Are you sure?

ইতিহাস »  বিবিধ ইতিহাস

আত-তাবারী কর্তৃক আল-খাওয়ারিজমীকে অগ্নিপুজক বলা প্রসঙ্গে আলোচনা এবং আল-খাওয়ারিজমীর প্রকৃত ধর্মবিশ্বাস নির্ণয়।

 

বিষয় : আত-তাবারী কর্তৃক আল-খাওয়ারিজমীকে অগ্নিপুজক বলা প্রসঙ্গে আলোচনা এবং আল-খাওয়ারিজমীর প্রকৃত ধর্মবিশ্বাস নির্ণয়। 

 

লেখক : সামিউল হাসান তবিব আল-ইনফিরাদী

 

 0. সুচিপত্র :- 

 

 1. ভুমিকা।

 2. আত-তাবারী (রহ) নিজ পক্ষ হতে আল-খাওয়ারিজমীকে মাজুসি বলেন নি।

 3. আত-তাবারীর (রহ) তারিখ গ্রন্থে বর্ণিত সব তথ্য সঠিক না।

 4. আল-খাওয়ারিজমী কি আসলেই মাজুসি (অগ্নিপুজক) ছিলেন?  

 5. আল-খাওয়ারিজমী প্রকৃতপক্ষে একজন অমাজুসী ইমানদার মুসলিম ছিলেন।

 6. একটি সম্ভাবনা। 

 7. উপসংহার। 

 8. টিকাসমুহ।

 

 

1. ভুমিকা :- 

 

প্রসিদ্ধ মুসলিম বিজ্ঞানী ও গণিতবীদ 'মুহাম্মদ বিন মুসা আল-খাওয়ারিজমী' এর ধর্মবিশ্বাসের ব্যাপারে দাবি করা হয়ে থাকে যে তিনি নাকি আসলে একজন মাজুসী তথা অগ্নিপুজারী ছিলেন, মুসলিম ছিলেন না। এই দাবির পক্ষে উল্লেখ্য করা হয় যে আত-তাবারী (রহ) নাকি আল-খাওয়ারিজমীর নামের সহিত 'আল-মাজুসী' (অগ্নিপুজক) লকবটি ব্যবহার করেছেন, এবং এরদ্বারা নাকি প্রমাণিত হয় যে আল-খাওয়ারিজমী একজন অমুসলিম অগ্নিপুজারি ছিলেন। এই লেখাটিতে এব্যাপারটি নিয়েই আলোচনা করা হবে এবং আল-খাওয়ারিজমীর প্রকৃত ধর্মবিশ্বাস কি ছিলো তা নির্ণয় করা হবে। এবার মূল আলোচনা আরম্ভ করা যাক।

 

 2. আত-তাবারী (রহ) নিজ পক্ষ হতে আল-খাওয়ারিজমীকে মাজুসি বলেন নি :- 

 

আত-তাবারী (রহ) আল-খাওয়ারিজমীর নামের সহিত 'আল-মাজুসী' (অগ্নিপুজক) লকবটি ব্যবহার করেছেন, তিনি তাঁর তারিখ গ্রন্থে আল-খাওয়ারিজমীর নামটিকে এভাবে উল্লেখ্য করেছেন,

'محمد بن موسى الخوارزمي المجوسي القطربلي'_[1]

উচ্চারণ - 'মুহাম্মদ বিন মুসা আল-খাওয়ারিজমী আল-মাজুসী আল-কুতুরবালী'

 

কিন্ত এখানে এই উল্লেখ্য করার পিছনে একটা কাহিনী আছে। আত-তাবারী (রহ) প্রকৃতপক্ষে কোন 'প্রসঙ্গে' আলোচনা করতে গিয়ে এভাবে আল-খাওয়ারিজমীর নাম উল্লেখ্যকরাপুর্বক তার নামের সহিত 'আল-মাজুসী' লকবটি উল্লেখ্য করেছেন, এবার সেটা একটু দেখা যাক।

 

উপরে উল্লেখিত আল-খাওয়ারিজমীর 'আল-মাজুসী' লকববিশিষ্ট নামের অংশটির আগে ও পড়ে লিখিত কথাবার্তাগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যাবে যে আত-তাবারি মুলত 'খলিফাহ আল-ওয়াছিক বিল্লাহ' (الخليفة الواثق باللّه) প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে কথাপ্রসঙ্গে আল-খাওয়ারিযমীর নামটি 'আল-মাজুসী' লকব সহকারে উল্লেখ্য করেছেন।[1]

 

তিনি আল-ওয়াছিক বিল্লাহ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে একটি স্থানে লিখেছেন যে,

 

وذكر أنه لما اعتل علته التي مات فيها وسقي بطنه أمر بإحضار المنجمين، فأحضروا، وكان ممن حضر الحسن بن سهل، أخو الفضل بن سهل، والفضل بن إسحاق الهاشمي وإسماعيل بن نوبخت ومحمد بن موسى الخوارزمي المجوسي القطربلي_[1] 

 

অর্থ : "এবং এমনটা উল্লেখ্য করা হয়েছে যে যখন তিনি (আল-ওয়াছিক) সেই রোগটি দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন যেই রোগটি কিনা তার মৃত্যুর কারণ হয়েছিলো ও (যার ফলে) তার পেট সিক্তকৃত হয়েছিলো, তখন তিনি জ্যোতির্বিদদের হাজিরকরণের আদেশ জারী করেন,ফলে তাদের হাজির করা হয়, এবং যারা তখন হাজির হয়েছিলো তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন আল-হাসান বিন সাহল, আল-ফাদ্বাল বিন সাহলের ভাই, এবং আল-ফাদ্বাল বিন ইসহাক আল-হাশেমী, এবং ইসমাইল বিন নুবাখত, এবং মুহাম্মদ বিন মুসা আল-খাওয়ারিজমী আল-মাজুসী আল-কুতুরবালী।" 

 

আর এখান থেকেই মুলত দাবি করা হয় যে আত-তাবারী (রহ) নাকি আল-খাওয়ারিজমী

কে  'আল-মাজুসী'(অগ্নিপুজক) বলেছেন। এবার লক্ষ্য করুন, আত-তাবারী এখানে শুরুর দিকে বলেছেন 'وذكر أنه' অর্থাৎ "এবং এমনটা উল্লেখ্য করা হয়েছে যে", এবং এটা বলার পর বাকি কথাগুলো উল্লেখ্য করেছেন। সুতরাং অবশ্যই উপরে উল্লেখিত এই বক্তব্যের অংশটি আত-তাবারীর নিজস্ব না, উনার কর্তৃক নিজ পক্ষ বা তরফ হতে প্রদানকৃত কোনোকিছু না। যদি এটা আত-তাবারী (রহ) কর্তৃক নিজ পক্ষ হতে প্রদানকৃত কোনো তথ্য হতো, তাহলে তিনি (রহ) এখানে "এবং এমনটা উল্লেখ্য করা হয়েছে যে" কথাটা বাদে উক্ত তথ্যটিকে বর্ণনা করতেন। "এমনটা উল্লেখ্য করা হয়েছে", কার বা কাদের কর্তৃক উল্লেখ্য করা হয়েছে? কে বা কারা সেই উল্লেখ্যকারী বা উল্লেখ্যকারীগণ, তা এক্ষেত্রে অনুল্লেখিত অস্পষ্ট অজানা, সুতরাং এক্ষেত্রে উক্ত তথ্যটির উল্লেখ্যকারীরা অজ্ঞাত। অতএব, এক্ষেত্রে আত-তাবারী (রহ) এক বা একাধিক অজ্ঞাত ব্যাক্তি কর্তৃক উল্লেখিত একটি তথ্যকে নিছকই নিজ তারিখ গ্রন্থে নকল করেছেন। তিনি এখানে নিজ পক্ষ হতে এই তথ্যটি প্রদান করেন নি।

 

আল-খাওয়ারিজমীর নামটিকে 'আল-মাজুসী' লকবের সহিত উল্লেখ্য করার ব্যাপারটা মুলত এই তথ্যটিরই একটি অংশ, এক বা একাধিক অজ্ঞাত ব্যাক্তি একটি তথ্য বর্ণনা করেছেন, সেই বর্ণিত তথ্যে আল-খাওয়ারিজমীর নামের সহিত আল-মাজুসী ব্যবহার করা হয়েছে, এবং আত-তাবারী সেই অজ্ঞাত ব্যাক্তি বা ব্যাক্তিদের সুত্র ধরে উক্ত তথ্যটি নকল করেছেন। সুতরাং এক্ষেত্রে আত-তবারী নিজ পক্ষ হতে আল-খাওয়ারিজমীর নামের সহিত আল-মাজুসী লকবটি ব্যবহার করেন নি, বরং কোনো এক বা একাধিক অজ্ঞাত ব্যাক্তি বা ব্যাক্তিগণ আল-খাওয়ারিজমীর নামের সহিত এই আল-মাজুসী লকবটি ব্যবহার করে একটি তথ্য বর্ণনা করেছেন ও আত-তাবারী (রহ) সেই তথ্যটিকে তাঁর তারিখ গ্রন্থে এই বলে নকল করেছেন যে 'এমনটা বলা হয়েছে যে '।

 

 3. আত-তাবারীর (রহ) তারিখ গ্রন্থে বর্ণিত সব তথ্য সঠিক না :- 

 

অপরদিকে, আত-তাবারী (রহ) তাঁর নিজ তারিখ গ্রন্থটির ব্যাপারে লিখেছেন যে, 

 

 فما يكن في كتابي هذا من خبر ذكرناه عن بعض الماضين مما يستنكره قارئه، أو يستشنعه سامعه، من أجل أنه لم يعرف له وجها في الصحة، ولا معنى في الحقيقة_[2]

 

অর্থ : "যাই হোক, আমার এই কিতাবটিতে আমি কিছু অতীতের ব্যাক্তিদের নিকট হতে যেসব খবর (তথ্য) উল্লেখ্য করেছি, সেসব খবরের মধ্যে এমন কিছু খবরও রয়েছে যেগুলোকে পাঠক প্রত্যাখ্যান করতে পারেন, কিংবা শ্রবণকারী নিন্দা করতে পারেন, এই কারণে যে সেগুলোর জন্য কোনো বিশুদ্ধতার ভিত্তি জানা যায়না, ও বাস্তবে কোনো তাৎপর্য নেই।" 

 

অর্থাৎ স্বয়ং আত-তাবারী (রহ) নিজেই বলে রেখেছেন যে তিনি তাঁর 'তারিখ' গ্রন্থটিতে যেসব তথ্য অন্যদের নিকট হতে উল্লেখ্য করেছেন, সেসব তথ্যের মধ্যে এমনো কিছু তথ্য থাকতে পারে যেগুলো অশুদ্ধ ভুল প্রত্যাখ্যানযোগ্য ও নিন্দা করার যোগ্য। 

 

 4. আল-খাওয়ারিজমী কি আসলেই মাজুসি (অগ্নিপুজক) ছিলেন?  :- 

 

আত-তাবারী (রহ) তাঁর তারিখ গ্রন্থে এক বা একাধিক অজ্ঞাত ব্যাক্তি কর্তৃক বর্ণিত একটি তথ্যকে নকল করেছেন, সেই তথ্যটির মধ্যে আল-খাওয়ারিজমীকে 'মাজুসী' বা অগ্নিপুজক বলা হয়েছে। এই বিষয়টা বাদে আল-খাওয়ারিজমীকে অগ্নিপুজক বা মাজুসি বলার পক্ষে আর কোনো ভিত্তি নেই।

 

এখন প্রশ্ন হলো এই যে, এই বিষয়টা দ্বারা কি অউদো প্রমাণিত হয় যে আল-খাওয়ারিজমী মাজুসী (অগ্নিপুজক) ছিলেন?  

 

উত্তর হলো, মোটেও না, কেননা আত-তাবারি (রহ) কর্তৃক উল্লেখিত তথ্যটির মূল প্রদানকারী বা প্রদানকারীরা অজ্ঞাত অপরিচিত, তারা কে বা কারা তা উল্লেখিত হয়নি। আর অজ্ঞাত অপরিচিত ব্যাক্তিদের বক্তব্য দলিলযোগ্য নয় নির্ভরযোগ্য নয়।

 

সুতরাং বলা যায় যে আল-খাওয়ারিজমীকে অগ্নিপুজক বলার পক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণের অস্তিত্ব নেই। এরবিপরীতে, এমন একটি অকাট্য প্রমাণ রয়েছে যাদ্বারা একদম শতভাগ নিশ্চয়তার সহিত প্রমাণিত হয় যে আল-খাওয়ারিজমী একজন অমাজুসী মুসলিম ছিলেন ও আত-তাবারি (রহ) কর্তৃক উল্লেখিত তথ্যটি ভুল। সেই প্রমাণটি পঞ্চম পয়েন্টে উল্লেখ্য করা হবে।

 

 5. আল-খাওয়ারিজমী প্রকৃতপক্ষে একজন অমাজুসী ইমানদার মুসলিম ছিলেন :- 

 

মুহাম্মদ বিন মুসা আল-খাওয়ারিজমী তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ "الجبر والمقابلة" (আল-জাবরু ওয়াল মুকাবালাহ) এর ভুমিকাতে নিজ মুসলিম হয়ার ব্যাপারটা একদম স্পষ্ট করে দিয়েছেন। উনার কর্তৃক লিখিত উক্ত ভুমিকা দ্বারা কোনোরুপ সন্দেহ ব্যাতিত অকাট্যভাবে এটা প্রমাণিত হয় যে তিনি একজন ইমানদার মুসলিম ছিলেন।

 

একদিকে আল-খাওয়ারিজমী নিজে বলছেন যে তিনি একজন মুসলিম, অপরদিকে কোনো এক বা একাধিক অজ্ঞাত ব্যাক্তি বলছে যে আল-খাওয়ারিজমী অমুসলিম মাজুসী। স্পষ্টতই এক্ষেত্রে আল-খাওয়ারিজমীর নিজের ব্যাপারে করা নিজের মন্তব্যটিই চুরান্ত ও এর উপরে অন্য কারো কথা খাটবেনা।

 

এব্যাপারে গণিত ও জৌতির্বিদ্যা সম্পর্কিত ইতিহাসের  ইতিহাসবিদ 'Gerald James Toomer' বলেছেন : 

 

"Another epithet given to him by al-Ṭabarī, "al-Majūsī," would seem to indicate that he was an adherent of the old Zoroastrian religion. This would still have been possible at that time for a man of Iranian origin, but the pious preface to al-Khwārizmī's Algebra shows that he was an orthodox Muslim, so al-Ṭabarī's epithet could mean no more than that his forebears, and perhaps he in his youth, had been Zoroastrians"[3] 

 

 6. একটি সম্ভাবনা :- 

 

এইক্ষেত্রে এটা হয়ারও সম্ভাবনা আছে যে 'আল-মাজুসী আল-কুতুরবালী' এবং 'মুহাম্মদ বিন মুসা আল-খাওয়ারিযমী' দুজন আলাদা ও পৃথক ব্যাক্তি। এটা হয়ার কথা ছিলো এরকম 'محمد بن موسي الخوارزمي و المجوسي القطربلي' অর্থাৎ 'মুহাম্মদ বিন মুসা আল-খাওয়ারিজমী এবং আল-মাজুসী আল-কুতুরবালী' ; কিন্ত আত-তাবারির তারিখ গ্রন্থের প্রথম দিকের কোনো এক মূল পান্ডুলিপি হতে কোনো কারণে المجوسي القطربلي (আল-মাজুসী আল-কুতুরবালী) ও محمد بن موسي الخوارزمي (মুহাম্মদ বিন মুসা আল-খাওয়ারিজমী) এর মধ্যকার و (ওয়াও, অর্থ : এবং) কথাটা মুছে যায়, যার ফলে দুইটা  মিলে একত্রে 'মুহাম্মদ বিন মুসা আল-খাওয়ারিজমী আল-কুতুরবালী আল-মাজুসী' হয়ে যায় এবং আল-মাজূসী লকবটা আল-খাওয়ারিজমীর জন্য প্রযোজ্য হয়ে যায়।

 

বিজ্ঞান সম্পর্কিত ইতিহাসের ইতিহাসবিদ Rashed Roshdi এব্যাপারে বলেছেন,

 

"There is no need to be an expert on the period or a philologist to see that al-Tabari's second citation should read "Muhammad ibn Mūsa al-Khwārizmī and al-Majūsi al-Qutrubbulli," and that there are two people (al-Khwārizmī and al-Majūsi al-Qutrubbulli) between whom the letter wa [Arabic 'و' for the conjunction 'and'] has been omitted in an early copy. This would not be worth mentioning if a series of errors concerning the personality of al-Khwārizmī, occasionally even the origins of his knowledge, had not been made. "[3]

 

 7. উপসংহার :- 

 

সুতরাং, আল-খাওয়ারিজমীর ধর্মবিশ্বাসের ব্যাপারে এমনটা বলা সঠিক নয় যে তিনি অমুসলিম মাজুসী ছিলেন, বরং প্রকৃতপক্ষে তিনি একজন অমাজুসী ইমানদার মুসলিম ছিলেন।

 

 8. টিকাসমুহ :- 

 

[1]আত-তাবারী, তারিখুর রুসুলি ওয়াল মুলুক (9/151) 

 

[2]আত-তাবারী, তারিখুর রুসুলি ওয়াল মুলুক  (1/8)

 

[3]সুত্র : ইংরেজি ওইকিপিডিয়া।