আল্লাহ কেন মানুষকে এতো কষ্ট ও বিপদ দেন?

বর্তমান নাস্তিক- ইসলাম বিদ্বেষীদের একটি প্রশ্ন যে, স্রষ্টা যদি থেকেই থাকেন তবে তিনি কেন মানুষকে এতো দুঃখ, কষ্ট ও বিপদ দেন? স্রষ্টা যদি থাকতেন তবে তার সৃষ্টিকে সাহায্য করতেন! এ ভাবে বিপদের মধ্যে তাকে রাখতেন না?

জবাব :- 

এই প্রশ্নের উত্তর স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা নিজেই কুরআনে দিয়েছেন। 

وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ

 এবং অবশ্যই আমি তোমাদিগকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের। (সূরা: আল বাকারা, আয়াত: ১৫৫)। 

أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُتْرَكُوا أَنْ يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ

মানুষ কি মনে করে যে, তারা একথা বলেই অব্যাহতি পেয়ে যাবে যে, আমরা বিশ্বাস করি এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না? (সূরা: আল আনকাবুত, আয়াত: ২)।

الَّذِیۡ  خَلَقَ الۡمَوۡتَ وَ الۡحَیٰوۃَ لِیَبۡلُوَکُمۡ  اَیُّکُمۡ  اَحۡسَنُ عَمَلًا ؕ وَ ہُوَ الۡعَزِیۡزُ  الۡغَفُوۡرُ ۙ﴿۲﴾ 

"যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য - কে তোমাদের মধ্যে কর্মে উত্তম। তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।" (আল-কুরআন, ৬৭:২)।

◾মহান আল্লাহ তায়ালা এই প্রশ্নের জবাব কুরআনেই দিয়েছেন। আল্লাহ আমাদেরকে পরীক্ষা করবেন। আল্লাহ কুরআনে বলেই দিয়েছেন তিনি মানুষকে পরীক্ষা করবেন ক্ষুধা, কষ্ট, ক্ষতি ইত্যাদি দিয়ে।

তিনি আমাদের পৃথিবীতে পরীক্ষা করার জন্য পাঠিয়েছেন :-

وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ ۖ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ

আমি তাদেরকেও পরীক্ষা করেছি, যারা তাদের পূর্বে ছিল। আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন যারা সত্যবাদী এবং নিশ্চয়ই জেনে নেবেন মিথ্যুকদেরকে। (সূরা: আল আনকাবুত, আয়াত: ৩)

তাফসীর ইবনে কাসীর 

সূরা বাকারা আয়াত ১৫৫-এর ব্যাখ্যা-

وَ لَنَبۡلُوَنَّکُمۡ بِشَیۡءٍ مِّنَ الۡخَوۡفِ وَ الۡجُوۡعِ وَ نَقۡصٍ مِّنَ الۡاَمۡوَالِ وَ الۡاَنۡفُسِ وَ الثَّمَرٰتِ ؕ وَ بَشِّرِ الصّٰبِرِیۡنَ ﴿۱۵۵﴾ۙ

তোমাদেরকে ভয় ও ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়-ক্ষতি এসবের কোনকিছুর দ্বারা নিশ্চয়ই পরীক্ষা করবো। ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ প্রদান করো। মু’মিনগণ বিপদে ধৈর্য ধারণের জন্য প্রতিদান পেয়ে থাকেন অত্র আয়াতের মাধ্যমে মহান আল্লাহ সংবাদ দিচ্ছেন যে, তিনি স্বীয় বান্দাগণকে অবশ্যই পরীক্ষা করে থাকেন। যেমন অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ বলেনঃ ﴿وَ لَنَبْلُوَنَّكُمْ حَتّٰى نَعْلَمَ الْمُجٰهِدِیْنَ مِنْكُمْ وَ الصّٰبِرِیْنَ١ۙ وَ نَبْلُوَاۡ اَخْبَارَكُمْ﴾ ‘আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করবো, যতোক্ষণ না আমি জেনে নেই তোমাদের মধ্যে কে জিহাদকারী ও ধৈর্যশীল এবং আমি তোমাদের কার্যাবলী পরীক্ষা করি।’ (৪৭ নং সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত নং ৩১) কখনো পরীক্ষা করেন উন্নতি ও মঙ্গলের দ্বারা, আবার কখনো পরীক্ষা করেন অবনতি, অমঙ্গল, ভয় ও ক্ষুধা তথা অভাব দ্বারা। অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ বলেছেনঃ ﴿فَاَذَاقَهَا اللّٰهُ لِبَاسَ الْجُوْعِ وَ الْخَوْفِ﴾ ‘ফলে তাদের কৃতকর্মের কারণে মহান আল্লাহ তাদেরকে আস্বাদ গ্রহণ করালেন ক্ষুধা ও ভীতির।’ (১৬ নং সূরা নাহল, আয়াত নং ১১২) আয়াতের ভাবার্থ এই যে, সামান্য ভয়-ভীতি, কিছু ক্ষুধা, কিছু ধনমালের ঘাটতি, কিছু প্রাণের হ্রাস অর্থাৎ নিজের ও অপরের, আত্মীয়-স্বজনের এবং বন্ধু-বান্ধবের মৃত্যু, কখনো ফল উৎপাদিত শস্যের ক্ষতি ইত্যাদি দ্বারা মহান আল্লাহ স্বীয় বান্দাদেরকে পরীক্ষা করেন। এতে ধৈর্যধারণকারীদেরকে তিনি উত্তম প্রতিদান দেন এবং অসহিষ্ণু, তাড়াহুড়াকারী এবং নৈরাশ্যবাদীদের ওপর শাস্তি অবতীর্ণ করেন। এজন্যই তিনি বলেনঃ وَبَشِّرِ الصَّابِرِيْنَ ‘আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ প্রদান করো।’ কোন কোন মুফাস্সির বলেন যে, অত্র আয়াতে ‘ভয়’ দ্বারা মহান আল্লাহ্‌র ভয় এবং ‘ক্ষুধা’ দ্বারা সাওম উদ্দেশ্য। আর ‘কিছু ধনমালের ঘাটতি’ দ্বারা যাকাত উদ্দেশ্য। ‘কিছু প্রাণের হ্রাস’ দ্বারা রোগ এবং ‘ ফল-ফসলের ক্ষয়-ক্ষতি’ দ্বারা সন্তান-সন্ততির ক্ষতি উদ্দেশ্য। তবে এ সব উক্তি গুলোতে গবেষণার প্রয়োজন আছে। মহান আল্লাহই ভালো জানেন। বিপদাপদে ‘আমরা মহান আল্লাহ্‌রই ওপর নির্ভরশীল’ বলার উপকারিতা অতঃপর মহান আল্লাহ সেই ধৈর্যশীল লোকদের পরিচয় বর্ণনা দিচ্ছেন যে, এসব লোক তারাই যারা সঙ্কীর্ণতা ও বিপদের সময় إِنَّلِلهِ পড়ে থাকে এবং এ কথার দ্বারা নিজেদের মনকে সান্ত্বনা দেয় যে, সেটা মহান আল্লাহ্‌রই অধিকার রয়েছে। বান্দার এই উক্তির কারণে তার ওপর মহান আল্লাহ্‌র দয়া ও অনুগ্রহ অবতীর্ণ হয়, সে শাস্তি হতে মুক্তি লাভ করে এবং সুপথ প্রাপ্ত হয়। আমীরুল মু’মিনীন ‘উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেনঃ ‘সম্মানের দু’টি জিনিস صَلَوَت ও رَحْمَةٌ এবং একটি মধ্যেবর্তী জিনিস রয়েছে অর্থাৎ ‘হিদায়াত’ এগুলি ধৈর্যশীলরা লাভ করে থাকে।’ মুসনাদ আহমাদে রয়েছে, উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) বলেনঃ ‘একবার আমার স্বামী আবূ সালামাহ্ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে আমার নিকট আসেন এবং অত্যন্ত খুশী মনে বলেনঃ ‘আজ আমি এমন একটি হাদীস শুনেছি যা শুনে আমি খুবই খুশী হয়েছি।’ ঐ হাদীসটি এই যে, যখন কোন মুসলিমের ওপর কোন কষ্ট ও বিপদ পৌঁছে এবং সে নিম্নের দু‘আটি পাঠ করে তখন মহান আল্লাহ তাকে অবশ্যই বিনিময় ও প্রতিদান দিয়ে থাকে। اللّٰهُمَّ أَجِرْنِيْ فِيْ مُصِيْبَتِيْ وَاخَلُفْ لِيْ خَيْرًا مِّنْهَا ‘হে মহান আল্লাহ! আমাকে মুসীবতের সময় ধৈর্য ধরার শক্তি দাও এবং এর পরিবর্তে উত্তম কিছু দান করো। উম্মু সালামাহ্ (রাঃ) বলেনঃ ‘আমি এই দু‘আটি মুখস্ত করে নেই। অতঃপর আবূ সালামাহ্ (রাঃ)-এর ইন্তিকাল হলে আমি إِنَّا لِلهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ راجِعُوْنَ পাঠ করি এবং এই দু‘আটি পড়ে নেই। কিন্তু আমার ধারণা হয় যে, আবূ সালামাহ্ (রাঃ) অপেক্ষা আর ভালো লোক আমি কাকে পাবো? আমার ‘ইদ্দত’ অতিক্রান্ত হলে একদিন আমি আমার একটি চামড়ায় রং করছিলাম। এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আগমন করেন এবং ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চান। আমি চামড়াটি রেখে হাত ধুইয়ে নেই এবং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ঘরের ভিতরে আসার জন্য বলি। তাঁকে একটি নরম আসনে বসতে দেই। তিনি আমাকে বিয়ে করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তাঁকে আমি বললামঃ হে মহান আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! এটাতো আমার জন্য বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার, কিন্তু প্রথমত আমি একজন লজ্জাবতি নারী। না জানি হয়তো আপনার স্বভাবের উল্টা কোন কাজ আমার দ্বারা সংঘটিত হয়ে যায় এবং এ কারণে মহান আল্লাহ্‌র নিকট আমার শাস্তি হয় নাকি! দ্বিতীয়তঃ আমি একজন বয়স্কা নারী। তৃতীয়তঃ আমার ছেলে মেয়ে রয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন ‘দেখো! মহান আল্লাহ তোমার এ লজ্জা দূর করে দিবে। আর আমার বয়সও তো কম নয় এবং তোমার ছেলে মেয়েও যেন আমারই ছেলে মেয়ে। আমি এ কথা শুনে বললামঃ ‘হে মহান আল্লাহ্‌র রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! তাহলে আমার কোন আপত্তি নেই।’ অতঃপর মহান আল্লাহ্‌র নবীর সাথে আমার বিয়ে হয়ে যায় এবং মহান আল্লাহ সেই দু‘আর বরকতে আমার পূর্ব স্বামী অপেক্ষা উত্তম স্বামী অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে দান করেন। (মুসনাদে আহমাদ ৪/২৭, ২৮, ৬/৩১৩, ৩১৭, ৬/৩২০, ৩২১, সহীহ মুসলিম ২/৬৩৩) সুতরাং সমুদয় প্রশংসা মহান আল্লাহ্‌র জন্য। সহীহ মুসলিমের মধ্যেও এই হাদীসেটি ভিন্ন শব্দে এসেছে আর তা হলোঃ

"ما من مسلم ولا مسلمة يصاب بمصيبة فيذكرها وإن طال عهدها -وقال عباد: قدم عهدها -فيحدث لذلك استرجاعا، إلا جدد الله له عند ذلك فأعطاه مثل أجرها يوم أصيب".

কোন বান্দা বিপদগ্রস্ত হয়ে নীচের দু‘আটি পড়লে মহান আল্লাহ তাকে বিপদেও পরস্কৃত করবেন এবং পূর্বের উত্তম প্রতিনিধি দান করবেন। অতঃপর আবূ সালামাহ মৃত্যুবরণ করলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নির্দেশ মুতাবিক আমি উক্ত দু‘আটির ‘আমল করি ফলে মহান আল্লাহ আবূ সালামার পরিবর্তে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে দান করেন। (সহীহ মুসলিম-২/৪/৬৩২, ৬৩৩, মুসনাদে আহমাদ-৬/৩০৯) মুসনাদে আহমাদের মধ্যে ‘আলী (রহঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ "ما من مسلم ولا مسلمة يصاب بمصيبة فيذكرها وإن طال عهدها -وقال عباد: قدم عهدها -فيحدث لذلك استرجاعا، إلا جدد الله له عند ذلك فأعطاه مثل أجرها يوم أصيب". ‘যখন কোন মুসলমানকে বিপদে ঘিরে ফেলে,এর ওপর যদি দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হয়ে যায়, অতঃপর আবার তার স্মরণ হয় এবং সে পুনরায় ইন্নালিল্লাহ পাঠ করে তবে বিপদে ধৈর্য ধারণের সময় যে পুণ্য সে লাভ করে ছিলো ঐ পুণ্য এখনও সে লাভ করবে। সুনান ইবনে মাজার মধ্যে আবূ সিনান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ আমি আমার একটি শিশুকে সমাধিস্থ করি। আমি তার কবরেই রয়েছি এমন সময়ে আবূ তালহা খাওলানী (রাঃ) আমাকে হাত ধরে উঠিয়ে নেন এবং বলেনঃ আমি কি আপনাকে একটি সুসংবাদ দিবো না? আমি বলি হ্যাঁ তিনি বলেনঃ আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

يا ملك الموت، قبضتَ ولد عبدي؟ قبضت قُرَّة عينه وثمرة فؤاده؟ قال نعم. قال: فما قال؟ قال: حَمِدَك واسترجع، قال: ابنو له بيتًا في الجنة، وسمُّوه بيتَ الحمد".

হে মরণের ফেরেশতা! তুমি আমার বান্দার ছেলে, তার চক্ষুর জ্যোতি এবং কলিজার টুকরোকে ছিনিয়ে নিয়েছো? ফিরিশতা বলেন হ্যাঁ। মহান আল্লাহ বলেনঃ তখন সে কি বলেছে? ফেরেশতা বলেনঃ সে আপনার প্রশংসা করছে এবং ইন্নালিল্লাহ পাঠ করছে। তখন মহান আল্লাহ বলেনঃ তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর তৈরি করো এবং তার নাম বায়তুল হামদ বা প্রশংসার ঘর রেখে দাও। (হাদীসটি হাসান। মুসনাদে আহমাদ-৪/৪১৫, জামি‘ তিরমিযী-৩/৩৪১/১০২১, সহীহ ইবনে হিব্বান-৪/২৬২/২৯৩৭, সিলসিলাতু সহীহাহ-১৪০৮)

তাফসীর ইবনে কাসীর 

সূরা আনকাবুত আয়াত ২-এর ব্যাখ্যা- 

اَحَسِبَ النَّاسُ اَنۡ یُّتۡرَکُوۡۤا اَنۡ یَّقُوۡلُوۡۤا اٰمَنَّا وَ ہُمۡ  لَا یُفۡتَنُوۡنَ ﴿۲﴾

লোকেরা কি মনে করে যে ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদেরকে অব্যাহতি দিয়ে দেয়া হবে, আর তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না? ১-৪ নং আয়াতের তাফসীর এরপর আল্লাহ পাক বলেনঃ মুমিনদেরকেও পরীক্ষা না করেই ছেড়ে দেয়া হবে- এটা অসম্ভব। সহীহ হাদীসে এসেছেঃ “সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় মুমিনদের উপর, তারপর সৎ লোকদের উপর, এরপর তাদের চেয়ে নিম্ন মর্যাদার লোকদের উপর, এরপর তাদের চেয়েও নিম্ন মর্যাদার লোকদের উপর। পরীক্ষা তাদের দ্বীনের অনুপাতে হয়ে থাকে। যদি সে তার দ্বীনের উপর দৃঢ় হয় তবে তার পরীক্ষাও কঠিন হয় এবং বিপদ-আপদ তার উপর অবতীর্ণ হয়ে থাকে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে দাখিল হয়ে যাবে, যখন আল্লাহ তোমাদের মধ্যে কে জিহাদ করেছে এবং কে ধৈর্যশীল তা এখনও জানেন (৩:১৪২) অনুরূপ আয়াত সূরায়ে বারাআতেও রয়েছে। মহামহিমান্বিত আল্লাহ সূরায়ে বাকারায় বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, যদিও এখনও তোমাদের নিকট তোমাদের পূর্ববর্তীদের অবস্থা আসেনি? অর্থ-সংকট ও দুঃখ-ক্লেশ তাদেরকে স্পর্শ করেছিল এবং তারা ভীত ও কম্পিত হয়েছিল। এমনকি রাসূল ও তার সাথে ঈমান আনয়নকারীরা বলে উঠেছিল- আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে? হ্যা, হ্যাঁ, আল্লাহর সাহায্য নিকটেই।” (২:২১৪) এই জন্যেই এখানেও বলেনঃ আমি তো তাদের পূর্ববর্তীদেরকেও পরীক্ষা করেছিলাম, আল্লাহ অবশ্যই প্রকাশ করে দিবেন কারা সত্যবাদী ও কারা মিথ্যাবাদী। এর দ্বারা এটা মনে করা চলবে না যে, আল্লাহ এটা জানতেন না। বরং যা হয়ে গেছে। এবং যা হবে সবই তিনি জানেন। এর উপর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সমস্ত ইমাম একমত। এখানে (আরবি) অর্থ (আরবি) বা দেখার অর্থে ব্যবহৃত। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) (আরবি)-এর অর্থ (আরবি) করেছেন। কেননা, দেখার সম্পর্ক বিদ্যমান জিনিসের সাথে হয়ে থাকে এবং (আরবি) এর (আরবি) থেকে বা সাধারণ। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ যারা মন্দ কর্ম করে তারা কি মনে করে যে, তারা আমার আয়ত্তের বাইরে চলে যাবে? তাদের সিদ্ধান্ত কত মন্দ! অর্থাৎ যারা ঈমান আনয়ন করেনি তারাও যেন এ ধারণা না করে যে, তারা পরীক্ষা হতে বেঁচে যাবে। তাদের জন্যে বড় বড় শাস্তি অপেক্ষা করছে। তারা আল্লাহর আয়ত্তের বাইরে যেতে পারবে না। তাদের ধারণা খুবই মন্দ, যার ফল তারা সত্বরই জানতে পারবেন।

◾আয়াত গুলো থেকে এটা পরিষ্কার যে আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে পরীক্ষা করবেন বিভিন্ন বিপদ, দুঃখ, কষ্ট, ক্ষতি ইত্যাদি দিয়ে। আমাদের পূর্বে যেসব মানুষ ছিল-এসেছিল তাদের সবাইকেই আল্লাহ কোন না কোন ভাবে পরীক্ষা করেছেন। আমাদেরকেও তিনি কোন না কোন ভাবে পরীক্ষা করবেন। আর আমাদেরকে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। এই পরীক্ষার মাধ্যমে বের হয়ে আসবে কারা ধৈর্যশীল, সত্যবাদী, মিথ্যাবাদী, ইবাদতকারী। এই পরীক্ষায় যদি আমরা উত্তীর্ণ হতে পারি তবে পুরষ্কার হিসেবে রয়েছে আমাদের জন্য জান্নাত। না হতে পারলে জাহান্নাম। তাই আমাদেরকে ধৈর্যশীল হতে হবে। কারণ আল্লাহ আগেই আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন তিনি আমাদেরকে পরীক্ষা করবেন বিপদ-আপদ, দুঃখ, কষ্ট ইত্যাদির মাধ্যমে। যেহেতু আমাদেরকে আগেই জানিয়ে দেয়া হয়েছে পরীক্ষা করার কথা তাই আমাদেরকে সেই পরীক্ষাতে উত্তীর্ণ হতেই হবে৷ আপনি আল্লাহর নেয়া এই পরীক্ষায় সফল না হতে পারলে শাস্তি হিসেবে রয়েছে জাহান্নাম। আপনি এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হয়ে যদি জাহান্নামে যান তবে এই জাহান্নামে যাওয়ার জন্য আপনি নিজেই দায়ী থাকবেন। কোন ভাবেই আপনি আল্লাহকে দোষারোপ করতে পারবেন না। কারণ আল্লাহ আপনাকে কুরআনের মাধ্যমে আগেই জানিয়ে দিয়েছেন তিনি আপনাকে পরীক্ষা করবেনই। তাই সর্বদা ধৈর্যশীল থাকুন ও আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করুন। 

Share this:

More articles

আসুন দেখি প্রথমে এ বিষয়ে পবিত্র কুরআন কী বলে!   যারা সেই নিরক্ষর রাসূলের অনুসরণ করে চলে যার কথা তারা তাদের নিকট রক্ষিত তাওরাত ও ইঞ্জীল কিতাবে লিখিত পায়। (৭:১৫৭)।  এখানে সুস্পষ্ট বলা আছে যে পবিত্র কুরআন বলছে মুহাম্মদ সা: সম্পর্কে তাওরাত ও ইজ্ঞিলে ভবিষ্যত বাণী করা হয়েছিলো। বাইবেলে মুহাম্মদ সাঃ সম্পর্কে বাইবেলের Old Testament ও New Testament এ বলা আছে। তাকে নিয়ে ভবিষ্যৎবাণী করা হয়েছিলো,   আজ আমরা তাই প্রমান করবো বাইবেল থেকে ।    15. প্রভু, তোমাদের ঈশ্বর, তোমাদের জন্য একজন ভাববাদী পাঠাবেন| তোমাদের ....
7 Min read
Read more
॥ ১॥ আল কুরআন নাজীলের সূচনা ৬১০ খৃষ্টাব্দে । আল কুরআন রাসুলুল্লাহর  (ﷺ) জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়বস্তু নিয়ে নাজীল হয়েছে খণ্ডে খণ্ডে, দীর্ঘ ২৩ বছরে। কুরআন পরিপূর্ণ রূপ পায় ৬৩২ ঈসায়ী সালে। কুরআনের প্রথম আয়াত সমুহ বদলে দেয় নবীজীর (ﷺ) জীবন। এরপর নবীজী (ﷺ) ও সাহাবীদের (رضي الله عنه) জীবন আবর্তিত হয় আল্লাহর কালাম তথা  কুরআনকে ঘিরেই । তাই সে সময় থেকেই কুরআনের প্রতিটি আয়াত বিশুদ্ধভাবে সংরক্ষণে প্রচেষ্টার কোনো কমতি ছিল না।  কুরআনের আয়াতাংশ, আয়াত, সূরা—যখনই যা নাজিল হতো, তখনই নবীজী (ﷺ) তা নিজে বার বার তেলাওয়াত ....
15 Min read
Read more
অজ্ঞতা : ইসলামে তালাকের অধিকার শুধু পুরুষদের দেয়া হয়েছে। নারীকে তালাক দেয়ার অধিকার দেয়া হয়নি।নারীর ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন মূল্য নাই এই ধর্মে। অজ্ঞতার জবাব: ইসলামে নারীরা ও তালাক দিতে পারে: তালাক শব্দের অর্থ হচ্ছে বিয়ে বিচ্ছেদ। আর ইসলামি শরিয়তে তালাক নিকৃষ্ট কাজ বলে সাব্যস্ত করা হয়েছে। রাসূল সা: এক হাদিসে বলেন , “তালাক হচ্ছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট হালাল কাজ।” [১] ইসলামে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা শর্ত সাপেক্ষে নারী পুরুষ উভয়কে দেওয়া হয়েছে। তবে নারী ও পুরুষের তালাকের মধ্য কিছুটা পার্থক্য আছে । নারী পুরুষের তালাক দে....
5 Min read
Read more
কাব ইবনু আশরাফের দূর্গের বর্তমান অবস্থা । সুত্র: Islamiclandmarks.com কাব ইবনু আশরাফের হত্যার ঘটনা বিশ্লেষণের পূর্বে তৎকালীন মাদীনার রাষ্ট্র ব্যাবস্থাপনা ও রাষ্ট্র ব্যাবস্থাপনা প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ভালো করে জানা দরকার । ইয়াসরীব বা মাদীনার অভিবাসনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস: তৎকালীন মাদীনার পরিচিত নাম ছিল ইয়াসরীব ।মক্কা থেকে ২০৯ মাইল বা ৩৩৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ইয়াসরিব । শহরটি ভৌগোলিকভাবে ছিল অত্যন্ত সুরক্ষিত । এর দক্ষিণ দিকে ঘনবসতি এবং খেজুর বাগান দিয়ে এমন ভাবে পরিবেষ্টিত ছিল ছিল যে অভ্যন্তরীণ সহযোগ....
22 Min read
Read more
প্রচলিত সুবিধাভোগী ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণী-ভিত্তিক সম্প্রদায়ের কায়েমি স্বার্থে আঘাত করে ইসলাম মানবতাকে অন্যায়-অবিচার থেকে মুক্তির পথ দেখিয়েছিল। স্বার্থহানীর কারণে কায়েমি স্বার্থবাদীরা ইসলামের এই অগ্রযাত্রাকে ইসলামের সূচনা কাল থেকেই থামিয়ে ফেলতে বা পৃথিবী থেকে এই দর্শনকে বিলীন করে দেবার জন্য সর্বশক্তি দিয়ে প্রচেষ্টা চালিয়েছিল এবং এখনও চালিয়ে যাচ্ছে।  ৬১০ খৃঃ থেকেই প্রতিবিপ্লবী ইসলাম-বৈরী শক্তি, যখন যেভাবে পারে সেভাবেই ইসলামের মহান মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করার প্রচেষ্টায় নিয়োজিত আছে; কখনও পুরো মিথ্যা ঘটনার ....
41 Min read
Read more
 এক. মুসলিম মাত্রই বিশ্বাস করেন যে কুরআন আল্লাহ প্রেরিত গ্রন্থ। তারা এও বিশ্বাস করেন, কুরআনে যেহেতু আল্লাহপাক বলেছেন তিনি কুরআনকে সংরক্ষণ করবেন, কাজেই কুরআন অবশ্যই অবিকৃত ও অপরিবর্তিত আছে  এবং থাকবে।  কিন্তু কথা হলো,  এই যে কুরআনে বলা আছে যে, কুরআন আল্লাহপাক সংরক্ষণ করবেন, এই কথাটিই যে অবিকৃত ও অপরিবর্তিত আছে, তার প্রমাণ কী? পূর্ববর্তী কোন আসমানী কিতাবই তো অবিকৃত ও অপরিবর্তিত নেই।  বলা হতে পারে,  উসমান(রা.) যে কুরআনের কপি তৈরি করেছিলেন, সেটা তো অদ্যাবধি সংরক্ষিত আছে।  সেই কপির সাথে বর্তমানে আমা....
9 Min read
Read more