার্যকর

সহিহ মুসলিম

১৬৯৮

আবু হুরায়রা (রা.)

রজমের বিচার

সহিহ বুখারি

৬৮২৯

উমর (রা.)-এর ভাষণ

রজমের ঐতিহাসিক স্বীকৃতি


সারণি–৪: রজম বিষয়ে সাহাবাদের অবস্থান

সাহাবি

অবস্থান

সূত্র

উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)

রজম কার্যকর ও সমর্থন

সহিহ বুখারি, মুসলিম

আলী ইবন আবি তালিব (রা.)

রজম কার্যকর

সহিহ বুখারি

আবু হুরায়রা (রা.)

হাদিস বর্ণনা

সহিহ মুসলিম

ইবন আব্বাস (রা.)

বিধান বর্ণনা

সুনান আবু দাউদ

জাবির (রা.)

মা'ইযের ঘটনা বর্ণনা

সহিহ বুখারি

সারণি–৫: সংস্কারবাদী আপত্তি ও ধ্রুপদী জবাব

সংস্কারবাদী আপত্তি

ধ্রুপদী জবাব

কুরআনে রজম নেই

সুন্নাহ কুরআনের ব্যাখ্যাকারী

সূরা নূর ২ সকলের জন্য

আয়াত সাধারণ; সুন্নাহ দ্বারা বিশেষায়িত

হাদিস কুরআনকে সীমাবদ্ধ করতে পারে না

উসুলুল ফিকহে তাখসিস স্বীকৃত

রজম মানবাধিকারের পরিপন্থী

এটি শরিয়ত নয়, আধুনিক নৈতিক দর্শনের আপত্তি


সারণি–৬: প্রধান মুফাসসিরদের ব্যাখ্যার তুলনা

মুফাসসির

সূরা নূর ২৪:২-এর ব্যাখ্যা

রজম সম্পর্কে অবস্থান

ইমাম কুরতুবী

আয়াত সাধারণ

সুন্নাহ দ্বারা মুহসান ব্যতিক্রম

ইমাম রাযী

আয়াতের ظاهر সাধারণ

রজম সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত

ইবন আশূর

عام বিধান

সুন্নাহ কর্তৃক তাখসিস

তাফসির আস-সাদী

অবিবাহিতের জন্য প্রযোজ্য

মুহসানের জন্য রজম

তাফসির জালালাইন

বেত্রাঘাত অবিবাহিতের জন্য

রজম সুন্নাহ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত


সারণি–৭: চার সুন্নি মাযহাবের অবস্থান

মাযহাব

মুহসানের শাস্তি

অবিবাহিতের শাস্তি

নির্বাসন

হানাফি

রজম

১০০ বেত্রাঘাত

ইমামের বিবেচনা

মালিকি

রজম

১০০ বেত্রাঘাত

গ্রহণযোগ্য

শাফেয়ি

রজম

১০০ বেত্রাঘাত

এক বছর

হাম্বলি

রজম

১০০ বেত্রাঘাত

এক বছর


সারণি–৮: ইসলামি শরিয়তের দলিলসমূহের শ্রেণিবিন্যাস

ক্রম

দলিল

মর্যাদা

কুরআন

সর্বোচ্চ

সহিহ সুন্নাহ

দ্বিতীয়

ইজমা

তৃতীয়

কিয়াস

চতুর্থ


সারণি–৯: ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে কুরআন ব্যাখ্যার ধারাবাহিকতা

ধাপ

ব্যাখ্যাকারী

কুরআন

রাসূলুল্লাহ ﷺ

সাহাবায়ে কেরাম

তাবেয়ীন

তাবে-তাবেয়ীন

মুজতাহিদ ইমামগণ

পরবর্তী মুফাসসির ও ফকিহগণ


সারণি–১০: গবেষণার প্রধান উপসংহার

গবেষণা প্রশ্ন

উপসংহার

সূরা নূর ২৪:২ কি ভাষাগতভাবে সাধারণ?

হ্যাঁ, ظاهر অর্থে সাধারণ

সুন্নাহ কি এ সাধারণ বিধানকে বিশেষায়িত করে?

হ্যাঁ, উসুলুল ফিকহ অনুযায়ী

রজম কি সহিহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত?

হ্যাঁ, একাধিক সহিহ হাদিসে

সাহাবাদের ঐকমত্য আছে কি?

ধ্রুপদী সুন্নি ফিকহ অনুযায়ী আছে

চার মাযহাবের অবস্থান

সকলেই মুহসানের ক্ষেত্রে রজম গ্রহণ করেছেন


চিত্র–১: ইসলামি শরিয়তের দলিলসমূহ

ইসলামি শরিয়তের দলিল

কুরআন

সুন্নাহ

ইজমা

কিয়াস


চিত্র–২: কুরআনের সাধারণ বিধান ও সুন্নাহ দ্বারা তাখসিস

সূরা আন-নূর (২৪:২)

الزانية والزاني

(সাধারণ বিধান)

সহিহ সুন্নাহ (তাখসিস)

┌──────────────┴──────────────┐

│ │

▼ ▼

অবিবাহিত (غير محصن) বিবাহিত (محصن)

১০০ বেত্রাঘাত (+ নির্বাসন) রজম

চিত্র–৩: রজমের বিধানের প্রমাণসমূহ

কুরআন

(সাধারণ বিধান)

সুন্নাহ

(বিশেষায়িত বিধান)

সাহাবাদের ইজমা

চার মাযহাবের ঐকমত্য


চিত্র–৪: ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে কুরআন ব্যাখ্যার ধারাবাহিকতা

কুরআন

রাসূলুল্লাহ ﷺ

সাহাবায়ে কেরাম

তাবেয়ীন

মুজতাহিদ ইমামগণ

সমকালীন গবেষক ও আলেম


চিত্র–৫: রজমের বিধানের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা

রাসূলুল্লাহ ﷺ

খোলাফায়ে রাশিদীন

সাহাবাদের ইজমা

তাবেয়ীন ও তাবে-তাবেয়ীন

চার মাযহাবের ফিকহ

আহলুস সুন্নাহর ঐতিহ্য

৮. কয়েকটি তাফসির :

১। মূল ইবারত :

قوله - عز وجل - : ( الزانية والزاني فاجلدوا كل واحد منهما مائة جلدة ) أراد إذا كانا حرين بالغين عاقلين بكرين غير محصنين " فاجلدوا " : فاضربوا كل واحد منهما مائة جلدة ، يقال جلده إذا ضرب جلده ، كما يقال رأسه وبطنه ، إذا ضرب رأسه وبطنه ، وذكر بلفظ الجلد لئلا يبرح . ولا يضرب بحيث يبلغ اللحم ، وقد وردت السنة أنه يجلد مائة ويغرب عاما وهو قول أكثر أهل العلم ، وإن كان الزاني محصنا فعليه الرجم ، ذكرناه في سورة النساء .( ولا تأخذكم بهما رأفة ) رحمة ورقة ، وقرأ ابن كثير " رأفة " بفتح الهمزة ولم يختلفوا في سورة الحديد أنها ساكنة لمجاورة قوله : " ورحمة " والرأفة معنى في القلب ، لا ينهى عنه ؛ لأنه لا يكون باختيار الإنسان .روي أن عبد الله بن عمر جلد جارية له زنت ، فقال للجلاد : اضرب ظهرها ورجليها ، فقال له ابنه : لا تأخذكم بهما رأفة في دين الله ، فقال يا بني إن الله - عز وجل - لم يأمرني بقتلها وقد ضربت فأوجعت .واختلفوا في معنى الآية . فقال قوم : لا تأخذكم بهما رأفة فتعطلوا الحدود ولا تقيموها ، وهذا قول مجاهد وعكرمة وعطاء وسعيد بن جبير والنخعي والشعبي . وقال جماعة : معناها ولا تأخذكم بهما رأفة فتخففوا الضرب ولكن أوجعوهما ضربا ، وهو قول سعيد بن المسيب والحسن . قال الزهري : يجتهد في حد الزنا والفرية ويخفف في حد الشرب . وقال قتادة : يجتهد في حد الزنا ويخفف في الشرب والفرية .( في دين الله ) أي : في حكم الله ، ( إن كنتم تؤمنون بالله واليوم الآخر ) معناه أن المؤمن لا تأخذه الرأفة إذا جاء أمر الله تعالى .( وليشهد ) وليحضر ( عذابهما ) حدهما إذا أقيم عليهما ( طائفة ) نفر ، ( من المؤمنين ) قال مجاهد والنخعي : أقله رجل واحد فما فوقه ، وقال عكرمة وعطاء : رجلان فصاعدا . وقال الزهري وقتادة : ثلاثة فصاعدا . وقال مالك وابن زيد : أربعة بعدد شهود الزنا .

বাংলা অনুবাদ :

আল্লাহ তাআলার বাণী:

﴿الزانية والزاني فاجلدوا كل واحد منهما مائة جلدة﴾

“ব্যভিচারিণী নারী ও ব্যভিচারী পুরুষ—তোমরা তাদের প্রত্যেককে একশত বেত্রাঘাত কর।” (সূরা আন-নূর: ২)

অর্থাৎ, যখন উভয়েই স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্ক (বালিগ), সুস্থবুদ্ধিসম্পন্ন এবং অবিবাহিত (মুহসান নয়) হয়, তখন তাদের প্রত্যেককে একশত বেত্রাঘাত করা হবে।

“فاجلدوا” অর্থ: তাদের প্রত্যেককে একশত বেত্রাঘাত কর। আরবিতে বলা হয়: جلده যখন কারও চামড়ায় আঘাত করা হয়। এজন্য “জিলদ” (চামড়া) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে যাতে প্রহার সীমা অতিক্রম না করে। এমনভাবে মারা যাবে না যাতে মাংস পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়।

সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত যে অবিবাহিত ব্যভিচারীকে একশত বেত্রাঘাতের সাথে এক বছরের জন্য নির্বাসনও দেওয়া হবে। অধিকাংশ আলিমের মত এটাই। আর যদি ব্যভিচারী মুহসান (বিবাহিত) হয়, তাহলে তার শাস্তি রজম (পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ড)। এ বিষয়ে পূর্বে সূরা আন-নিসায় আলোচনা করা হয়েছে।

﴿ولا تأخذكم بهما رأفة﴾

“তাদের ব্যাপারে তোমাদের যেন কোনো দয়া-মমতা গ্রাস না করে।”

অর্থাৎ এমন দয়া বা কোমলতা নয়, যা আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে।

ইবনু উমর (রা.)-এর একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তিনি তাঁর এক দাসীকে ব্যভিচারের অপরাধে বেত্রাঘাত করাচ্ছিলেন। তিনি জল্লাদকে বললেন, “তার পিঠ ও পায়ে আঘাত কর।” তখন তাঁর পুত্র বললেন, “আল্লাহ তো বলেছেন, ‘তোমাদের যেন তাদের ব্যাপারে দয়া না আসে।’” ইবনু উমর (রা.) জবাব দিলেন, “হে বৎস! আল্লাহ আমাকে তাকে হত্যা করার নির্দেশ দেননি। আমি তাকে এমনভাবে প্রহার করেছি যাতে সে কষ্ট অনুভব করে।”

এরপর মুফাসসিরগণ আয়াতটির অর্থ নিয়ে মতভেদ করেছেন:

ইমাম যুহরী বলেন: ব্যভিচার ও অপবাদের (কাযফ) হদ্দে কঠোরতা অবলম্বন করা হবে, আর মদ্যপানের শাস্তিতে কিছুটা লঘুতা করা হবে।

কাতাদা বলেন: ব্যভিচারের হদ্দে কঠোরতা করা হবে, আর মদ্যপান ও অপবাদের শাস্তিতে তুলনামূলক লঘুতা থাকবে।

﴿في دين الله﴾

অর্থাৎ আল্লাহর বিধান ও ফয়সালার ক্ষেত্রে।

﴿إن كنتم تؤمنون بالله واليوم الآخر﴾

“যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখো।”

অর্থাৎ প্রকৃত মুমিন আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এমন দয়ার বশবর্তী হয় না, যা শরিয়তের বিধানকে অকার্যকর করে দেয়।

﴿وليشهد عذابهما طائفة من المؤمنين﴾

“এবং মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।”

অর্থাৎ হদ্দ কার্যকর করার সময় কিছু মুমিন উপস্থিত থাকবে।

“طائفة” (একটি দল) কতজনকে বোঝায়—এ ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে:

মুজাহিদ ও নাখঈ: অন্তত একজন।

ইকরিমা ও আতা: দুইজন বা তার বেশি।

যুহরী ও কাতাদা: তিনজন বা তার বেশি।

ইমাম মালিক ও ইবনু যায়দ: চারজন, যেহেতু ব্যভিচার প্রমাণে চারজন সাক্ষী লাগে।

৩। সূরা আন-নূর ২৪:২ আয়াতের ই‘রাব (ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ)। নিচে এর বাংলা অনুবাদ দেওয়া হলো:

মূল ইবারত :

ر (الزَّانِيَةُ) مبتدأ (وَالزَّانِي) معطوف والجملة مستأنفة. (فَاجْلِدُوا) الفاء زائدة وأمر وفاعله والجملة خبر (كُلَّ) مفعول به (واحِدٍ) مضاف إليه (مِنْهُما) متعلقان بمحذوف صفة لواحد (مِائَةَ) نائب مفعول مطلق (جَلْدَةٍ) مضاف إليه (وَلا) الواو عاطفة لا ناهية (تَأْخُذْكُمْ) مضارع مجزوم والكاف مفعوله (بِهِما) متعلقان بتأخذكم (رَأْفَةٌ) فاعل مؤخر (فِي دِينِ) متعلقان بتأخذكم (اللَّهِ) لفظ الجلالة مضاف إليه (إِنْ) شرطية (كُنْتُمْ) كان واسمها والجملة ابتدائية (تُؤْمِنُونَ) مضارع وفاعله والجملة خبر (بِاللَّهِ) لفظ الجلالة مجرور بالباء متعلقان بتؤمنون (وَالْيَوْمِ) معطوفة على لفظ الجلالة (الْآخِرِ) مضاف إليه (وَلْيَشْهَدْ) الواو استئنافية ولام الأمر ومضارع مجزوم بلام الأمر والجملة استئنافية (عَذابَهُما) مفعول به والهاء مضاف إليه (طائِفَةٌ) فاعل مؤخر (مِنَ الْمُؤْمِنِينَ) متعلقان بطائفة وجواب الشرط محذوف دل عليه ما قبله.

বাংলা অনুবাদ :

إعراب الآية (ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ)

﴿الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا مِائَةَ جَلْدَةٍ﴾

الزَّانِيَةُ : মুবতাদা (বাক্যের প্রারম্ভিক বিশেষ্য)।

وَالزَّانِي : "الزانية"-এর উপর আতফ (সংযোজিত)।

এ দুটিকে নিয়ে গঠিত বাক্যটি নতুনভাবে শুরু হওয়া (استئنافية) বাক্য।

فَاجْلِدُوا : ফা অক্ষরটি অতিরিক্ত (زائدة) বলে ধরা হয়েছে; اجلدوا হলো আদেশবাচক ক্রিয়া, এবং এর কর্তা (فاعل) হলো এর মধ্যে নিহিত "তোমরা" (واو الجماعة)।

كُلَّ : কর্ম (مفعول به)।

وَاحِدٍ : "كل" এর মুদাফ ইলাইহ।

مِنْهُمَا : "واحد" এর বিশেষণ (صفة) সম্পর্কিত একটি অপসৃত (محذوف) অংশের সাথে সংশ্লিষ্ট।

مِائَةَ : نائب مفعول مطلق (মুতলাক কর্মের প্রতিনিধি)।

جَلْدَةٍ : "مائة" এর মুদাফ ইলাইহ।

﴿وَلَا تَأْخُذْكُمْ بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ اللَّهِ﴾

وَ : সংযোজক অব্যয়।

لَا : নিষেধবাচক (لا الناهية)।

تَأْخُذْكُمْ : মুজযূম (জযমপ্রাপ্ত) বর্তমান ক্রিয়া; كم এর কর্ম (مفعول به)।

بِهِمَا : "تأخذكم" ক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট।

رَأْفَةٌ : বিলম্বিত কর্তা (فاعل مؤخر)।

فِي دِينِ اللَّهِ : "تأخذكم" এর সাথে সংশ্লিষ্ট।

اللَّهِ : মুদাফ ইলাইহ।

﴿إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ﴾

إِنْ : শর্তবাচক অব্যয়।

كُنْتُمْ : "كان" এবং তার ইসম (اسم كان)।

تُؤْمِنُونَ : বর্তমান ক্রিয়া; এর কর্তা ওয়াও (واو الجماعة)।

এই বাক্যটি "كان" এর খবর (خبر كان)।

بِاللَّهِ : "تؤمنون" এর সাথে সংশ্লিষ্ট।

اللَّهِ : বা-এর কারণে মাজরুর।

وَالْيَوْمِ : "الله" এর উপর আতফ।

الْآخِرِ : "اليوم" এর মুদাফ ইলাইহ।

﴿وَلْيَشْهَدْ عَذَابَهُمَا طَائِفَةٌ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ﴾

وَ : নতুন বাক্য শুরু করার জন্য (استئنافية)।

لْيَشْهَدْ : আদেশসূচক লাম (لام الأمر) সহ মুজযূম বর্তমান ক্রিয়া।

عَذَابَهُمَا : কর্ম (مفعول به)।

هما : মুদাফ ইলাইহ।

طَائِفَةٌ : বিলম্বিত কর্তা (فاعل مؤخر)।

مِنَ الْمُؤْمِنِينَ : "طائفة" এর সাথে সংশ্লিষ্ট।

المؤمنين : "من" এর কারণে মাজরুর।

৪। তাফসিরে সাদী :

মূল ইবারত :

هذا الحكم في الزاني والزانية البكرين، أنهما يجلد كل منهما مائة جلدة، وأما الثيب، فقد دلت السنة الصحيحة المشهورة، أن حده الرجم، ونهانا تعالى أن تأخذنا رأفة [بهما] في دين الله، تمنعنا من إقامة الحد عليهم، سواء رأفة طبيعية، أو لأجل قرابة أو صداقة أو غير ذلك، وأن الإيمان موجب لانتفاء هذه الرأفة المانعة من إقامة أمر الله، فرحمته حقيقة، بإقامة حد الله عليه، فنحن وإن رحمناه لجريان القدر عليه، فلا نرحمه من هذا الجانب، وأمر تعالى أن يحضر عذاب الزانيين طائفة، أي: جماعة من المؤمنين، ليشتهر ويحصل بذلك الخزي والارتداع، وليشاهدوا الحد فعلا، فإن مشاهدة أحكام الشرع بالفعل، مما يقوى بها العلم، ويستقر به الفهم، ويكون أقرب لإصابة الصواب، فلا يزاد فيه ولا ينقص، والله أعلم.

বাংলা অনুবাদ :

এই বিধান ব্যভিচারী অবিবাহিত পুরুষ ও অবিবাহিত নারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তাদের প্রত্যেককে একশত বেত্রাঘাত করা হবে।

আর বিবাহিত (ثيب) ব্যক্তির ব্যাপারে সুপ্রসিদ্ধ ও সহীহ সুন্নাহ প্রমাণ করে যে তার শাস্তি হলো রজম (পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ড)।

আল্লাহ তাআলা আমাদের নিষেধ করেছেন যে, আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে তাদের প্রতি এমন দয়া বা মমতা যেন আমাদেরকে হদ্দ (নির্ধারিত শাস্তি) কার্যকর করা থেকে বিরত না রাখে। তা সে স্বাভাবিক মানবিক দয়া হোক, আত্মীয়তার কারণে হোক, বন্ধুত্বের কারণে হোক অথবা অন্য কোনো কারণে হোক।

আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমানের দাবি হলো, আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে এমন দয়া-মমতা দূর হয়ে যাবে।

প্রকৃতপক্ষে তার প্রতি সত্যিকারের দয়া হলো তার ওপর আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি কার্যকর করা। সুতরাং তাকদীরের কারণে তার ওপর যা ঘটেছে, সে কারণে আমরা তার জন্য দুঃখ অনুভব করতে পারি; কিন্তু এই দুঃখ বা দয়া আমাদেরকে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়ন থেকে বিরত রাখতে পারে না।

আল্লাহ তাআলা আরও নির্দেশ দিয়েছেন যে, ব্যভিচারী নারী-পুরুষের শাস্তি কার্যকর করার সময় মুমিনদের একটি দল উপস্থিত থাকবে।

অর্থাৎ, একদল মুমিন যেন এই শাস্তি প্রত্যক্ষ করে, যাতে ঘটনাটি সমাজে প্রসিদ্ধ হয়, অপরাধীর জন্য লাঞ্ছনা ও সামাজিক ভর্ৎসনা সৃষ্টি হয় এবং অন্যরা এ ধরনের অপরাধ থেকে বিরত থাকে।

এছাড়া তারা যেন শরিয়তের বিধান বাস্তবে কার্যকর হতে দেখে। কারণ শরিয়তের বিধানকে বাস্তবে প্রত্যক্ষ করা জ্ঞানকে দৃঢ় করে, উপলব্ধিকে স্থিতিশীল করে এবং সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে অধিক সহায়ক হয়।

এর ফলে শাস্তির ক্ষেত্রে না বাড়াবাড়ি হবে, না কমতি করা হবে।

আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।

৫। মুহাম্মদ আত-তাহির ইবন আশূর রহ : এ আয়াতের তাফসিরে বলেন,

মূল ইবারত :

ففرض حد الزنى بهذه الآية جلد مائة فعمّ المحصن وغيره ، وخصصته السنة بغير المحصن من الرجال والنساء . فأما من أحصن منهما ، أي تزوج بعقد صحيح ووقع الدخول فإن الزاني المحصن حده الرجم بالحجارة حتى يموت . وكان ذلك سُنةً متواترةً في زمن النبي صلى الله عليه وسلم ورجم ماعز بن مالك . وأجمع على ذلك العلماء وكان ذلك الإجماع أثراً من آثار تواترها . وقد روي عن عمر أن الرجم كان في القرآن «الثيِّب والثيبة إذا زنيا فارجموهما البتة» وفي رواية «الشيخ والشيخة» وأنه كان يقرأ ونسخت تلاوته . وفي «أحكام ابن الفرس» في سورة النساء : «وقد أنكر هذا قوم» ، ولم أر من عيّن الذين أنكروا . وذكر في سورة النور أن الخوارج بأجمعهم يرون هذه الآية على عمومها في المحصن وغيره ولا يرون الرجم ويقولون : ليس في كتاب الله الرجم فلا رجم . ولا شك في أن القضاء بالرجم وقع بعد نزول سورة النور . وقد سئل عبد الله بن أبي أوفى عن الرجم : أكان قبل سورة النور أو بعدها؟ ( يريد السائل بذلك أن تكون آية سورة النور منسوخة بحديث الرجم أو العكس ، أي أن الرجم منسوخ بالجلد) فقال ابن أبي أوفى : لا أدري . وفي رواية أبي هريرة أنه شهد الرجم . وهذا يقتضي أنه كان معمولاً به بعد سورة النور لأن أبا هريرة أسلم سنة سبع وسورة النور نزلت سنة أربع أو خمس كما علمت وأجمع العلماء على أن حد الزاني المحصن الرجم . وقد ثبت بالسنة أيضاً تغريب الزاني بعد جلده تغريب سنة كاملة ، ولا تغريب على المرأة . وليس التغريب عند أبي حنيفة بمتعين ولكنه لاجتهاد الإمام إن رأى تغريبه لدعارته . عطف على جملة { فاجلدوا } ؛ فلما كان الجلد موجعاً وكان المباشر له قد يرق على المجلود من وجعه نُهي المسلمون أن تأخذهم رأفة بالزانية والزاني فيتركوا الحد أو ينقصوه . والأخذ : حقيقته الاستيلاء . وهو هنا مستعار لشدة تأثير الرأفة على المخاطبين وامتلاكها إرادتهم بحيث يضعفون عن إقامة الحد فيكون كقوله : { أخذته العزة بالإثم } [ البقرة : 206 ] فهو مستعمل في قوة ملابسة الوصف للموصوف .

বাংলা অনুবাদ :

এই আয়াতের মাধ্যমে ব্যভিচারের শাস্তি হিসেবে একশত বেত্রাঘাত নির্ধারণ করা হয়েছে। আয়াতটির ভাষা সাধারণ (عام), ফলে এটি বিবাহিত (মুহসান) ও অবিবাহিত (গায়রে মুহসান) উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করে। কিন্তু সুন্নাহ এই সাধারণ বিধানকে নির্দিষ্ট করে দিয়েছে যে, এই বেত্রাঘাতের শাস্তি অবিবাহিত পুরুষ ও নারীর জন্য।

পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি মুহসান—অর্থাৎ বৈধ বিবাহ সম্পন্ন করেছে এবং স্ত্রীর সঙ্গে সহবাসও সংঘটিত হয়েছে—তার ব্যভিচারের শাস্তি হলো পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ড (রজম)।

এটি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর যুগে সুপ্রতিষ্ঠিত ও মুতাওয়াতির সুন্নাহ ছিল। তিনি Ma'iz ibn Malik-কে রজম করেছিলেন।

এ বিষয়ে মুসলিম আলিমগণের ঐকমত্য (ইজমা) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং সেই ইজমা মূলত এই মুতাওয়াতির সুন্নাহরই ফল।

Umar ibn al-Khattab থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রজম সম্পর্কিত একটি আয়াত কুরআনে ছিল:

«الثيب والثيبة إذا زنيا فارجموهما البتة»

“বিবাহিত পুরুষ ও বিবাহিতা নারী যখন ব্যভিচার করবে, তখন অবশ্যই তাদের রজম করো।”

অন্য একটি বর্ণনায় আছে:

«الشيخ والشيخة إذا زنيا فارجموهما البتة»

এবং তিনি বলেন, এটি একসময় তিলাওয়াত করা হতো, পরে এর তিলাওয়াত রহিত (নাসখ) হয়ে গেছে।

ইবনুল ফারাস তাঁর আহকামুল কুরআন গ্রন্থে সূরা নিসার আলোচনায় উল্লেখ করেছেন যে, কিছু লোক এই বিষয়টি অস্বীকার করেছে। তবে তিনি নির্দিষ্ট করে বলেননি কারা এ মত পোষণ করত।

সূরা আন-নূরের তাফসীরে তিনি উল্লেখ করেন যে, খারিজিদের সকল দল এই আয়াতকে বিবাহিত ও অবিবাহিত উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য মনে করত। তারা রজম মানত না এবং বলত:

“আল্লাহর কিতাবে রজমের কথা নেই; অতএব রজমও নেই।”

তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, সূরা আন-নূর নাযিল হওয়ার পরও রজমের বিধান কার্যকর ছিল।

Abd Allah ibn Abi Awfa-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল:

“রজমের বিধান কি সূরা আন-নূর নাযিলের আগে ছিল, নাকি পরে?”

(প্রশ্নকারীর উদ্দেশ্য ছিল জানতে চাওয়া যে, রজমের হাদিস কি সূরা আন-নূরের আয়াত দ্বারা রহিত হয়েছে, নাকি উল্টোটা।)

তিনি উত্তর দেন:

“আমি জানি না।”

অন্যদিকে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি নিজে রজম কার্যকর হতে দেখেছেন। এটি প্রমাণ করে যে সূরা আন-নূর নাযিল হওয়ার পরও রজমের বিধান কার্যকর ছিল। কারণ আবু হুরায়রা (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন ৭ হিজরিতে, আর সূরা আন-নূর নাযিল হয় ৪ বা ৫ হিজরিতে।

এ কারণেই আলিমগণ সর্বসম্মতিক্রমে একমত যে, মুহসান ব্যভিচারীর শাস্তি রজম।

সুন্নাহ দ্বারা আরও প্রমাণিত হয়েছে যে, অবিবাহিত ব্যভিচারীকে একশত বেত্রাঘাতের পর এক বছরের জন্য নির্বাসিত (تغريب) করা হবে।

তবে নারীর ক্ষেত্রে নির্বাসন নেই।

আর আবু হানিফ-এর মতে নির্বাসন বাধ্যতামূলক নয়; বরং ইমাম বা বিচারক পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজন মনে করলে তা প্রয়োগ করবেন।

এরপর আল্লাহর বাণী:

﴿ولا تأخذكم بهما رأفة في دين الله﴾

“আল্লাহর বিধান কার্যকর করার ক্ষেত্রে তাদের প্রতি কোনো দয়া যেন তোমাদেরকে প্রভাবিত না করে।”

এটি পূর্বের ﴿فاجلدوا﴾ (তাদেরকে বেত্রাঘাত করো) নির্দেশনার সঙ্গে সংযুক্ত।

যেহেতু বেত্রাঘাত কষ্টদায়ক, তাই শাস্তি কার্যকরকারী ব্যক্তি কখনো অপরাধীর যন্ত্রণা দেখে তার প্রতি কোমলতা অনুভব করতে পারে। ফলে সে হয়তো শাস্তি বাস্তবায়ন থেকে বিরত থাকবে অথবা শাস্তি হালকা করে দেবে। এজন্য মুসলমানদেরকে এ ধরনের দয়া দ্বারা প্রভাবিত হতে নিষেধ করা হয়েছে।

“أخذ” (ধরা) শব্দের মূল অর্থ হলো কোনো কিছুর উপর কর্তৃত্ব বা দখল প্রতিষ্ঠা করা।

এখানে তা রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ দয়া-মমতা যেন এমনভাবে মানুষের মন ও ইচ্ছাশক্তির উপর প্রভাব বিস্তার না করে যে, তারা আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি কার্যকর করতে দুর্বল হয়ে পড়ে।

এটি আল্লাহর এই বাণীর অনুরূপ:

﴿أخذته العزة بالإثم﴾

“অহংকার তাকে পাপের মধ্যে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে।” (সূরা আল-বাকারা: ২০৬)

অর্থাৎ এখানে “ধরা” শব্দটি কোনো গুণ বা অবস্থার মানুষের উপর গভীর প্রভাব বিস্তার বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।

৬। ইমাম ফখরুদ্দীন আর-রাযী (রহ.)-এর তাফসিরে কাবীর থেকে সূরা নূর, আয়াত ২-এর বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:-

মূল ইবারত :

واعلم أنه كان في أول الإسلام عقوبة الزاني الحبس إلى الممات في حق الثيب، والأذى بالكلام في حق البكر.

قال الله تعالى: {واللاتي يَأْتِينَ الفاحشة مِن نّسَائِكُمْ فاستشهدوا عَلَيْهِنَّ أَرْبَعةً مّنْكُمْ فَإِن شَهِدُواْ فَأَمْسِكُوهُنَّ فِي البيوت حتى يَتَوَفَّاهُنَّ الموت أَوْ يَجْعَلَ الله لَهُنَّ سَبِيلاً * واللذان يأتيانها مِنكُمْ فَئَاذُوهُمَا فَإِن تَابَا وَأَصْلَحَا فَأَعْرِضُواْ عَنْهُمَا} [النساء: 15، 16]

ثم نسخ ذلك فجعل حد الزنا على الثيب الرجم وحد البكر الجلد والتغريب، ولنذكر هاتين المسألتين:

المسألة الأولى: الخوارج أنكروا الرجم واحتجوا فيه بوجوه:

أحدها: قوله تعالى: {فَعَلَيْهِنَّ نِصْفُ مَا عَلَى المحصنات} [النساء: 25] فلو وجب الرجم على المحصن لوجب نصف الرجم على الرقيق لكن الرجم لا نصف لها.

وثانيها: أن الله سبحانه ذكر في القرآن أنواع المعاصي من الكفر والقتل والسرقة، ولم يستقص في أحكامها كما استقصى في بيان أحكام الزنا، ألا ترى أنه تعالى نهى عن الزنا بقوله: {وَلاَ تَقْرَبُواْ الزنى} [الإسراء: 32] ثم توعد عليه ثانياً بالنار كما في كل المعاصي، ثم ذكر الجلد ثالثاً ثم خص الجلد بوجوب إحضار المؤمنين رابعاً، ثم خصه بالنهي عن الرأفة عليه بقوله: {وَلاَ تَأْخُذْكُمْ بِهِمَا رَأْفَةٌ فِي دِينِ الله} خامساً، ثم أوجب على من رمى مسلماً بالزنا ثمانين جلدة، وسادساً، لم يجعل ذلك على من رماه بالقتل والكفر وهما أعظم منه، ثم قال سابعاً: {وَلاَ تَقْبَلُواْ لَهُمْ شَهَادَةً أَبَداً} ثم ذكر ثامناً من رمى زوجته بما يوجب التلاعن واستحقاق غضب الله تعالى ثم ذكر تاسعاً أن {الزانية لاَ يَنكِحُهَا إِلاَّ زَانٍ أَوْ مُشْرِكٌ} [النور: 3]، ثم ذكر عاشراً أن ثبوت الزنا مخصوص بالشهود الأربعة فمع المبالغة في استقصاء أحكام الزنا قليلاً وكثيراً لا يجوز إهمال ما هو أجل أحكامها وأعظم آثارها، ومعلوم أن الرجم لو كان مشروعاً لكان أعظم الآثار فحيث لم يذكره الله تعالى في كتابه دل على أنه غير واجب.

وثالثها: قوله تعالى: {الزانية والزانى فاجلدوا} يقتضي وجوب الجلد على كل الزناة، وإيجاب الرجم على البعض بخبر الواحد يقتضي تخصيص عموم الكتاب بخبر الواحد، وهو غير جائب. لأن الكتاب قاطع في متنه، وخبر الواحد غير قاطع في متنه، والمقطوع راجح على المظنون.

الأول: أن الرجم ثبت بالتواتر عن رسول الله صلى الله عليه وسلم، فإنه رجم ماعز بن مالك والغامدية، وعمل به الخلفاء الراشدون، وذلك مما لا يجوز أن يخفى، بل هو من المعلوم من الدين بالضرورة، والخوارج وإن أنكروا وجوب العمل به لكنهم لا ينكرون وقوعه.

الثاني: أن قوله تعالى: {الزانية والزاني فاجلدوا} وإن كان عاماً لكنه لم يخصص بخبر الواحد، بل نقول: إن هذه الآية نزلت في البكرين، وأما حكم الثيب فثبت بالسنة استقلالاً، والسنة ليست مقلدة للكتاب بل هي أصل مستقل، وأيضاً فإن تخصيص عموم الكتاب بالسنة قد وقع في مواضع لا تحصى، كتخصيص آية المواريث بقوله صلى الله عليه وسلم: "لا نورث، ما تركناه صدقة".

جواب الوجه الأول: أن المراد من المحصنات في قوله تعالى: {فعليهن نصف ما على المحصنات} الحرائر، لأن حد الأمة إذا زنت وهي غير محصنة نصف حد الحرة غير المحصنة، وهو خمسون جلدة، وإذا زنت وهي محصنة فعقوبتها أيضاً خمسون جلدة، فظهر أن الاعتبار في التنصيف بحرية المحصنات لا بإحصانهن.

جواب الوجه الثاني: أن القرآن قد يفصل وقد يجمل، وقد فوض الله تعالى إلى رسوله بيان ما أنزل، كما في أعداد الصلوات ومقادير الزكوات، فكذلك الرجم. وأيضاً فقد روي عن عمر رضي الله عنه أنه قال: "كان فيما أنزل من القرآن: الشيخ والشيخة إذا زنيا فارجموهما البتة" وهذا وإن نسخت تلاوته فحكمه باقٍ.

جواب الوجه الثالث: أن الرجم لم يثبت بخبر الواحد فقط، بل بالتواتر والإجماع، والتواتر والإجماع يفيدان القطع، فلا يكون هذا تخصيصاً للكتاب بخبر الواحد. يكون هذا تخصيصاً للكتاب بخبر الواحد.

وأما المحصن: فاعلم أن العلماء اختلفوا في تفسيره، فعند أبي حنيفة رحمه الله: المحصن هو الحر العاقل البالغ الذي دخل بزوجة في نكاح صحيح. وعند الشافعي رحمه الله: المحصن هو من دخل بزوجة في نكاح صحيح، سواء كان حراً أو عبداً. وعند مالك رحمه الله: المحصن هو من دخل بزوجة في نكاح صحيح، وهو حر مسلم بالغ عاقل.

حجة الجمهور: قوله صلى الله عليه وسلم: "خذوا عني، قد جعل الله لهن سبيلاً: البكر بالبكر جلد مائة وتغريب عام، والثيب بالثيب جلد مائة والرجم". (رواه مسلم)

والثيب هو من وطئ في نكاح صحيح، سواء كان حراً أو عبداً.

وأما الجمع بين الجلد والرجم: فمذهب الجمهور أن الثيب الزاني يرجم فقط ولا يجلد، لأن النبي صلى الله عليه وسلم رجم ماعزاً والغامدية ولم يجلدهما.

وقال أحمد في رواية والحسن البصري: يجلد ثم يرجم، وعليه عمل علي رضي الله عنه في شراحة، فإنه جلدها يوم الخميس مائة ثم رجمها يوم الجمعة، وقال: "جلدتها بكتاب الله، ورجمتها بسنة رسول الله صلى الله عليه وسلم".

وأجاب الجمهور: بأن هذه القضية مخصوصة بشراحة، ولعلها كانت بكراً عند الجلد ثم تزوجت ودخل بها قبل الرجم، أو أن الحديث ضعيف.

وأما التغريب: فهو واجب عند الجمهور في حق البكر الزاني، وهو تغريب عام كامل، ولا تغريب على المرأة.

حجتهم: حديث عبادة بن الصامت: "خذوا عني، قد جعل الله لهن سبيلاً: البكر بالبكر جلد مائة وتغريب عام، والثيب بالثيب جلد مائة والرجم".

وقال أبو حنيفة رحمه الله: التغريب ليس بواجب، بل هو إلى اجتهاد الإمام، إن شاء غربه وإن شاء حبسه.

حجته: أن الأمر بالتغريب كان في صدر الإسلام ثم نسخ بآية الجلد، لأن آية النور مطلقة في الجلد ولم تذكر التغريب.

وأجاب الجمهور: بأن الآية لم تنسخ التغريب، بل هو حكم ثابت بالسنة.

وأما طريق ثبوته: فلا يثبت الزنا إلا بأربعة شهود رجال عدول، يشهدون أنهم رأوا ذكره في فرجها كالميل في المكحلة، والرشاء في البئر. ولا تقبل شهادة النساء في الزنا.

فإن شهد أقل من أربعة فهم قذفة يجلدون ثمانين جلدة.

وأما الإقرار: فيعتبر أن يقر أربع مرات في أربع مجالس، ولو رجع قبل تمام الإقرارات الأربع سقط عنه الحد. وقد لقن النبي صلى الله عليه وسلم ماعزاً الرجوع بقوله: "لعلك قبلتها، لعلك لمستها".

وأما الحبل: فهل هو دليل على الزنا؟

قال مالك رحمه الله: إذا حبلت المرأة التي لا زوج لها ولا سيد، فعليها الحد، إلا أن تدعي شبهة.

وقال أبو حنيفة والشافعي رحمهما الله: لا حد عليها بمجرد الحبل، لجواز أن يكون وطء شبهة أو إكراهاً، والحدود تدرأ بالشبهات، لقوله صلى الله عليه وسلم: "ادرؤوا الحدود بالشبهات".

وأما المخاطبون بقوله: {فاجلدوا} فالخطاب للأئمة ونوابهم، وليس للعامة أن يقيموا الحدود بأنفسهم، لئلا يفضي إلى الفتنة والهرج.

وقال مالك والشافعي وأحمد: للسيد أن يقيم الحد على عبده وأمته.

وقال أبو حنيفة رحمه الله: لا يقيم الحد إلا الإمام أو نائبه.

وأما كيفية الجلد: فيجلد بسوط لا جديد ولا خلق، وسط بين السوطين، ولا يرفع الجالد يده حتى يرى بياض إبطه.

ويتقي الوجه والفرج والمقاتل، وتضرب سائر الأعضاء عند أبي حنيفة.

وعند الشافعي رحمه الله: يختص الجلد بالظهر.

والمرأة تجلد قاعدة، والرجل يجلد قائماً.

ولا يقام الحد على المريض حتى يبرأ

وأما قوله تعالى: {ولا تأخذكم بهم رأفة في دين الله} فالمراد النهي عن ترك الحد أو تخفيفه رحمة بهما.

والرأفة: رقة القلب، وهي رحمة طبيعية، والمنهي عنه هو ما يفضي إلى تعطيل حدود الله.

قال مجاهد: "الرأفة: أن لا تقيم الحد".

وقال بعضهم: النهي عن تخفيف الضرب، بل يضرب ضرباً وجيعاً.

قال الإمام الرازي رحمه الله: وفي الآية دليل على أن الرحمة على خلق الله حسنة، إلا في موضع إقامة حدود الله، فإنها قبيحة، ولهذا قال صلى الله عليه وسلم: "والله لو أن فاطمة بنت محمد سرقت لقطعت يدها".

، ولا على الحامل حتى تضع حملها.

বাংলা অনুবাদ :

জমহুর (আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত) জেনে রাখো, ইসলামের প্রাথমিক যুগে যিনার শাস্তি ছিল— বিবাহিতদের জন্য মৃত্যু পর্যন্ত গৃহবন্দী এবং অবিবাহিতদের জন্য মৌখিক ধমক ও কষ্টদায়ক কথা। যেমন আল্লাহ বলেছেন: “তোমাদের নারীদের মধ্যে যারা ব্যভিচার করে, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের মধ্য থেকে চারজন সাক্ষী উপস্থিত করো; তারা সাক্ষ্য দিলে নারীদের মৃত্যু পর্যন্ত গৃহবন্দী রাখো, যতক্ষণ না আল্লাহ তাদের জন্য কোনো পথ করে দেন। আর তোমাদের পুরুষদের মধ্যে দুজন যদি ব্যভিচার করে, তাদেরকে কষ্ট দাও; তারা তাওবা করলে ও সংশোধিত হলে তাদের থেকে বিরত থাকো।” (সূরা নিসা, ১৫-১৬) পরবর্তীতে এই বিধান রহিত (মানসুখ) করা হয় এবং যিনার ‘হদ’ নির্ধারিত হয়: বিবাহিতদের জন্য রজম ও অবিবাহিতদের জন্য বেত্রাঘাত ও নির্বাসন। আমরা এ দুটি মাসআলা উল্লেখ করব। প্রথম মাসআলা: খারেজীরা রজম অস্বীকার করে এবং তাদের দলিল: ১. আল্লাহ বলেছেন: “তাহলে তাদের (দাসীদের) শাস্তি হবে স্বাধীন নারীদের (মুহসানাত) অর্ধেক।” (সূরা নিসা, ২৫) যদি স্বাধীন নারীর জন্য রজম আবশ্যক হয়, তাহলে দাসীদের জন্য অর্ধ রজম আবশ্যক হওয়া দরকার। কিন্তু রজমের তো অর্ধেক হয় না। ২. আল্লাহ কুরআনে কুফর, হত্যা, চুরি ইত্যাদি পাপের বিধান এত বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেননি, যতটা যিনার বিধান বর্ণনা করেছেন। দেখো! তিনি যিনা নিষেধ করলেন (সূরা ইসরা: ৩২), তারপর জাহান্নামের ভয় দেখালেন, তারপর বেত্রাঘাতের কথা বললেন, তারপর মুমিনদের উপস্থিতির আদেশ দিলেন, তারপর দয়া করতে নিষেধ করলেন, তারপর যিনার অপবাদকারীর জন্য আশি বেত্রাঘাত ফরজ করলেন, অথচ হত্যা বা কুফরির অপবাদে তা ফরজ করলেন না, যদিও তা বড় অপরাধ। এরপর বললেন: “তোমরা কখনোই তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ করো না।” তারপর স্ত্রীকে অপবাদ দিলে ‘লিআন’ ও আল্লাহর লানতের বিধান দিলেন, তারপর বললেন: “ব্যভিচারী নারীকে ব্যভিচারী বা মুশরিক ছাড়া কেউ বিয়ে করে না”, তারপর যিনা প্রমাণের জন্য চারজন সাক্ষী নির্দিষ্ট করলেন। যিনার ছোট-বড় এত বিস্তারিত বর্ণনার পরও যদি তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বড় বিধান (রজম) বাদ পড়ে যায়, তবে তা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়। যেহেতু আল্লাহ কিতাবে তা উল্লেখ করেননি, প্রমাণিত হয় যে তা আবশ্যক নয়। ৩. “ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণী— বেত্রাঘাত করো” আয়াতটি সাধারণভাবে সব যিনাকারীর জন্য বেত্রাঘাত আবশ্যক করে। আর খবরে ওয়াহিদ (একক বর্ণনা) দ্বারা কারও জন্য রজম সাব্যস্ত করা মানে কুরআনের সাধারণ বিধানকে খবরে ওয়াহিদ দিয়ে খাস (নির্দিষ্ট) করা, যা বৈধ নয়। কারণ কুরআন তার বর্ণনায় দ্ব্যর্থহীন (কাতঈ), আর খবরে ওয়াহিদ দ্ব্যর্থহীন নয় (জান্নী)। দ্ব্যর্থহীন দলিল ধারণাপ্রবণ দলিলের ওপর প্রাধান্য পায়। খারেজীদের এই দাবির জবাবে বলেন: প্রথম দলিল: রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে ‘রজম’ তাওয়াতুরের (অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিক সূত্রে) পর্যায়ে প্রমাণিত। তিনি নিজে মা‘ইয ইবনে মালিক (রা.) ও গামিদিয়া গোত্রের নারীকে রজম করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরামের যুগেও এর ওপর ধারাবাহিকভাবে আমল হয়েছে। এটি এমন একটি বিষয়, যা গোপন থাকতে পারে না; বরং এটি ‘দ্বীন থেকে অপরিহার্যভাবে জানা’ (মা‘লুমুম মিনাদ দ্বীন বিল জরুরা) বিষয়সমূহের অন্তর্ভুক্ত। খারেজীরা যদিও তাদের শাস্তির কথা অস্বীকার করে, কিন্তু ঘটনাটি (রজমের বাস্তবায়ন) অস্বীকার করতে পারে না। দ্বিতীয় দলিল: কুরআনের আয়াত “الزانية والزاني فاجلدوا” যদিও সাধারণ (আম) বাক্য, কিন্তু তা ‘খবরে ওয়াহিদ’ দ্বারা ‘তাখসীস’ (নির্দিষ্টকরণ)-এর দাবি আমরা করছি না; বরং বলছি, এই আয়াতটি নাজিলই হয়েছে অবিবাহিত (বিক্র) ব্যক্তিদের জন্য, আর বিবাহিত (মুহসান)-এর বিধান সুন্নাহ দ্বারা স্বতন্ত্রভাবে প্রমাণিত। সুন্নাহ এখানে কুরআনের মুকাল্লিদ (অনুসারী) নয়, বরং স্বাধীন শরয়ী দলিল। তদুপরি, কুরআনের ‘আম’-কে সুন্নাহ দিয়ে তাখসীস করা তো অগণিতবার ঘটেছে— যেমন মৃত ব্যক্তির ত্যক্ত সম্পদ থেকে মাতা-পিতার জন্য ‘ছুদুস’ (ছয় ভাগের এক ভাগ) আয়াতকে ‘লা নূরাছুল আম্বিয়া’ (নবীগণের কোনো ওয়ারিস হয় না) হাদিস দ্বারা তাখসীস করা হয়েছে। খারেজীদের প্রথম দলিলের জবাব: (দাসীদের অর্ধেক শাস্তি) আয়াতে ‘মুহসানাত’ বলতে স্বাধীন নারীদের বোঝানো হয়েছে। স্বাধীন নারীর শাস্তি যদি পঞ্চাশ বেত্রাঘাত হয় (যেমন তোমরা দাবি করো যে, আয়াতটি অবিবাহিত হোক বা বিবাহিত সবাইকে একশো বেত্রাঘাত করে), তাহলে দাসী পাবে পঁচিশ। কিন্তু তারা যদি ‘মুহসান’ অর্থ ‘বিবাহিত’ নেয়, তবে আমরা বলি: ‘মুহসানাত’ শব্দটি এখানে স্বাধীন নারী অর্থে ব্যবহৃত। কারণ দাসী ব্যভিচার করলে, তা সে স্বাধীন হোক বা বিবাহিত হোক, সর্বাবস্থায় তার শাস্তি পঞ্চাশ বেত্রাঘাত। সুতরাং অর্ধেক শাস্তির রেফারেন্স পয়েন্ট হলো স্বাধীন নারীর শাস্তি (একশো বেত্রাঘাত), বরং রজমের অর্ধেক নয়। খারেজীদের দ্বিতীয় দলিলের জবাব: (কুরআনে রজমের উল্লেখ নেই) কুরআনে বিস্তারিত বিধান আসতে পারে, আবার ইজমালি (সংক্ষিপ্ত) বিধানও আসতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে আল্লাহ কুরআনের ব্যাখ্যা করার এখতিয়ার দিয়েছেন। যেমন নামাজ, যাকাত— এগুলোর বিস্তারিত সংখ্যা ও পদ্ধতি কুরআনে নেই, বরং সুন্নাহ থেকে গৃহীত। রজমও তেমন একটি বিধান। তাছাড়া ওমর (রা.) থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত যে, রজমের আয়াত কুরআনের অংশ হিসেবে নাজিল হয়েছিল: “الشيخ والشيخة إذا زنيا فارجموهما البتة” (প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও নারী ব্যভিচার করলে তাদের অবশ্যই রজম করো), কিন্তু পরে এর তিলাওয়াত রহিত (মানসুখ) করা হয়, যদিও বিধান বহাল থাকে। খারেজীদের তৃতীয় দলিলের জবাব: (খবরে ওয়াহিদ দিয়ে কুরআনের তাখসীস) আমরা বলি, রজমের বিধান ‘খবরে ওয়াহিদ’ দিয়ে প্রমাণিত নয়; বরং তা ‘খবরে মুতাওয়াতির’ (অবিচ্ছিন্ন সূত্রে বর্ণিত) এবং ‘ইজমা’ (সাহাবায়ে কেরামের ঐকমত্য) দ্বারা প্রমাণিত। তাই এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। বিবাহিত (মুহসান)-এর সংজ্ঞা: ‘মুহসান’ বা ‘মুহসানা’ কাকে বলে— এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে ‘ইহসান’ তথা বিবাহিত হওয়ার শর্তগুলো হলো: স্বাধীন হওয়া, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া, জ্ঞানসম্পন্ন হওয়া এবং বৈধ বিবাহ বন্ধনে সহবাস করা। ইমাম শাফেঈ (রহ.)-এর মতে দাসত্ব বাদে বাকি শর্তগুলো একই। অর্থাৎ তাঁর মতে দাস বা দাসীও যদি বিবাহিত হয়, তবে তারা ‘মুহসান’ হবে এবং ব্যভিচার করলে তাদের রজম হবে। ইমাম মালেক (রহ.)-ও অনুরূপ বলেছেন। জমহুরের দলিল: নবী (সা.) বলেছেন: “তোমরা আমার কাছ থেকে (বিধান) নাও। আল্লাহ তাদের (নারীর) জন্য পথ নির্ধারণ করেছেন: অবিবাহিত (বিক্র) কর্তৃক অবিবাহিতার সাথে ব্যভিচার— শাস্তি একশো বেত্রাঘাত ও এক বছরের নির্বাসন; আর বিবাহিত (সাইয়্যিব) কর্তৃক বিবাহিতার সাথে ব্যভিচার— শাস্তি একশো বেত্রাঘাত ও রজম।” (সহীহ মুসলিম) এখানে ‘সাইয়্যিব’ বলতে সহবাসকারী ব্যক্তিকেই বোঝানো হয়েছে, চাই সে স্বাধীন হোক বা দাস। আর ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন, দাস-দাসী ‘ইহসান’-এর পূর্ণতা পায় না, কারণ দাসত্ব একটি নিকৃষ্ট অবস্থা, যা সম্মানের পরিপন্থী। রজম ও জিলদ (বেত্রাঘাত) একত্রিত হবে কি না? জমহুরের মতে, বিবাহিত ব্যভিচারীর জন্য শুধুমাত্র রজমই যথেষ্ট; তার সাথে বেত্রাঘাত একত্রিত হবে না। দলিল: রাসূলুল্লাহ (সা.) মা‘ইয (রা.) ও গামিদিয়াকে শুধু রজম করেছেন, বেত্রাঘাত করেননি। তবে ইমাম আহমদ (রহ.) থেকে একটি বর্ণনা এবং হাসান বসরী (রহ.)-এর মতে, প্রথমে একশো বেত্রাঘাত, তারপর রজম। দলিল: আলী (রা.) ‘শারাহা’ নামক এক নারীকে জুমাবার একশো বেত্রাঘাত করেছিলেন, অতঃপর বৃহস্পতিবার তাকে রজম করেছিলেন এবং বলেছিলেন: “আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী বেত্রাঘাত করলাম, আর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী রজম করলাম।” কিন্তু জমহুর বলেন, এই ঘটনাটি শারাহার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ছিল, কারণ সে হয়তো বেত্রাঘাতের দিবসে অবিবাহিত ছিল এবং পরে রজমের পূর্বে তার স্বামী সহবাস করেছিল (এমন দুর্বল সূত্রে বর্ণিত)। মূলনীতি হলো, রজমই যথেষ্ট। ‘তাগরীব’ (নির্বাসন) প্রসঙ্গে: জমহুরের মতে, অবিবাহিত ব্যভিচারী পুরুষের জন্য একশো বেত্রাঘাতের পর এক বছরের নির্বাসন আবশ্যক। নারীর জন্য নির্বাসন নেই। দলিল: পূর্বোক্ত হাদিস: “অবিবাহিত কর্তৃক অবিবাহিতার সাথে ব্যভিচার— শাস্তি একশো বেত্রাঘাত ও এক বছরের নির্বাসন।” ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন, নির্বাসন অপরিহার্য ‘হদ’ নয়, বরং তা ইমামের এখতিয়ারাধীন ‘তা‘যীর’। তিনি চাইলে তাকে নির্বাসিত করতে পারেন, আবার জেলেও রাখতে পারেন। ইমামের যা উচিত মনে হবে, তাই করবেন। তাঁর দলিল: নির্বাসনের নির্দেশটি যিনার ওপর হদ নির্ধারণকারী আয়াতের (فاجلدوا) পূর্বের একটি ঘটনায় দেওয়া হয়েছিল, যা পরবর্তীতে রহিত হয়ে গেছে। কিন্তু জমহুর বলেন, বরং এটি একটি স্বতন্ত্র বিধান, যা কখনো রহিত হয়নি। সাক্ষ্য প্রমাণের শর্তাবলি: যিনার শাস্তি কার্যকর হতে হলে অবশ্যই চারজন পুরুষ ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীর সাক্ষ্য প্রয়োজন। এতে নারীর সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। সাক্ষীরা একই সাথে দেখবে যে, পুরুষাঙ্গ যোনিতে প্রবেশ করছে— “যেমন মাথায় সুরমা শলাকা প্রবেশ করে এবং রশি বালতির মধ্যে প্রবেশ করে”— (হাদিসের ভাষ্য)। যদি চারজনের কম সাক্ষী হয়, তাহলে তাদের সাক্ষ্য কবুল হবে না এবং তারা নিজেরা ‘কাযাফ’-এর (মিথ্যা অপবাদ) শাস্তি ভোগ করবে। কেউ স্বীকারোক্তি করলে তাকে চারবার স্বীকারোক্তি করতে হবে এবং চতুর্থ বারের পূর্বে যদি ফিরিয়ে নেয়, তাহলে শাস্তি মওকুফ হবে। নবী (সা.) মা‘ইয (রা.)-কে বলেছিলেন: “তুমি কি তার চুম্বন করেছিলে? হয়তো তুমি স্পর্শ করেছিলে?” (অর্থাৎ ফিরিয়ে নেওয়ার পথ বাতলে দিচ্ছিলেন)। গর্ভাবস্থা কি যিনার প্রমাণ? জমহুরের মতে, অবিবাহিত নারী গর্ভবতী হলে তা এককভাবে যিনার প্রমাণ নয়, যদি না সে স্বীকার করে বা সাক্ষী থাকে। কিন্তু ইমাম মালেক (রহ.) বলেন, গর্ভাবস্থা নিজেই যিনার প্রমাণ, যদি তার কোনো স্বামী বা মালিক না থাকে। পক্ষান্তরে ইমাম আবু হানিফা ও শাফেঈ (রহ.) বলেন, গর্ভাবস্থা বিভিন্ন কারণে হতে পারে (জোরপূর্বক, সন্দেহজনক বিবাহ, ইত্যাদি), তাই ‘হদ’ থেকে বাঁচতে সন্দেহকেই প্রাধান্য দিতে হবে। নবী (সা.) বলেছেন: “সন্দেহাবস্থায় হুদূদ বাতিল করে দাও।” “তাদের বেত্রাঘাত করো”— সম্বোধন কারা? (فاجلدوا) এই আদেশের সম্বোধন কাদের? আলেমগণ একমত যে, এটি মুসলিম শাসক (ইমাম) বা তার প্রতিনিধি (বিচারক)-এর প্রতি নির্দেশ। সাধারণ মুসলিমগণ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ‘হদ’ কার্যকর করতে পারে না। তবে ইমাম মালেক, শাফেঈ ও আহমদ (রহ.)-এর মতে মনিব তার দাস-দাসীর ওপর হদ কার্যকর করতে পারে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন, এ অধিকার কেবল ইমামের। তবে সকলেই একমত যে, কাউকে হত্যা বা অঙ্গহানি করার এখতিয়ার সাধারণ মানুষের নেই। প্রহারের পদ্ধতি: প্রহার হবে ‘মধ্যম মানের’ চাবুক দিয়ে, চামড়ার ফালি দিয়ে তৈরি— খুব বেশি শক্ত না আবার খুব নরমও না। প্রহারকারী তার হাত এতটা তুলবে না যাতে বগল দেখা যায়। শরীরের মারাত্মক অঙ্গ (মাথা, চেহারা, লজ্জাস্থান) পরিহার করে অন্যান্য স্থানে প্রহার করতে হবে। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, চেহারা, মাথা ও লজ্জাস্থান ছাড়া সব অঙ্গে প্রহার করা যাবে এবং প্রহারের কষ্ট পুরো শরীরে ছড়িয়ে দিতে হবে, এক জায়গায় একটানা দেওয়া যাবে না। ইমাম শাফেঈ (রহ.)-এর মতে মূলত পিঠেই প্রহার করতে হবে। নারীর ক্ষেত্রে বসা অবস্থায় প্রহার করা হবে, যাতে তার শরীরের গোপনীয়তা রক্ষিত হয়। পুরুষের ক্ষেত্রে দাঁড় করিয়ে প্রহার করা হবে। তবে রোগী বা গর্ভবতীর ক্ষেত্রে সুস্থতা ও প্রসব পর্যন্ত শাস্তি স্থগিত থাকবে। “আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে তাদের প্রতি কোনো দয়া যেন তোমাদের গ্রাস না করে।” (ولا تأخذكم بهم رأفة في دين الله) আলেমগণ এর অর্থ সম্পর্কে বলেন: এই নিষেধাজ্ঞা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো— ‘হদ’ কার্যকর করা থেকে বিরত থাকা বা শাস্তির মাত্রা কমানো থেকে নিষেধ করা। ‘রাফত’ বলতে সেই স্বাভাবিক করুণা, যা অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার সময় মানুষের অন্তরে জাগে। কিন্তু এখানে মুমিনদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহর হুকুমের সামনে এই দয়া যেন তাদের আটকে না ফেলে। কারণ সত্যিকারের দয়া ও রহমত হলো আল্লাহর বিধান কার্যকর করা। ইমাম মুজাহিদ (রহ.) বলেছেন: “এটি হলো সেই দয়া, যা শাস্তি পুরোপুরি ছেড়ে দিতে প্ররোচিত করে, কিন্তু শাস্তি হালকা করে দিলে তা এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসে না।” বরং কেউ কেউ বলেন, বরং ‘প্রহারে হালকা দয়া’ও এ নিষেধের আওতায়; অর্থাৎ শাস্তির প্রহার যেন বেদনাদায়ক হয়, নিছক স্পর্শ করার মতো না হয়। ইমাম রাযী (রহ.) বলেন, এই আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি দয়া করা ভালো, কিন্তু আল্লাহর নির্দেশের ক্ষেত্রে দয়া খারাপ। এই জন্যই নবী (সা.) বলেছেন: “আল্লাহর কসম! যদি ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদও চুরি করত, আমি তার হাত কেটে দিতাম।

৯. উপসংহার

এই বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট যে:

  • ভাষাতাত্ত্বিকভাবে সূরা নূর ২ নং আয়াত শুধু অবিবাহিতদের জন্য নয়, সকলের জন্য প্রযোজ্য — এটি সংস্কারবাদীদের দাবিকে দুর্বল করে, শক্তিশালী করে না।

  • হাদিস দ্বারা কুরআনের আম বিধানের তাখসিস করা উসুলুল ফিকহে প্রতিষ্ঠিত ও স্বীকৃত পদ্ধতি।

  • সাহাবাদের সর্বসম্মত ইজমা রজমের পক্ষে — যা ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে অকাট্য দলিল।

  • আধুনিক সংস্কারবাদীরা ইসলামি জ্ঞানের ক্রমশ্রেণি অনুসরণ না করে ব্যক্তিগত যুক্তিকে প্রাধান্য দিচ্ছেন — যা পদ্ধতিগতভাবে অগ্রহণযোগ্য।

রজমকে কুরআনবিরোধী বলার কোনো ভাষাগত, ঐতিহাসিক বা পদ্ধতিগত ভিত্তি নেই। এটি একটি আধুনিক সংস্কারবাদী অবস্থান যা ইসলামি জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের সাথে সাংঘর্ষিক।

গবেষণা পদ্ধতি:

এই গবেষণাটি একটি গুণগত (Qualitative) এবং ডকুমেন্টভিত্তিক (Documentary/Library Research) গবেষণা। গবেষণার উদ্দেশ্য হলো রজমের বিধান সম্পর্কে উত্থাপিত আধুনিক সংস্কারবাদী দাবিগুলোকে ইসলামি জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো, আরবি ভাষাতত্ত্ব, উসুলুল ফিকহ এবং ধ্রুপদী তাফসিরের আলোকে মূল্যায়ন করা।

গবেষণায় মূলত বর্ণনামূলক (Descriptive), বিশ্লেষণধর্মী (Analytical) এবং তুলনামূলক (Comparative) পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। প্রথমে সূরা আন-নূর (২৪:২)-এর ভাষাগত ও ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়েছে। এরপর উসুলুল ফিকহে عام (সাধারণ বিধান), تخصيص (বিশেষায়ন) এবং بيان (ব্যাখ্যা)-সংক্রান্ত নীতিমালা পর্যালোচনা করা হয়েছে। পরবর্তীতে সহিহ হাদিস, সাহাবাদের আমল ও ইজমা এবং ধ্রুপদী মুফাসসির ও ফকিহদের ব্যাখ্যার সঙ্গে আধুনিক সংস্কারবাদী মতামতের তুলনামূলক মূল্যায়ন করা হয়েছে।

গবেষণার প্রাথমিক (Primary) উৎস হিসেবে পবিত্র কুরআন, সহিহ আল-বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনান আবু দাউদ, সুনান আত-তিরমিজি এবং অন্যান্য প্রামাণ্য হাদিসগ্রন্থ ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি তাফসির আল-কুরতুবী, তাফসির আল-কাবীর (ফখরুদ্দীন আর-রাযী), আত-তাহরীর ওয়াত-তানবীর (ইবন আশূর), তাফসির আস-সাদী, আল-জালালাইন, আর-রিসালা (ইমাম শাফিঈ), আল-ইহকাম ফি উসুলিল আহকাম (আল-আমিদি), আল-মুগনি (ইবন কুদামা), মাজমুউল ফাতাওয়া (ইবন তাইমিয়া) এবং আল-কিতাব (সিবাওয়াইহি)-সহ ধ্রুপদী ইসলামি গ্রন্থসমূহ পর্যালোচনা করা হয়েছে।

গৌণ (Secondary) উৎস হিসেবে ইসলামি আইন, উসুলুল ফিকহ এবং আধুনিক একাডেমিক গবেষণাসংক্রান্ত গ্রন্থ ও গবেষণাপত্র ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষভাবে Rudolph Peters, Wael B. Hallaq এবং Mohammad Hashim Kamali-এর গবেষণাকর্ম আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে বিষয়টির সমকালীন একাডেমিক প্রেক্ষাপটও প্রতিফলিত হয়।

তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে Content Analysis এবং Comparative Textual Analysis পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রাথমিক ও গৌণ উৎসের বক্তব্য পরস্পরের সঙ্গে তুলনা করে তাদের ভাষাগত, ঐতিহাসিক এবং উসুলভিত্তিক সামঞ্জস্য মূল্যায়ন করা হয়েছে। কোনো একটি বিচ্ছিন্ন বর্ণনার ওপর নির্ভর না করে, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ইসলামি জ্ঞান-ঐতিহ্যে গৃহীত মূলধারার (Mainstream Sunni Scholarship) অবস্থানকে কেন্দ্র করে বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়েছে।

এই গবেষণার পরিধি মূলত ধ্রুপদী সুন্নি ইসলামি আইনচিন্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে শিয়া ফিকহ, ইবাদি ফিকহ বা অন্যান্য বিকল্প আইনতাত্ত্বিক ধারার বিশদ আলোচনা এ গবেষণার অন্তর্ভুক্ত নয়। একইভাবে গবেষণাটি আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন বা সমসাময়িক দণ্ডবিধির তুলনামূলক মূল্যায়নের পরিবর্তে ইসলামি শরিয়তের নিজস্ব উৎস, পদ্ধতি ও ব্যাখ্যাগত কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।


তথ্যসূত্র ও গ্রন্থপঞ্জি

প্রাথমিক উৎস

  • আল-বুখারি, মুহাম্মদ ইবন ইসমাইল। সহিহ আল-বুখারি। কিতাবুল হুদুদ। হাদিস নং ৬৮২৯, ৬৮১২, ৬৮১৪।

  • মুসলিম ইবন আল-হাজ্জাজ। সহিহ মুসলিম। কিতাবুল হুদুদ। হাদিস নং ১৬৯০-১৬৯৮।

  • আবু দাউদ আস-সিজিস্তানি। সুনান আবু দাউদ। কিতাবুল হুদুদ। হাদিস নং ৪৪১৫-৪৪২৮।

  • আত-তিরমিজি, মুহাম্মদ ইবন ঈসা। সুনান আত-তিরমিজি। কিতাবুল হুদুদ।

তাফসীর

  • তাফসির আল-জালালাইন

  • তাফসির আস-সাদী

  • তাফসির আত-তাহরির ওয়াত-তানবির

  • তাফসির আল-কাবীর

  • তাফসির

তাফসির আল-কুরতুবী উসুলুল ফিকহ

  • আল-শাফিঈ, মুহাম্মদ ইবন ইদ্রিস (মৃ. ২০৪ হি.)। আর-রিসালা। তাহকিক: আহমাদ মুহাম্মদ শাকির। কায়রো: মাকতাবাতুল হালাবি।

  • আল-আমিদি, সাইফুদ্দিন (মৃ. ৬৩১ হি.)। আল-ইহকাম ফি উসুলিল আহকাম। বৈরুত: দারুল কিতাব আল-আরাবি।

  • ইবন তাইমিয়া, আহমাদ (মৃ. ৭২৮ হি.)। মাজমুউল ফাতাওয়া। রিয়াদ: মাজমাউ মালাকি।

  • ইবন কুদামা, মুওয়াফফাকুদ্দিন (মৃ. ৬২০ হি.)। আল-মুগনি। বৈরুত: দারুল ফিকর।

আরবি ভাষাতত্ত্ব

  • সিবাওয়াইহি, আমর ইবন উসমান (মৃ. ১৭৭ হি.)। আল-কিতাব। তাহকিক: আবদুস সালাম হারুন। কায়রো: মাকতাবাতুল খানজি।

  • আল-জারজানি, আবদুল কাহির (মৃ. ৪৭১ হি.)। দালাইলুল ই'জায। বৈরুত: দারুল মারিফা।

আধুনিক গবেষণা

  • Peters, Rudolph. Crime and Punishment in Islamic Law. Cambridge: Cambridge University Press, 2005.

  • Hallaq, Wael B. A History of Islamic Legal Theories. Cambridge: Cambridge University Press, 1997.

  • Kamali, Mohammad Hashim. Principles of Islamic Jurisprudence. Cambridge: Islamic Texts Society, 2003.

মন্তব্য

  • এখনো কোনো মন্তব্য নেই