বেদ কি ঈশ্বরপ্রদত্ত নাকি মানব রচিত
বেদ মানব ঋষিদের দ্বারা রচিত ও বিকৃত হওয়ার প্রমাণ
?
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।
এক নজরে পয়েন্ট
* বেদ থেকে প্রমাণ: বেদ ঋষিদের দ্বারা রচিত।
* বেদের ব্যাপারে ঋষি ও দর্শনের মত।
* বেদের বৈপরীত্যের মাধ্যমে প্রমাণ: বেদ মানব রচিত ও বিকৃত।
* বেদের বৈজ্ঞানিক ভুল দ্বারা প্রমাণ: বেদ মানব রচিত।
* বেদ কি সবচেয়ে প্রাচীন গ্রন্থ?
* বেদ ঈশ্বরের বাণী না হলে কার বাণী?
* বেদ কি অবিকৃত?
তো চলুন, প্রশ্নগুলোর উত্তর তাদের শাস্ত্রের আলোকে জেনে নেওয়া যাক।
পয়েন্ট-১
আমি সরাসরি বেদের মন্ত্র দ্বারা প্রথমে প্রমাণ করছি যে বেদ ঋষিদের দ্বারা রচিত।
রেফারেন্স:
১. মন্ত্র:
“সুতৃণবিশিষ্ট ধেনুর ন্যায় তোমাকে দোহন করিতে ইচ্ছা করিয়া, বসিষ্ঠ স্তোত্র সৃজন করিতেছেন। সমস্ত লোকে তোমাকেই গাভীগণের পতি বল; ইন্দ্র, আমাদের সুস্তুতির নিকট আগমন করুন।”
(ঋগ্বেদ - ৭/১৮/৪)
২. মন্ত্র:
“হে ইন্দ্র! তুমি সকলের আদি; হে সুনেত্র, বলবান ইন্দ্র! তুমি রথে অশ্ব যোজনা কর; গৌতম ঋষির পুত্র নোদা আমাদের নিমিত্ত তোমার এ নূতন স্তোত্র রচনা করেছেন। অতএব যিনি কর্ম দ্বারা ধন প্রাপ্ত হয়েছেন, সে ইন্দ্র প্রাতঃকালে শীঘ্র আগমন করুন।”
(ঋগ্বেদ - ১/৬২/১৩)
মন্ত্র-৩:
“যে সকল প্রাচীন ঋষি ছিলেন এবং যে সকল নূতন ঋষি আছেন, সকলে তোমার স্তোত্র উৎপাদন করিতেছেন। আমাদের প্রতি তোমার সখ্য মঙ্গলকর হউক। তোমরা আমাদিগকে সর্বদা স্বস্তি দ্বারা পালন কর।”
(ঋগ্বেদ - ৭/২২/৯)
মন্ত্র-৪:
“হে কশ্যপ ঋষি, মন্ত্রের রচয়িতা, স্তুতি করো।”
(ঋগ্বেদ - ৯/১১৪/২)
উল্লেখ্য, এখানে সংস্কৃত মন্ত্রে ‘কৃতাং’ শব্দ এসেছে। ঋষি যাস্ক তাঁর নিরুক্ত-এ “কৃতাং” শব্দের অর্থ করেছেন “সৃষ্টি করা”।
(নিরুক্ত - ৬/৩২/৩)
মন্ত্র-৫:
সংস্কৃত:
“মিমীহি শ্লোকমাস্যে পর্জন্য ইব ততনঃ। গায় গায়ত্রমুকথ্যম্।”
বাংলা:
“মুখে শ্লোক রচনা কর, পর্জন্যের ন্যায় তা বিস্তার কর, বিশিষ্ট গায়ত্রীচ্ছন্দে রচিত (সূক্ত) পাঠ কর।”
(ঋগ্বেদ - ১/৩৮/১৪)
এই পাঁচটি মন্ত্রের আলোকে আমরা সরাসরি বুঝতে পারছি যে বেদ মানব, অর্থাৎ ঋষিদের দ্বারা বানানো।
আপনারা যদি ঋগ্বেদ ১/১/১-৯ পড়েন, তাহলেও বুঝতে পারবেন যে বেদ ঈশ্বরের বাণী নয়। যদি ঈশ্বরের বাণী হতো, তাহলে বেদে ঈশ্বর নিজেই নিজেকে সম্বোধন করে বাক্য বলতেন না এবং নিজের গুণগান (স্তুতি) নিজেই করতেন না।
পয়েন্ট-২
এখন আমরা দুজন ঋষি এবং দর্শনের বক্তব্য দেখব বেদের ব্যাপারে।
বেদ যে মানুষের স্বার্থের জন্য লেখা, এই কথাটা স্বয়ং ঋষি জাবালও বলেছেন রামকে উদ্দেশ্য করে।
(বাল্মীকি রামায়ণ - অযোধ্যাকাণ্ড, ১০৮-১০৯ সর্গ - পঞ্চানন তর্করত্ন)
এমনকি হিন্দুদের সাহিত্যসম্রাটখ্যাত সনাতন পণ্ডিত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও বেদ যে মানব ঋষিদের রচিত, তা স্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য নিম্নরূপ:
“বেদ যে মানুষের প্রণীত, তাহা বেদের আর কিছু পরিচয় পাইলেই, বোধ হয় পাঠকেরা আপনারাই সিদ্ধান্ত নিতে পারিবেন। আমরা কেবল ইহাই বলিতে চাই যে বেদেই অনেক স্থলে স্পষ্ট বলা আছে যে বেদের মন্ত্র সকল ঋষি দ্বারা রচিত ও প্রণীত, ইহা ঈশ্বরের বাণী নয়।”
(বঙ্কিম রচনাবলী, খণ্ড-২, ভাগ-৩, অধ্যায়-৪, পৃষ্ঠা নং-৭৭৯ ও ৭৮২ / সংগৃহীত রেফারেন্স)
এছাড়াও বেদান্তও একই কথা বলে।
(বেদান্ত - অধ্যায় ৪, পৃষ্ঠা ১৬ ও ১৭)
পয়েন্ট-৩
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেন:
«“কোরআন যদি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও পক্ষ থেকে আসত, তাহলে এতে অনেক বৈপরীত্য থাকত।”
(নিসা - ৮২)»
কোরআনের এই আয়াত থেকে আমরা একটি উসূল পেলাম যে, ঈশ্বর বা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা ধর্মগ্রন্থে কোনো বৈপরীত্য থাকবে না।
এখন আমরা এই উসূল বেদে প্রয়োগ করব।
বেদের মধ্যে বিভিন্ন বৈপরীত্য আছে। যেমন:
বেদের ঈশ্বর এক জায়গায় বলেছেন, “তিনি শরীররহিত, স্নায়ুরহিত”।
(যজুর্বেদ - ৪০/৮)
আবার আরেক জায়গায় বলা হয়েছে, “ঈশ্বরের বহু মস্তক, চোখ রয়েছে।”
(যজুর্বেদ - ৩১/১)
আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, (যজুর্বেদ - ৪০/৮) দ্বারা ঈশ্বরকে নিরাকার প্রমাণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে, আবার (যজুর্বেদ - ৩১/১) দ্বারা তাঁকে সাকার প্রমাণ করা হচ্ছে। আর এখানেই বেদের ঈশ্বর সাকার নাকি নিরাকার, এই ধারণায় বৈপরীত্য পাওয়া যাচ্ছে।
এছাড়াও ঈশ্বরকে দেখা যায় কি না, এই ব্যাপারেও বেদ দু-রকম বক্তব্য প্রদান করে।
যজুর্বেদ - ৪০/৪-এ বলা হয়েছে, “ঈশ্বরকে দেখা যায় না।”
আবার যজুর্বেদ - ৩৪/৪৪-এ বলা হচ্ছে যে “যোগীরা নাকি ঈশ্বরকে দেখতে পারে।”
এছাড়াও বেদের মধ্যে একবার বলা হচ্ছে যে “ইন্দ্র তার মা থেকে জন্মেছে”।
(ঋগ্বেদ - ১০/৭৩/১)
আবার অন্য জায়গাতে বলা হয়েছে, “ইন্দ্রের দেহ থেকে তার মা ও পিতার জন্ম।”
(ঋগ্বেদ - ১০/৫৪/৩)
এখন প্রশ্ন হলো, কে কার থেকে জন্মেছে?
এরকম নানান বৈপরীত্য বেদে আছে, যা প্রমাণ করে যে বেদ মানব রচিত ও বিকৃত। এটি কোনো ঈশ্বর থেকে প্রদত্ত হয়নি।
উল্লেখ্য: আমি ৫০টির মতো দলিল দিতে পারব বেদের বৈপরীত্যের ব্যাপারে।
পয়েন্ট-৪
পবিত্র আল-কোরআনে আল্লাহ বলেন:
“বিজ্ঞানময় (প্রজ্ঞাময়) কোরআন।”
(ইয়াসিন - ২)
এই আয়াত থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, আল্লাহর নাজিল করা বা ঈশ্বরপ্রদত্ত ধর্মগ্রন্থ হবে বিজ্ঞানময়। সেখানে কোনো অবৈজ্ঞানিক কথা থাকতে পারবে না। বিজ্ঞানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো কথা থাকার কোনো সুযোগ নেই।
যদি অবৈজ্ঞানিক কথা পাওয়া যায়, তাহলে বুঝতে হবে যে সেটা ঈশ্বরপ্রদত্ত নয়, আর একসময় ঈশ্বরপ্রদত্ত হলেও পরে তা বিকৃত হয়ে গিয়েছে।
এখন আমরা এই উসূলের আলোকে বেদকে যাচাই করব।
আমরা যদি যজুর্বেদের ৩২/৬ নম্বর মন্ত্র দেখি, তাহলে সেখানে দেখতে পাব যে “পৃথিবীকে স্থির” বলা হয়েছে।
সংস্কৃত মন্ত্রে “দৃঢ়া” শব্দ ব্যবহার হয়েছে, যার অর্থ “স্থির” হয়।
(নিরুক্ত - ১০/৬/১-২; অষ্টাধ্যায়ী - ৭/২/২০)
আর এই মন্ত্রে যে পৃথিবী স্থির বলা হয়েছে, তা তুলসী রাম শর্মা (বিখ্যাত ইংরেজি অনুবাদক) ও স্বামী সত্যপ্রকাশ সরস্বতী (বাংলা আর্য অনুবাদক) স্বীকার করেছেন।
এরকম আরও বৈজ্ঞানিক ভুল তথ্য বেদে দেওয়া আছে। এসব ব্যাপারে আপনারা হয়তো জেনে থাকবেন, তাই আমি বাকিগুলো উল্লেখ করলাম না।
পয়েন্ট-৫
বেদ কি সবচেয়ে প্রাচীন?
উত্তর: না, একদমই না।
“হে জ্ঞানী মানুষ, প্রাচীন হতে শিক্ষা নাও, যারা অতিথিপরায়ণ, রথারোহীর ন্যায়, যারা নিজ অশ্বদের সংযুক্ত করে, যারা দক্ষদের দ্বারা সুনিয়ন্ত্রিত এবং যারা নিজেদের ন্যায়ের আসনে বসিয়েছে।”
(যজুর্বেদ - ১৩/৩৭)
এখানে প্রাচীন ঋষিদের কাছ থেকে শিক্ষা নিতে বলা হয়েছে। আর রথের কথা উল্লেখ আছে। রথ চলার জন্য চাকার প্রয়োজন। আমরা ইতিহাস থেকে জানি যে, চাকা আবিষ্কার হয়েছে কয়েক হাজার বছর আগে, অর্থাৎ মানব সভ্যতার বহু পরে। তাই বোঝা যাচ্ছে যে বেদ প্রাচীন নয়।
আরেকটা কথা না বললেই নয়। সেটা হলো, বেদ দীর্ঘ সময় ধরে ঋষিদের মাধ্যমে রচিত হয়েছে।
আপনারা যদি ঋগ্বেদ - ১/১/২ এবং ঋগ্বেদ - ৭/২২/৯ মন্ত্রগুলো দেখেন, তাহলে সেখানে দেখতে পাবেন যে নতুন ও পুরাতন ঋষি ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আর এখান থেকেই বুঝতে পারি যে বেদ নতুন ও পুরাতন ঋষিদের দ্বারা তৈরি করা হয়েছে।
এমনকি প্রত্যেক সূক্তে তো আপনারা সেই সূক্তের ঋষির নামও পেয়ে থাকেন, যিনি তা রচনা করেছেন।
পয়েন্ট-৬
সর্বশেষ প্রশ্ন: বেদ কি অবিকৃত?
উত্তর হলো: না, একদমই না।
আমরা যদি নিরুক্ত-এর খণ্ড ৩-এর ৭ নম্বর অধ্যায়ের ৫ নম্বর পরিচ্ছেদে দেখি, তাহলে সংশোধনের কথা পাওয়া যায়।
* এছাড়াও বেদ মূসা ম্লেচ্ছের সময় নষ্ট হয়েছিল।
রেফারেন্স:
ভবিষ্যৎ পুরাণ - প্রতিসর্গ পর্ব, অধ্যায় ৫, শ্লোক ৩০ ও ৩১।
যেটা নষ্ট হয়, তা আবার অবিকৃত থাকে কী করে?
আর এতটুকুতেই আমরা বুঝতে পারি যে:
১. বেদ মানব (কথিত ঋষিদের তৈরি) রচিত।
২. বেদে বিকৃতি সংঘটিত হয়েছে।
এরকম নানান পর্যালোচনার মাধ্যমে বুঝা যাবে যে, বেদ একটা ভুয়া ধর্মগ্রন্থ। আর এটা প্রমাণ করতে হিন্দু শাস্ত্রই যথেষ্ট।
আমি এখানে যেসব পয়েন্ট নিয়েছি, তা সবই হিন্দু কিতাবের আলোকে। তাই এটা বলার কোনো সুযোগ নেই যে, আমি নিজের মতো করে উল্টাপাল্টা পয়েন্ট টেনেছি।
যাই হোক, সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন।
কলমে: মোঃ মেহেদী হাসান ✍️
আল্লাহ হাফেজ।
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।
Prince Frerase -
মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন।