পৃথিবীর সব অপরাধ কি আল্লাহর হুকুমেই হয় ? 

 হুকুম শব্দের অর্থ হলো নির্দেশ। আল্লাহﷻ‎  কখনোই অপরাধ বা খারাপ কাজের নির্দেশ দেন না অথচ । আল্লাহﷻ‎ বলেন,

“... আল্লাহ মন্দ কাজের আদেশ দেন না। তোমরা এমন কথা আল্লাহর প্রতি কেন আরোপ কর, যা তোমরা জানো না? ” [১]

 

আল্লাহﷻ‎ হলেন সমস্ত কিছুর সৃষ্টিকর্তা। পাপ কিংবা পূণ্য – মানুষের সকল কর্মও আল্লাহর সৃষ্টি। পৃথিবীতে যা ঘটে এবং মানুষ যা করে – এগুলোর সবগুলোই আল্লাহর অনুমতিক্রমে বা ইচ্ছায় হয়।  আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছা দুই ধরনের হতে পারে।

যথা:

১। কাউনিয়্যাহ ২। শারইয়্যাহ 

 

💠কাউনিয়্যাহ:

এ ধরণের ইচ্ছা দ্বারা আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছাকৃত জিনিসটি সম্পন্ন হয়। তবে জিনিসটি আল্লাহ তা’আলার কাছে পছন্দনীয় হওয়া জরুরী নয়। আর এটা দ্বারাই ‘মাশিয়াত’ বা ইচ্ছা বোঝানো হয়।

যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন,

“...আর আল্লাহ যদি ইচ্ছা করতেন, তাহলে তারা পরস্পর লড়াই করতো না। কিন্তু আল্লাহ তাই করেন, যা তিনি ইচ্ছা করেন।” [2]

   💠শারইয়্যাহ:

এ ধরণের ইচ্ছা দ্বারা আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছাকৃত জিনিসটি সম্পন্ন হওয়া অপরিহার্য নয়। তবে এ ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত জিনিস বা বিষয়টি তাঁর পছন্দনীয়।

যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন,

“আর আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিতে চান।... ” [৩]

[৪]

  💠কাউনিয়্যাহ ও শারইয়্যাহ ইচ্ছার উদাহরণ :

আবু বকর(রা.) এর ঈমান আনা – এই ঘটনাটি একই সাথে আল্লাহর কাউনিয়্যাহ ও শারইয়্যাহ ইচ্ছার উদাহরণ। এটি কাউনিয়্যাহ ইচ্ছা এই জন্য যে, এটি সংঘটিত হয়েছিল। শারইয়্যাহ ইচ্ছা এই জন্য যে, এটি আল্লাহর পছন্দনীয় ছিল। 

আবার ফিরআউনের কুফরী – এটি শুধুমাত্র আল্লাহর কাউনিয়্যাহ ইচ্ছার উদাহরণ। এটি কাউনিয়্যাহ ইচ্ছা এই কারণে যে, এটি সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু এটি শারইয়্যাহ ইচ্ছা নয় কেননা এর পেছনে আল্লাহর কোন অনুমোদন বা সন্তুষ্টি ছিল না। আল্লাহ মুসা(আ.)কে তার নিকট ঈমানের দাওয়াত দিয়ে প্রেরণ করেছিলেন।   আল্লাহ মানুষকে নির্দেশ দিয়েছেন যাকাত আদায় করার, তিনি মানুষকে চুরি করতে নিষেধ করেছেন। এ নির্দেশগুলো পালন করা আল্লাহর নিকট পছন্দনীয়। মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দেওয়া হয়েছে যা দ্বারা সে এ আদেশগুলো মানতেও পারে আবার ভঙ্গও করতে পারে। মানুষ যদি নিজ ইচ্ছাশক্তি দ্বারা যাকাত আদায় না করে কিংবা চুরি করে, তাহলে আল্লাহ তা’আলা তাকে জোর করে যাকাত আদায় করতে বাধ্য করেন না কিংবা চুরি করা আটকে দেন না। যদিও আল্লাহর এ ক্ষমতা আছে। মানুষ যদি যাকাত আদায় না করে কিংবা যদি চুরি করে, তাহলে আল্লাহ তা’আলা তা হতে দেন। কিন্তু এসব ব্যাপারে আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টি নেই।  যেহেতু মানুষের সকল কর্ম আল্লাহর সৃষ্টি কাজেই পূণ্যের সাথে সাথে পাপও আল্লাহর ইচ্ছাক্রমে হয়। তবে তা কেবলমাত্র এ অর্থে যে আল্লাহ এগুলোকে(পাপ) নির্ধারিত করেছেন; এ অর্থে নয় যে আল্লাহ এগুলো অনুমোদন করেন বা আদেশ দেন। পৃথিবীতে যত খারাপ কাজ বা অপরাধ সংঘটিত হয়, এগুলোর উপর আল্লাহ তা’আলার কোনো সন্তুষ্টি নেই। আল্লাহ এগুলো ঘৃণা করেন, অপছন্দ করেন এবং এগুলো থেকে বিরত হবার আদেশ দেন।[৫]

 

  💠পৃথিবীতে যত অপরাধ সংঘটিত হয়, এগুলোর উপর আল্লাহর সন্তুষ্টি না থাকা সত্ত্বেও কেন আল্লাহ এগুলো সংঘটিত হতে দেন ?

 

এর উত্তরে বলা যেতে পারে – কুফর যদি না থাকত, তাহলে মু’মিন ও কাফির কে যেমন আলাদা করা যেত না বরং সবাই মু’মিন হত,  একইভাবে পাপ যদি না থাকতো

তাহলে পূণ্য বলে কিছু থাকতো না । সৎকর্ম ও মহত্ত্বেরও কোনো মানে থাকতো না । যদি অশুভ শক্তি না থাকতো তাহলে শুভ ও কল্যাণকর জিনিসের কোনো মূল্য থাকতো না। অন্ধকার আছে বলেই আলোর গুরুত্ব আছে। পৃথিবীতে নিষ্ঠুরতা বা নৃশংসতা না থাকলে মানবতারও কোনো আলাদা অস্তিত্ব বা অর্থ থাকতো না। কাজেই পৃথিবীতে অন্যায়, পাপ ইত্যাদির অস্তিত্ত্বও আল্লাহর সৃষ্টির অসামান্য হিকমতের পরিচায়ক। উল্লেখ্য ভালোর অনুপস্থিতিই হলো মন্দ । অর্থাৎ কাউকে ভালো কাজ না করার ক্ষমতা প্রদান করলে সে যখনই সে ক্ষমতা ব্যবহার করবে তখন সেটা মন্দ কাজ হয়ে যাবে । আল্লাহ মানুষকে ইচ্ছা স্বাধীনতার শক্তি দিয়েছেন। এখনএই ইচ্ছা শক্তির ব্যবহার করে কেউ খারাপ কাজকে বেছে নিলে তার জন্য সে নিজেই দায়ী ।

আল্লাহ বলেন, 

 

  قُلْ يَٰعِبَادِىَ ٱلَّذِينَ أَسْرَفُوا۟ عَلَىٰٓ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا۟ مِن رَّحْمَةِ ٱللَّهِۚ إِنَّ ٱللَّهَ يَغْفِرُ ٱلذُّنُوبَ جَمِيعًاۚ إِنَّهُۥ هُوَ ٱلْغَفُورُ ٱلرَّحِيمُ 

» সম্ভাব্য ভাবানুবাদ:

“ও আমার বান্দারা, তোমরা যারা নিজেদের উপরে চরম অন্যায় করেছ, আল্লাহর অনুগ্রহের উপর কখনও আশা হারিয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ সব পাপ ক্ষমা করেন।  কোন সন্দেহ নেই, তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, নিরন্তর করুণাময়।”« [৬]

 

এখন  অনেকেই হয়তো প্রশ্ন করবেন, “আমার কি পরিণতি হবে সেটা তো আল্লাহ জানেই? যদি আল্লাহ জানেই আমি দোযখে যাচ্ছি, তাহলে আর ভালো কাজ করে লাভ কি?”

এটা একটা জটিল প্রশ্ন কারণ এর সাথে ‘কদর’ বা ‘পূর্ব নির্ধারিত ভাগ্যের’ ধারণা জড়িত। এটি একটি ব্যাপক ব্যপার যার জন্য বেশ কয়েকটি বই পড়া প্রয়োজন। আমি যদি একটা ছোট সারাংশ দেই তাহলে দাঁড়ায়ঃ আল্লাহর কোন কিছু জানার অর্থ এই না যে আপনার কোন স্বাধীনতা নেই। আল্লাহ মানুষকে ‘সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা’ দিয়ে পাঠিয়েছেন। প্রতিটি মানুষকে আল্লাহ কিছু ব্যপার পূর্ব নির্ধারিত করে দিয়েছেন, কিন্তু বাকি অনেক কিছু মানুষের সিদ্ধান্তের উপর ছেড়ে দিয়েছেন। মানুষ কোন পরিস্থিতে পড়ে যদি ভালো সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সে তার জন্য পুরস্কার পাবে, যদি খারাপ সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে তার জন্য শাস্তি পাবে। পরিস্থিতিগুলো আল্লাহ তৈরি করেন। প্রতিটি পরিস্থিতে মানুষ কতগুলো সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিতে পারবে সেটাও আল্লাহ নির্ধারণ করে দেন। মানুষের কাজ হচ্ছে ভাল সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া এবং নিজের রাগ, লোভ, কামনা, বাসনা, ইগো ইতাদির বশবর্তী হয়ে অন্যায় সিদ্ধান্ত গুলো না নেওয়া। আল্লাহ বলেন,  

مَّنْ عَمِلَ صَٰلِحًا فَلِنَفْسِهِۦۖ وَمَنْ أَسَآءَ فَعَلَيْهَاۗ وَمَا رَبُّكَ بِظَلَّٰمٍ لِّلْعَبِيدِ

»সম্ভাব্য ভাবানুবাদ:

“যে সৎ কাজ করে সে নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে এবং কেহ মন্দ কাজ করলে ওর প্রতিফল সে’ই ভোগ করবে। তোমার রাব্ব বান্দাদের প্রতি কোন যুলম করেন না।” « [৭]

 

কিন্তু এর মানে এই না যে আল্লাহ জানেন না আমরা কি সিদ্ধান্ত নিব, বা আল্লাহ যদি জানেনই আমরা কি সিদ্ধান্ত নিব, তার মানে এই না যে আমাদের সমস্ত সিদ্ধান্ত পূর্ব নির্ধারিত। আমরা যখনি বলি – “আল্লাহ তো সব জানেন” – আমরা ধারণা করে নেই যে আল্লাহর জানাটা হচ্ছে অতীত কালের ঘটনা এবং যেহেতু আল্লাহ ‘অতীত কালে’ জেনে গেছেন, তার মানে বর্তমান, ভবিষ্যৎ সবই পূর্ব নির্ধারিত। এটা ভুল ধারণা। আল্লাহ সময়ের উর্ধে। তাঁর জন্য কোন অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ নেই। কোন সত্ত্বা যখন সময়ের বাইরে চলে যায়, তখন সে একই সাথে অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সবকিছুই একই সময়ে, একই মুহূর্তে জানতে পারে। সুতরাং, আমি জাহান্নামে যাবো এটা যদি আল্লাহ জানেন, তার মানে এই না যে আল্লাহর জানাটা অতীত কালে ঘটে গেছে এবং আমার আর ভালো কাজ করে কোন লাভ নেই, আমার ভবিষ্যৎ পূর্বনির্ধারিত। আল্লাহ এই মুহূর্তে আমি কি করেছি, কি করবো এবং তার ফলে আমার পরিণতি কি হবে তা সব দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু তার মানে এই না যে আমি কি করবো, কি করবোনা, সেই সিদ্ধান্ত নেবার স্বাধীনতা আল্লাহ আমাকে দেন নি। কিভাবে একই সাথে অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ দেখা যায় তার একটা উপমা দেই। ধরুন আপনি সিনেমা হলে গিয়ে একটি চলচ্চিত্র দেখছেন। যেহেতু আপনি একটা একটা করে দৃশ্য দেখছেন, আপনি জানেন না সামনে কি হতে যাচ্ছে। আপনি শুধুই অতীতে কি হয়েছে জানেন এবং বর্তমানে কি দৃশ্য হচ্ছে তা দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু ধরুন চলচ্চিত্রটির পুরো ফিল্মের রোলটাকে যদি মাটিতে সমান করে বিছিয়ে রাখা হত এবং আপনি দশ তলা বাড়ির ছাদ থেকে পুরো ফিল্মটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একবারে, এক পলকে দেখতে পেতেন, তাহলে আপনি একই সাথে, একই মুহূর্তে অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সবকিছুই দেখতে পেতেন। আপনার কাছে তখন আর চলচ্চিত্রটি একটা একটা দৃশ্য করে আগাতো না বরং পুরো চলচ্চিত্রটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক মুহূর্তে আপনার চোখের সামনে ভেসে উঠত। এটা শুধুই একটা উপমা, আল্লাহ্‌ই জানেন সময় তাঁর কাছে কিভাবে কাজ করে।  এবার পূর্ব নির্ধারিত ভাগ্যের একটা উদাহরণ দেই। ধরুন আপনি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম গাড়িতে করে যাচ্ছেন। আপনি একটা রাস্তার মোড়ে এসে দেখলেন একটা রাস্তা বায়ে গেছে, আরেকটা ডানে গেছে। আপনি বায়ের রাস্তা নিলেন এবং চট্টগ্রামের বদলে সিলেটে গিয়ে পৌঁছালেন। এখন যারা রাস্তা বানিয়েছে – বিআরটিএ, তারা ভালো করেই জানে কোন রাস্তায় গেলে মানুষ কোন জায়গায় গিয়ে পৌঁছাবে। প্রত্যেকটা রাস্তার মোড়ে গিয়ে কোন দিকে ঘুরলে মানুষ কোন জায়গায় গিয়ে পৌঁছাবে তারা তা সবই জানে। তার মানে এই না যে আপনি সিলেটে গিয়ে পৌঁছাবেন তা পূর্ব নির্ধারিত, কারণ বিআরটিএ ইতিমধ্যেই জানে রাস্তাগুলো সিলেটে গেছে। আপনি আপনার জীবনে যত মোড় নিবেন, তার প্রত্যেকটির পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ জানেন কারণ জীবনের রাস্তার প্রতিটা মোড় তাঁরই বানানো।  যেমন ধরুন আপনার যখন দশ বছর বয়স ছিল, আপনার স্কুলে দুজন বন্ধু ছিল। রহিম – যে একজন ভালো ছাত্র, সারাদিন পড়াশুনা করে, ভালো ঘরের ছেলে; আর রকি – যে বিরাট বড় লোকের ছেলে, যার ভিডিও গেমের অভাব নেই, সারারাত মুভি দেখে, বন্ধু বান্ধব নিয়ে আড্ডা দিয়ে বেড়ায়। আল্লাহ আপনাকে দুটো সুযোগ দিয়েছিলেন – রহিম এবং রকি। আপনি রকির ভিডিও গেমের লোভকে সামলাতে না পেরে রকির পিছনে লেগে গেলেন। পড়ালেখা বাদ দিয়ে সারাদিন সময় নষ্ট করে বেড়ালেন। স্কুল শেষ করলেন একটা বাজেরেজাল্ট নিয়ে। জীবনটা দুর্বিষহ করে ফেললেন। সারাজীবন আল্লাহকে দোষ দিলেন আপনার দুরাবস্থার জন্য। বাকি জীবনটা আল্লাহর কোন নির্দেশ না মেনে, তার সাথে যুদ্ধ করে, তার নির্দেশগুলো অমান্য করে দোযখে চলে গেলেন। আপনি যদি রকির পেছনে না ঘুরে রহিমের সাথে থাকতেন, আপনার একটা সুন্দর চরিত্র তৈরি হত, আপনি সুন্দর চিন্তা করতে শিখতেন, ঠিকমত পড়ালেখা করতেন, ভাল রেজাল্ট করে ভালো কলেজে পড়তে পারতেন। আপনার জীবনটা সফল হতো। তখন আপনি সারাজীবন আল্লাহকে ধন্যবাদ দিয়ে, তাঁর আদেশ মেনে জীবন পার করে বেহেশতে চলে যেতেন। আল্লাহﷻ‎ আপনাকে দুটো সুযোগ দিয়েছিলেন। আপনার সিদ্ধান্তের জন্য আপনি দায়ী।

 

আবার ধরুন আপনি রকির পেছনে লেগে ছিলেন এবং কোন মতে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে পেরেছেন আপনার বাবা-মার মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিনরাত চেষ্টা করার পর। তারপর একদিন আপনার বন্ধু করিম আপনাকে এসে বলল, “দোস্ত, আমার এক বন্ধুর কাছে খবর পেলাম। ওদের এক দল আছে যারা সন্ধার পর ‘ইয়ে’ করতে যায়। সাংঘাতিক মজার ব্যপার নাকি। চল, আমরাও আজকে একবার ‘ইয়ে’ করে দেখি।” এখন এতদিনে আপনার যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে আজে বাজে বন্ধুর সাথে মিশলে জীবনে কত পস্তাতে হয়। কিন্তু তারপরেও আপনি লোভ সামলাতে পারলেন না, বন্ধুর সাথে চলে গেলেন। এর জন্য যদি আল্লাহ আপনাকে ধরে সোজা জাহান্নামে পাঠিয়ে দেন, আপনি কি আল্লাহকে দোষ দিবেন? কিন্তু ধরুন আপনি নিজে তো গেলেনই না, বরং আপনার বন্ধু করিমকেও আটকে রাখলেন। তাকে আপনার নিজের জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে ভালো করে বোঝালেন। যার ফলে সে জীবনে একটা বড় ভুল করা থেকে বেঁচে গেল। নিজেকে সংশোধন করার জন্য এবং অন্য একজন মানুষের জীবনকে বাঁচানোর জন্য আল্লাহ খুশি হয়ে আপনাকে বেহেশত দিয়ে দিলেন।  এভাবে আল্লাহ আমাদেরকে জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন রাস্তার ব্যবস্থা করে দেন। আমাদেরকে সংশোধনের সুযোগ করে দেন। কিছু রাস্তা আপনাকে আরও খারাপ করে দিবে, আপনার এবং আপনার পরিবারের সদস্যদের জীবনে আরও কষ্ট এনে দিবে। কিছু রাস্তা আপনাকে আপনার দুরবস্থা থেকে বের করে এনে জীবনটা সহজ করে দিবে। আপনি যদি আপনার গত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না পেয়ে, নিজের লোভ, ইগো, সন্মান, রাগ, অহংকারকে সংযত না করে আবারো ভুল রাস্তায় চলে যান, তাহলে এর জন্য আপনি দায়ী, আল্লাহ নয়।

আল্লাহ বলেন,

إِنَّا هَدَيْنَـٰهُ ٱلسَّبِيلَ إِمَّا شَاكِرًا وَإِمَّا كَفُورًا

»সম্ভাব্য ভাবানুবাদ:

“আমি নিশ্চিত ভাবে মানুষকে সঠিক পথ দেখিয়েছি, সে কৃতজ্ঞ হোক আর অকৃতজ্ঞ হোক।”«[৮]

এ পর্যন্ত যা বললাম তা হল মানুষের মস্তিস্ক বর্তমানে যে পর্যায়ে আছে তার পক্ষে ধারণা করা সম্ভব এমন কিছু উপলব্ধি। যেহেতু ‘কদর’ ব্যপারটিই মানুষের কল্পনাতীত একটি ব্যপার, তাই মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতা যত উন্নত হবে, মানুষের এই সম্পর্কে ধারণায় তত পরিবর্তন হবে। এখন পর্যন্ত আমরা এইটুকুই আন্দাজ করতে পারি। আল্লাহ্‌ই জানেন তিনি কিভাবে কদর সৃষ্টি করেছেন। এধরনের ব্যপার মানুষের জন্য চিন্তা করাটা কঠিন কারণ মানুষ সময়ের মধ্যে বাস করে এবং সময়ের বাইরে কোন কিছু তারা চিন্তা করতে পারেনা। আমাদের ভাষায় অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ এর বাইরে আর কোন শব্দ নেই। যেহেতু আমাদের ভাষায় এর বাইরে কোন শব্দ নেই, সেহেতু আমরা সময়ের বাইরে কিছু কল্পনাও করতে পারিনা। [৯]

 

  💠প্রাসঙ্গিক কিছু কুরআনের আয়াত:

১.

(٧)وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّىٰهَا (٨) فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَىٰهَا (٩) قَدْ أَفْلَحَ مَن زَكَّىٰهَا (١٠) وَقَدْ خَابَ مَن دَسَّىٰهَا 

»ভাবানুবাদ:

(৭) কসম নাফ্সের এবং যিনি তা সুসম করেছেন। (৮) অতঃপর তিনি তাকে অবহিত করেছেন তার পাপসমূহ ও তার তাকওয়া সম্পর্কে। (৯) নিঃসন্দেহে সে সফলকাম হয়েছে, যে তাকে পরিশুদ্ধ করেছে। (১০) এবং সে ব্যর্থ হয়েছে, যে তা (নাফস)-কে কলুষিত করেছে।«[১২]

২.

(٤) إِنَّ سَعْيَكُمْ لَشَتَّىٰ (٥) فَأَمَّا مَنْ أَعْطَىٰ وَٱتَّقَىٰ (٦) وَصَدَّقَ بِٱلْحُسْنَىٰ (٧) فَسَنُيَسِّرُهُۥ لِلْيُسْرَىٰ (٨) وَأَمَّا مَنۢ بَخِلَ وَٱسْتَغْنَىٰ (٩) وَكَذَّبَ بِٱلْحُسْنَىٰ (١٠) فَسَنُيَسِّرُهُۥ لِلْعُسْرَىٰ (١١) وَمَا يُغْنِى عَنْهُ مَالُهُۥٓ إِذَا تَرَدَّىٰٓ (١٢) إِنَّ عَلَيْنَا لَلْهُدَىٰ (١٣) وَإِنَّ لَنَا لَلْءَاخِرَةَ وَٱلْأُولَىٰ

»সম্ভাব্য ভাবানুবাদ:

(৪) নিশ্চয় তোমাদের কর্মপ্রচেষ্টা বিভিন্ন প্রকারের। (৫) সুতরাং যে দান করেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে, (৬) আর উত্তমকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছে, (৭) আমি তার জন্য সহজ পথে চলা সুগম করে দেব। (৮) আর যে কার্পণ্য করেছে এবং নিজকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করেছে, (৯) আর উত্তমকে মিথ্যা বলে মনে করেছে, (১০) আমি তার জন্য কঠিন পথে চলা সুগম করে দেব। (১১) আর তার সম্পদ তার কোন কাজে আসবে না, যখন সে অধঃপতিত হবে। (১২) নিশ্চয় পথ প্রদর্শন করাই আমার দায়িত্ব। (১৩) আর অবশ্যই আমার অধিকারে পরকাল ও ইহকাল। «[১১]

 

  💠এই বিষয়ে আরো বিস্তারিত পড়তে পারবেন এখানে ‌।

 

💠তথ্যসূত্র:

[১] ভাবানুবাদ, প্রাসঙ্গিক অংশ আল-কুরআন ৭:২৮

[২] ভাবানুবাদ, প্রাসঙ্গিক অংশ আল-কুরআন, ৪:২৭

[৩] ভাবানুবাদ, প্রাসঙ্গিক অংশ আল-কুরআন,২:২৫৩

[৪] ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের আকীদা’ – শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল উসাইমিন(র)

[৫] ‘শারহ আকিদা আত ত্বহাওয়ী’ – ইবন আবিল ইজ্জ হানাফী(র)

 [৬] আল কুরআন, আয-যুমার ৩৯:৫৩

[৭] আল-কুরআন ফুসিলাত ৪১:৪৬

[৮] আল-কুরআন ৭৬:৩। 

[৯] ওমর আল জাবির এর ব্লগ হতে ।

[১০] আল-কুরআন ৯১:৭-১০

[১১] আল-কুরআন ৯২:৪-১৬

 

Share this: