পর্ব ১//: "ইব্রাহিম আঃ কাকে কোরবানির উদ্দেশ্যে নিয়ে গিয়েছিলেন? ইসমাইল আঃ নাকি ইসহাক আঃ?

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম 

১ম অংশ 

বিষয়: কোরবানি সম্পর্কে বিভ্রান্তির অপনোদন।

আলোচনা: "ইব্রাহিম আঃ কাকে কোরবানির উদ্দেশ্যে নিয়ে গিয়েছিলেন? ইসমাইল আঃ নাকি ইসহাক আঃ? 

কৃতজ্ঞতান্তে: প্রিয় Muhammad Mushfiqur Rahman Minar ভাই

লেখক: Boniamin Khan 

\__________________________________/

আসসালামু আলাইকুম ওয়ারহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতাহু প্রিয় ভাই ও বোনেরা। আশা করি অবশ্যই সবাই মহান আল্লাহ্ সুবহানু ওয়াতা আলার অসীম রহমত ও দয়ায় ভালো এবং সুস্থ আছেন। সকল প্রশংসা এই বিশ্বজগতের সর্বোত্তম রব মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ সুবহানু ওয়াতা'আলার জন্য, যিনি বিচার দিনের মালিক। অসংখ্য কোটি দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক মহান আল্লাহর রাসূল হযরত মুহাম্মদ (ﷺ) এর উপর, তাঁর পরিবারবর্গ, তাঁর সাহাবাগণের প্রতি এবং কিয়ামত পর্যন্ত আগত তাঁর অনুসারী সকল মুসলিম ভাই ও বোনদের প্রতি। আর ভুমিকা না টেনে মূল আলোচনায় আসা যাক ইনশাআল্লাহু তাআ'লা। 

 

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (ﷺ) ১৪০০+ বছর পূর্বেই বলে গেছেন,"এমন এক সময় আসবে যখন সকাল বেলা যে ব্যক্তি মুমিন থাকবে, সে সন্ধ্যাবেলা কাফের হয়ে যাবে এবং সন্ধ্যাবেলা যে ব্যক্তি মুমিন থাকবে সে সকাল বেলা কাফের হয়ে যাবে।"

 

অনলাইন সোর্স থেকে পড়ুন:

http://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=44926

 

এরকম কথা অন্যান্য হাদিস গ্রন্থেও বলা হয়েছে। ঠিক যেন বর্তমান মানুষের ক্ষেত্রে এরকমই ঘটে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। তারা অর্থাৎ সাধারণ এবং দুর্বলপ্রাণ মুসলিমগণ ইসলামের শত্রুদের বিভিন্ন অভিযোগ এবং প্রকৃত ইসলাম সম্পর্কে না জানার কারণে অজ্ঞতার শিকার হয়ে সহজেই ঈমান হারা হয়ে যাচ্ছে, যা খুবই দুঃখজনক। কখনো কখনো এ সকল সাধারণ এবং দুর্বলপ্রাণ মুসলিমগণ সে সকল অভিযোগের সত্যতা নিজেরা যাচাই বাছাই ই করে না বা জানার চেষ্টা করে না।

 

আজ প্রতিনিয়ত সাধারণ মুসলিমদের বিভ্রান্ত করার জন্য, তাদের ঈমান আকিদায় চির ধরানোর জন্য ইসলামের শত্রুরা উঠে পড়ে লেগেছে,,,যেভাবেই হোক, মুসলিমদের মধ্যে ভুল তথ্যগুলো প্রবেশ করিয়ে ইসলাম সম্পর্কে সংশয়ের সৃষ্টি করতেই হবে এবং তাদেরকে ইমান হারা করতে হবে। তারা নানা দিক থেকে এসকল মুসলিমদের বিভিন্ন রকম মারাত্মক প্রশ্ন করে বসে, যার অধিকাংশই তার অজানা। আর এর মধ্যে অন্যতম প্রশ্ন হলো যা বর্তমানে ত্রিত্ববাদী খ্রিস্টানরা করে থাকে কোরবানির ঈদ এলে আর তা হলো,"পবিত্র কোরআন এবং সহীহ হাদিসের মাধ্যমে কোন ভাবেই প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে আসলেই ইব্রাহিম আঃ কোরবানি করার জন্য ইসমাইল আঃ কে নিয়ে গিয়েছিলেন। কেননা এ সম্পর্কে কোরআনে সুস্পষ্ট কোন কথাই উল্লেখ নেই অর্থাৎ ইসমাইল আঃ এর নাম উল্লেখ নেই। যখন কোরআনেই উল্লেখ নেই, তখন কিভাবে বিশ্বাস করব যে প্রকৃতপক্ষে ইসমাইল আঃ কে কোরবানি করতে নিয়েছিলেন।?"

 

আসলে ত্রিত্ববাদী খ্রিস্টান মিশনারিরা বাইবেল এবং পবিত্র কোরআনের মাধ্যমে প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে, ইসমাইল নয় বরং ইসহাক আঃ কেই কোরবানি করতে নিয়ে গিয়েছিলেন ইব্রাহিম আঃ। তারা বাইবেলের তথ্যকে পবিত্র কোরআনের উপরে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে বাইবেল কে সঠিক এবং পবিত্র কোরআনকে ভুল প্রমাণ করার বৃথা চেষ্টা করে। আসলে এসব খ্রিস্টান মিশনারিদের উদ্দেশ্য হলো তারা তাদের প্রচলিত বিশ্বাস কে পবিত্র কোরআনের মাধ্যমে প্রমাণ করতে চেষ্টা করে এবং সাধারণ মুসলিমদের খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত করাতে চায়। তারা প্রমাণ করতে চায় যে, বাইবেল এবং পবিত্র কোরআন আসলেই ইসহাক আঃ কেই কোরবানি করার কথা বলেছে। কিন্তু বর্তমান মুসলিমগণ ভুলভাল বিশ্বাস করে কোরআনের বাইরে চলে গিয়েছে। তাহলে আসুন এটা কতটুকু সত্য বা মিথ্যা তা নিরপেক্ষ ভাবে প্রমাণ করব ইনশাআললাহ। 

 

প্রথমত ইসলামি আকিদা হচ্ছে--হযরত ইব্রাহিম আঃ এর বড় ছেলে ইসমাইল আঃ কেই কোরবানির জন্য নির্বাচিত করা হয়েছিল অর্থাৎ তিনি হচ্ছেন "জবিহুল্লাহ"। পবিত্র কোরআন দ্বারা এটাই প্রমাণিত এবং এ সম্পর্কে মুসলিম উম্মাহর ইজমা রয়েছে। 

 

অপরদিকে বাইবেল বলে যে, ইব্রাহিম আঃ আসলে ইসমাইল আঃ নয় বরং ইসহাক আঃ কে কোরবানি করতে নিয়ে গিয়েছিলেন। কেননা বাইবেলের মধ্যে কোরবানির ঘটনায় ইসহাক আঃ এর নামটা সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে। আর এটা আছে বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টের আদিপুস্তকের বর্ণনাতে। প্রসঙ্গত কথা হলো বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্ট দুই ধর্মের অর্থাৎ ইহুদি এবং খ্রিস্টানদের পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ। তাহলে ইহুদি এবং খ্রিস্টানদের বিশ্বাস অনুযায়ী ইব্রাহিম আঃ, ইসহাক আঃ কে কোরবানি করতে নিয়ে গিয়েছিলেন। 

 

এখন আমরা নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে পবিত্র কোরআন-হাদিস এবং বাইবেল থেকেই প্রমাণ করে দেখাব যে, ইহুদি খ্রিস্টানদের প্রচলিত বিশ্বাস ভুল অর্থাৎ ইব্রাহিম আঃ কোরবানি করার জন্য ইসহাক আঃ নয় বরং ইসমাইল আঃ কে নিয়ে গিয়েছিলেন।

 

পবিত্র কোরআনের ৩৭ নং সূরা আস সাফফাতে সুস্পষ্ট ভাবে ইঙ্গিতে বলা হয়েছে যে, ইব্রাহিম আঃ এর বড় পুত্র ইসমাইল আঃ কে কোরবানি করার জন্য নির্বাচিত করা হয়েছিল। নিচের প্রতিটি আয়াত মনোযোগ সহকারে লক্ষ্য করুন ইনশাআললাহ। আমি এইখানে মাওলানা মুজিবুর রহমানের অনুবাদ উদ্ধৃতি করছি। 

 

37:100

হে আমার রব্ব! আমাকে এক সৎকর্মপরায়ণ সন্তান দান করুন।

37:101

অতঃপর আমি তাকে এক স্থির বুদ্ধিসম্পন্ন (অতি ধৈর্য্যশীল) পুত্রের সুসংবাদ দিলাম

37:102

অতঃপর সে যখন তার পিতার সাথে কাজ করার মত বয়সে উপনীত হল তখন ইবরাহীম বললঃ বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে আমি যবেহ করছি, এখন তোমার অভিমত কি, বল। সে বললঃ হে আমার পিতা! আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তাই করুন। আল্লাহ ইচ্ছা করলে আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।

37:103

যখন তারা উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইবরাহীম তার পুত্রকে কাত করে শায়িত করল –

37:104

তখন আমি তাকে আহবান করে বললামঃ হে ইবরাহীম – 

37:105

তুমিতো স্বপ্নাদেশ সত্যিই পালন করলে। এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি।

37:106

নিশ্চয়ই এটা ছিল এক স্পষ্ট পরীক্ষা।

37:107

আমি তাকে মুক্ত করলাম এক মহান কুরবানীর বিনিময়ে। 

37:108

আমি এটা পরবর্তীদের স্মরণে রেখেছি।

37:109

ইবরাহীমের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। 

37:110

এভাবে আমি সৎ কর্মশীলদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি।

37:111

সে ছিল আমার মু’মিন বান্দাদের অন্যতম।

 

তাহলে আমরা উপরোল্লিখিত আয়াত তথা ১০০-১১১ এর মধ্য হতে কোন আয়াতেই ইসমাইল অথবা ইসহাক আঃ এর নামটা সরাসরি উল্লেখ পাইনি অর্থাৎ সুস্পষ্ট ভাবে জানতে পারলাম না যে, আসলে এইখানে কাকে কোরবানি করার জন্য ইব্রাহিম আঃ আদিষ্ট হয়েছিলেন? ইসমাইল আঃ নাকি ইসহাক আঃ? তাহলে আসুন এরপরের আয়াত পড়লেই আমরা সুস্পষ্ট ভাবে জেনে যাব যে, আসলে উপরোল্লিখিত আয়াতে কার দ্বারা কোরবানি সম্পন্ন হয়েছে? এরপরের আয়াতে বলা হয়েছে-

 

37:112

আমি তাকে সুসংবাদ দিয়েছিলাম ইসহাকের [ইব্রাহিম আঃ এর দ্বিতীয় সন্তান], সে ছিল এক নবী, সৎকর্মশীলদের অন্যতম। 

 

উক্ত আয়াতগুলোসহ তাফসীর পড়তে চাইলে পবিত্র কোরআনের ৩৭ নং সূরা আস সাফফাত পড়ুন: https://hadithbd.com/quran/tafsir/?sura=37

 

প্রসঙ্গত যে এই সূরার ৯৯-১১২ নং আয়াতগুলো তে মহান আল্লাহ তা'আলা ইব্রাহিম আঃ এর হিযরত এবং তাঁর প্রিয় সন্তান কে কোরবানি করার ঘটনা ব্যক্ত করেছেন। ইব্রাহিম আঃ যখন দেখলেন যে, তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা সত্য গ্রহণ করছে না বিধায় তিনি সেখান থেকে হিযরত করলেন। তখন হযরত ইব্রাহিম আঃ এর বয়স ৮৬ বছর এবং তাঁর স্ত্রীর বয়স ৭৬ বছর। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া-ইবনে কাসীর ১/১৭৯)। বৈবাহিক জীবনে তখনো তাঁদের কোন সন্তান হয়নি। তাই নিঃসন্তান ইব্রাহিম আঃ যখন মহান আল্লাহর দরবারে দোআ করলেন:-"رَبِّ هَبۡ لِیۡ مِنَ الصّٰلِحِیۡنَ/হে আমার রব্ব! আমাকে এক সৎকর্মপরায়ণ সন্তান দান করুন।" [পবিত্র কোরআন  ৩৭:১০০]। আর মহান আল্লাহ্ সুবহানু ওয়াতা 'আলা  এরুপ পরিস্থিতিতে তাঁর বন্ধু ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ আঃ এর দোআ কবুল করলেন এবং তাঁকে একজন ধৈর্য্যশীল সন্তান দান করলেন যা আমরা ১০১ নং আয়াতে দেখতে পাই।

 

আর এই "ধৈর্য্যশীল সন্তান"  ছিলেন হযরত ইসমাইল আঃ, যাকে (حَلِيْمٌ) হালিম বলা হয়েছে। কেননা পুরো কোরবানির ঘটনার বর্ণনা শেষ হবার পরে সর্বোত্তম রব মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ সুবহানু ওয়াতা'আলা ইব্রাহিম আঃ কে তাঁর দ্বিতীয় পুত্র "ইসহাক আঃ" এর জন্মের সুসংবাদ দেন। অর্থাৎ কোরবানির সময়ে ইসহাক আঃ এর জন্মই হয়নি। যখন তাঁর জন্ম ই হয়নি তখন তাঁকে কোরবানি করার কোন প্রশ্নই উঠে না। 

 

[নোট: "ইসমাইল আঃ ছিলেন ধৈর্য্যশীল" (পবিত্র কোরআন ২১:৮৫)]

 

উক্ত আয়াতগুলোর বর্ণনা পরম্পরায়ও সুস্পষ্ট ভাবে বোঝা যায় যে, প্রথম সুসংবাদ প্রাপ্ত সন্তানটি ছিলেন ইসমাইল আঃ, যাঁকে কোরবানি করার নির্দেশ প্রদান করা হয়। কারণ ইব্রাহিম আঃ ৮৫ বছর পর্যন্ত নিঃসন্তান ছিলেন। আর তিনি সবসময়ই মহান আল্লাহর কাছে একটি পুত্র সন্তানের জন্য দোআ করতেন। অর্থাৎ তিনি এতটা দীর্ঘ সময় ধরে ধৈর্য্য ধারণ করেছিলেন একটা পুত্র সন্তানের আশায়। আর মহান আল্লাহ্ও তাঁর ৮৬ বছরের দীর্ঘ জীবনে একটি সন্তান দান করলেন, যে ছিলেন ইব্রাহিম আঃ এর ধৈর্য্যের ফল অর্থাৎ ইব্রাহিম আঃ এত বছর ধৈর্য্য ধারণ করার পরে একটি পুত্র সন্তানের মুখ দেখেছেন। আর এই প্রথম সন্তান ই ছিলেন আরব জাতির পিতা হযরত ইসমাইল আঃ। 

 

এছাড়া আল্লাহ্ তা'আলা কখন কোরবানি করার আদেশ দিয়েছিলেন?তখন ইব্রাহিম আঃ এর পুত্র সন্তান ছিলেন কতজন? নিশ্চয়ই কোরবানি সংঘটিত হবার সময়ে তাঁর মাত্র একজন পুত্র সন্তান ছিলেন। যদি একজন পুত্র থাকে তাহলে ইব্রাহিম আঃ কাকে কোরবানি করার জন্য নিয়ে যেতে পারেন? নিশ্চয়ই ইসমাইল আঃ কে নিয়ে গিয়েছিলেন। কেননা তখন ইসমাইল আঃ ই ছিলেন ইব্রাহিম আঃ এর একমাত্র তথা অদ্বিতীয় সন্তান। কারণ মহান আল্লাহ্ ইব্রাহিম আঃ কে মাত্র একটা সন্তান দান তো করেছেন-ই ; সেই সাথে আবার ঐ সন্তানকেই কোরবানি করারও আদেশ দেন ইব্রাহিম আঃ কে। 

 

একবার চিন্তা করুন তো, একজন নিঃসন্তান পিতা, যিনি কিনা একটা সন্তানের আশায় ৮৫ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ধৈর্য্য ধারণ করেছেন, অবশেষে আপনি ৮৬ বছর পরে একটা সন্তান লাভ করলেন। তখন আপনার কাছে কেমন অনুভূতি হবে? নিশ্চয়ই আপনি এই সন্তান কে অসীম আদর যত্ন ভালবাসা দিবেন। কিন্তু আবার যখন শুনলেন আপনার এই প্রিয় আদুরে একমাত্র সন্তান কে কোরবানি করতে হবে, তখন আপনার অবস্থা কেমন হতে পারে? আপনি কেমন জ্বালাময়ী কষ্ট অনুভব করবেন? নিশ্চয়ই বুকে অসীম যন্ত্রণা অনুভব করবেন, যা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। আর ঠিক এমনটাই হয়েছিল আবুল আম্বিয়া ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ আঃ এর সাথে। 

 

[নোট: হযরত ইব্রাহিম আঃ এর প্রথম সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিলেন তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হযরত হাজেরা আঃ এর গর্ভে। বিশ্ব মুসলিমের ঐক্যমতে তিনি হযরত ইসহাক আঃ এর বড় ভাই ছিলেন এবং ইব্রাহিম আঃ এর প্রথম স্ত্রী হযরত সারা আঃ এর সন্তান। এ কথা আহলে কিতাব তথা ইহুদি-খ্রিস্টানরাও বিশ্বাস করে। এমনকি তাদের কিতাবেও লেখা আছে যে, ইসমাইল আঃ এর জন্মের সময় ইব্রাহিম আঃ এর বয়স ছিল ৮৬ বছর। অপরদিকে যখন দ্বিতীয় পুত্র হযরত ইসহাক আঃ এর জন্ম হয়, তখন ইব্রাহিম আঃ এর বয়স নিরানব্বই বছরে পৌঁছে ছিল।-- বিস্তারিত পড়ুন: তাফসীরে ইবনে কাসীর]

 

আবার পবিত্র কোরআনের অন্যত্র আয়াতগুলো ভালো করে লক্ষ্য করুন ইনশাআল্লাহু তাআ'লা। কোরআনের ১১ নং সূরা হুদে মহান আল্লাহ্ তাআলা এরশাদ করছেন:-

 

11:69

আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ ইবরাহীমের কাছে সুসংবাদ নিয়ে এসেছিল। তারা এসে বলল ‘‘তোমার প্রতি সালাম! সেও বলল, ‘তোমাদের প্রতিও সালাম!’ অনতিবিলম্বে সে ভুনা করা বাছুর নিয়ে আসলো। --অনুবাদক: তাইসিরুল  

তাফসীর: https://www.hadithbd.com/quran/link/?id=1542

 

11:70

যখন সে দেখল তাদের হাত তার (অর্থাৎ খাবারের) দিকে পৌঁছতেছে না, সে তাদের সম্পর্কে সন্দিগ্ধ হল আর তাদের ব্যাপারে ভীতি অনুভব করল। তারা বলল, ‘ভয় পেয়ো না, আমাদেরকে পাঠানো হয়েছে লূতের সম্প্রদায়ের প্রতি।'-- অনুবাদক: তাইসিরুল

তাফসীর: https://www.hadithbd.com/quran/link/?id=1543

11:71

আর তার স্ত্রী দাঁড়ানো ছিল, সে হেসে উঠল। অতঃপর আমি তাকে সুসংবাদ দিলাম ইসহাকের ও ইসহাকের পরে ইয়া‘কূবের। অনুবাদক: আল-বায়ান

তাফসীর: https://www.hadithbd.com/quran/link/?id=1544

 

(এই আয়াতগুলো আরো ভালো ভাবে জানা ও বোঝার জন্য তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ এবং তাফসীরে ইবনে কাসীর পড়তে পারেন ইনশাআল্লাহু তা'আলা)

 

তাহলে উপরোল্লিখিত আয়াতগুলোর পূর্বেও আমরা দেখেছি তখন ইব্রাহিম আঃ এর একটি পুত্র সন্তান ছিলেন ইসমাইল আঃ। আর এখন আমরা সূরা হুদের এই আয়াতগুলোতে সরাসরি নাম উল্লেখ করা দেখতে পাই যে, ফেরেশতাগণ একই সাথে ইব্রাহিম আঃ কে তাঁর দ্বিতীয় পুত্র "ইসহাক আঃ " এবং নাতী "ইয়াকুব আঃ" এর জন্মের সুসংবাদ দেন। 

 

এখন কথা হলো, যদি ইসহাক আঃ "জবিহুল্লাহ" হয়ে থাকেন তাহলে ইয়াকুব আঃ এর জন্মের সংবাদ কিভাবে দেওয়া হবে? যেহেতু তিনি তো কোরবানি হয়েই যাবেন। তাহলে তো ইব্রাহিম আঃ কে কোন পরীক্ষা করা হলো না। কেননা পরীক্ষার ফলাফল আগে থেকেই জানা অর্থাৎ ইসহাক আঃ বেঁচে যাবেন; এবং সেই সাথে তাঁর ছেলে ইয়াকুব আঃ একজন নবী হবেন (পবিত্র কোরআন ১৪:৪৯)। এছাড়া যদি ইসহাক আঃ কেই কোরবানি দেওয়ার আদেশ পেতেন তাহলে ইব্রাহিম আঃ কখনোই তাঁর নাতী ইয়াকুব আঃ এর জন্মের শুভ সংবাদ পেতেন না। 

 

তাহলে আমরা মুসলিমগণ মহিমান্বিত ঐশীগ্রন্থ পবিত্র আল কোরআন মাজীদের আলোকে তথ্য প্রমাণ ও যৌক্তিকতার ভিত্তিতে নিঃসন্দিগ্ধ ভাবে বিশ্বাস করি যে, ইব্রাহিম আঃ ইসহাক নয় বরং ইসমাইল আঃ কেই কোরবানি করার জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন অর্থাৎ ইসমাইল আঃ হলেন "জবিহুল্লাহ"।

 

এছাড়া আবুল আম্বিয়া ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ আঃ, মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে দোআ করেন যা পবিত্র কোরআনের ১৪ নং সূরা ইব্রাহিমের মধ্যে বর্ণিত হয়েছে। 

 

14:39

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই প্রাপ্য যিনি আমাকে আমার বার্ধক্যে ইসমাঈল ও ইসহাককে দান করেছেন; আমার রব্ব অবশ্যই প্রার্থনা শুনে থাকেন। -- অনুবাদক: মুজিবুর রহমান

 

তাফসীর: https://www.hadithbd.com/quran/link/?id=1789

 

এই আয়াতে, ইসমাইলের পরে ইসহাক আঃ এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাছাড়া পবিত্র কোরআনের ২ নং সূরা আল বাকারার ১৩৩,১৩৬,১৪০; ৩ নং সূরা আল ইমরানের ৮৪; ৪ নং সূরা আন নিসার ১৬৩ নং আয়াতগুলোতে সর্বত্রই ইসমাইল আঃ এর পরে ইসহাক আঃ এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। 

 

এখন ইসলাম বিদ্বেষী অমুসলিম নাস্তিক খ্রিস্টান মিশনারিরা এই বলে জল ঘোলা করে বলে:-"কোরআনে কেন সরাসরি নাম উল্লেখ করা হয়নি? যদি সরাসরি নাম উল্লেখ থাকত তাহলে তো এতো সমস্যা হতো না।"

 

প্রথমত এসব সমস্যা আমাদের মুসলিমদের নেই। দ্বিতীয়ত পবিত্র কোরআন কারো ইচ্ছা মতো করে নাযিল হয়নি। তৃতীয়ত আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি যে কোরআনে সরাসরি নাম উল্লেখ করা না থাকলেও কোরআনে এটা সুস্পষ্ট যে, ইব্রাহিম আঃ এর প্রথম সন্তান ইসমাইল আঃ ই জবিহুল্লাহ। এছাড়া কোরবানির এই পুরো ঘটনা কেবলমাত্র সূরা আস-সাফফাতের মধ্যেই উল্লেখ করে জবিহুল্লাহর নাম উহ্য রাখা হয়েছে। কোরবানির ঘটনার বর্ণনা শেষ করার পরে ইব্রাহিম আঃ এর দ্বিতীয় পুত্র ইসহাক আঃ এর সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে। এরপর মুসা আঃ এবং হারুন আঃ এর জীবন বৃত্তান্ত। একজন নবীর পর আরেকজন নবীর বর্ণনা। এ দ্বারা সুস্পষ্ট ভাবেই বোঝা যায় যে, কোরবানির উদ্দেশ্যে ইসহাক আঃ কে নেওয়া হয়নি বরং ইসমাইল আঃ কেই নেওয়া হয়েছিল, যিনি ছিলেন ইব্রাহিম আঃ এর প্রথম সন্তান। মুসলিম, ইহুদি ও খ্রিস্টানরা একমত যে ইব্রাহিম আঃ এর প্রথম সন্তান ছিলেন হযরত ইসমাইল আঃ। পবিত্র কোরআন অনেক সময়ই মহিমান্বিত ব্যক্তির নাম উহ্য রেখে বিশেষণ দিয়ে ঐ ব্যক্তিকে প্রকাশ করা হয়েছে। এটাই পবিত্র কোরআনের ভাষা শৈলীর সৌন্দর্য এবং বর্ণনা ভঙ্গি। 

 

ইসমাইল আঃ ছাড়াও ইউনুস আঃ এর নাম উহ্য রেখে বিশেষণ দিয়ে এক স্থানে তাঁকে "ذَاالنُّوۡنِ/যান নুন" তথা মাছওয়ালা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অনলাইন সোর্স থেকে পড়ুন: 

https://hadithbd.com/quran/link/?id=2570

 

আরো পড়ুন : 

ইসমাইল আঃ কী দাসীর পুত্র ছিলেন অথবা কম মর্যাদাবান ছিলেন?

http://response-to-anti-islam.com/show/%E0%A6%87%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%88%E0%A6%B2(%E0%A6%86.)-%E0%A6%95%E0%A6%BF-'%E0%A6%A6%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A7%80%E0%A6%B0-%E0%A6%AA%E0%A7%81%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%B0'-%E0%A6%9B%E0%A6%BF%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%A8-%E0%A6%AC%E0%A6%BE-%E0%A6%95%E0%A6%AE-%E0%A6%AE%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A8-%E0%A6%9B%E0%A6%BF%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%A8--/181

 

বিঃদ্রঃ 

i) সম্পূর্ণ পবিত্র কোরআনের অর্থ, বাংলা, ইংরেজি, আরবি সহ বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ, তাফসীর লিংক (আবু বকর যাকারিয়া হাফিঃ) পড়ুন। 

Published by: King Fahd Complex, Madina, Saudi Arabia 

https://quranenc.com/en/browse/bengali_zakaria/48/1

 

ii) বাংলাদেশ হাদিস অ্যাকাডেমির "কোরআনের তাফসীর লিংক)

https://hadithbd.com/quran/

 

iii) পবিত্র কোরআনের আরবি, বাংলা, ইংরেজি অনুবাদ সহ চারটি তাফসীর (ব্যাখ্যা) [আহসানুল বয়ান, আবু বকর যাকারিয়া, ফাতহুল মাজীদ এবং তাফসীরে ইবনে কাসীর] পড়তে লিঙ্কে ক্লিক করে ডাউনলোড করুন ইনশাআললাহ। 

https://play.google.com/store/apps/details?id=bd.jetbrain.nazim.al_quran

 

iv) খতমে নবুয়তের ৪০ দলিল

https://drive.google.com/file/d/1FKBo0irDUIsCYjjxkw97Rs1WrBoEgpc_/view

 

v) যীশু কতৃক বিঘোষিত সাহায্যকারী মুহাম্মদ সাঃ এর সম্পর্কে 

https://www.facebook.com/104106391067326/posts/320898009388162/

 

vi) কিতাবুল মুকাদ্দাস, ইঞ্জিল শরীফ ও ঈসায়ী ধর্ম 

https://hadithbd.com/books/section/?book=135

 

খ্রিস্টান এবং ইসলাম সম্পর্কে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের বই সত্যের প্রকাশ (ইযহারুল হক) পড়তে ক্লিক করুন:

vii) https://i-onlinemedia.net/10983

Share this: