চন্দ্র বিদারণ ও কিছু বিভ্রান্তি

Contents

সূচনা.. 2

অনুবাদ. 3

আসল অনুবাদ. 3

হাদিস দিয়ে অনুবাদ. 4

কুরআন দিয়ে অনুবাদ. 5

উপসংহার. 5

হাদিসের কথা.. 6

চাঁদ পর্বতে পতিত হয়. 6

চাঁদ বিচ্ছিন্ন হয় নি? 7

কারা সেখানে ছিল? 8

অনুবাদে ভুল. 8

কবে হয়েছে? 8

ভণ্ডামি.. 9

আরবরা বোকা... 10

বিজ্ঞান দিয়ে মুজিযা ব্যাখ্যার চেষ্টা.. 11

দাউদ মুসা পিডকক.. 11

পৃষ্ঠীয় ফাটলের খোঁজে... 12

পৃষ্ঠের নিচে কি অবস্থা? 12

ড. নিদাল জাসুমের বক্তব্য.. 13

শনি গ্রহের চাঁদ. 14

মন্তব্য.. 14

ইতিহাস? 14

মুসলিম উত্স... 14

অনারব উত্স নিষ্প্রয়োজন. 15

মহাকাশীয় ঘটনার সাক্ষ্য পাওয়া কেন দুরূহ? 16

কয়টা সাক্ষ্য থাকা যৌক্তিক? 17

ভারতের রাজা... 18

রাজা ভোজ.. 18

সামেরী নয়তো পেরুমাল. 19

মায়া সভ্যতা.. 22

চাঁদ উত্সব. 23

ঘটনা যেভাবে হল. 24

শেষ কথা.. 24

 

সূচনা

আজকে এমন একজন নাস্তিকের পোস্ট ব্যবচ্ছেদ করা হবে যে মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ইতিহাসবেত্তা এবং লুগাত বিশেষজ্ঞ। যিনি দাবি করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ [সাঃ] কখনও চাঁদ বিদারণ করেন নি। কারন-

১. কুরআনে চাঁদ বিদারণের কথা বলা হয় নি।

2. হাদিসে বলা হয়েছে, চাঁদের টুকরো দুনিয়াতে এসেছে পড়েছে।

নাস্তিকদের যদি কেউ অপমান করতে চায়, তাহলে তার জন্য সুবর্ণ সুযোগ হল ঐসময়ে আক্রমণ করা, যখন নাস্তিকরা কুরআন-হাদিস নিয়ে তর্ক করতে আসবে। কারন এটা এমন এক জিনিস যা গত ১৪০০ বছর ধরে উলামা এত এত আলোচনা করেছেন যে, ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র জিনিসও তারা আলোচনার বাইরে রাখে নি। আমার অভিজ্ঞতা এটা বলে যে, শুধু বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনার সময়ে একটু কষ্ট করতে হয়; মাথা খাটাতে হয়; কারন তখন সেই কাজ করতে হয়, যে কাজ উলামা আপনার জন্মের আগে করেছেন, অর্থাৎ একদম গোড়া থেকে তাফসীর শুরু করা বা হাদিসের শরাহ করা। আর এটা খুব কঠিন কাজ। কিন্তু যখন ইসলামের একদম তত্ত্বীয় বিষয় হয়, আপনি মুখে বিশাল হাসি এঁকে নিতে পারেন।

অনুবাদ

তো শুরু করা যাক, শুরুতে-ই আমাদের নাস্তিক সাহেব সূরা ক্বমারের অনুবাদ করেছেন, “সময় নিকটবর্তী ও চন্দ্র অর্ধেক/আংশিক হয়েছে”।

এরপরে ভদলোক তার অত্র অনুবাদের পিছনে যুক্তি দেয়া শুরু করলেন যে, কেন তার অনুবাদ সঠিক। ভাল কথা, কেন সঠিক? তিনি বিভন্ন অভিধানের রেফারেন্স দেয়া শুরু করলেন! মানে? অভিধান? আমরা আজীবন জেনে এসেছি অনুবাদ যদি আক্ষরিক হয়, তবে তাতে ভুল অর্থ প্রকাশ হয়ে পারে। যেমনঃ mind your own business , মানে- নিজের কাজ স্মরণ কর, নয়। সুতরাং, ভাবানুবাদ করা উচিত, আপন চরকায় তেল দাও। উসুলে তাফসীর আপনি জানেন না বুঝলাম, অন্তত অনুবাদ কিভাবে করে তা-ও জানবেন না! মাদ্রাসার উসুলে তাফসীর বিভাগে এই জ্ঞান নিয়ে ভর্তি হলে বেতের বাড়ি খেয়ে পিঠ লাল হয়ে যেত। আয়াতের শাব্দিক অনুবাদ কেন সঠিক, তা তিনি কল্পনার ঘোড়া ছুটিয়ে প্রমাণে লিপ্ত হয়েছেন যা সামনে আসবে।

আসল অনুবাদ

শাব্দিক অনুবাদটা যদি ঠিকমত করতেন তবুও এক কথা ছিল। জনগণকে ধোঁকা দিতে তিনি লিখেছেন যে, আয়াতে ক্বিয়ামাত শব্দের উল্লেখ নেই। এভাবে তিনি অনুবাদকদের যোগ্যতার উপর অভিযোগ এনে নিজের অযোগ্যতা প্রমাণ করলেন। ভদ্রলোক জানেন না যে, কুরআন-হাদিসে কিয়ামতের প্রায় ১৫ টি নাম আছে, ক্বিয়ামাতের আরেক নাম ছাআ’ত। তিনি রেফারেন্স দিয়েছেন জে. মিল্টন কাউয়ানের অভিধানে আছে, ‘শাক্কা’ অর্থ- অর্ধেক/অংশ। অথচ, কাউয়ান সাহেবের বইয়ে আমি half/ part বলে কোন অর্থ পেলাম না। আমি পেলাম - to split, cleave, part, tear, rend, rip (A s.th.); to break (A s.th.); to plow, till, break up (A the ground); to furrow, traverse, arose (a s.th.); to pass, go, travel (a through a region); to break (dawn),..

পরের শব্দ ‘শাক্ক’ মানে দেয়া আছে, half . আবার ‘শিক্ক’ মানে half, side, part, portion; অভিধানে হরকত দেয়া নেই, তাই মুফাসসির সাহেব শীন-ক্বাফ দেখেই শাক্কা-কে শাক্ক/শিক্ক ভেবে নিয়েছেন। যাই হোক, কেউ কেউ বলতে পারেন, “ভাই শাক্কা-র অর্থে ৩য় শব্দটা-ই তো part এতে কি তার কথা প্রমাণ হয় না”? জবাব হল, “না। ভাল করে তাকিয়ে দেখুন শুরুতে to আছে এখানে যতগুলো ক্রিয়াপদ আছে [split, cleave, part, tear, rend, rip] সবার আগে to যুক্ত করতে হবে। মানে, [to] part যার অর্থ ‘পৃথক করা’, তবে কারও আইকিউ কম থাকলে সে ‘আংশিক হওয়া’ অর্থ করতেও পারে

হাদিস দিয়ে অনুবাদ

মজার ব্যাপার হল, তিনি আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস [রাঃ] থেকে বর্ণিত সহীহ মুসলিমের হাদিসে [ই.ফা. ৬৮২০; ই.সে. ৬৮৭৬; হা.ফা. ৬৯৭২] ‘শাক্কা’-র অনুবাদে ঠিকই ‘দ্বিখন্ডিত’ লিখেছেন। তাছাড়া সহীহ মুসলিমে ইবনে মাস’উদ [রাঃ]-এর ২টি সনদে ভিন্ন ভিন্ন শব্দ এসেছে; একটিতে [ই.ফা. ৬৮১৫; ই.সে. ৬৮৬৯; হা.ফা. ৬৯৬৫] ‘ইযান ফালাক্বাল [বিদীর্ণ] ক্বমার’, অন্যটিতে [ই.ফা. ৬৮১৬; ই.সে. ৬৮৭০; হা.ফা. ৬৯৬৬] ‘আন শাক্কাল [অর্ধেক !] ক্বমার’ বলা আছে। উনার অনুবাদ সঠিক হলে ২টি সহীহ হাদিসে গোলমাল লেগে যাবে।

এছাড়া বিভিন্ন হাদিসের অনুবাদ অদ্ভুত বা হাস্যকর হয়ে যাবে। যেমনঃ শত্রুর কাতার আংশিক করে এগিয়ে গেলেন। [বুখারী, ই.ফা. ৩৬৮৮] “জামা আংশিক করে ফেলবে”।[ বুখারী, ই.ফা. ১৮৭ ]

এছাড়া তিনি মদীনা পাবলিকেশনের আধুনিক আরবি-বাংলা অভিধানের রেফারেন্স দিলেন। ইন্টারনেটে এই শিরোনামের পিডিএফ/হার্ড কপি [বিজ্ঞাপণ] কোনটির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় নি। একটি পাওয়া গেছে, কিন্তু সেটি রিয়াদ প্রকাশনীর। আর সেখানে কাউওয়ান সাহেবের অনুরূপ দেখা গেছে। মূলত, কাউয়ান সাহেবের অভিধান হল আরবি থেকে ইংরেজি, আপনি আবার ইংরেজি থেকে বাংলা করলে কয়েকবার ভাষা পরিবর্তনের ফলে এমনিতেই মূল অর্থ বিকৃতি হয়ে যায়। কিন্তু বিকৃত করেও মেলানো গেল না, ভদ্রলোক হালকার উপর to উহ্য করে দিলেন! যাকে অনেকে definitional retreat বলতে পারেন।

কুরআন দিয়ে অনুবাদ

আগেই বলেছি, মাদ্রাসার উসুলে তাফসীর বিভাগে এই জ্ঞান নিয়ে ভর্তি হলে বেতে বাড়ি খেয়ে পিঠ লাল হয়ে যেত। কারন উসুল এটা-ই বলে যে, কুরআনকে কুরআন দ্বারা তাফসীর করতে হবে। এমতাবস্থায়, ‘শাক্কা’র অর্থ ‘অর্ধেক’ হলে সূরা ক্বাফের ৪৪ নং আয়াতের কি হবে? ‘ইয়াওমা তাশাক্কাকুল আরদ’ এর অনুবাদ কি হবে? ‘যেদিন পৃথিবী আংশিক/অর্ধেক হবে”? যেহেতু এটা বলতে পারবে না যে, পৃথিবী বিদীর্ণ হবে; তাহলে কি আংশিক হবে? [ব্যাসার্ধ? তাদের দাবি কি কুরআন অনুযায়ী কিয়ামাতের আগে পৃথিবীর ব্যাসার্ধ কমে যাবে? এতে করে কুরআনের অন্য আয়াতের বিরুদ্ধে যাবে। যেখানে বলা হয়েছে যে- আল্লাহ পৃথিবীকে সম্প্রসারিত করবেন। যেমন, সূরা ইনশিক্বাকঃ ৩] মানে, আয়াতের অর্থ আগা-গোড়া পাল্টে যাচ্ছে। এছাড়া আরও অনেক আয়াতে গোলমাল লেগে যাবে। যেমনঃ ইনশিক্বাক ১, আবাসা ২৬, মারইয়াম ৯০, বাক্বারাহ ৭৪, আর-রাহমান ৩৭, আল-হাক্কাহ ১৬, ফুরকান ২৫, ক্বাফ ৪৪। দ্বিতীয় কাজ হল, হাদিস দ্বারা তাফসীর করা, যা ইতিমধ্যে করা হয়ে গেছে। ‘শাক্কা’-র অর্থ ‘আংশিক/অর্ধেক’ করলে কত গ্যাঞ্জাম হবে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। নিঃসন্দেহে, ভাল কোন মুফাসসিরের নিকট গেলে অনেক অনেক সম্ভাব্য ঝামেলার উদাহরণ পাওয়া যাবে।

উপসংহার

সারকথা হল, শাক্কা নিয়ে তার আলোচনা সম্পূর্ণ কল্পনাপ্রসূত এবং অনুমান। তিনি দাবি করেছেন যে, যুগে যুগে অর্থ বিকৃত হয়ে ‘বিদীর্ণ’ শব্দে পরিণত হয়েছে, কিন্তু সে বিশুদ্ধতার সাথে তার অনুমিত অনুবাদের দূরতম সম্পর্কও প্রমাণ করতে পারে নি। অথচ পুরো পোস্ট অনর্থক হয়ে যায়, শুধু একটি শব্দের ভুল অনুবাদের কারনে। ইলমে লুগাহ মুসলিমদের বহু চর্চিত শাস্ত্র, যার সূচনা খ্রিস্টীয় ৮ম শতাব্দীতে এবং কুরআন-হাদিসের প্রতিটি শব্দের ঠিক ঠিক অর্থ নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে লিপিবদ্ধ হয়েছে। “এ ব্যাপারে তাদের কোন জ্ঞান নেই, তারা শুধু (মিথ্যা) অনুমান-নির্ভর কথা বলে”[৪:১১৬]

হাদিসের কথা

ভদ্রলোক বোল্ড হরফে লিখেছেন যে চাঁদ দ্বিখন্ডিত হওয়ার গল্প ৪০০ বছর পরে দালাইলুন নুবুওয়াত কিতাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে। এদ্বারা তিনি সম্ভবত নিজের বিকৃত শব্দগত তাফসীরকে সঠিক হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন, যে তাফসীর ১৩০০ বছর পরে লিখিত অভিধান থেকে করা হয়েছে। আর তিনি ৪০০ বছর পরে লিখিত বলতে কি বুঝাতে চান? দালাইলুন নুবুওয়াত কিতাব ৪০০ বছর পরে লিখিত হতে পারে, কিন্তু দালাইলুন নুবুওয়াত যে কিতাব থেকে কপি করা হয়েছে সেটা তো ৪০০ বছর পরে নয়। বুঝলেন না? মুহাদ্দিস যখন হাদিস লিপিবদ্ধ করেন, তখন রাবীর মৌখিক ও লিখিত উভয় ইবারতের মিল পরীক্ষা করেন। সুতরাং আবু নুয়াইম যার কাছ থেকে হাদিস লিখেছেন তার মৌখিক ও লিখিত উভয় সনদের উপস্থিতির কারনে-ই লিখেছেন। এভাবে উক্ত রাবী তার উস্তাদের, তার উস্তাদ তার উস্তাদের লিখিত কিতাব থেকেই হাদিস লিখেছেন। [উল্লেখ্য এসকল কিতাব ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকত।] কিন্তু উনাদের কিতাব ইতিহাস থেকে হারিয়ে গেছে, আর অক্ষত থেকে গেছে বিখ্যাত মুহাদ্দিসগণের বিখ্যাত সংকলনগুলো। কাজেই, ৪০০ বছর পরে হাওয়া থেকে লিখা হয় নি, বরং পূর্বের আরেক কিতাব থেকে লিখা হয়েছে, পূর্বের কিতাব আরও পূর্বের কিতাব থেকে নকল করা হয়েছে, আর এভাবে সনদ সাহাবীদের পর্যন্ত গেছে।

চাঁদ পর্বতে পতিত হয়

হাদিস অনুবাদেও তিনি পাকা উকিলের মত কাজ করেছেন, যেটাকে আজকাল অনেকে fallacy of accent বলেপ্রত্যেক ভাষায় কিছু শব্দ থাকে, যা আক্ষরিক অনুবাদ করে পুরো ঘটনা পালটিয়ে দেয়া যায় বা ভুল খুঁজে বের করা যায়। যেমনঃ বনফুল তার ‘অবর্তমান’ গল্পে লিখেছেন, সূর্য ডুবে গেল অস্তমান সূর্য-কিরণে গঙগার জলটা যত জবলনত লাল দেখাচছিল, সূর্য ডুবে যাওয়াতে ততটা আর রইল না। [তার মানে কি লেখকের মতে, সূর্য পানির নিচে চলে গেছে?]

বুদ্ধদেব গুহ-এর একটি উপন্যাসের কিছু লাইন ছিল এরকম, “খেতে খেতে সূর্য ডুবে যাবে। আসলে ডুববে অনেকই পরে। আমরা পাহাড়ের খোঁদলে আছি বলে প্রায় আধঘণ্টা আগে সূর্য অদৃশ্য হবে এখানে। এখানে ভোরের প্রথম আলো পৌঁছোতেও আধঘণ্টা সময় নেয়। খাওয়া শেষ হতে হতেই যেমন সূর্য ডুববে তেমন চাঁদও উঠবে” [তার মানে কি লেখকের মতে সূর্য পানির নিচে ডুবে গেছে?]

কাফেররা বলেছিল, আপনি যদি সত্যবাদী হন, তা হলে চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত করে আমাদেরকে দেখান, যার অর্ধেক আবু কোবাইস/কুবাইস পর্বতে এবং অর্ধেক কাইকুআন পর্বতে পতিত হবে... অতঃপর চাঁদ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, অর্ধেক আবু কোবাইস/কুবাইস পর্বতে পতিত হয় এবং অর্ধেক কাইকুআন পর্বতে পতিত হয়”।

[হাদিসটি যঈফ, কারন উভয় পর্বত মিনা-র পশ্চিমে। আর সহীহ হাদিস অনুসারে, রাসূল[সাঃ] তখন মিনায় ছিলেন। উভয় টুকরোর মাঝে হেরা পর্বত ছিল এবং হেরা পর্বত মিনা-র উত্তরে। বিস্তারিত আব্দুল হামীদ ফাইযী অনূদিত ‘বিশ্ব যখন ধ্বংস হবে’-এর পৃ. ৩৫। ]

মুহাদ্দিস সাহেব এখানে এসে বেশ চাল চেলেছেন। গোটা পোস্টের আলোচনার অর্ধেক অংশ জুড়ে তিনি দাবি করেছেন, চাঁদ একটি বিশাল উপগ্রহ, ইহা ব্যাসার্ধ এত, ভর এত, গতি এত এবং পৃথিবীর ব্যাসার্ধ এত, ভর এত, গতি এত। সুতরাং চাঁদের খন্ড পৃথিবীতে পতিত হতে পারে না।

প্রথমত, অদ্যবধি কোন সালফে-সালেহীন এই দাবি করে নি যে, চাঁদের টুকরো দুনিয়াতে এসে পড়েছে। ইবনে কাছীর লিখেছেন, “বস্তুত চাঁদ যখন বিদীর্ণ হয়েছিল, তখনও আকাশে-ই ছিল[আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খন্ড ৩, পৃ. ২৩২, ই.ফা.] কে ভাল আরবি জানে? ইবনে কাছীর নাকি এই কথিত নব্য মুহাদ্দিস? দ্বিতীয়ত, তর্কের খাতিরে যদি মেনে নিই চাঁদ পৃথিবীর বুকে পতিত হয়েছিল, তাতে কি যায় আসে? এটা মুজিযা, প্রাকৃতিক ঘটনা নয়।

চাঁদ বিচ্ছিন্ন হয় নি?

অতঃপর তিনি দাবি করেছেন যে, কোন কোন মুফাসসির বলেছেন যে, এটা কিয়ামাতের আগে ঘটবে। আমি ভাবছিলাম, “ব্যাটা, ছুপা হিন্দু নাকি”? সব মুসলিম-ই জানে এটা কিয়ামতের ঐসব আলামতের একটি যা ঘটে গেছে। হতে পারে, কেউ কেউ পুনরায় বিদীর্ণ হওয়ার সম্ভাব্যতার কথা বলেছেন। কারন কিয়ামাতের আলামত একাধিক বার ঘটতে পারে। যেমনঃ জেরুজালেম কিয়ামাতের আগে মুসলিমদের দখল হওয়ার কথা, আর তা ২ বার দখল ও হাত ছাড়া হয়ে গেছে। কিন্তু এতে করে ‘চাঁদ আংশিক হয়েছে’ দাবির সত্যতা কিভাবে প্রমাণিত হয়? কেউ যদি অতীতে বিদীর্ণ হয় নি দাবি করে থাকেন তবে ভুল বলেছেন।

কারা সেখানে ছিল?

এরপরে তিনি দাবি করেছেন যে, চন্দ্রবিদারণের সময় শুধু ইবনে মাস’উদ ছাড়া কোন সাহাবী উপস্থিত ছিল না। অথচ, আলী, যুবাইর ইবনে মুত’ইম, ইবনে উমার [রাঃ] উপস্থিত ছিলেন। [ড. আসাদুল্লাহ গালিব, সীরাতুর রাসূল [সাঃ], পৃ. ১১৮] এছাড়া ছিলেন আবু সালামা ইবন আব্দুল আসাদ, আরকাম ইবনে আরকাম [রাঃ] [আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খন্ড ৩, পৃ. ২২৯, ই.ফা.]। আরও ছিলেন হুযাইফা বিন ইয়ামান[i], আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন আস [রা:][ii]

কাফিরদের মধ্যে উপস্থিত ছিল ওয়ালিদ বিন মুগিরা, আবু জাহল, আস বিন ওয়াইল, আস বিন হিশাম, আসওয়াদ বিন আব্দী ইয়াগুস, আসওয়াদ বিন মুত্তালিব, জাম’আ বিন আসওয়াদ, নাযর বিন হারিস এবং অন্যরা।[iii]

অনুবাদে ভুল

তিনি সহীহ মুসলিমের ইবনে মাস’উদের [ই.ফা. ৬৮১৫; ই.সে. ৬৮৬৯; হা.ফা. ৬৯৬৫] হাদিসে ‘এমতাবস্থায় হঠাৎ’ শব্দের উল্লেখ পেলেন, আর দাবি করলেন যে- ঘটনা হঠাৎ করে ঘটেছে। কাজেই কাফিররা একদিন মুজিযা দাবি করে ঘরে চলে গিয়েছিল, তার কিছুদিন পরে চন্দ্রগ্রহণের সময় রাসূল [সাঃ] ট্রাম্প কার্ড [!] ব্যবহার করেন। অথচ, বিশুদ্ধ সীরাতের গ্রন্থে এমন আভাস পাওয়া যায় না। অপরদিকে সহীহ মুসলিমের [ই.ফা. ৬৮১৫; ই.সে. ৬৮৬৯; হা.ফা. ৬৯৬৫] হাদিসের আরবি ইবারতে ‘এমতাবস্থায় হঠাৎ’ পাওয়া যায় নি। তাতে বলা আছে, “বাইনামা [থাকাকালীন] নাহনু [আমরা] মা’আ [সাথে] রাসূলিল্লাহ [সাঃ] বিমিনা [মিনায়] ইযা [যখন] ফালাক্বাল ক্বমার [চাঁদ বিদীর্ণ হয়]”।

এমতাবস্থায় হঠাৎ করেই অনুবাদে ‘এমতাবস্থায় হঠাৎ’ শব্দদ্বয় চলে এসেছেিছু করার নেই।

কবে হয়েছে?

এরপরে ভদ্রলোক দাবি করেন যে, চন্দ্র দ্বিখন্ডের ঘটনার সময়কাল নিয়ে মুসলিমদের ব্যাপক মতবিরোধ আছে, তবে ইতহাসবেত্তাদের মতে ৫ম, ৮ম বা ৯ম নববী সনে হতে পারে এবং এই প্রক্রিয়ায় নিজের Inflation of conflict বৈধতা দিলেন। অথচ বর্তমানে বাংলাদেশের সর্বাধিক বিশুদ্ধ সীরাত হল 'সীরাতুর রাসূল [সাঃ]’, যেখানে শুধু ৯ম বর্ষ নির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে। [Rahime Kaya তার Prophet Muhammad: The Seal of All Prophets বইতে একই কথা লিখেছেন] মাসের ১৪ তম রাতে।[iv] প্রশ্ন হল, উনি কেন নিজ দাবি প্রমাণের উদ্দেশ্যে ইতিহাসের তথ্য বাদ দিয়ে নিজের কল্পনার অনুসরন করলেন? উত্তর খুব সহজ, তিনি যেহেতু শুরুতে-ই ধরে নিয়েছেন যে, চন্দ্র বিদারণ আসলে চন্দ্রগ্রহণ ছিল [যা প্রমাণহীন], সেহেতু তিনি ৫ম, ৮ম বা ৯ম বর্ষে আরবে চন্দ্রগ্রহণের তালিকা খুঁজলেন, কিন্তু সন্তোষজনক কিছু পেলেন না। তবে ৭ ম বর্ষে পেয়ে গেলেন। এবার ৭ ম বর্ষে দাবি করার পিছনে একটা খোড়া দলিলও যোগাড় করলেন। সেটা হল, সূরা ক্বমারের 46 নং আয়াত তখন নাযিল হয়, যখন আয়েশা [রাঃ] কিশোরী ছিলেন। [বুখারী] কিন্তু একথা তো সর্বজনবিদিত যে একই সূরার আয়াত ধারাবাহিক নাযিল না হয়ে, আগে-পরে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে নাযিল হতে পারে। সেক্ষেত্রে উক্ত হাদিস দ্বারা কি করে সঠিক সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে? অথচ লেখক 7 ম বর্ষকে সুনির্দিষ্ট করে দিলেন, শুধু নিজের কল্পিত মতবাদ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে!

সুতরাং, ৯ম বর্ষে চন্দ্র বিদারণ ইতিহাসের তথ্যের ভিত্তিতে বলা, আর ৭ম বর্ষে চন্দ্র বিদারণের কথা কোন দুর্বল সূত্রেও লিখা নেই এবং আরেকটি অনুমান। “এ ব্যাপারে তাদের কোন জ্ঞান নেই, তারা শুধু (মিথ্যা) অনুমান-নির্ভর কথা বলে”। [৪:১১৬]

ভণ্ডামি

[আমি অবশ্য ৮ম বর্ষে চন্দ্রবিদারণের গুজব নিয়ে মাথা খাটিয়েছিলাম। আর আমার ধারনা, ৮ম বছরে বিদারণের কথাটি শব্দের ভুল প্রয়োগের দ্বারা এসেছে। যেমনঃ কোন ঘটনা ১৯৩৮ সালে ঘটলে সচেতন লোকেরা বলবে ‘বিংশ’ শতাব্দীর ঘটনা; কিন্তু যারা কিছুটা অসচেতন তারা কমিয়ে বলবে, ঘটনাটি ‘ঊনবিংশ’ শতকে ঘটেছে। একইভাবে চন্দ্র বিদারণ ঘটেছে ৯ম বর্ষে, কিন্তু মানুষের মুখে মুখে তা কমে ৮ম হয়ে গেছে। আমার হিসাব অনুসারে, যদি ৩৬৫ দিনে এক বছর ও ৩০ দিনে এক মাস হয়, তাহলে সম্ভবত চন্দ্র বিদারণ হয়েছে ৬১৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বরের পর থেকে ৩৫৫ দিনের ভেতর কোন এক পূর্ণিমার রাতে। আল্লাহ অধিক জানেন।]

কুরাইশরা চন্দ্র বিদারণ দেখতে চেয়েছিল, আর মাসের নতুন চাঁদ তো খুব-ই চিকন। তাই পূর্ণিমার রাতে চন্দ্র বিদারণ দেখতে চাওয়া-ই স্বাভাবিক, যেহেতু চাঁদের পূর্ণ রূপ সেদিন দেখা যাবে। আর চন্দ্রগ্রহণ সবসময় পূর্ণিমার রাতে-ই ঘটেযদি চন্দ্রগ্রহণ হয়, তবে পৃথিবীর রাতের অংশের সকল মানুষ তা দেখতে পারে [অবশ্য, গ্রহণের শুরু থেকে শেষ সব দেখতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে, তবে কিছু অংশ অবশ্যই দেখবে যদি আকাশ মেঘমুক্ত থাকে।] ৫ম থেকে ৯ম পর্যন্ত ৪ বছরে ৪৮ টি পূর্ণিমা ছিল, যার মধ্যে ১১ বার চন্দ্রগ্রহণ হয়েছে [৬১৫-৬১৯], যার মধ্যে আংশিক গ্রহণ হয়েছে ৬ বার, পূর্ণগ্রহণ ৩ বার ৬ টি আংশিক গ্রহণ থেকে সহজেই একটি অর্ধগ্রহণ বা অর্ধের কাছাকাছি গ্রহণ খুঁজে বের করা যায়। ব্যস, এবার ইতিহাসবেত্তাদের তথ্য নাকচ করে, এতক্ষণে খুঁজে বের করা বছর বসিয়ে দিলেই কাজ শেষ

এভাবে ভদ্রলোক সাধারণ মানুষের সাথে অসাধারণ একটা ধোঁকাবাজি করলেন। যদি তর্কের খাতিরে ৭ম বর্ষে চন্দ্রবিদারণের কথা মেনেও নিই, তবুও সে বছরে ১২টি পূর্ণিমা ছিল। আর মুজিযার ঘটনা গ্রহণের দিনে ঘটার সম্ভাবনাও অনেক কম। মোটকথা, তিনি জোর করে বুদ্ধির বিপরীতে গিয়ে অনুমানের দ্বারা সত্যের সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। পুরো পোস্টে একটা মিথ্যা দাবি [i.e. আংশিক হয়েছে] গড়ে তোলা হয়েছে, আর তার সপক্ষে প্রমাণ সংগ্রহ করে, নিজের দাবিকে সত্য বলে চালানোর চেষ্টা করেছেন, যা কিনা reification

কিন্তু এই চন্দ্রগ্রহণের গল্পটা বেশ হাস্যকর। ক্বুরাইশরা মহাকাশ নিয়ে যথেষ্ট সচেতন ছিল। আমাদের ব্লগার সাহেবকে মরুভূমিতে ছেড়ে দিলে দুদিন পর লাশ পাওয়া যাবে, আর ক্বুরাইশরা নক্ষত্র দেখে ঠিকই ঘরে পৌঁছে যাবে। সুতরাং কেউ যদি চন্দ্র গ্রহণকে চন্দ্র বিদারণ মনে করে থাকে, তবে সেটা আমাদের ব্লগার সাহেবের পক্ষেই সম্ভব।

আরবরা বোকা

আরবদের মাঝে চন্দ্র গ্রহণ একটি সুপরিচিত ঘটনা। আরবিতে চন্দ্র গ্রহণকে খুসুফ বলা হয়, শাক্কা বলে না। চন্দ্র গ্রহণ [খুসুফ] বলতে চাঁদের ’আলো কমে আসা’ বুঝায়। [সূরা ক্বিয়ামাহ ৮] সাহাবীরা চন্দ্র গ্রহণের সালাতও আদায় করতেন। [দেখুন] বুঝা গেল, আরবরা চন্দ্র গ্রহণ ও এর দৃশ্যপট সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত; তাদের নিকট চন্দ্র গ্রহণকে চন্দ্র বিদারণ বলে চালিয়ে দেয়া মোটেই সম্ভব না।

এরপরে তিনি আবার চাঁদের খন্ড পাহাড়ে পতিত হওয়ার দাবি করেছেন, যা নিয়ে আগেই কথা বলেছি।

তারপরে তিনি নিজের মন মত একটি গল্প ফেঁদেছেন যা কোন ইতিহাসবেত্তা বলেন নি। এবং ‘শাক্কা’ শব্দ কালের প্রবাহে বিকৃত হওয়ার দাবি করেছেন, অথচ কোন ভাষাবিজ্ঞানী বা সংশ্লিষ্ট ব্যাপারে অভিজ্ঞ ব্যক্তির পক্ষ থেকে যুক্তি উদ্ধৃত না করে কল্পনাকে কাজে লাগিয়েছেন।

বিজ্ঞান দিয়ে মুজিযা ব্যাখ্যার চেষ্টা

নাস্তিকরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে-ই মানুষ ঠকিয়ে থাকে, উপরে যার প্রমাণ ইতিমধ্যে পেয়ে গেছেন। তবে উপরে শুধু জালিয়াতি-র প্রমাণ পেয়েছেন, নাস্তিকরা আরও একটি বিশেষ উপায়ে মানুষ ঠকিয়ে থাকে যা এরকম, “আচ্ছা, বুঝলাম, চন্দ্র দ্বিখন্ডিত হয়েছে। তাহলে দ্বিখন্ডিত চন্দ্রের মাঝে ফাটল অবশ্যই পাওয়া যাবে। সেটা দেখাও”। আর অনেক মুসলিম বোকার মত ইনিয়ে-বিনিয়ে প্রমাণ দাড় করানোর চেষ্টা করে। তাদের মাথায় আসে-ই না যে, মুজিযা তার সংজ্ঞানুসারে বিজ্ঞান বা মস্তিষ্কজাত বুদ্ধির উর্দ্ধে, তাই এ প্রকারের প্রশ্নের জবাব দেয়া অনাবশ্যক।

তাছাড়া একটি বিতর্কে উভয় পক্ষ-ই প্রমাণ প্রদানের দায়ভার বহন করে। নাস্তিকরা সোজা সমস্ত দায় মুসলিমদের উপর চাপিয়ে দিয়ে হালকার উপর কেটে পড়ে।

দাউদ মুসা পিডকক

এর মধ্যে একটি হল, দাউদ মুসা পিডককের ঘটনা। দাউদ মুসা একজন ইংরেজ নও-মুসলিম। তিনি নাকি বিবিসি-তে বহুদিন আগে জেমস বুর্কের একটি অনুষ্ঠানে এক বিজ্ঞানীকে চাঁদ বিদীর্ণ হয়েছে দাবি করতে শুনে মুসলিম হয়েছেন। [আল্লাহ ভাল জানেন]

কিন্তু তার দাবি অদৌ সত্য কিনা অর্থাৎ বিবিসি-তে জেমস বুর্কের অনুষ্ঠানে এমন কোন পর্ব ছিল কিনা তা যাচাই করা যায় নিউলটো একজন খ্রিস্টান যখন মুসলিম হয়ে যান, তখন ব্যাপারটা বিস্ময়কর লাগে। তার উপর তিনি ইসলাম গ্রহণের কারন হিসাবে যা উপস্থাপন করছেন সেটাও অনাকংক্ষিত

যা বলছিলাম, একটি বিতর্কে উভয় পক্ষ-ই প্রমাণ প্রদানের দায়ভার বহন করে। যদি মুজিযা-র প্রাকৃতিক প্রমাণ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকত, তবে অবশ্যই চাঁদের গায়ে ফাটল পাওয়া যেত। আর এই ফাটল খোঁজার দায়ভার নাস্তিক-মুসলিম উভয়ের।

পৃষ্ঠীয় ফাটলের খোঁজে

তবুও যদি কেউ ধারনা করে যে, চাঁদের পৃষ্ঠে কোন ফাটল মুজিযা-র কারনে সৃষ্ট হয় নি। তবে তাকে ধরে ধরে চাঁদের প্রতিটি ফাটলের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করতে হবে, যা অসম্ভব। তাছাড়া যেকোন ঘটনার একাধিক সম্ভাব্য কার্যকারণ থাকতে পারে, এত বছর পরে নির্দিষ্ট করে সঠিক কার্যকারণ সনাক্ত করা যাবে কিনা তাও অনিশ্চিত। আর সেক্ষেত্রে খুব সহজে অপ্রাকৃতিক কার্যকারণ অস্বীকার করা যেতে পারে, এমনকি অপ্রাকৃতিক কার্যকারণ সত্যিকারে থাকলেও।

আমি এক্ষেত্রে সহজ সমাধান দিচ্ছি, এখানে কারও কিছু করার নেই। সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, চাঁদের কেন্দ্র শীতল হচ্ছে বলে চাঁদের পৃষ্ঠ কোথাও কোথাও সংকুচিত এবং কোথাও কোথাও প্রসারিত হচ্ছেফলে, অতীতের ফাটল মুছে ভাজ হয়ে যাচ্ছে, আর কোথাও নতুন নতুন ফাটল সৃষ্টি হচ্ছে। মুজিযা যদি ফাটল সৃষ্টি করেও থাকে, তা মুছে গেছে।

এছাড়া আমাদের পৃথিবীর মহাকর্ষ বলের প্রভাবে চাদের মাটিতে জোয়ার-ভাটার সৃষ্টি হয়। এতে করেও চাঁদের পৃষ্ঠ বহু পালটে গেছে। সুতরাং, চাঁদের পৃষ্ঠে মুজিযা-র ফলে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে যেমন প্রমাণ করা অসম্ভব, তেমনি ‘হয় নি’ এটা প্রমাণ করাও অসম্ভব।

[অনেকে চাঁদের রিমা আরিয়াডিয়াস [Rima Ariadaeus] ফাটলকে চন্দ্রবিদারণের প্রমাণ মনে করে, কিন্তু তা ভুল, এর দৈর্ঘ্য চাঁদের পরিধির মাত্র ২.৭%।]

পৃষ্ঠের নিচে কি অবস্থা?

এতক্ষণে কেউ কেউ হয়তো ভাববেন যে, “চন্দ্রপৃষ্ঠের ফাটল না হয় নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু এমনও তো হতে পারে যে, চাঁদের অভ্যন্তরে কয়েকশ মিটার নিচে নিরবিচ্ছিন্ন ফাটোলের রেখা পাওয়া যাবে”। চিন্তাটা উড়িয়ে দেয়া যায় না, তবে এ পথে এগিয়ে লাভ হবে না। চাঁদের অভ্যন্তরের ৯৮% বহু আগে থেকেই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে আছে। এরকম হওয়ার কারন হল, চাঁদ তার শৈশবে বহু উল্কা ও ধমকেতু দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল। ফলে এর পৃষ্ঠের ঠিক নিচে আজকের দিনে আমরা অসংখ্য প্রাচীন জ্বালামুখ বা গর্ত পাই।[v] আপনি যদি আশা করে থাকেন যে, চন্দ্রবিদারণের ফলে কেন্দ্রের গভীর থেকে বেরিয়ে আসা লাভা আপনি সনাক্ত করবেন, তবে সেটাও সম্ভব হবে না। শত শত টুকরো দিয়ে ভরা দেহে আরেকটি দাগ খুঁজে বের করা, খড়ের গাদায় সুঁই খোঁজার ন্যায়। যতদূর জানি, এসব গর্ত ও ফাটলের বয়স নির্ণয় যায় না; শুধু কোন গর্ত ও ফাটল পরস্পর থেকে অপেক্ষাকৃত নতুন, এতটুকু অনুমান করা যায় মাত্র। তাই কোন গর্ত ও ফাটল ১৪০০ বছর আগের তা বলা অসম্ভব।

আবার যে মাধ্যাকর্ষণ বল ৭.৩৪৮ X ১০২২ কেজি ভর একত্রে ধরে রাখতে পারে, তা নেহায়েত কম নয়। আর এই বলের নিকট ১৪০০ বছরের ব্যবধানে অনেক ফাটল মুছে দেয়া খুবই স্বাভাবিক। চাঁদের ব্যাসার্ধ প্রতি বছর ৪১০ মিলিমিটার করে কমে যাচ্ছে।[vi] চাঁদ যদি প্রসারিত হত, সেক্ষেত্রে কিছু আশা থাকত। কিন্তু যা সংকুচিত হচ্ছে, তা ফাটল মুছে দিবে এটা-ই স্বাভাবিক।

সুতরাং, চাঁদের পৃষ্ঠের নিচে মুজিযা-র ফলে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে যেমন প্রমাণ করা অসম্ভব, তেমনি ‘হয় নি’ এটা প্রমাণ করাও অসম্ভব।

ড. নিদাল জাসুমের বক্তব্য

ড. নিদাল জাসুম হলেন একজন পদার্থ ও জ্যোতির্বিদ্যার অধ্যাপক। উনার অনুমান হল, চন্দ্র বিদারণ যে রাতে হয়েছে সে রাতের কোন এক সময়ে পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ হয়েছিল [অন্য শব্দে বলা যায়, ঘটনা পূর্ণিমার রাতে হয়েছে। যেহেতু চন্দ্রগ্রহণ পূর্ণিমার রাতে হয়]। এরকম সময়ে, চাঁদ বৃহৎ আকারের উল্কা দ্বারা আঘাত প্রাপ্ত হওয়ার অনুকূল অবস্থায় থাকে।[vii] কিছু বিজ্ঞানী দেখিয়েছেন যে, কয়েক হাজার বছরে এক-দু’ বার নয়, বরং প্রতি কয়েক মিলিয়ন বছরে চাঁদে এরকম বিশাল আকারের উল্কা পাত হয়।[viii] হতে পারে, রাসূল [সাঃ]-এর মুজিযা-র সময়ে আল্লাহর ইচ্ছায় বিশাল এক উল্কার আঘাতে চাঁদ কিছু সময়ের জন্য দুই টুকরো হয়ে যায়। এখানে মুজিযা হল, সঠিক সময়ে সঠিক ঘটনা। মানে, যে সময় কুরাইশরা নিদর্শন চাইলো, সে সময়েই আল্লাহ উল্কা পাঠালেন। আর বাহ্যিক কারন রাখা আল্লাহ-র ফিতরাত। যেমনঃ মুসা[আঃ]-এর সময়ে আল্লাহ ইচ্ছা করলেই নদীর পানি সরে যেত, তবুও আল্লাহ বললেন লাঠি নিক্ষেপ করতে। এক্ষেত্রে বাহ্যিক কারন উল্কা হতে পারে।

যদি নিদাল জাসুমের অনুমান সঠিক হয়, তাহলে আর পাঁচটা উল্কাপাতের মত চন্দ্রবিদারণের উল্কাও একই রকম হবে। অর্থাৎ ১৪০০ বছর পর আলাদা করে বলা কঠিন যে, অদৌ চাঁদ বিদীর্ণ হয়েছিল কিনা।

শনি গ্রহের চাঁদ

লাপিটাস হল শনি গ্রহের সবচেয়ে বড় উপগ্রহ। এর গায়ে ৮০০ মাইল [গড় পরিধির প্রায় ৩০%] লম্বা উচু রেখার উৎপত্তি নিয়ে ব্যাপক মতবিরোধ আছে।[ix] কেউ কেউ বলছেন যে, যেহেতু আল্লাহ নির্দিষ্ট করে বলেন নি যে কোন চাঁদকে খণ্ডিত করা হয়েছে; হতে পারে, লাপিটাসকে পৃথিবীর নিকটে এনে খণ্ডিত করে দেখান হয়েছিল।

মন্তব্য

রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম]-এর সবচেয়ে বড় মুজিযা হল কুরআন। আল্লাহ কুরআনকে সংরক্ষণ করবেন বলে ওয়াদা দিয়েছেন, চন্দ্র বিদারণের প্রমাণকে নয়। আল্লাহ যদি চন্দ্র বিদারণে প্রকৃতিকে ব্যবহার করতেন, তবে চাঁদের চারিদিকে কিছু সময়ের জন্য শনি গ্রহের ন্যায় পাথরের টুকরো বেষ্টিত একটা রিং বা বলয় সৃষ্টি হত। অথচ সাহাবীদের বর্ণনায় এমন কিছু পাওয়া যায় না। যেহেতু শুরু থেকে-ই এই ঘটনা প্রকৃতির নিয়মের বাইরে ছিল, সেহেতু বিজ্ঞান দিয়ে প্রাকৃতিক প্রমাণ তদন্ত করা আমার দৃষ্টিতে বৃথা। আর যদি বিজ্ঞান দ্বারা চন্দ্র বিদারণ ব্যাখ্যা করা যেত, তবে সেটাকে প্রাকৃতিক ঘটনা বলা হত, মুজিযা নয়।

ইতিহাস?

এই অংশের আলোচনা উত্তমভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন যদি মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম (র) রচিত 'ইসলামের ইতিহাস দর্শন' বইটা পড়েন।

মুসলিম উত্স

প্রথমত, ইমাম তাহাবী, ইবনে কাসীর [রাহ.][x] ও ইমাম তাজ উদ্দীন সুবকী [রাহ:][xi] এই ঘটনাকে মুতাওয়াতির বলেছেন। চন্দ্র বিদারণ নিয়ে এত এত সহীহ হাদিস এসেছে যে, তা মুতাওয়াতির বলে ইজমা হয়েছে।[xii] মুতাওয়াতির হাদিস হল সহীহ অপেক্ষা বিশুদ্ধ। অবশ্য, ইসলামবিদ্বেষীরা এসব হাদিস মুসলিমদের বানানো দাবি করে। তাদের কথা শুনলে মনে হয়, গত ১৩০০ বছর ধরে বুনা ষড়যন্ত্রের জাল থেকে একমাত্র তারা-ই মুক্তি পেয়েছে। এই ধরনের হাস্যকর বিশ্বাস ইসলামবিদ্বেষীরা পোষণ করে থাকেন। অথচ, আমরা অপ্রমাণিত কোন কথা রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম]-এর দিকে ইংগিত করি না। মুহাদ্দিসরা বহু কথিত মুজিযা বানোয়াট ঘোষণা করেছেন [যেমন: তার ছায়া ছিল না], চন্দ্র বিদারণকেও করতে পারতেন। কিন্তু বিশুদ্ধ সূত্রকে মিথ্যা বলা তাদের স্বভাব না।

যদি মুতাওয়াতির সনদ অগ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে পৃথিবীর কোন ইতিহাসকে সঠিক বলা যাবে না। কারন ইতিহাস রচনার সময় বর্ণনাকারীর ন্যায়পরায়ণতা যাচাই করা হয় না।

সত্য এই যে, চন্দ্র বিদারণের এই দলিলগুলো ইসলামবিদ্বেষীরা জেনেটিক ফাল্যাসি দ্বারা প্রত্যাখ্যান করে। মজার ব্যাপার হল, তাদের এজেন্ডার পক্ষে নিতে পারলে, তারা-ই আবার হাদিসকে ব্যবহার করেন।

দ্বিতীয়ত, ক্বুরাইশরা চন্দ্র বিদারণকে যাদু হিসাবে ব্যাখ্যা করেছে, মানে চন্দ্র বিদারণ প্রত্যক্ষ করার কথা কখনও অস্বীকার করে নি।

তৃতীয়ত, এই ঘটনা ঘটেছে হিজরতের আগে। যদি সাহাবীরা মিথ্যা হাদিস প্রচার করে বেড়াতেন, তাহলে মদীনায় ঠাঁই জুটতো বলে মনে হয়?

চতুর্থত, সূরা ক্বামার রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] সারা জীবন তিলাওয়াত করেছেন। তার বিরুদ্ধে কাফিররা অনেক কুত্সা রটনা করলেও চন্দ্র বিদারণ প্রত্যক্ষ করার কথা কখনও অস্বীকার করে নি।

লক্ষণীয় যে, মদিনায় শুরুর দিকে ইহুদিরা বেশ শক্তিশালী ছিল। তারা প্রায়ই বিভিন্ন প্রশ্ন নিয়ে রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম]-কে কোনঠাসা করতে চাইলেও কখনও মুজিযা দেখাতে দাবি করেছিল বলে জানি না। যা প্রমাণ করে, রাসূল [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] হিজরত করার আগেই তারা কোন মুজিযা দেখেছিল।

অনারব উত্স নিষ্প্রয়োজন

অনেক সালাফ মনে করেন, চন্দ্র বিদারণ সারা বিশ্ববাসীকে দেখানোর দাবি অযৌক্তিক। যেমন, বদিউজ্জামান সাইদ নুরসি [রাহ:] লিখেছেন,

“নবুওয়তের দাবি প্রমাণ করার জন্য এবং অস্বীকারকারীদের বোঝাতে, অলৌকিক ঘটনা ঘটে। কিন্তু তাদের বিশ্বাস করতে বাধ্য করার জন্য অলৌকিক ঘটনা ঘটে না। যারা ইতিমধ্যে মুহাম্মদ [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম]-এর নবুওয়াতের বাণী শুনেছেন, তাদের বোঝাতে এই অলৌকিক কাজের প্রয়োজন ছিল। চন্দ্র বিদারণ বিশ্বের অন্যান্য অংশ থেকে দেখানো বা চন্দ্র বিদারণ অনস্বীকার্যভাবে সুস্পষ্ট উপায়ে দেখানো, সর্বজ্ঞানী সৃষ্টিকর্তার হিকমাহ এবং মহাবিশ্বে মানবতার কার্যকারিতা উভয়েরই পরিপন্থী। কারন আল্লাহ-র হিকমাহ হল- মুক্ত ইচ্ছাশক্তিকে অক্ষম না করে, মানব মনের জন্য পথ খোলা। যদি সর্বজ্ঞানী স্রষ্টা বস্তুবাদী দার্শনিকদের খেয়াল অনুসারে সমগ্র বিশ্বকে চাঁদ বিদারণ দেখানোর জন্য কয়েক ঘন্টা ধরে একই অবস্থায় রেখে দিতেন, এবং যদি এই ঘটনাটি সমস্ত ইতিহাসবেত্তাদের দ্বারা লিপিবদ্ধ করা হত, তবে এটি জ্যোতির্বিজ্ঞানের অন্যান্য ঘটনাগুলির মত স্বাভাবিক বিবেচনা করা হত, মুহাম্মদ [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] এর নবুওয়াতের প্রমাণ হিসাবে ব্যাখ্যা করা হত না এবং তাঁর নবুওয়াতের প্রমাণ হিসাবে বিবেচনা করা হত না। অন্যথায়, এটি এমন সুস্পষ্ট অলৌকিক ঘটনা হত যে, তা মানব মনকে ঈমান আনতে বাধ্য করত এবং তাদের স্বাধীন ইচ্ছা থেকে বঞ্চিত করত। ফলস্বরূপ, কয়লা এবং হিরা (বা আবু জাহল এবং আবু বকর) একই হত এবং মহাবিশ্বে মানবতার ক্রিয়াকলাপের উদ্দেশ্যটি হারিয়ে যেত ...”[xiii]

মহাকাশীয় ঘটনার সাক্ষ্য পাওয়া কেন দুরূহ?

মানুষ দ্রুত ঘুমাত যেন ভোরে উঠে কাজ শুরু করতে পারে ও দিবালোকের পূর্ণ ব্যবহার করতে পারে। অর্ধেক দুনিয়ায় তখন দিন, তাদের দেখার প্রশ্ন-ই ওঠে না।

মাদারিজুন নুবুওয়াতে আছে,

“সম্মানিত ওলামা কিরাম ইহার এই উত্তর দিয়া থাকেন যে, তাহারা যে বিষয়ের উল্লেখ করিয়া থাকে এই ঘটনা উহা হইতে বহির্ভূত ইহা এ বিষয় যাহাকে এক সম্প্রদায় এবং বিশেষ ব্যক্তিরা দাবী করিয়াছিল এবং এই ঘটনা রাত্রে অনুষ্ঠিত হইয়াছিল । রাব্রিকালে অধিকাংশ লোক ঘুমাইয়া থাকে। যদি কিছু লোক জাগিয়াও থাকে, তবে তাহারা গৃহে অথবা গৃহ কোণ বিশ্রাম করিয়া থাকে । ময়দানে উপস্থিত থাকা এবং জাগ্রত থাকা ইহা বহুত বিরল। আর ইহাও এক কারণ যে, এই ঘটনা এক মুহূর্তের জন্য সংঘটিত হইয়াছিল । আর ইহাও হইতে পারে যে, এ সময় সকল ব্যক্তির জন্য প্রত্যক্ষ করার ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি হইয়া থাকিবে। যথা মেঘমালা অথবা পাহাড় অন্তরায় হইতে পারে। অথবা কোন কোন লোক আনন্দ উৎসবমূলক কার্ষে মগ্ন থাকিতে পারে । যথা কিস্সা কাহিনী প্রভৃতি শুনিতে ও শোনাইতে পারে। আর উহারা ইহার দর্শন হইতে বাদ থাকিয়া যাইতে পারে। আর ইহাও স্বভাব বিরুদ্ধ কার্য যে, মানুষ চাদের দর্শনের জন্য ওৎপাতিয়া বসিয়া থাকিবে এবং এক মুহূর্তের জন্যও এদিক-ওদিক দৃষ্টি ফিরাইবে না। এইরূপ অবস্থার কেবল এঁ সময়ই কল্পনা করা যায়, যখন লোকদিগকে পূর্ব হইতে উহাকে দেখা ও প্রত্যক্ষ করার জন্য আগ্রাহান্বিত করা হইয়া থাকে এবং দিন তারিখ ও সময় ধার্য করতঃ সমগ্র পৃথিবীতে উহার ঘোষণা ও বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হইয়া থাকে । আর ইহাও হইতে পারে যে, চন্দ্র উহার স্বীয় কক্ষপথে ছিল, যে কক্ষ হইতে উহা পৃথিবীর কোন অঞ্চলে তো দেখা যাইত এবং কোন অঞ্চলে দেখা যাইত না, যেন এক সম্প্রদায়ের দৃষ্টির সম্ুখে ছিল এবং অপর সম্প্রদায়ের দৃষ্টির অগোচরে । যেমন চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যহণের ক্ষেত্রে হইয়া থাকে যে, কোন শহরে তো দেখা যায়, কোন শহরে দেখা যায় না। কোথাও গ্রহণের একাংশ দৃষ্টিগোচর হয় এবং কোথাও অন্য অংশ। কোন শহরতো এমনও আছে যে, যাহাদের গ্রহণ সম্পর্কে কোন ধারণাই নাই। একমাত্র এ সকল লোক ছাড়া যাহারা অংক দ্বারা তৎসম্পর্কে জ্ঞানের দাবী করিয়া থাকে”।

ইতিহাসবেত্তারা রাজা-রাণীর কথা লিপিবদ্ধ করে, আকাশের ঘটনা নয়। কোন জ্যোর্তিবিদ যদি লিখেও থাকে, পরবর্তীদের পক্ষে তা যাচাইয়ের জন্য ভিনদেশে যাওয়া অপেক্ষা চোখের ভুল বিবেচনা করে বাতিল করে দেয়া অনায়াসসাধ্য কাজ।

কয়টা সাক্ষ্য থাকা যৌক্তিক?

১১৭৮ সালে, ১৮ বা ৩৫ জুন ইংল্যান্ডের ক্যান্টেবুরিতে সন্ধ্যার ১ ঘন্টা পর চাদেঁর মধ্যভাগ বরাবর আগুনের লম্বা শিখা দেখা যায়, যেন চাঁদ দুভাগ হয়ে গেছে। এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী মাত্র ৫ জন! নাসা মন্তব্য করেছে,

yet there are no accounts of such a storm in any known historical record, including the European, Chinese, Arabic, Japanese and Korean astronomical archives.

“তবুও ইউরোপীয়, চীনা, আরব, জাপানি এবং কোরিয়ান জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত সংরক্ষণাগারগুলি সহ কোনও পরিচিত ঐতিহাসিক রেকর্ডে এমন কোনও বিবরণ পাওয়া যায়নি”।[xiv]

পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা এই ঘটনাকে একটি অতিকায় উল্কা চাদেঁ আছড়ে পরার সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। আর ২২ কি:মি: লম্বা খাদকে প্রমাণ হিসাবে পেশ করেছেন।

তবে কোন কোন ওয়েবসাইটে নিউজিল্যান্ডের মাওরি উপজাতি রচিত পাথরে খোদাইকৃত একটি পঙতি-কে একই ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। লাইনটি হল, a new moon with the lower horn of the moon split. মানে, নতুন চাঁদে বিভক্ত চাঁদের নিম্নমুখী শিং। [বিভত্স অনুবাদের জন্য দু:খিত। কবিতা বলে কথা]

আমি জানি না, আপনার কাছে মাওরি উপজাতির কবিতা ক্যান্টেবুরির ঘটনাকে সত্যায়িত করেছে বলে মনে হয় কিনা। তবে আমার খুঁতখুঁত করছে। কারন কোন কবি কি খেয়ে কি বুঝাতে কি লিখেছে, সেটাকে ক্যান্টেবুরির সাথে সম্পৃক্ত করা যায় কিভাবে?

তো, একটা প্রাকৃতিক ঘটনা; সন্ধ্যার ১ ঘন্টা পর ঘটেছে; প্রত্যক্ষদর্শী মাত্র ৫ জন; কোনও পরিচিত ঐতিহাসিক রেকর্ডে নেই; তবে তা ঘটেছে।

আর চন্দ্র বিদারণ একটি মুজিযা; [সম্ভবত] ঈশা-র পর হয়েছে; প্রত্যক্ষদর্শী মক্কা-মদীনাবাসী; কোনও পরিচিত ঐতিহাসিক রেকর্ডে নেই[!!!]; তবে তা ঘটে নি?

ভারতের রাজা

রাজা ভোজ

বাবা রতন নামের একজন চন্দ্র দ্বিখণ্ডন প্রত্যক্ষ করে ইসলাম গ্রহণের হাদিস যঈফ।[xv] ‘ভবিষ্য পুরাণ’ অনুযায়ী মধ্যপ্রদেশের ধারা নগরের রাজা ভোজ [একই নামে ভারতবর্ষে আরও অনেক রাজা এসেছেন] চন্দ্র বিদারণ দেখেছিলেন বলে জানা যায়।[xvi]

‘ইসলাম কি ছদাকত’ নামক পুস্তকে হযরত মওলানা আশরাফ আলী থানভী (রা.) রাজাভোজের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কিত তথ্য অনুসন্ধানে যে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার উল্লেখ করেছেন তা এক্ষেত্রে এক অভিনব সংযোজন। মওলানা থানভী (রা.)-এর দীর্ঘ বর্ণনা এখানে উদ্ধৃত করা সম্ভব নয়। তবে রাজা ভোজ সংক্রান্ত কিছু উদ্ধৃতি প্রদত্ত হলো। তিনি একটি পুরাতন পুস্তক প্রসঙ্গে বলেন,“পুস্তকটিতে অতীত যুগের মহাপুরুষদের জীবনী ও ঘটনাবলী আভিধানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে লিপিবদ্ধ ছিল। ...উহার সারমর্ম ছিল : রাজা ভোজ ভারতবর্ষে হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত করার অলৌকিক ঘটনা দর্শনে বিস্মিত ও মুগ্ধ হয়ে তার রহস্য উদঘাটনের জন্য আরব দেশে দূত প্রেরণ করেন। ঘটনার সত্যতা ও উদ্দেশ্য অবগত হয়ে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন। ধর্মগ্রহণের পর রাজা ভোজের নাম রাখা হয় আবদুল্লাহ। রাজা ভোজের মাজারের নিকট গুজরাটের ধারদার গ্রামে অবস্থিত বলে হযরত থানভী (রা.)-এর বিবরণ হতে জানা যায়।

আরো বিভিন্ন গ্রন্থ যথা তারিখে ফেরেশতা ‘সাওয়ানেহে হারামাইন’ তারিখে ফজলী’ প্রভৃতি গ্রন্থে মালাবারের আলোচ্য রাজার  নাম ভোজ উল্লেখ করা হয়েছে। রাজা ভোজের মাজারের নিকট গুজরাটের ধারদার গ্রামে অবস্থিত বলে হযরত থানভী (রা.)-এর বিবরণ হতে জানা যায়। আরো বিভিন্ন গ্রন্থ যথা তারিখে ফেরেশতা ‘সাওয়ানেহে হারামাইন’ তারিখে ফজলী’ প্রভৃতি গ্রন্থে মালাবারের আলোচ্য রাজার  নাম ভোজ উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতীয় খ্যাতনামা আলেম, ‘মাশরেক’ পত্রিকার সম্পাদক মওলানা মোহাম্মদ নজির হাশেমী রচিত এবং ১৯৩০ সালের ১৮ আগস্ট দিল্লির ‘পেশওয়া’ নামক পত্রিকায় ‘হিন্দুদের পবিত্র গ্রন্থাবলীতে ফখরে কায়েনাতের আবির্ভাব প্রসঙ্গ’ শীর্ষক একটি উর্দু প্রবন্ধে, মশহুর আলেম রাজা ভোজের ইসলাম গ্রহণ শিরোনামে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিবেশিত হয়েছে।

বলে রাখা ভাল, রাজা ভোজ মক্কা গমন করেন নি। মুস্তাদরাক হাকীমে হিন্দু রাজা কর্তৃক রাসুলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম]-এর সাথে দেখা করার হাদিস যঈফ।[xvii] তিনি সংবাদ সংগ্রাহক দূত প্রেরণ করেছিলেন মাত্র। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে বলা আছে, “কথিত আছে যে, ভারতীয় উপমহাদেশের কোন কোন স্থানে ঐ রাতটিকে ঐতিহাসিক রাত হিসেবে চিহ্নিতি করা হয়েছে এবং ঐ রাতে চন্দ্র বিদীর্ণের ঐতিহাসিক ম্মারকরূপে একটি স্মৃতিস্তম্ভও নির্মাণ করা হয়”।[xviii] এত বছরে নিশ্চয়ই সেই স্মৃতিস্তম্ভ টিকে নেই।

সামেরী নয়তো পেরুমাল

দক্ষিণ ভারতের মালাবার উপকূলের কেরালা রাজ্যের হিন্দু রাজা চক্রবর্তী ফারমাস। সেখানকার রাজাদের উপাধি ছিল ‘চেরামান পেরুমাল’। চক্রবর্তী ফারমাস নিয়ে আজ্ঞাতনামা লেখকের সবচেয়ে পুরাতন[xix] নথি হল আরবি ভাষার ‘ক্বিসসাত শাকরওয়াতি ফারমাদ’, যা ড. হামিদুল্লাহ India Office Records থেকে উদ্ধার করেন [MS. Islamic 2807d, fols. 81a-104a]; বর্তমানে তা ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে।[xx] ঘটনাটি আরও লিপিবদ্ধ হয়েছে- তুহফাত আল মুজাহিদীন, তারিখ যুহুর আল ইসলাম ফিল মালিবার, Portuguese chronicles গ্রন্থে; তেলেগু ভাষায়ও একটি সংস্করণ পাওয়া যায়।[xxi] এছাড়া সংস্কৃত ‘কেরালা মহাত্মায়ম’  গ্রন্থের বর্ধিত মালায়লাম সংস্করণ ‘কেরালোলপথি’, যা তুনচাত্তু রামানুজন ইউত্তাচান[xxii] রচনা করেছেন, সেখানেও চক্রবর্তী ফারমাস কর্তৃক চন্দ্র বিদারণ প্রতক্ষ্য করার কথা উল্লেখ আছে। কেরালোলপথি হল ’ভোগোলা পুরাণের’ উপ-পুরাণ। উল্লেখ্য, গবেষকদের নিকট কেরালোলপথি একটি বিতর্কিত বই

তবে অন্যান্য ঐতিহাসিক নথির মত, এখানেও প্রতিটি উৎসে বিবরণের ভিন্নতা আছে। মাপ্পিলা বিবরণে বলা আছে, চাঁদের অর্ধেক পৃথিবীতে পতিত হয়েছিল! কোথাও বলা আছে, সে চন্দ্র বিদারণের রাতেই ইসলাম গ্রহণ করে; কোথাও বলা আছে, আরও পরে। কোথাও মালিক বিন দিনারের [একই নামে ভারতবর্ষে অনেক লোক এসেছেন] কথা বলা আছে, কোথাও নেই। পেরুমালের কবর ও মৃত্যুকাল নিয়েও আছে মতবিরোধ। তার নাম নিয়েও বিরোধ আছে।

Dr. Herman Gundert অনূদিত কেরালোলপথি-তে ২ জন রাজা মক্কা গমন করে বলে বিবরণ আছে; যার একটি হল বানা পেরুমাল বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করে মক্কা গমন করেন! ২য় বিবরণে চেরামান পেরুমালের ইসলাম গ্রহণের কথা থাকলেও, মৃত্যুকাল ভুল দেয়া এবং চন্দ্র বিদারণ নিয়ে কিছু নেই। এই ব্যাপারে বিস্তারিত বিবরণ হুসাইন রানতাত্তানি রচিত Mappila Muslims: A Study on Society and Anti Colonial Struggles বইয়ে পাবেন।

এম.জি.এস. নারায়ণ বলেন, "there is no reason to reject the tradition that the last Chera king embraced Islam and went to Makkah, since it finds a place, not only in Muslim chronicles, but also in Hindu brahmanical chronicles like the Keralolpatti which need not be expected to concoct such a tale which is no way enhances the prestige or the interests of the Brahmins or Hindu population."

“এই লোককথাটি অস্বীকার করার কোনও কারণ নেই যে, শেষ চেরা রাজা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং মক্কায় চলে গিয়েছিলেন; যেহেতু এটি কেবল মুসলিম ইতিহাস অনুসারে নয়, কেরলোলপাত্তির মতো হিন্দু ব্রাহ্মণ্য ইতিহাসেও স্থান পেয়েছে। ব্রাহ্মণ বা হিন্দু জনগণের প্রতিপত্তি বা স্বার্থকে মজবুত করে না-এমন কিছু জাল করা হয়েছে বলে মনে করা হয় না”।[xxiii]

কিন্তু কে.পি. পদ্মনাভ শেষ পেরুমালের ইসলাম গ্রহণ অস্বীকার করেন। সম্ভবত, অনেকের মত তিনিও মনে করেন যে, আসলে কোঝিকোডের জামুরিন রাজা ইসলাম গ্রহণ করেছিল।[xxiv]

তবে গবেষক রাম চন্দ্রণের মতে, it was not the Perumal,it was his son,a King Kotha Varma (1102–1125),who may have embraced Islam...From the myriad myths,the one inference one can arrive at is that,one Perumal/Perumal's son, did embrace Islam, and the legend is a concoction of Buddhism and Islam.In the olden days,Hindus seldom differentiated between the two,calling Muslims,Boudhas.

“শেষ পেরুমাল কুলশেখর নয়, এটি ছিল তাঁর পুত্র, রাজা কোথা ভার্মা (১১০২-১১২৫), যিনি সম্ভবত ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন ... অজস্র জনশ্রুতি থেকে কেউ এই সিদ্ধান্তে আসতে পারে যে, পেরুমাল / পেরুমালের এক পুত্র ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এবং কিংবদন্তিটি হল বৌদ্ধধর্ম ও ইসলামের মিশ্রণ। প্রাচীনকালে হিন্দুরা খুব কমই দুই ধর্মের মধ্যে পার্থক্য করত, মুসলমানকে বৌদ্ধ বলে অভিহিত করত।”[xxv]

আমার মতে, এক জামুরিন রাজা কিংবা পেরুমাল রাজপুত্র কোথা ভার্মা ইসলাম গ্রহণ করেন, তবে জামুরিনের ইসলাম গ্রহণের প্রমাণ অপেক্ষাকৃত মজবুত। উল্লেখ্য, জামুরিন বা ভার্মার কেউ-ই চন্দ্র বিদারণ দেখে নি। কারন জামুরিনদের রাজত্বকাল 1124 সালের পরে। তাই রাসুলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম]-এর সাথে দেখা করার গল্পগুলোকে বাদ দিলে-ই প্রকৃত বর্ণনা পাওয়া যাবে। সম্ভবত, প্রকৃত ঘটনা তারীখে ফিরিশতায় বর্ণিত হয়েছে যে,

চন্দ্র দ্বিখন্ডিত হওয়ার এই দৃশ্য ভারতের মালাবারের জনৈক মহারাজা স্বচক্ষে দেখেন এবং তা নিজের রোজনামচায় লিপিবদ্ধ করেন। পরে আরব বণিকদের মুখে ঘটনা শুনে তখনকার রাজা ‘সামেরী’ উক্ত রোজনামচা বের করেন। অতঃপর তাতে ঘটনার সত্যতা দেখে তিনি মুসলমান হয়ে যান। যদিও সামরিক নেতা ও সমাজনেতাদের ভয়ে তিনি ইসলাম গোপন রাখেন।[xxvi]

“সামেরী” [জামুরিন] হল কালিকুটের [কোঝিকোডের] রাজাদের উপাধি। কালিকুট মালাবার উপকূলের নগরী।

অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন, ইতিহাসে এমন অনেক অতিপ্রাকৃত ঘটনা আছে। আমরা কি সবই বিশ্বাস করব? অবশ্যই না। তবে এই ঘটনাটি সঠিক হবার যথেষ্ট কারন হল, সহীহ সনদে চন্দ্রবিদারণের হাদিস বিদ্যমান থাকা। যদি হাদিস না থাকত, আমরা হয়তো এটাকে কাল্পনিক বলতাম।

মায়া সভ্যতা

মায়া আদিবাসীরা জ্যোতির্বিদ্যায় ব্যাপক উন্নতি লাভ করেছিল। এরিক উলফের মতে, ৭ম শতাব্দীর শেষ দিকে, মানে ৭০০ সালের আগে, হন্ডুরাসের কোপান শহরে মায়াদের জ্যোতির্বিদগণ দূর-দূরান্ত থেকে আগমন করেন। তারা গ্রেগরীয় দিনপঞ্জিকা থেকেও নিখুঁত দিনপঞ্জিকা তৈরি করে। উক্ত দিনপঞ্জিকা ছাড়াও মায়া সভ্যতার আরও গুরুত্বপূর্ণ জিনিসে পরিবর্তন করা হয়; আর তা মায়া রাজ্যের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।[xxvii] ড্রেসডেন কোডেক্স [৭ম শতাব্দীর একটি মায়া গ্রন্থের পুন:লিপি] ১ম পৃষ্ঠার ২য় কলাম থেকে অন্তত এতটুকু নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ৭ম শতাব্দীতে দিনপঞ্জিকায় কিছু পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু A Ten-Sun Day ও The Popol Vuh বইয়ের লেখিকা উরকুইডি মনে করেন, সময়টা ৯ ফেব্রুয়ারি [জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে, ৬ ফেব্রুয়ারি] ৬২৩ সালের দিকে। কারন কে৪৯৯৯ পাত্রের চিত্রাক্ষর [গ্লিফ] থেকে উনার এটাই মনে হয়েছে। এই পাত্রটির অবস্থা অদ্যাবধি আবিষ্কৃত পাত্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি খারাপ; তাই তিনি ধরে নিয়েছেন যে, কে৪৯৯৯ সবচেয়ে পুরাতন পাত্র। অবশ্য, পাত্রের আবিষ্কারক ‘জাস্টিন কের’ মনে করেন, কোন পাত্রের অবস্থা সবচেয়ে বেশি খারাপ হলেই তাকে সবচেয়ে পুরাতন বলা যায় না। তবে উরকুইডি-র অনুমান অমূলক নয়। তাছাড়া, কে৪৯৯৯ সবচেয়ে পুরাতন না হলেও, অন্তত এটা বলা যায় যে, কে৪৯৯৯ পাত্রের চিত্রাক্ষর অনুযায়ী পাত্রটি ৯ ফেব্রুয়ারি ৬২৩ সালের দিকে বানানো। কে৪৯৯৯ পাত্রকে এত গুরুত্ব দেয়ার কারন হল, এই পাত্রের ছবি অনুযায়ী, মায়াদের নতুন সময়-রক্ষক হিসেবে খরগোশকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তাহলে বলা যায় যে, মায়া সভ্যতার দিনপঞ্জিকায় পরিবর্তন আনা হয়েছে ৬২৩ সালের দিকে, ৭ম শতাব্দীর শেষ দিকে নয়। প্রশ্ন হল, মায়াগণ কেন তাদের দিনপঞ্জিকায় পরিবর্তন করল? তারা কি কোন অতিপ্রাকৃত ঘটনা অবলোকন করেছিল?

গবেষক উরকুইডি বলেন,

But, if one reads the Rabbit and the Mirror, one will see, that not only was the rabbit a new addition to the home of the moon goddess, but also the cosmic tree (probably the Milky Way) was new. Being held up to the mirror, the rabbit is shown where it was then (now) located, not how it was born. In agreement with that statement is vase K2772. It shows the same three women as in the so-called birth scene, but instead of a pregnant woman with two midwives, it shows that the palace of the moon is being shaken by a quake, indicated by the same "question mark" curls found in the ears of the split-faced moon rabbit and identified by Eric Thompson as a symbol of the Moon Goddess glyphs…

The rabbit replaced the monkey (possibly the old north star?) as the recorder of time and became a very important figure with the same split face of the moon, with the same question mark curl in each ear.[xxviii]

“তবে, যদি কেউ ‘খরগোশ এবং দর্পণ’ পড়ে থাকে, তবে দেখতে পাবে যে, খরগোশটি কেবল চাঁদের দেবীর বাড়িতে নতুন সংযোজন-ই ছিল না, মহাজাগতিক বৃক্ষটিও (সম্ভবত, মিল্কি ওয়ে-তে) ছিল নতুন। আয়না ধরে রেখে, খরগোশটি তখন (বর্তমানে) কোথায় ছিল তা দেখানো হয়েছে; এর জন্ম কিভাবে হয়েছে, তা বুঝানো হয় নি। এই বিবৃতির পক্ষে ফুলদানি K2772 পেশ করা যায়। এটাতে তথাকথিত জন্মের দৃশ্যের সেই তিনটি মহিলাকে দেখা যায়, তবে দুটি ধাত্রী সহ একজন গর্ভবতী মহিলার পরিবর্তে এখানে দেখা যাচ্ছে যে, চাঁদের প্রাসাদটি ভূমিকম্পে কাঁপছে, এর প্রমাণ হল- "প্রশ্ন চিহ্ন"-এর মত প্যাঁচগুলি বিভক্ত-মুখী চন্দ্র খরগোশের কানের মত এখানেও পাওয়া যায় এবং এটি এরিক থম্পসন কর্তৃক চন্দ্র দেবীর গ্লাইফের প্রতীক হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে…।

vase k1208
vase k1208; দ্বিখণ্ডিত মুখের চন্দ্র খরগোশ

চাঁদের বিভক্ত মুখ এবং কানে "প্রশ্ন চিহ্ন"-এর মত প্যাঁচ চিহ্নিত এই খরগোশ বানরকে সরিয়ে নিজে সময় নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে এবং গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে ওঠে।”

আমি বলব, ৬২৩ সালের কয়েক বছর আগে থেকেই দ্বিখণ্ডিত মুখের চন্দ্র খরগোশ সময় নিয়ন্ত্রক হয়েছিল, কারন মায়া সভ্যতা সম্ভবত চন্দ্র বিদারণ দেখেছিল। অথবা, তারা রাসূলুল্লাহ -এর হিজরতের দিন স্মরণীয় করতে তারা নতুন দিনপঞ্জিকা শুরু করেছে।

চাঁদ উত্সব

চীনের তাং রাজবংশ 618 সালের দিকে, বছরে ৫ দিন বৃদ্ধি করে চাঁদ ভিত্তিক নতুন দিনপঞ্জিকা শুরু করে। সে সময় ‘চাঁদ উৎসব’ ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই উৎসবে তারা ‘চাঁদ পিঠা’ নামের বিশেষ পিঠা খায়। কেউ কেউ বলতে পারেন, এটা আমাদের দেশের নবান্ন উৎসবের মত। প্রশ্ন হল, এর নাম চাঁদ উৎসব কেন? উৎসব পূর্ণিমা রাতেই হয় কেন, দিনের বেলা কি সমস্যা? 618 সালে-ই কেন? গবেষক উরকুইডি একই সন্দেহ পোষণ করেছেন।

ঘটনা যেভাবে হল

সময়: ৬১৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বরের পর থেকে ৩৫৫ দিনের ভেতর কোন এক পূর্ণিমার রাতে।

স্থান: মিনা।

উপস্থিত ছিল: উপরে দেখুন।

চন্দ্র বিদারণ কখন কিভাবে হয়েছে তা সীরাতুর রাসূল পড়ুন। আমার কাছে এটাই বিশুদ্ধ মনে হয়েছে। আরেকটু ভিন্ন বর্ণনা ‘সীরাহ মুহাম্মাদ ’-তে এসেছে। আমি এখানে তা উল্লেখ করে দিচ্ছি।

“কুরাইশের লোকেরা নিদর্শন দেখানোর জন্য রাসূলুল্লাহকে বারবার চাপাচাপি করছিল। কুরআন তাদের জন্য যথেষ্ট ছিল না, যদিও কুরআনের চেয়ে বড় অলৌকিক বিষয় আর কিছুই নেই। আল্লাহ তাআলা জিবরীলের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহর কাছে ওয়াহী পাঠালেন, “যদি তারা নিদর্শন দেখতে চায়, আমরা তাদের জন্য চাঁদকে দুইভাগ করে দেবা। রাসূলুল্লাহ কাফিরদের ডেকে বললেন, "চাঁদ দুই ভাগ হয়ে যাবে”, রাতের বেলা কাফিররা সবাই একত্রে জড়ো হলো | তারা সবাই তাদের চোখের সামনে দেখলো চাঁদ দুইভাগ হয়ে আবার জোড়া লেগে গেল”। [রেইন ড্রপস প্রকাশনী]

এই মুজিযার কারনেই মদীনার লোকদের নিকট হিযরত সহজ হয়েছিল।

শেষ কথা

আলহামদুলিল্লাহ, আমার মনে হয় আলোচনা আর বৃদ্ধির দরকার নেই। সত্যান্বেষীদের জন্য এটা মেনে নেয়া যৌক্তিক যে, মুজিযা বিজ্ঞান দ্বারা ব্যাখ্যা করা বোকামি; আর ইতিহাস দিয়ে মহাকাশীয় ঘটনা প্রমাণ করা দুরূহ। তবুও আমরা ৩ টি দলিল দেয়ার চেষ্টা করেছি, সহীহ হাদিসের মত নিশ্চয়তা দিতে না পারলেও, ইতিহাসের দৃষ্টিতে তা গ্রহণীয় হবার-ই কথা।

আল্লাহ অধিক জানেন।



[i] ই.ফা.বা., সীরাত বিশ্বকোষ, ৯ম খণ্ড, পৃ. ২৬০।

[ii] হাকিম, মুস্তাদরাক, খ. ২, পৃ. 472; আবু'ল-ফিদা, খ. ৩, পৃ. 118।

[iii] আবু নুয়াইম, দালাইলু’নুবুওয়া, খ. ১, পৃ. 280; আবু'ল-ফিদা, আল-বিদায়া ও'আন-নিহায়া, খ. ৩, পৃ. 119; সুয়ুতি, দুরুল আল মনসুর, খ. 6, পৃ 133; কাস্তালানী, মাওয়াহিবু'ল-লাদুন্নিয়া, খ. ১, পৃ 467; দিয়ারবেক্রি, হামিস, খ. ১, পৃ. 299; যুরকানী, শারহ মাওয়াহিবু'ল-লাদুন্নিয়া, খ. ৫, পৃষ্ঠা ১১০।

[iv] তাবারি, তাফসির, খ. 27, পৃ. 85; আবু'ল-ফিদা, আল-বিদায়া ও'আন-নিহায়া, খ. ৩, পৃ 120; সুয়ুতি, দুরুল আল মনসুর, খ. 6, পৃ. 133।

[v] Zuber, M. T. et al. "Gravity Field Of The Moon From The Gravity Recovery And Interior Laboratory (GRAIL) Mission". Science, vol 339, no. 6120, 2012, pp. 668-671. American Association For The Advancement Of Science (AAAS), doi:10.1126/science.1231507. Accessed 1 Jan 2019.

Wieczorek, M. A. et al. "The Crust Of The Moon As Seen By GRAIL". Science, vol 339, no. 6120, 2012, pp. 671-675. American Association For The Advancement Of Science (AAAS), doi:10.1126/science.1231530. Accessed 1 Jan 2019.

[vi] Nyambuya, Golden Gadzirayi. “On the Expanding Earth and Shrinking Moon.” (2012).

[vii] Sigismondi,Costantino&Imponente,Giovanni:The observation of lunar impacts’,WGN, Journal of the International Meteor Organization 28/23 (2000), pp. 547.

[viii] Guessoum, Nidhal. Islam's Quantum Question. I.B.Tauris And Co Ltd, pp. 12-13.

[ix] Spaceflightnow.com. 2020. Spaceflight Now | Cassini | Encountering Iapetus. [online] Available at: <https://www.spaceflightnow.com/cassini/050109iapetus.html> [Accessed 22 October 2020].

[x] আবু'ল-ফিদা, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ই.ফা.বা., ৩য় খণ্ড, জুন ২০০৩, পৃ. ২৩১।

[xi] মাওলানা মুহাম্মদ তৈয়্যব, উর্দু অনুবাদক, দালায়েলুন নবুয়ত, দালায়েলুন নবুয়তের প্রান্তত টীকা, পৃ. ২৪৫।

[xii] আল্লামা ইদরীস কান্ধলবী, সীরাতুল মুস্তফা (সা.), ই.ফা.বা., ১ম খণ্ড, জুন ২০১০, পৃ. ২০৮।

[xiii] বদিউজ্জামান সাইদ নুরসি, রিসালে-ই নূর সংগ্রহ, "পত্রগুলি: ঊনবিংশ পত্র, সপ্তদশ নিদর্শন," www.risale-inur.com.tr/rnk/eng/letters/19letter.html

[xiv] The Mysterious Case of Crater Giordano Bruno | Science Mission Directorate. (2020). Retrieved 7 July 2020, from https://science.nasa.gov/science-news/science-at-nasa/2001/ast26apr_1 

[xv] মালেক, . (2018). বাবা রতন : একটি প্রশ্ন তার উত্তর. Retrieved 7 December 2020, from https://www.alkawsar.com/bn/article/2286/

[xvi] Pundit Dharm Ved Apadhye, Antim Ishwar Doot, page 97. As cited in: Dr. Kamala Kant Tewari, Kalyuge Ke Antim Rishi, Page 5. Also, Schimmel, A. (1980). Islam in the Indian subcontinent (p. 3). Leiden [etc.]: Brill.

[xvii] هل هناك أحد من الصحابة من بلاد الهند أو بلاد الصين ؟ - الإسلام سؤال وجواب. (2020). Retrieved 12 September 2020, from https://tinyurl.com/y2f9xs4e

[xviii] আবু'ল-ফিদা, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ই.ফা.বা., ৩য় খণ্ড, জুন ২০০৩, পৃ. ২৩০।

[xix] O. Loth, Arabic Manuscripts in the Library of the India Office (London: Secretary of State of India, 1877), no. 1044.

also, Y. Friedmann, "Qissat Shakarwati Farmad: A Tradition Concerning the Introduction of Islam to Malabar", Israel Oriental Studies 5 (1975), 239-241.

[xx] O. Loth, Arabic Manuscripts in the Library of the India Office (London: Secretary of State of India, 1877), no. 1044.

also, Y. Friedmann, "Qissat Shakarwati Farmad: A Tradition Concerning the Introduction of Islam to Malabar", Israel Oriental Studies 5 (1975), 239-241.

[xxi] H. H. Wilson, Mackenzie Collection. A descriptive catalogue of the Oriental manuscripts and other articles illustrative of the literature, history, statistics and antiquities of the south of India (Calcutta, 1828), II, appendix, p. XCV.

[xxii] History of Travancore by Shungunny Menon, page 28

[xxiii] M.G.S. Narayanan, Perumals of Kerala, p. 65

[xxiv] Aiya, V., 1983. The Travancore State Manual. Zug, Switzerland: International Documentation Centre, p.350.

[xxv] Ramachandran, 2020. THE MYSTERY OF CHERAMAN PERUMAL AND MAHABALI. [online] Hamletram.blogspot.com. Available at: <http://hamletram.blogspot.com/2014/12/the-mystery-of-cheraman-perumal-and.html> [Accessed 8 September 2020].

[xxvi] মুহাম্মাদ ক্বাসেম হিন্দুশাহ ফিরিশতা, তারীখে ফিরিশতা (ফার্সী হ’তে উর্দূ অনুবাদ : লাক্ষ্ণৌ ছাপা, ১৩২৩/১৯০৫) ১১শ অধ্যায় ‘মালাবারের শাসকদের ইতিহাস’ ২/৪৮৮-৮৯ পৃঃ।

[xxvii] Wolf, E., 1962. Sons Of The Shaking Earth. 3rd ed. Chicago, Ill: Univ. of Chicago Press, p.100.

[xxviii] Urquidi, D., 2010. Persia. [online] mayalords.org. Available at: <https://bit.ly/39aKZqa> [Accessed 18 November 2020].

 

Share this: