হাদিস মানতে হবে কেনো?

আসসালামু আলাইকুম,

       ইসলাম বিদ্বেষীরা বিভিন্নভাবে চেষ্টা করে হাদিসকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে। আবার খ্রিস্টানদের জ্বালিয়াতির একটা হাতিয়ার হচ্ছে প্রথমে মুসলিমদের মধ্যে হাদিসকে গুরুত্বহীন, অপ্রামাণ্য, মিথ্যা-বানোয়াট, ২০০ বছর পরের মানুষদের লেখা বলে তুলে ধরে প্রথমে আহলে কুরআন বানানো, এর পরে আহলে কুরআন থেকে ইসায়ী মুসলিম নামে খ্রিস্টান বানানো। তাই এবারে আমার ক্ষুদ্রচেষ্টা কেনো হাদিস মানতে হবে সিরিজের লেখা। তো চলুন আলোচনা শুরু করা যাক। 

হাদিস অস্বীকারকারীদের অভিযোগ সমূহকে ৩ ভাগে ভাগ করা যায়।

  1. রাসুল (সঃ) এর উপর নাজিল হয়েছে শুধুমাত্র কুরআন, রাসুল (সঃ) এর দায়িত্ব ছিলো শুধু কুরআন প্রচার করা। তাই রাসুল (সঃ) এর অনুসরণ ফরজও নয়,ওয়াজিবও নয়। কুরআন কে বোঝার জন্য হাদিসের দরকার নাই!!
  2. রাসুল (সঃ) যেসব আহকাম বর্ণনা করেছেন, সেসব রাসুল (সঃ) এর যুগের সাথে বিশেষিত। প্রতিটি যুগের প্রতি লক্ষ্য করলে, এসব আহকাম পরিবর্তন করা যেতে পারে। তাই আমাদের যুগে হাদিসের প্রয়োজন নেই বা আমাদের যুগের জন্য হাদিস প্রমাণ হিসাবে গ্রহন যোগ্য নয়।
  3. রাসুল (সঃ) এর হাদিস আমাদের জন্যও আহকাম হিসাবে, কিন্তু হাদিসগুলো সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি, তাই হাদিসগুলো আমাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য সূত্রে না পৌছানোতে তা গ্রহনযোগ্য নহে। আল্লাহ যদি আমাদের জন্য হাদিস মানা গুরুত্বপূর্ণ করতেন তবে কুরআন এর মতো হাদিস এর সংরক্ষণের দায়িত্বও আল্লাহ নিজেই নিতেন।

➡ইনশাআল্লাহ হাদিস অস্বীকারকারীদের প্রতিটি অভিযোগ, প্রমাণের আলোকে যুক্তি দিয়ে খন্ডন করবো। আজ এই লেখায় হাদিস অস্বীকারকারীদের প্রথম দৃষ্টিভঙ্গি খন্ডাবো। প্রথমে পবিত্র কুরআন এর একটি আয়াত দিয়ে শুরু করি,

وَمَا كَانَ لِبَشَرٍ أَن يُكَلِّمَهُ ٱللَّهُ إِلَّا وَحْيًا أَوْ مِن وَرَآئِ حِجَابٍ أَوْ يُرْسِلَ رَسُولًا فَيُوحِىَ بِإِذْنِهِۦ مَا يَشَآءُۚ إِنَّهُۥ عَلِىٌّ حَكِيمٌ

English - Sahih International -
 And it is not for any human being that Allah should speak to him except by revelation or from behind a partition or that He sends a messenger to reveal, by His permission, what He wills. Indeed, He is Most High and Wise.

Bengali - Bayaan Foundation -
কোন মানুষের এ মর্যাদা নেই যে, আল্লাহ তার সাথে সরাসরি কথা বলবেন, ওহীর মাধ্যম, পর্দার আড়াল অথবা কোন দূত পাঠানো ছাড়া। তারপর আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে তিনি যা চান তাই ওহী প্রেরণ করেন। তিনি তো মহীয়ান, প্রজ্ঞাময়।[1]

এই আয়াত থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার, কোনো মানুষের পক্ষেই সরাসরি আল্লাহর সাথে কথা বলা সম্ভব নয়, আবার আল্লাহ যা চান তাই ওহী করেন, আল্লাহ শুধুমাত্র কুরআন নাজিলের জন্যই ওহী প্রেরন করেননি, বরং আল্লাহর যা জানানোর ইচ্ছা তাই জানাতে ওহী পাঠিয়েছেন। কিন্তু আমার মুখের কথায় তো আর প্রমান হবে না যে আল্লাহ কুরআন নাজিল ছাড়াও ওহী পাঠিয়েছেন। তাই আরও একটি আয়াত এর উদ্ধৃতি দিচ্ছি কুরআন থেকে।

وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَٰكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِّتَكُونُوا۟ شُهَدَآءَ عَلَى ٱلنَّاسِ وَيَكُونَ ٱلرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًاۗ وَمَا جَعَلْنَا ٱلْقِبْلَةَ ٱلَّتِى كُنتَ عَلَيْهَآ إِلَّا لِنَعْلَمَ مَن يَتَّبِعُ ٱلرَّسُولَ مِمَّن يَنقَلِبُ عَلَىٰ عَقِبَيْهِۚ وَإِن كَانَتْ لَكَبِيرَةً إِلَّا عَلَى ٱلَّذِينَ هَدَى ٱللَّهُۗ وَمَا كَانَ ٱللَّهُ لِيُضِيعَ إِيمَٰنَكُمْۚ إِنَّ ٱللَّهَ بِٱلنَّاسِ لَرَءُوفٌ رَّحِيمٌ

English - Sahih International - 
And thus we have made you a just community that you will be witnesses over the people and the Messenger will be a witness over you. And We did not make the qiblah which you used to face except that We might make evident who would follow the Messenger from who would turn back on his heels. And indeed, it is difficult except for those whom Allah has guided. And never would Allah have caused you to lose your faith. Indeed Allah is, to the people, Kind and Merciful.

Bengali - Bayaan Foundation  - 
আর এভাবেই আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি, যাতে তোমরা মানুষের উপর সাক্ষী হও এবং রাসূল সাক্ষী হন তোমাদের উপর। আর যে কিবলার উপর তুমি ছিলে, তাকে কেবল এ জন্যই নির্ধারণ করেছিলাম, যাতে আমি জেনে নেই যে, কে রাসূলকে অনুসরণ করে এবং কে তার পেছনে ফিরে যায়। যদিও তা অতি কঠিন (অন্যদের কাছে) তাদের ছাড়া যাদেরকে আল্লাহ হিদায়াত করেছেন এবং আল্লাহ এমন নন যে, তিনি তোমাদের ঈমানকে বিনষ্ট করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল, পরম দয়ালু।[2]

 

এই আয়াত এ কিবলা দ্বারা কোন দিকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে, সেই উত্তর হাদিস অস্বীকারকারীদের কাছে নেই, কারণ সম্পূর্ণ কুরআনে কিবলা পূনঃনির্ধারনের আগে কিবলা নির্ধারন সম্পর্কিত একটিও আয়াতও নাই। جعانا (জা'আলনা) দ্বারা নিজের দিকে উদ্দেশ্য করেছেন। অর্থাৎ আল্লাহই এর আগে কিবলা নির্ধারন করেছিলেন। এর আগে কিবলা হিসাবে কোন দিকে বা কোন জায়গা নির্ধারণ করেছিলেন সে উত্তর যেমন তাদের কাছে নাই, তেমনি এর আগে যে আল্লাহই কিবলা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। আমরা হাদিস থেকে জানতে পারি আল্লাহ এর আগে বাইতুল মুকাদ্দাস কে কিবলা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। এখন, যদি কুরআন ছাড়া ওহী না এসে থাকে, তাহলে এই আয়াতটি ভুল হয়ে যায়। তাই আমরা এই দুই আয়াত থেকে এটুকু বুঝতে পারি যে, আল্লাহ কুরআন নাজিল করা ছাড়াও ওহীর মাধ্যমে রাসুল (সঃ) এর কাছে জ্ঞান এবং নির্দেশ পাঠিয়েছেন। চলুন আরেকটি আয়াত দেখে নেই,

وَإِذْ يَعِدُكُمُ ٱللَّهُ إِحْدَى ٱلطَّآئِفَتَيْنِ أَنَّهَا لَكُمْ وَتَوَدُّونَ أَنَّ غَيْرَ ذَاتِ ٱلشَّوْكَةِ تَكُونُ لَكُمْ وَيُرِيدُ ٱللَّهُ أَن يُحِقَّ ٱلْحَقَّ بِكَلِمَٰتِهِۦ وَيَقْطَعَ دَابِرَ ٱلْكَٰفِرِينَ
English - Sahih International
[Remember, O believers], when Allah promised you one of the two groups - that it would be yours - and you wished that the unarmed one would be yours. But Allah intended to establish the truth by His words and to eliminate the disbelievers.
Bengali - Bayaan Foundation
আর স্মরণ কর, যখন আল্লাহ তোমাদেরকে দু’দলের একটির ওয়াদা দিয়েছিলেন যে, নিশ্চয় তা তোমাদের জন্য হবে। আর তোমরা কামনা করছিলে যে, অস্ত্রহীন দলটি তোমাদের জন্য হবে এবং আল্লাহ চাচ্ছিলেন তাঁর কালেমাসমূহ দ্বারা সত্যকে সত্য প্রমাণ করবেন এবং কাফেরদের মূল কেটে দেবেন।[3]

 

এই আয়াতে দুই দলের যেকোনো একটি দলকে মুসলিমদের আয়ত্বাধীন করার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ দিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন।কিন্তু কুরআন এর কোনো আয়াতেই সেই প্রতিশ্রুতি দেয়ার কথা নেই। অবশ্যই সেই প্রতিশ্রুতি আল্লাহ দিয়েছিলেন ওহীয়ে গাইরে মাতলু এর মাধ্যমে। আরো একটি আয়াত লক্ষ্যبِيرُ

English - Sahih International
And [remember] when the Prophet confided to one of his wives a statement; and when she informed [another] of it and Allah showed it to him, he made known part of it and ignored a part. And when he informed her about it, she said, "Who told you this?" He said, "I was informed by the Knowing, the Acquainted."
Bengali - Bayaan Foundation
আর যখন নবী তার এক স্ত্রীকে গোপনে একটি কথা বলেছিলেন; অতঃপর যখন সে (স্ত্রী) অন্যকে তা জানিয়ে দিল এবং আল্লাহ তার (নবীর) কাছে এটি প্রকাশ করে দিলেন, তখন নবী কিছুটা তার স্ত্রীকে অবহিত করল আর কিছু এড়িয়ে গেল। যখন সে তাকে বিষয়টি জানাল তখন সে বলল, ‘আপনাকে এ সংবাদ কে দিল?’ সে বলল, ‘মহাজ্ঞানী ও সর্বজ্ঞ আল্লাহ আমাকে জানিয়েছেন।’[4]

 

এখানেও রাসুল (সঃ) কে তার দুজন সম্মানিত স্ত্রীর গোপন কথা বিনিময়ের খবর আল্লাহ জানিয়ে দেয়ার কথা বলেছেন, কিন্তু কুরআন এর কোনো আয়াতে সেই খবর জানিয়ে দেয়ার কথা খুঁজেও পাওয়া যায় না। অবশ্যই এটি ছিলো ওহীয়ে গাইরে মাতলু। এবারে আরো দুইটি আয়াত দেখি,

وَلَوْلَا فَضْلُ ٱللَّهِ عَلَيْكَ وَرَحْمَتُهُۥ لَهَمَّت طَّآئِفَةٌ مِّنْهُمْ أَن يُضِلُّوكَ وَمَا يُضِلُّونَ إِلَّآ أَنفُسَهُمْۖ وَمَا يَضُرُّونَكَ مِن شَىْءٍۚ وَأَنزَلَ ٱللَّهُ عَلَيْكَ ٱلْكِتَٰبَ وَٱلْحِكْمَةَ وَعَلَّمَكَ مَا لَمْ تَكُن تَعْلَمُۚ وَكَانَ فَضْلُ ٱللَّهِ عَلَيْكَ عَظِيمًا

English - Sahih International
And if it was not for the favor of Allah upon you, [O Muhammad], and His mercy, a group of them would have determined to mislead you. But they do not mislead except themselves, and they will not harm you at all. And Allah has revealed to you the Book and wisdom and has taught you that which you did not know. And ever has the favor of Allah upon you been great.

Bengali - Bayaan Foundation 
আর তোমার উপর যদি আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর দয়া না হত তবে তাদের মধ্য থেকে একদল তোমাকে পথভ্রষ্ট করার সংকল্প করেই ফেলেছিল! আর তারা নিজদের ছাড়া কাউকে পথভ্রষ্ট করে না এবং তারা তোমার কোনই ক্ষতি করতে পারে না। আর আল্লাহ তোমার প্রতি নাযিল করেছেন কিতাব ও হিকমাত এবং তোমাকে শিক্ষা দিয়েছেন যা তুমি জানতে না। আর তোমার উপর আল্লাহর অনুগ্রহ রয়েছে মহান। [5]

 

এই আয়াতে কিতাব যে আল-কুরআন তাতে কোন সন্দেহ নেই।কিন্তু হিকমাত ও শিক্ষা কি?

كَمَآ أَرْسَلْنَا فِيكُمْ رَسُولًا مِّنكُمْ يَتْلُوا۟ عَلَيْكُمْ ءَايَٰتِنَا وَيُزَكِّيكُمْ وَيُعَلِّمُكُمُ ٱلْكِتَٰبَ وَٱلْحِكْمَةَ وَيُعَلِّمُكُم مَّا لَمْ تَكُونُوا۟ تَعْلَمُونَ
English - Sahih International
Just as We have sent among you a messenger from yourselves reciting to you Our verses and purifying you and teaching you the Book and wisdom and teaching you that which you did not know.

Bengali - Bayaan Foundation
যেভাবে আমি তোমাদের মধ্যে একজন রাসূল প্রেরণ করেছি তোমাদের মধ্য থেকে, যে তোমাদের কাছে আমার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে, তোমাদেরকে পবিত্র করে এবং কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়। আর তোমাদেরকে শিক্ষা দেয় এমন কিছু যা তোমরা জানতে না।[6]

এখানেও খেয়াল করুন, আয়াত দুটিতে কিতাব, হিকমত এবং এমন কিছু যা রাসুল (সঃ) এবং আমরা জানতাম না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর সব কিছুই যদি শুধুমাত্র কুরআন কে বুঝিয়ে থাকে তবে কুরআন পুনরাবৃত্তির দোষে দুষ্ট (নাউজুবিল্লাহ)। এতক্ষণে আমরা এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পেলাম যে শুধু কুরআনই ওহীর মাধ্যমে নাজিল হয়নি, বরং ওহীর মাধ্যমে আমাদের জন্য বিভিন্ন নির্দেশনাও নাজিল হয়েছে। এবারে দেখার পালা যে রাসুল (সঃ) কে অনুসরণ করা কি বাধ্যতামূলক?

قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ ٱللَّهَ فَٱتَّبِعُونِى يُحْبِبْكُمُ ٱللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْۗ وَٱللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
English - Sahih International
Say, [O Muhammad], "If you should love Allah, then follow me, [so] Allah will love you and forgive you your sins. And Allah is Forgiving and Merciful."

Bengali - Bayaan Foundation
বল, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমার অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’।[7]

এই আয়াত থেকে পরিষ্কারভাবে আল্লাহর হুকুম পাচ্ছি রাসুল (সঃ) কে অনুসরন করার জন্য। তাই যে ব্যক্তি রাসুল (সঃ) কে অনুসরণ করলো না সে ব্যক্তি অবশ্যই কুফরি করলো। আর অবশ্যই রাসুল (সঃ) দ্বীনের ব্যাপারে নিজের মনগড়া কোন কথা বলেন নি।

قُل لَّآ أَقُولُ لَكُمْ عِندِى خَزَآئِنُ ٱللَّهِ وَلَآ أَعْلَمُ ٱلْغَيْبَ وَلَآ أَقُولُ لَكُمْ إِنِّى مَلَكٌۖ إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَىٰٓ إِلَىَّۚ قُلْ هَلْ يَسْتَوِى ٱلْأَعْمَىٰ وَٱلْبَصِيرُۚ أَفَلَا تَتَفَكَّرُونَ
English - Sahih International
Say, [O Muhammad], "I do not tell you that I have the depositories [containing the provision] of Allah or that I know the unseen, nor do I tell you that I am an angel. I only follow what is revealed to me." Say, "Is the blind equivalent to the seeing? Then will you not give thought?"
Bengali - Bayaan Foundation
বল, ‘তোমাদেরকে আমি বলি না, "আমার কাছে আল্লাহর ভান্ডারসমূহ রয়েছে এবং আমি গায়েব জানি না এবং তোমাদেরকে বলি না, নিশ্চয় আমি ফেরেশতা"। আমি কেবল তাই অনুসরণ করি যা আমার কাছে ওহী প্রেরণ করা হয়’। বল, ‘অন্ধ আর চক্ষুষ্মান কি সমান হতে পারে? অতএব তোমরা কি চিন্তা করবে না?[8]

 

আমরা সিরাত এবং হাদিস থেকে রাসুল (সঃ) এর অনেক কর্মকান্ড এবং কথা জানতে পারি, এমন কি অনেক ভবিষ্যৎবাণীও জানতে পারি, যেসব ভবিষ্যৎবাণী কুরআনে নেই, কিন্তু রাসুল (সঃ) বলে গিয়েছেন, এবং সেগুলোর বেশিরভাগই ইতিমধ্যে পূর্ণ হয়ে গিয়েছে। অথচ আল্লাহ রাসুল (সঃ) কে সুস্পষ্ট ভাবে বলতে বলছেন যে রাসুল (সঃ) গায়েব জানেন না, এবং রাসুল (সঃ) সে কথাও আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন। 

وَمَا يَنطِقُ عَنِ ٱلْهَوَىٰٓ
English - Sahih International
Nor does he speak from [his own] inclination.
Bengali - Bayaan Foundation
আর সে মনগড়া কথা বলে না।[9]

আল্লাহ এই আয়াতেও জানিয়ে দিচ্ছেন, রাসুল (সঃ) কোনো মনগড়া কথা বলেন না। এই আয়াত কিন্তু খাসভাবে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের কথা বলছে না, এই আয়াত আমভাবেই বলা হচ্ছে। এই আয়াত থেকে পরিষ্কার হয়ে যে রাসুল (সঃ) কোনো মনগড়া কথা বলেননি। 

হাদিস অস্বীকারকারীদের কাছে এতগুলো প্রশ্নের উত্তর না থাকলেও আমাদের কাছে আছে।

আল-মিক্বদাম ইবনু মা’দীকারিব (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ জেনে রাখো! আমাকে কিতাব এবং তার সঙ্গে অনুরূপ কিছু দেয়া হয়েছে। জেনে রাখো! এমন এক সময় আসবে যখন কোন প্রাচুর্যবান লোক তার আসনে বসে বলবে, তোমরা শুধু এ কুরআনকেই গ্রহন করো, তাতে যা হালাল পাবে তা হালাল এবং যা হারাম পাবে তা হারাম মেনে নিবে। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, জেনে রাখো! গৃহপালিত গাধা তোমাদের জন্য হালাল নয় এবং ছেদন দাঁতবিশিষ্ট হিংস্র পশুও নয়। অনুরুপ সন্ধিবদ্ধ অমুসলিম গোত্রের হারানো বস্তু তোমাদের জন্য হালাল নয়, অবশ্য যদি সে এর মুখাপেক্ষী না হয়। আর যখন কোন লোক কোন সম্প্রদায়ের নিকট আগন্তুক হিসাবে পৌঁছে তখন তাদের উচিত তার মেহমানদারী করা। যদি তারা তা না করে, তাহলে তাদেরকে কষ্ট দিয়ে হলেও তার মেহমানদারীর পরিমান জিনিস আদায় করার অধিকার তার আছে।[10]

এবারে আসছি হাদিস অস্বীকারকারীদের প্রথম দৃষ্টিভঙ্গির শেষ যুক্তিখন্ডনে। তারা নিম্নোক্ত আয়াত দ্বারা দলীল দেয় যে কুরআন বোঝা সহজ, তাই কুরআন বুঝতে হাদিসের দরকার নাই।

وَلَقَدْ يَسَّرْنَا ٱلْقُرْءَانَ لِلذِّكْرِ فَهَلْ مِن مُّدَّكِرٍ
English - Sahih International
And We have certainly made the Qur'an easy for remembrance, so is there any who will remember?
Bengali - Bayaan Foundation
আর আমি তো কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণের জন্য। অতএব কোন উপদেশ গ্রহণকারী আছে কি?[11]

এই আয়াত এর বাংলা অর্থ পড়ে তাদের যুক্তি সঠিক মনে হলেও আমাদের একটু কষ্ট করে এই আয়াতটির দুইটি আরবি শব্দ এর অর্থ জানতে হবে (للذكر) এখানে লিলজিকরি শব্দের অর্থ হচ্ছে "মনে রাখার জন্য"। (مدكر) মুদ্দাকিরিন শব্দের অর্থ হচ্ছে "যে মনে রাখবে", সহীহ্ ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সলেশন এও এটিই অনুবাদ করা হয়েছে। কুরআন মনে রাখা সহজ, এ বিষয়টি যে চিরন্তন সত্য তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, সারা পৃথিবীতে আজকে যখন আপনি এই লেখাটি পড়ছেন তখনও কয়েক লক্ষ মানুষ রয়েছেন যারা সম্পূর্ণ কুরআন হিফজ করেছেন। এবারে আবার তারা প্রশ্ন করতে পারেন যে কুরআন যদি বোঝা কঠিনই হয় তবে আল্লাহ কুরআন নাজিল করলেন কেনো? আলহামদুলিল্লাহ, তাদের এই প্রশ্নের উত্তর ও আমাদের কাছে আছে। কুরআন এর কিছু অংশ রয়েছে যা বোঝা কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়, কুরআন এর কিছু অংশ রয়েছে যা স্বাভাবিক বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ মাত্রই বুঝতে পারবে, আর কিছু অংশ রয়েছে যেগুলো ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে, এবং একই সাথে চিন্তাশীল মানুষদের জন্যও রয়েছে চিন্তার খোরাক। চলুন আরো একটি আয়াত দেখে নেয়া যাক_

فَإِنَّمَا يَسَّرْنَٰهُ بِلِسَانِكَ لِتُبَشِّرَ بِهِ ٱلْمُتَّقِينَ وَتُنذِرَ بِهِۦ قَوْمًا لُّدًّا
English - Sahih International
 So, [O Muhammad], We have only made Qur'an easy in the Arabic language that you may give good tidings thereby to the righteous and warn thereby a hostile people.
Bengali - Bayaan Foundation
আর আমি তো তোমার ভাষায় কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি, যাতে তুমি এর দ্বারা মুত্তাকীদেরকে সুসংবাদ দিতে পার এবং কলহপ্রিয় কওমকে তদ্বারা সতর্ক করতে পার। [12]

এই আয়াতটি ভালো করে পড়ে দেখুন, আল্লাহ কুরআনকে রাসুল (সঃ) এর ভাষায় সহজ করে দিয়েছেন, এবং কারন হিসাবে উল্লেখ করেছেন, যাতে রাসুল (সঃ) এর দ্বারা মুত্তাকীদের সতর্ক করতে পারেন এবং কলহপ্রিয় কওম কে সতর্ক করতে পারেন। যদি শুধু মাত্র কুরআন পৌঁছে দেয়াই কাজ হতো তাহলে রাসুল (সঃ) এর নিজে সতর্ক করার প্রয়োজন হতো না, আবার নিজে সংবাদ পৌঁছে দেয়ার ও প্রয়োজন হতো না। আল্লাহ রাসুল (সঃ) কে প্রেরনের মাধ্যমে আমাদের কে দেখিয়েছেন কিভাবে কুরআন কে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে হয়। যদি তারপরেও অস্বীকারকারী মানতে না চায় তবে উপরে উল্লেখিত ৩টি আয়াত যেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে রাসুল (সঃ) কে কিছু সংবাদ আল্লাহ জানিয়েছিলেন, নির্দেশনা দিয়েছিলেন, সেই আয়াতগুলোতে কোনো সংবাদ এবং কোনো নির্দেশনা এর ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন তার ব্যাখ্যা চাই হাদিস অস্বীকারকারীদের কাছ থেকে। উক্ত লেখায় হাদিস অস্বীকারকারীদের প্রথম দৃষ্টিভঙ্গি খন্ডন করা হলো। ইনশাআল্লাহ তাদের বাকি ২ টি দৃষ্টিভঙ্গিও খন্ডন করবো।

 

তথ্যসূত্রঃ

  1. সূরা আশ-শুরা ৪২:৫১
  2. আল-বাকারাহ ২:১৪৩
  3. আল-আনফাল ৮:৭
  4. আত-তাহরীম ৬৬:৩
  5. আন নিসা ৪:১১৩
  6. আল-বাকারাহ ২:১৫১
  7. আলি ‘ইমরান ৩:৩১
  8. আল-আন‘আম ৬:৫০
  9. আন-নাজ্‌ম ৫৩:৩
  10. সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৬০৪ হাদিসের মান: সহিহ হাদিস Source: আল হাদিস অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ, IRD
  11. আল-কামার ৫৪:১৭
  12. মারইয়াম ১৯:৯৭
Share this:
Contributors Umar Al Khattab