পর্ব ১//: রোমীয় সভ্যতা বনাম ইসলামে নারীর অধিকার কেমন?

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম 

১ম পর্ব 

বিষয়: বিভিন্ন সভ্যতায় নারীর অধিকার বনাম ইসলামে নারীর অধিকার।

আলোচনা: রোমীয় সভ্যতা বনাম ইসলামে নারীর অধিকার কেমন?

\____________________________________/

সকল প্রশংসার একমাত্র যোগ্য মালিক মহান আল্লাহ্ সুবহানাহু  ওয়াতা'আলার। এছাড়া তাঁর প্রিয় হাবিব রাসূল (ﷺ) এর উপর অসংখ্য দরুদ ও সালাম এবং সেই সাথে তাঁর প্রিয় সঙ্গী- সাথীদের উপরে আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক। এছাড়া আল্লাহ্ আমাদেরকেও ক্ষমা করুন। আমীন 

 

আসসালামু আলাইকুম ওয়ারহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতাহু প্রিয় ভাই ও বোনেরা। মহান আল্লাহর নামে আমরা একটি ধারাবাহিক সিরিজ লেখার চেষ্টা করেছি বিভিন্ন পাঠকবর্গের জন্য বিশেষ করে যারা ইসলাম এবং ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করেন অথবা পড়াশোনা বা লেখালেখি করেন, তাদের জন্য খানিকটা হলেও উপকার হবে বলে আশাবাদী। এছাড়া বর্তমানে ইসলাম বিদ্বেষী অমুসলিম নাস্তিকরা সহ বিভিন্ন এজেন্ডারেরা নারীদের কে ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলেছে এবং বোঝাতে চাচ্ছে যে, ইসলাম নারীদের কোন উত্তম জীবন বিধান দিতে পারেনি, ইসলাম নারীদের অধিকার খর্ব করেছে ইত্যাদি ইত্যাদি বলে লেখালেখি, বক্তৃতা বা আলোচনা করার মাধ্যমে বিষয়টিকে জটিলতার দিকে রুপ দিচ্ছে। যার ফলে ইসলাম না জানা অনেক নারীরাই তাদের কথাকে যাচাই বাছাই ছাড়াই সত্য বলে মনে করে ইসলাম কে ভুল বুঝে বরঞ্চ ইসলামের বিরুদ্ধেই লেগে পড়েছে অথচ তাদের উচিত ছিল নিরপেক্ষ ভাবে ইসলামে নারীর অধিকার সম্পর্কে নিরপেক্ষ ভাবে গবেষণা করা। তো সেসব বিষয়ে যথার্থ জবাব দেওয়ার জন্যই এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। মূলত এখানে বিভিন্ন সভ্যতার ইতিহাসে নারীদের অধিকার বনাম চুড়ান্ত ইসলামে নারীদের অধিকারের বিষয়টিই তুলনামূলক ভাবে যাচাই করা হয়েছে এবং দেখানো হয়েছে ইসলাম পূর্ব বিভিন্ন সভ্যতার ইতিহাসে নারীদের অধিকার কেমন ছিল আর ইসলাম এসে নারীদের কেমন অধিকার দিয়েছে। তো আর বেশি কথা না বাড়িয়ে মূল আলোচনায় আসা যাক ইনশাআল্লাহু তাআ'লা। 

 

রোমীয় সমাজ ব্যবস্থায় নারীর অবস্থান কেমন ছিল?

* গ্রিক সভ্যতার পরে রোমীয় সভ্যতাই ছিল ইউরোপের সর্ববৃহৎ মানব সভ্যতা। আর এ সভ্যতায় বলতে গেলে নারীর কোন মান-সম্মান, ইজ্জত-মর্যাদা, অধিকার বলতে কিছুই ছিল না কেবলমাত্র কল্পনা করা ছাড়া। তো সেই সমাজ ব্যবস্থায় নারীর অধিকার কেমন ছিল তা কি জানেন? তাহলে দুটি ঐতিহাসিক কথার ভিত্তিতে তা বলছি।

 

"রোমীয় সমাজ ব্যবস্থায় নারীর অধঃপতিত অবস্থা এতটাই করুন ছিল যে, এক সভায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, নারী প্রাণহীন দেহ! এ কারণেই তার পরলৌকিক জীবন বিশ্বাস স্বীকৃত ছিল না। রোমীয় সমাজে নারী একটা অপবিত্র বস্তু হিসেবে বিবেচিত হতো। গোস্ত খাওয়া, হাসি তামাশা করা কিংবা কথা বার্তা বলা তার জন্য নিষিদ্ধ ছিল। যাতে কথা বলতে না পারে- এজন্য নারীদের মুখের উপর লোহার তালা লাগানো হতো!! [ আহমাদ শিলবি, মুকারানাতুল আদইয়ান; ২/১৮৮]

 

সারকথা হলো রোমীয় সভ্যতায় এ করুন চিত্র ফুটে ওঠে যে, রোম সাম্রাজ্যে নৈতিকতার ভিত্তি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, শিষ্টাচার ও ভদ্রতার শেকড় মাটি শূণ্য হয়ে পড়েছিল। ঐতিহাসিক Edward Gibbon রোম সাম্রাজ্যের এ অস্থিরতার চিত্র উল্লেখ করে বলেন," ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ দিকে রোমান সাম্রাজ্য পতন ও অধঃপতনের একেবারে শেষ ধাপে পৌঁছে গিয়েছিল। এ যেন সে বৃক্ষ, এক সময় যা ছিল সবুজ, বিস্তৃত এবং যার ছায়া ছিল বিশ্বের সকল জাতির আশ্রয়, কিন্তু এখন আছে শুধু তার কান্ড যা দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে ...।" [ Gibbon Edward; The History of the Decline & Fall of the Roman Empire (Oxford University Press 1904) Vol. 5, Chapter 45, Page: 127-8.]

 

তাহলে রোম সাম্রাজ্যের নারীর অবস্থা ছিল নিম্নরুপ:

১] নারী প্রাণহীন দেহ অর্থাৎ নারীর কোন ধরনের অধিকার ই নেই;

২] নারী অপবিত্র বস্তু;

৩] গোস্ত খাওয়া, হাসি তামাশা করা কিংবা কথা বার্তা বলা তার জন্য নিষিদ্ধ ছিল;

৪] নারীদের মুখের উপর লোহার তালা লাগানো হতো!! 

 

এখন আসুন জেনে নিই, পবিত্র ইসলামে নারীর অবস্থান কেমন?

 

1] ইসলামে নারী প্রাণহীন দেহ নয় অর্থাৎ নারীকে যথার্থ সম্মান, মর্যাদা এবং অধিকার দেওয়া হয়েছে। মহিমান্বিত ঐশীগ্রন্থ পবিত্র কোরআন মাজীদের ৪৬ নং সূরা আল-আহকাফের ১৫ নং আয়াতের মধ্যে বলেছেন:-"আমি মানুষকে তার মাতা-পিতার প্রতি সদয় ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। " [অনুবাদক: মুজিবুর রহমান]

 

সম্পূর্ণ আয়াত সহ এর তাফসীর পড়তে ক্লিক করুন:

https://www.hadithbd.com/quran/link/?id=4525

 

অর্থাৎ একজন নারীকে মহান আল্লাহ্ মাতার সম্মান দান করেছেন। আর তাঁর সাথে সদয় ব্যবহার করতে হবে। সদয় ব্যবহার করতে গেলে পরিপূর্ণ উত্তম ব্যবহার করতে হবে মাতার সাথে। এর মানে মাতা তাঁকে যে সকল আদেশ-নিষেধ জারি করবেন তা পালন করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। 

 

আবার পবিত্র কোরআনের ১৭নং সূরা বনী ইসরাঈলের ২৩ নং আয়াতে মহান আল্লাহ্ পিতা-মাতার প্রতি নির্দেশ দিয়ে বলেছেন:-"তোমার রব্ব নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদাত করবেনা এবং মাতা-পিতার প্রতি সদ্ব্যবহার করবে; তাদের একজন অথবা উভয়ে তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদেরকে বিরক্তিসূচক কিছু বলনা এবং তাদেরকে ভৎর্সনা করনা; তাদের সাথে কথা বল সম্মানসূচক নম্রভাবে।" [অনুবাদক: মুজিবুর রহমান]

 

উক্ত আয়াতের সম্পূর্ণ তাফসীর পড়তে ক্লিক করুন: 

https://www.hadithbd.com/quran/link/?id=2052

 

এইভাবে পবিত্র কোরআনের বহু জায়গায় মহান আল্লাহ্ নির্দেশিকা দান করেছেন পিতা মাতার প্রতি সর্বোত্তম ব্যবহারের। অর্থাৎ একজন নারীর সাথে সদয় আচারণের ক্ষেত্রে যতগুলো নৈতিকতা বিদ্যমান রয়েছে তার সবগুলোই প্রয়োগ করতে হবে। এর মানে মহান আল্লাহ্ নারীদের সর্বোচ্চ মর্যাদা এবং অধিকার দান করেছেন। 

 

[নোট: পবিত্র কোরআন বলছে," নারীদের অধিকার রয়েছে রয়েছে" ২:২২৮, ২৩৭; ৪:৭,১১,৩২ ইত্যাদি আয়াত দ্রষ্টব্য]

 

এছাড়া সহীহ হাদিসে বলা হয়েছে:-" মুআবিয়া ইবনে জাহিমা আস-সালামী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর সন্তোষ লাভের এবং আখেরাতে জান্নাত প্রাপ্তির আশায় আমি আপনার সাথে জিহাদে যেতে চাই। তিনি বলেনঃ তোমার জন্য দুঃখ হয়, তোমার মা কি জীবিত আছে? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বলেনঃ ফিরে গিয়ে তার সেবাযত্ন করো।"  [সুনানে ইবনে মাজাহ, জিহাদ অধ্যায়-হাদিস নং-২৭৮১]

 

এই কথাটি উক্ত সাহাবী পরপর ৩ বার বলেছেন এবং রাসূল (ﷺ) ও পরপর ৩ বার-ই একই উত্তর দিয়েছেন। এর মানে নারীকে তিনি সম্মানিত করেছেন, তাঁকে অধিকার দিয়েছেন। আলহামদুলিল্লাহ। 

সম্পূর্ণ হাদিস পড়তে ক্লিক করুন:

http://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=43397

 

আরো বলা হয়েছে এক ব্যক্তি ইবনু মাসউদ (রাঃ)-কে প্রশ্ন করল, কোন কাজটি সবচেয়ে ভাল? তিনি বললেন, আমি এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি বলেছেনঃ নির্দিষ্ট ওয়াক্তসমূহে নামায আদায় করা। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! এরপর কোন কাজটি সবচেয়ে ভাল? তিনি বললেনঃ পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা। আমি বললাম, অতঃপর কোনটি? তিনি বললেনঃ আল্লাহ তা'আলার রাস্তায় জিহাদ করা।" [জামে আত-তিরমিযি, হাদিস নং-১৭৩]

উক্ত হাদিস সম্পূর্ণ পড়তে ক্লিক করুন:

http://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=39193

 

উল্লেখ্য ইসলামে নারীর পরলৌকিক জীবন স্বীকৃত; পবিত্র কোরআন ৪:১২৪ ইত্যাদি আয়াত দ্রষ্টব্য।

 

২] ইসলামে নারী অপবিত্র বস্তু নয় অর্থাৎ নারী সম্মানিত। নারীকে মাতা হিসেবে, স্ত্রী হিসেবে, বোন হিসেবে সম্মান দিয়েছে ইসলাম। এছাড়া নারীরা সম্মানিত। নারীরা পুতঃপবিত্র হতে পারে [পবিত্র কোরআন ৩:৪২-৪৩; ৪:৩৪]। এছাড়া পবিত্র কোরআনে একজন সতী- সাধ্বী পবিত্র নারীর বিরুদ্ধে জঘন্য মিথ্যা অভিযোগ, অবাধ্যতা ও সীমালঙ্ঘনের জন্য অভিশাপ দেওয়া হয়েছে [পবিত্র কোরআন ৪:১৫৬; ৫:৭৮; ২৪:৪,২৩]। 

 

এছাড়া সহীহ হাদিসে বলা হয়েছে:-আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) সূত্রে নবী (ﷺ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় থেকে তোমরা বিরত থাকবে.....সরল স্বভাবা সতী-সাধ্বী মু’মিনাদের অপবাদ দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।" আর সতী-সাধ্বী নারীরাই পবিত্র হয়।

অনলাইন সোর্স থেকে পড়ুন:

http://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=26905

 

এইভাবে অসংখ্য রেফারেন্স দেওয়া যাবে। এছাড়া পবিত্র কোরআনে তো নারীদের পবিত্রতা সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হয়েছে। সূরা নিসা পড়লেই জানা যাবে। তাছাড়া রাসূল সাঃ কে পবিত্রতা অর্জনের কথা বলা মানেই সমগ্র নারী-পুরুষের পবিত্রতা অর্জনের কথা বলা অর্থাৎ সমগ্র মুমিন নর-নারীদের সর্বাবস্থায় পবিত্র থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে রাসূল সাঃ এর মাধ্যমে [পবিত্র কোরআনে ৭:৪ ইত্যাদি]।

 

৩] ইসলামে নারীদের জন্য গোস্ত খাওয়া, হাসি তামাশা করা কিংবা কথা বার্তা বলা তার জন্য নিষিদ্ধ না। মুসলিম নারীদের কে গোস্ত খাওয়া কোন নিষিদ্ধ নয়; হাসি তামাশাও করা যাবে তবে হ্যাঁ কেউ যেন কষ্ট না পায় এবং তাতে যেন মিথ্যা না থাকে। আর কথা বলা এটা তো মৌলিক অধিকার সেটা হোক ইসলাম অথবা অন্যান্য। 

 

৪] নারীদের মুখের উপর লোহার তালা লাগানো মানেই নারীদের অধিকার কেড়ে নেওয়া, তাদের অসম্মান করা, তাদের সাথে কাপুরুষের মতো আচারণ করা। আর এসব জঘন্য কাজকর্ম ইসলামে নিষিদ্ধ বরং হারাম। এরকম কাজ করার পরিণতি তাদের জন্য ভয়াবহ শাস্তি রয়েছে। 

 

বিঃদ্রঃ এ সম্পর্কে কোন তথ্য বা রেফারেন্স থাকলে দিয়ে সহায়তা করবেন। এবং আপনারা চাইলে বিনা অনুমতিতে কপি করতে পারেন। জাযাকাল্লাহ্ খাইরান 

 

 

Share this: