‘কুরআন’ এর পৃথিবী ও চাঁদ সূর্যের অবস্থা  সংক্রান্ত তিনটি অভিযোগের জবাব ।

   

 

🔥অভিযোগ:

কুরআন -এ চন্দ্র ও সূর্য একই কক্ষপথে আবর্তনের কথা বলা হয়েছে (৩৬:৪০) এবং সেই সাথে মহাবিশ্বকে ভূ-কেন্দ্রিকও মনে করা হয়েছে (৩১:২৯)! 

36.40: It is not permitted to the Sun to catch up the Moon, nor can the Night outstrip the Day: Each (just) swims along in (its own) orbit (according to Law). 

31.29: Seest thou not that God merges Night into Day and he merges Day into Night; that He has subjected the sun, and the moon (to his Law), each running its course for a term appointed; and that God is well-acquainted with all that ye do?

💮জবাব:

কুরআনের কোথাও চন্দ্র ও সূর্য একই কক্ষপথে আবর্তনের কথা লিখা নেই। তবে সে সময় মানুষ এমন কিছুতে বিশ্বাস করতে পারে। কোরআনে বিষয়টিকে সংশোধন করা হয়েছে। অন্যথায় চন্দ্র ও সূর্য একে-অপরকে ধরার প্রশ্ন আসতো না। তাছাড়া কেউ যদি অনুমান করে বলেন: The sun cannot cause the moon to gravitate towards itself and the night and the day cannot lengthen or shorten other than the appointed measure–সেক্ষেত্রেও কিন্তু কারোরই কিছু বলার থাকবে না। অনুরূপভাবে, কোরআনের কোথাও মহাবিশ্বকে যেমন ভূ-কেন্দ্রিক বলা হয়নি তেমনি আবার সূর্যকে পৃথিবীর চারিদিকে আবর্তনের কথাও লিখা নেই। ভূ-কেন্দ্রিক মহাবিশ্বের ধারণা এসেছে গ্রীক ফিলোসফি ও বাইবেল থেকে। আর এ কারণেই ভূ-কেন্দ্রিক মহাবিশ্বের বিশ্বাসে আঘাত হানার কারণে ক্রিস্টিয়ান চার্চ বিজ্ঞানীদের উপর অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েছিল। 

 

🔥অভিযোগ:

কুরআনে বলা হয়েছে পৃথিবী তার নিজ অক্ষের উপর ঘুরছে না–অতএব অবৈজ্ঞানিক! 

💮জবাব: 

প্রথমত, কোরআনের কোথাও পৃথিবীকে স্থির তথা নিজ অক্ষের উপর না ঘোরার কথা বলা হয়নি। কুরআনের বিরুদ্ধে অনেক অপপ্রচারের মধ্যে এটিও একটি। দ্বিতীয়ত, কেউ কি কুরআন থেকে অকাট্য যুক্তির সাহায্যে দেখাতে পারবেন যে পৃথিবী সত্যি সত্যি ঘুরছে না? উত্তর হচ্ছে, মোটেও না। তাহলে বছরের পর বছর ধরে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে কেন! নীচের আয়াতগুলো দিয়ে তাদের দাবিকে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়।  15.19: And the earth We have spread out (like a carpet); set thereon mountains firm and immovable; and produced therein all kinds of things in due balance.  27.61: Who has made the earth firm to live in; made rivers in its midst; set thereon mountains immovable; and made a separating bar between the two bodies of flowing water.  আয়াতগুলোতে ‘Immovable’ শব্দটা দেখেই পৃথিবীকে বুঝানো হয়েছে বলে ধরে নেয়া হয়েছে! কিন্তু এখানে ‘Immovable’ বলতে পর্বতমালাকে বুঝানো হয়েছে, পৃথিবীকে নয়। দ্বিতীয় আয়াতে ইউসুফ আলীর অনুবাদে ‘Who has made the earth firm to live in’ বলতে পৃথিবীর শক্ত (Firm/Solid: Having a solid or compact structure that resists stress or pressure–Merriam-Webster Dictionary) উপরিভাগকে বুঝানো হয়েছে, যার উপর পর্বতমালা ও নদী-নালা তৈরী হয়েছে। পৃথিবীর উপরিভাগ মধ্যভাগের মতো গলিত পদার্থ দ্বারা তৈরী হলে তার উপর কিন্তু পর্বতমালা ও নদী-নালা তৈরী হতো না। পুরো আয়াতটা তো পড়তে হবে। তাছাড়া শাকিরের অনুবাদে কিন্তু ‘Restingplace’ লিখা হয়েছে। পিকথালের অনুবাদে ‘Fixed abode’ দেখে সম্ভবত ‘পৃথিবী ঘুরছে না’ ধরে নেয়া হয়েছে! ‘Fixed abode’ এর ব্যাখ্যা হচ্ছে পৃথিবী তার নিজ অক্ষের উপর প্রচন্ড বেগে ঘোরা সত্ত্বেও মানুষ ও অন্যান্য জীবের সুবিধার জন্য পৃথিবীকে আপাতদৃষ্টিতে স্থির অবস্থায় রাখা হয়েছে। অন্যথায় পৃথিবীতে জীবনযাত্রা ব্যহত হতে পারতো। কোরআনে অন্যান্য আয়াতে বলা হয়েছে যে, পৃথিবীর পৃষ্ঠভাগে পর্বতমালা স্থাপন করে ঝাঁকুনিকে প্রতিরোধ করা হয়েছে। নীচের আয়াত দুটি দিয়েও ‘পৃথিবী ঘুরছে না’ প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়।  30.25: And one of His signs is that the heaven and the earth subsist by His command.  35.41: It is God Who sustains the heavens and the earth, lest they cease (to function).  প্রথম আয়াতে ‘Subsist by His command’ বলতে ‘পৃথিবী ঘুরছে না’ ধরে নেওয়া হয়েছে! অথচ ‘Subsist’ শব্দের অর্থ কিন্তু ‘ঘুরছে না’ নয়। তাছাড়া আয়াতটাতে হেভেন ও পৃথিবী উভয়েরই কথা বলা হয়েছে, শুধুই পৃথিবীর কথা বলা হয়নি। দ্বিতীয় আয়াতে ‘Who sustains the heavens and the earth, lest they cease to function’ কথাটার দ্বারা পৃথিবী ও গ্রহ-নক্ষত্রের যথাযথ কার্য-প্রণালীকে বুঝানো হয়েছে, কোনভাবেই ‘পৃথিবী ঘুরছে না’ বুঝানো হয়নি।  কী মনে হয় পাঠক! উপরের আয়াতগুলো থেকে কি বলা যাবে যে পৃথিবী ঘুরছে না? কুরআনে পৃথিবীর ঘূর্ণনের স্বপক্ষে বা বিপক্ষে সরাসরি যেমন কোন আয়াত নেই তেমনি আবার এমন কোন আয়াতও নেই যেখানে থেকে কেউ অকাট্য যুক্তির সাহায্যে পৃথিবীর ঘূর্ণনকে থামিয়ে দিতে পারে। চ্যালেঞ্জ থাকলো। তবে কুরআনে পৃথিবীর ঘূর্ণনের স্বপক্ষেই কিছু ইঙ্গিত আছে (২৭:৮৮, ৫৫:১৭-১৮, ২১:৩৩)। কুরআনের আলোকে পৃথিবী আসলে ঘূর্ণায়মান। যদিও পৃথিবী তার নিজ অক্ষের উপর প্রচন্ড বেগে ঘুরছে তথাপি আপাতদৃষ্টিতে পৃথিবীকে স্থির তথা অনড় মনে হয়। পৃথিবীর পৃষ্ঠভাগ ফুটবল বা বেলুনের মত মসৃণ হলে পৃথিবীর ঘূর্ণনের কারণে হয়তো ঝাঁকুনির সৃষ্টি হতো। কোরআনে বলা হয়েছে যে, পৃথিবীর পৃষ্ঠভাগে পর্বতমালা স্থাপন করে ঝাঁকুনিকে প্রতিরোধ করা হয়েছে। ফলে কোরআনে যদি পৃথিবীকে ‘স্থির’ তথা ‘অনড়’ মনে করা হতো তাহলে পৃথিবীতে পর্বতমালা স্থাপন করে ঝাঁকুনি প্রতিরোধের কথা কোনভাবেই আসতো না। অতএব কুরআনে সুস্পষ্টভাবে পৃথিবীর ঘূর্ণনের স্বপক্ষেই ইঙ্গিত আছে। অথচ এই আয়াতগুলো নিয়েই বোকার মতো বেশ হাসি-তামাসা ও কৌতুক করা করা হয় এবং সেই সাথে উল্টোদিকে কোরআনের পৃথিবীর ঘূর্ণনকে জোর করে থামিয়েও দেয়া হয়! কিছু নমুনা দেখুন:  31.10: He created the heavens without any pillars that ye can see; He set on the earth mountains standing firm, lest it (the earth) should shake with you.  16.15: And He has set up on the earth mountains standing firm, lest it (the earth) should shake with you.  21.31: And We have set on the earth mountains standing firm, lest it (the earth) should shake with them (mountains). 

 

🔥অভিযোগ কুরআনে যেহেতু পৃথিবীকে বেড ও কার্পেটের সাথে তুলনা করা হয়েছে সেহেতু পৃথিবীর আকারকে ডিস্কের মতো সমতল মনে করা হয়েছে–অতএব অবৈজ্ঞানিক! 

💮জবাব: 

প্রথমত, কোরআনের কোথাও পৃথিবীর আকারকে সমতল বলা হয়নি। কোরআনের বিরুদ্ধে অনেক অপপ্রচারের মধ্যে এটিও একটি। দ্বিতীয়ত, কেউ কি অকাট্য যুক্তি-প্রমাণের সাহায্যে কোরআনের পৃথিবীকে সমতল বানাতে পারবেন? উত্তর হচ্ছে, মোটেও না। নীচের আয়াতগুলো দিয়ে কোরআনের পৃথিবীকে সমতল বানানোর চেষ্টা করা হয়।  20.53: YUSUFALI: “He Who has, made for you the earth like a carpet spread out; has enabled you to go about therein by roads (and channels); and has sent down water from the sky.” With it have We produced diverse pairs of plants.  PICKTHAL: Who hath appointed the earth as a bed and hath threaded roads for you therein and hath sent down water from the sky and thereby We have brought forth divers kinds of vegetation.  15.19: And the earth We have spread out (like a carpet); set thereon mountains firm and immovable; and produced therein all kinds of things in due balance.  51.48: And We have spread out the (spacious) earth: How excellently We do spread out!  71.19: And God hath made the earth a wide expanse for you.  তাদের যুক্তি হচ্ছে, কুরআনে যেহেতু পৃথিবীকে বেড ও কার্পেটের সাথে তুলনা করা হয়েছে সেহেতু কোরআনে পৃথিবীর আকারকে সমতল মনে করা হয়েছে! কিন্তু এই ধরণের যুক্তিকে কু-যুক্তি ছাড়া অন্য কিছু বলা যেতে পারে না। কারণগুলো নিম্নরূপ:  ১। সাদা চোখে পৃথিবীকে যেমন সমতল মনে হয় তেমনি আবার কিন্তু বৃত্তাকারও মনে হয়। বরঞ্চ সমতলের চেয়ে বৃত্তাকারই বেশী মনে হয়। কারণ উঁচু কোন পাহাড়ের উপর থেকে পৃথিবীকে কিছুটা হলেও উত্তল দেখায়। তা-ই যদি হয় তাহলে সাদা চোখের জ্ঞান দিয়ে পৃথিবীর আকারকে কোনভাবেই বেডের সাথে তুলনা করা হতো না। কারণ এই পৃথিবীর কারো বাড়িতে বৃত্তাকার বেড আছে বলে মনে হয় না, যদি না কেউ এই লেখাটি পড়ে তড়িঘড়ি করে একটি বৃত্তাকার বেড বানিয়ে নেয়! সমালোচকরা সারা জীবন ধরে চতুর্ভুজাকৃতির বেডে শুয়ে থেকেও কুরআন পড়তে যেয়ে কুরআনের পৃথিবীকে জোর করে সমতল বানানোর জন্য সেই বেডকেই আবার ‘বৃত্তাকার’ কল্পনা করে! তাছাড়া তারা হয়তো ‘বেড’ বলতে কাঠ অথবা লোহার তৈরী চতুর্ভুজাকৃতির ফ্রেমকে বুঝে থাকে! ওয়েল, তা-ই যদি হয় তাহলে বেড এর চার পা ও স্ট্যান্ড থাকলেও কুরআনের কোথাও কিন্তু পৃথিবীর চার পা ও স্ট্যান্ড এর কথা বলা হয়নি! অধিকন্তু যাদের বাড়িতে কাঠ অথবা লোহার তৈরী বেড নেই তারা কিন্তু মেঝেতেই শুয়ে থাকে। ফলে তাদের কাছে এই পৃথিবীটাই একটি বেড। যাহোক, বেড বলতে সাধারণত নরম গদিকে বুঝানো হয়ে থাকে। অর্থাৎ বেড তাকেই বলা হয় যেখানে আরাম ও স্বাচ্ছন্দের সাথে বিশ্রাম নেয়া যায়। বেডে মানুষ যতটা আরাম ও স্বাচ্ছন্দের সাথে বিশ্রাম নিতে পারে, মরুভূমির উত্তপ্ত বালুচরে ততটা আরাম ও স্বাচ্ছন্দের সাথে বিশ্রাম নিতে পারে না। ফলে মরুভূমির উত্তপ্ত বালুচরকে কিন্তু বেড বলা যাবে না। বেড এর সাথে মরুভূমির পার্থক্য ইতোমধ্যে নিশ্চয় পরিস্কার। তাছাড়া বেড সাধারণত প্রটেকটিভ জায়গার মধ্যে রাখা হয় যাতে করে সূর্যের তাপ ও ক্ষতিকর রশ্মি, ঝড়-বৃষ্টি, হিংস্র জন্তু, ও বিষাক্ত কীট-পতঙ্গের হাত থেকে জীবন বাঁচানো যায়। এবার আসা যাক কুরআনের ক্ষেত্রে। কুরআনে পৃথিবীকে বেড বা কার্পেট এর সাথে তুলনা করে পৃথিবীর আকার-আকৃতিকে বুঝানো হয়নি। বরঞ্চ এই তুলনাটা অত্যন্ত যৌক্তিক ও তাৎপর্যপূর্ণ। আমরা সবাই জানি এ পর্যন্ত যতগুলো গ্রহ-উপগ্রহ আবিষ্কার করা হয়েছে তার মধ্যে পৃথিবী একটি ব্যতিক্রমধর্মী গ্রহ, যেখানে পানি-বাতাস ও জীবের অস্তিত্ব আছে। অর্থাৎ পৃথিবী নামক গ্রহে মানুষ ও অন্যান্য জীব-জন্তু-উদ্ভিদ যত সহজে বসবাস করতে পারে, যত সহজে আরাম ও স্বাচ্ছন্দের সাথে বিশ্রাম নিতে পারে, সর্বোপরি যত সহজে বেঁচে থাকতে পারে, অন্য কোন গ্রহে যেয়ে তত সহজে বসবাস করা কিন্তু অসম্ভব। বেড এর সাথে উত্তপ্ত মরুভূমির যেমন সম্পর্ক–পৃথিবী নামক গ্রহের সাথে অন্যান্য গ্রহেরও অনুরূপ সম্পর্ক। আর এ কারণেই কুরআনে পৃথিবীকে বেড এর সাথে তুলনা করা হয়েছে। অর্থাৎ কোরআনে পৃথিবীকে বেড এর সাথে তুলনা করে পৃথিবীকে বসবাস ও জীবন ধারণের উপযোগী বুঝানো হয়েছে, পৃথিবীর আকার-আকৃতিকে বুঝানো হয়নি। আয়াতগুলো পড়লেই বুঝা যায়। বেডকে যেমন প্রটেকটিভ জায়গার মধ্যে রাখা হয় তেমনি পৃথিবীকেও প্রটেকটিভ আবরণের মধ্যে রাখা হয়েছে (২১:৩২)।  ২। কুরআনের এই আয়াতগুলোতে ‘Shape’ ও ‘Flat’ শব্দ দুটির কোনটিই ব্যবহার করা হয়নি। সুতরাং আয়াতগুলোতে আসলে কী বুঝাতে চাওয়া হয়েছে সেটাই বিবেচ্য বিষয়। প্রথমত, কিছু অনুবাদক ‘কার্পেট’ ও ‘বেড’ শব্দ দুটি ব্যবহারই করেননি। দ্বিতীয়ত, কার্পেটিং করতে হলে রাস্তা-ঘাট সরল রেখার মতো সমতল হতেই হবে, এমন আজগুবি কথা কে বলেছে! পাহাড়ের উপর দিয়ে যে রাস্তা তৈরী করা হয় সেটি তো বক্রাকার বা অর্ধবৃত্তাকার। সেই অর্ধবৃত্তাকার রাস্তায় কি কার্পেটিং করা হয় না? ফলে গোলাকার বস্তুর উপর কার্পেট বিছানো যাবে না কেন? ফুটবলের উপরের চামড়াকেও তো এক অর্থে কার্পেট বলা যেতে পারে। কেস ডিসমিস। ঘরের মেঝেতে মানুষ কার্পেট বিছায় মূলতঃ কিছু কারণে: মেঝে খসখসে হলে; মেঝে ঠান্ডা হলে; মেঝের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য; ইত্তাদি। রাস্তায় যানবাহন চলাচলের সুবিধার জন্য যেমন কার্পেটিং করা হয়, পৃথিবীর পৃষ্ঠভাগকেও মানুষের বসবাস ও ফসল ফলানোর উপযোগী করার জন্য কার্পেটিং করা হয়েছে। পৃথিবীর মধ্যভাগ বসবাস ও ফসল ফলানোর উপযোগী নয়। বেডের উপর মানুষ যেমন বিশ্রাম নিতে পারে তেমনি পৃথিবীর পৃষ্ঠেও বিশ্রাম নিতে পারে। আর এ কারণেই পৃথিবীকে বেডের সাথে তুলনা করা হয়েছে, পৃথিবীর মধ্যভাগ বিশ্রামযোগ্য নয়। অতএব প্রচলিত বেডের আকার সমতল না হয়ে অন্য কিছু হলেও সেই বেডের সাথেই হয়তো তুলনা করা হতো। তাছাড়া স্ফেরিক্যাল বেডও তো অসম্ভব কিছু নয়। পুরো পৃথিবীকে একটি বিশাল স্ফেরিক্যাল বেড ধরে নেয়াটা অযৌক্তিক হবে কেন? আয়াতগুলোতে কিছু শব্দ যেমন Bed, Carpet, Spread out, Expanse ইত্যাদি দেখেই পৃথিবীর আকারকে সমতল ধরে নেয়া হয়েছে! কিন্তু Bed, Carpet, Spread out, Expanse ইত্যাদি বলতে যে সমতল হতেই হবে তার কোন যৌক্তিকতা নেই। কোরআনের কিছু আয়াত পড়ে অনুমান করা যায় যে, পৃথিবীটা বর্তমান অবস্থায় হুট করে আসেনি। ফলে ‘এক্সপ্যান্ড’ ও ‘স্প্রেড’ শব্দ দুটি কোরআনের জন্য অর্থবহ।  ৩। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিভিন্ন আনুবাদক বিভিন্ন রকম শব্দ ব্যবহার করেছেন। যেমন আয়াত ২০:৫৩ এর বিভিন্ন অনুবাদ লক্ষ্যণীয়:  [Qaribullah]: It is He who has made for you the earth as a cradle.  [Khalifa]: He is the One who made the earth habitable for you.  [YUSUFALI]: He Who has, made for you the earth like a carpet.  [PICKTHAL]: Who hath appointed the earth as a bed.  [SHAKIR]: Who made the earth for you an expanse.  তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, পাঁচজন অনুবাদক পাঁচ রকম শব্দ ব্যবহার করেছেন এবং সবগুলোই আসলে যৌক্তিক, যার ব্যাখ্যা ইতোমধ্যে দেয়া হয়েছে। কিন্তু অন্ধ-অজ্ঞ সমালোচকদের ‘বিভ্রান্তি’ এড়ানোর জন্য ক্বারিবুল্লাহ ও রাশাদ খলিফা যথাক্রমে ‘ক্রেডল’ ও ‘হ্যাবিটেবল’ ব্যবহার করেছেন। কেস ডিসমিস। অনুবাদের ক্ষেত্রে যে অনুবাদকে সবচেয়ে বেশী যৌক্তিক মনে হবে সেটা গ্রহণ করাতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু বিভিন্ন অনুবাদ থেকে নিজের ইচ্ছেমতো কিছু শব্দ বেছে নিয়ে একটি গ্রন্থকে ভুল বা অবৈজ্ঞানিক প্রমাণ করার চেষ্টা করা অযৌক্তিক। কারণ অনুবাদের ক্ষেত্রে ‘বেনিফিট অফ ডাউট’ কুরআন বা যে কোন গ্রন্থকেই দিতে হবে। কুরআনে এমন কোন আয়াত নেই যেখানে থেকে কেউ পৃথিবীর আকারকে অকাট্য যুক্তি দিয়ে সমতল বানাতে পারে। চ্যালেঞ্জ থাকলো।  এবার পজেটিভ অ্যাপ্রোচ নেয়া যাক। কুরআনে সমতল পৃথিবীর পরিবর্তে বরং স্ফেরিক্যাল পৃথিবীরই ইঙ্গিত আছে। যেমন: (ক) আয়াত ৮৪:৩-৪ তে মহাপ্রলয় দিবস সম্পর্কে বলা হয়েছে, “And when the earth is flattened out, and casts forth what is in it and becomes empty.” কোরআনের আলোকে পৃথিবীর আকার যদি সমতলই হতো তবে তাকে প্রলয়দিনে আবার সমতল বানানোর প্রশ্ন আসবে কেন, তাই না? সমতল পৃথিবীকে আবার সমতল বানানো এবং সেই সাথে খালি করার প্রশ্ন কিন্তু অবান্তর। পৃথিবীকে সমতল ও খালি করার প্রশ্ন তখনই আসবে যখন পৃথিবীর আকার স্ফেরিক্যাল হবে। (খ) কিছু স্কলারের মতে আয়াত ৭৯:৩০ তে পৃথিবীকে ডিমের মতো বলা হয়েছে। আরো দেখুন:  31.29: Seest thou not that God merges Night into Day and he merges Day into Night.  Note: Merging here means that the night slowly and gradually changes to day and vice versa. This phenomenon can only take place if the earth is spherical. If the earth was flat, there would have been a sudden change from night to day and from day to night.  39.5: He makes the Night overlap the Day, and the Day overlap the Night.  Note: The Arabic word used here is Kawwara meaning ‘to overlap’ or ‘to coil’ – the way a turban is wound around the head. The overlapping or coiling of the day and night can only take place if the earth is spherical.  55.17-18: Lord of the two Easts and the two Wests. Then which of the favours of your Lord will ye deny?  [Note: The question of two Easts and the two Wests does only arise if the earth is spherical.]  অতএব দেখা যাচ্ছে যে কুরআনের আলোকে পৃথিবীর আকার আসলে স্ফেরিক্যাল, কোনভাবেই সমতল নয়। প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীর আকারকে বাস্তবে কোন কিছুর সাথেই তুলনা করা যায় না। কেউ কেউ বলেন কমলালেবুর মতো। কেউ কেউ আবার বলেন কুমড়ার মতো। তবে কোনটাই কিন্তু পুরোপুরি সঠিক নয়। ইন্টারনেটে পৃথিবীর অনেক ইমেজ আছে কিন্তু কমলালেবুর মতো ‘দুই সাইড চ্যাপ্টা এবং কিছুটা ভেতর দিকে ঢুকে গেছে’ এরকম কোন ইমেজ দেখা যায় না। আর তা-ই যদি হয় তাহলে পৃথিবীকে ডিমের সাথে তুলনা করাই বেশী যৌক্তিক। কারণগুলো হচ্ছে: (১) কমলালেবুর মতো ডিমও স্ফেরিক্যাল; (২) কমলালেবুর বোঁটা আছে, কিন্তু ডিম ও পৃথিবীর বোঁটা নেই; (৩) কমলালেবুর মধ্যে বিচি আছে, কিন্তু ডিম ও পৃথিবীর মধ্যে বিচি নেই; (৪) কমলালেবুর কেন্দ্রে কিছুটা ফাঁপা, কিন্তু ডিম ও পৃথিবীর কেন্দ্রে ফাঁপা নয়; (৫) কমলালেবুর মধ্যভাগ অনেকগুলো কোয়ার সমষ্টি এবং কোয়াগুলোকে একে অপর থেকে সহজে পৃথকও করা যায়, কিন্তু ডিম ও পৃথিবীর মধ্যেভাগ কমলালেবুর মতো নয়; (৬) ডিমের যেমন কয়েকটি স্তর আছে (শেল, শেলের নীচে পাতলা স্তর, সাদা তরল পদার্থের স্তর, হলুদ তরল পদার্থের স্তর, ইত্যাদি) পৃথিবীরও তেমনি কয়েকটি স্তর আছে (Crust, Mantle, Inner core, Outer core, etc.); (৭) ডিম ও পৃথিবী উভয়েরই পৃষ্ঠভাগ শক্ত পদার্থ এবং মধ্যভাগ নরম ও গলিত পদার্থ দ্বারা গঠিত। নীচের ছবিগুলোতে দেখুন তো পৃথিবীর আকারের সাথে কমলালেবু নাকি ডিমের সাদৃশ্য বেশী।  নোট: কুরআনে পৃথিবীকে সরাসরি স্ফেরিক্যাল ও ঘূর্ণায়মান উল্লেখ না করে পরোক্ষভাবে ইঙ্গিত দেয়ার পেছনে যৌক্তিক একটি কারণ যেটা হতে পারে সেটা হচ্ছে, বিষয় দুটি সেই সময়ের মানুষের কাছে সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য মনে হতো এবং যার ফলে তারা হয়তো কুরআনকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করতো। এমনকি নিকট অতীতেই গ্যালিলিও ও ব্রুনোর কাহিনী কে না জানে! কারণ একদিকে যেমন সেই সময়ের মানুষের কাছে ‘প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাস’ বলতে পৃথিবীটা সমতল ও অনড় ছিল, অন্যদিকে আবার পৃথিবীটা যে সত্যি সত্যি স্ফেরিক্যাল ও ঘূর্ণায়মান সেটা তাদেরকে পরীক্ষা করে দেখানোও সম্ভব হতো না। ফলে বিষয় দুটি সত্য হলেও তাদের কাছে কোন তথ্যই বহন করতো না। অতএব কোরআনের মূখ্য উদ্দেশ্য “পার্থিব ও অপার্থিব গাইডেন্স” ব্যর্থ হতে পারতো। কুরআনে তেমন কোন উক্তি নেই যেটা সেই সময়ের মানুষের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক এবং সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্যও মনে হতে পারে।

Share this: