নবী মুহাম্মদ (ﷺ) চরিত্র কেমন ছিলো? মুহাম্মদ সাঃ এর চরিত্র ও আর্দশ সম্পর্কে জানুন!

মুহাম্মদ সাঃ এর চরিত্র সম্পর্কে সয়ং আল্লাহ তায়ালা কোরআনে বলেন :- 

নিশ্চয়ই আপনি এক মহান চরিত্রের অধিকারী।” -- (সূরা ক্বালাম-৪) “হে মুহাম্মদ! আমি তোমাকে সমগ্র জগতের জন্য রহমতস্বরূপ পাঠিয়েছি।” (আম্বিয়া-১০৭)

“আমি তো তোমাকে সমগ্র মানবজাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সর্তককারীরূপে প্রেরণ করেছি, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা উপলব্ধি করে না।” (সূরা সাবা-২৮)

তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সূরা আল-আহজাব, আয়াত: ২১)

◉ সয়ং আল্লাহ তায়ালা নিজে মুুহাম্মদ (সাঃ)  এর প্রশংসা করেছেন। চিন্তা করুন যিনি এই পৃথিবী সৃটি করেছেন, আমাদের সৃষ্টি  করেছেন সেই মহান আল্লাহ তায়ালা নিজে তার কালাম পবিত্র কুরআনে মহানবী সাঃ এর চরিত্রের প্রশংসা করেছেন । আপনি নিজে ঠান্ডা মাথায় একটু ভাবুন যে কেমন ছিল আমাদের নবীর চরিত্র যে সয়ং আল্লাহ তায়ালা তার প্রশংসা করেছেন কোরআনে। 

অমুসলিমদের দৃষ্টিতে মুহাম্মদ সাঃ এর চরিত্র:-

ফিজারের যুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর বয়স ছিল ১৫ বছর। এই যুদ্ধে তিনি স্বয়ং অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধের নির্মমতায় তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হন। কিন্তু তাঁর কিছু করার ছিলনা। সে সময় থেকেই তিনি কিছু একটি করার চিন্তাভাবনা শুরু করেন। নবী মুহাম্মদ সাঃ এর উত্তম চরিত্র ও সদাচরণের কারণে পরিচিত মহলের সবাই তাকে "আল-আমিন" (আরবিঃ الامين, অর্থঃ "বিশ্বস্ত, বিশ্বাসযোগ্য, আস্থাভাজন") "আল-সিদ্দিক" (অর্থঃ "সত্যবাদীl") বলে সম্বোধন করতেন। শত্রুরা পর্যন্ত কোন দিন তাকে মিথ্যাবাদী বলতে পারেনি। অমুসলিম কাফেররা কোন দিন নবী মুহাম্মদ সাঃ কে মিথ্যাবাদী বলতে পারেনি। তিনি তার জীবনে কখনো কোন দিন কোন মিথ্যা বলেনি। মক্কার কাফেররা পর্যন্ত তাকে আল-আমিন মানে বিশ্বাসী বলে ডাকত । মক্কার কাফেররা, শত্রুরা পর্যন্ত নবী মুহাম্মদ সাঃ এর কাছে তাদের দামী জিনিস পত্র আমানত রাখতো। চিন্তা করুন তিনি কতটা বিশ্বস্ত ছিল। কারণ তারা জানতো নবী মুহাম্মদ সাঃ কখনো আমানতের খেয়ানত করেন না। তিনি মক্কার মধ্যে সবচেয়ে সত্যবাদী লোক ছিলেন।মহৎ বৈশিষ্ট্যের কোন কমতি ছিল না তার মাঝে । আল-আমিন’ উপাধিতে ভূষিত হওয়ার কারণে খাদিজা (রাঃ) তাকে প্রথমত ব্যবসা ও দ্বিতীয়ত স্বামী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। খাদিজা (রাঃ) ছিলেন একজন ধনবতী, ভদ্র ও সম্ভ্রামত্ম ব্যবসায়ী মহিলা। তিনি তার পুঁজি দিয়ে লাভ-ক্ষতির অংশীদারিত্বভিত্তিক যৌথ ব্যবসা করতেন। খাদিজা (রাঃ) মহানবীর (সাঃ) এর সততা ও উত্তম চরিত্রের কথা জানতে পেরে তাঁকে পুঁজি নিয়ে সিরিয়ায় ব্যবসায়িক সফরে যাওয়ার জন্য আবেদন জানালেন। মহানবী (সাঃ) তার প্রসত্মাব গ্রহণ করলেন এবং দ্বিগুণ পুঁজি ও বিনিময় নিয়ে খাদিজার ক্রীতদাস ‘মায়সারাহ’র সঙ্গে সিরিয়ার পথে বাণিজ্যিক সফরে বের হলেন। বিগত সফরগুলোর তুলনায় এবার সফরে দ্বিগুণ লাভ হলো। ‘মায়সারাহ’ খাদিজার কাছে রাসূল (সাঃ) এর বিশ্বসত্মতা ও মহান চরিত্রের বর্ণনা দিলেন। খাদিজা (রাঃ) বিশেষত রাসূল (সাঃ) এর সংস্পর্শে আসার পর তার সম্পদে যে সমৃদ্ধির চিহ্ন ফুটে উঠেছে, তা দেখে তিনি বিস্মিত হলেন। তিনি তার বান্ধবী ‘নাফিসাহ’র মাধ্যমে রাসূল (সা.) এর কাছে বিয়ের প্রসত্মাব পেশ করেন। রাসূল (সা.) এ ব্যাপারে তাঁর চাচাদের সঙ্গে মতবিনিময় করলে তারা বিয়ে সম্পন্ন করেন। এই খাদিজা (রাঃ) প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন। কারণ তিনি জানতেন মুহাম্মদ সাঃ কখনো মিথ্যা বলেন না তিনি মহৎ চরিত্রের অধিকারী। 

চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য :-

ধৈর্যঃ- নিজেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে সর্বদা আল্লাহ্‌ তায়ালার আনুগত্যের উপর অটল রাখা,অবাধ্যতার নিকটবর্তী না হওয়া, তার সিদ্ধান্তের কারণে হা হুতাশ না করা এবং তাতে রাগান্বিত না হওয়ার নামই ধৈর্য। রাসুল (সাঃ) ইসলামের দাওয়াতকে ছড়িয়ে দেয়ার কাজ করতে গিয়ে কুরাইশদের কাছ থেকে অমানুষিকভাবে অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়ে ধৈর্যধারণ করেছেন।তিনি ধৈর্যধারণ করেছেন দুঃখের বছর, যুদ্ধক্ষেত্র, ইহুদীদের ষড়যন্ত্র, ক্ষুধা ও অন্যান্য পরিস্থিতিতে। কোন ষড়যন্ত্রই তাকে দুর্বল করতে পারেনি এবং কোন পক্ষই তাকে টলাতে পারেনি। নবী মুহাম্মদ সাঃ এর ধৈর্য্যের কোন কমতি ছিলো না । তায়েফ বাসীরা যখন মুহাম্মদ সাঃ কে নির্মমভাবে রক্তাক্ত করে তখনো তিনি তাদেরকে ধব্বংস করার জন্য বদ দোয়া করেনি। মহানবীর উপর তায়েফবাসীর অমানবিক ভাবে পাথর ছোঁড়া দেখে ফেরেশতারা পর্যন্ত ক্ষুদ্র হয়ে পড়ে। পাহাড়ের  ফেরেশতা পর্যন্ত তায়েফ বাসীকে ধব্বংস করে দেয়ার জন্য বললেন। কিন্তু মহানবী সাঃ নিষেধ করলেন। একবার ভেবে দেখুন মুহাম্মদ সাঃ এর ধৈয্য কতটুকু ছিল। মহানবী ক্ষমা করার এক চরম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।

ক্ষমাঃ- ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিশোধ না নেয়ার নামই ক্ষমা। মক্কা বিজয়ের দিনে রাসুল (সাঃ) মক্কার লোকদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা করছিলেন। তারা নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের ব্যাপারে তার নির্দেশেরই অপেক্ষা করছিল। তিনি বললেন, হে কুরাইশগণ তোমরা আমার কাছ থেকে আজ কেমন ব্যবহার আশা কর? তারা বলল, সম্মানিত ভাই ও ভ্রাতুষ্পুত্রের মত, তিনি বললেন তোমরা চলে যাও। আজ তোমরা মুক্ত। তারা তাকে অনেক অত্যাচার-নির্যাতন, তিরস্কার, সামাজিকভাবে বয়কট করা এমনকি হত্যার চেষ্টা করা সত্ত্বেও তিনি তাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিলেন। মুহাম্মদ সাঃ কে অনেকে-অনেক সময়ই হত্যা করতে চেয়েছিলো কিন্তু তাদের সব চেষ্টায় ব্যর্থ হতো এবং তারা ধরাও পড়তো। কিন্তুু মহানবীর কাছে তারা ক্ষমা চাইলে তিনি তাদেরকেে ক্ষমা  করে দিতেন। 

সাহসীকতাঃ কথাবার্তা, মতপ্রকাশ ও কোন কাজ করতে যাওয়ায় সাহসীকতা প্রদর্শন একটা অত্যন্ত চমৎকার গুণাবলী। রাসুল (সাঃ) যুদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ অবস্থায় ছিলেন সকল মানুষের চেয়ে বেশী সাহসী। তার মত সাহসী মানুষ খুব কম ছিল। হযরত আলী (রাঃ) বলেন, যখন প্রচন্ড যুদ্ধ শুরু হত তখন আমরা রাসুল (সাঃ) কে আড়াল নিয়ে আত্মরক্ষা করতাম। তিনি থাকতেন আমাদের মধ্য থেকে শত্রুদের সবচেয়ে নিকটতম ব্যক্তি। এর অনেক প্রমাণ রয়েছে উহুদ ও হুনায়ন যুদ্ধে।  

দানশীলতাঃ মুহাম্মাদ (সাঃ) এর দানশীলতা ছিল দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী। তিনি নিজের কাছে কিছু থাকলে কাউকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতেন না। তিনি একসময় ইয়েমেনী এক সেট পোশাক পরেছিলেন। একজন এসে পোশাকটা চাইলে তিনি বাড়ীতে গিয়ে সেটা খুলে ফেললেন। এরপর সেটা লোকটির কাছে পাঠিয়ে দিলেন। তার কাছে কেউ কিছু চাইলেই তিনি তা দিয়ে দিতেন। একবার একজন লোক তার কাছে এসে ছাগল চাইলে তিনি তাকে প্রচুর পরিমাণ ছাগল দিয়েছিলেন। যা দুই পাহাড়ের মধ্যকার স্থান পূর্ণ করে ফেলবে।এরপর লোকটা নিজ সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গিয়ে বলল: হে আমার সম্প্রদায় তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর। আল্লাহর কসম !! মুহাম্মাদ(সাঃ) এত বেশী পরিমাণে দান করেন যে কখনও দারিদ্রতার ভয় করেন না। মুহাম্মদ (সাঃ) সব-সময় খুুুব বেশি  দান করতেন গরীব-অসহায়দের মাঝে। 

ন্যায়বিচারঃ- মহানবী সাঃ সব-সময় ন্যায় বিচার করেছেন। তিনি সব-সময় অন্যায়ের প্রতিবাদ  করেছেন। নিরপেক্ষক ভাবে তিনি ন্যায় বিচার করতেন।একবার কুরাইশ বংশীয় মাখজুম গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত মহিলা চুরির অপরাধে ধরা পড়লে রাসুলুল্লাহ (সা.) তার হাত কর্তনের নির্দেশ দেন। আভিজাত্য ও বংশমর্যাদার উল্লেখ করে সে মহিলার শাস্তি লাঘবের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে তাঁর একান্ত স্নেহভাজন উসামা ইবনে জায়েদ (রা.) সুপারিশ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে বলেন, ‘তুমি কি আল্লাহর দণ্ডবিধির ব্যাপারে সুপারিশ করছ?’ অতঃপর লোকজনকে আহ্বান করে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেন, ‘হে মানবমণ্ডলী! নিশ্চয়ই তোমাদের পূর্ববর্তী জনগণ পথভ্রষ্ট হয়েছে। এ জন্য যে তাদের কোনো সম্মানিত লোক চুরি করলে তখন তারা তাকে রেহাই দিত। আর যখন কোনো দুর্বল লোক চুরি করত তখন তারা তার ওপর শাস্তি প্রয়োগ করত। আল্লাহর কসম! মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করে, তবে অবশ্যই তার হস্ত কর্তন করে দিতাম।

ব্যবহারঃ মুহাম্মদ সাঃ এর চাইতে উত্তম ব্যবহার কারো ছিল না বলেই তখন তাকে আল-আমিন মানে বিশ্বস্ত উপাধী দেয়া হয়েছিলো । বাল্যকাল থেকেই  তিনি ছিলেন মহৎ চরিত্রের অধিকারী। তার ব্যবহার সকলকে মুুুুগ্ধ করে দিতো। দাস-দাসীদের সাথে তিনি সব-সময় ভালো ব্যবহার করতেন । কখনো কাউকে কটু কথা বলা তো দূূূূরে কেউ তার বিরুদ্ধে কখনো কোন অভিযোগ করতে পারেনি। চরম শত্রুরা পর্যন্ত তাকে বিশ্বাসী  বলে ডাকতো। 

আশা করি বুঝতেই পেরেছেন, মুহাম্মদ সাঃ ছিলেন মহৎ চরিত্রের অধিকারী। সয়ং আল্লাহ বলে দিয়েছেন তার মধ্যে আমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আর্দশ ।

Share this:

MH Emon