বাইবেল বিড়ম্বনা: এলোহিম শব্দ; একবচন নাকি বহুবচন এবং বাইবেলের অনুবাদ।

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
ত্রিত্ববাদ বা তিন ঈশ্বর প্রমাণের জন্য খ্রিষ্টানগণ বাইবেলের আদিপুস্তক ১:২৬ এর উদাহরণ দিয়ে থাকেন যেখানে সম্পূর্ণ উদ্ধৃতিতে বলা হয়েছে:

আদিপুস্তক ১:২৬ SBCL
তারপর ঈশ্বর বললেন, “আমরা আমাদের মত করে এবং আমাদের সঙ্গে মিল রেখে এখন মানুষ তৈরী করি। তারা সমুদ্রের মাছ, আকাশের পাখি, পশু, বুকে-হাঁটা প্রাণী এবং সমস্ত পৃথিবীর উপর রাজত্ব করুক।

এই সেই বিখ্যাত ভার্স যেটার মাধ্যমে খ্রিস্টানগণ ত্রিত্ববাদ প্রমাণ করার ব্যর্থ অপচেষ্টা করেন।

▪︎ এখানে খ্রিষ্টানগণ ব্যাখ্যা করে থাকেন যে ঈশ্বর "আমরা আমাদের" বলতে নিজে, নিজের ছেলে ঈসা (যীশু) ও পবিত্র আত্মার কথা বলেছেন। আরে বাবা এটা ইহুদিদের লেখা তানাখ। সেটা নিজেদের আদিপুস্তক হিসেবে নিয়ে মনগড়া বললে তো হবে না। ইহুদিরা ওখানে ঈশ্বরকে বহুবচন লিখে।

שְׁמַע יִשְׂרָאֵל, יְהֹוָה אֱלהֵינוּ, יְהֹוָה אֶחָד:

▪︎ (শোনো হে ইসরায়েল, আমাদের প্রভু একজনই -ইয়াহ্ওয়ে) গায় কেনো? সেটা কখনও ভেবেছেন? দুই জায়গায় দুই রকম কথা নাকি?

যদি তিন ঈশ্বর হতো তাহলে এখানে লেখা থাকতো "তখন ঈশ্বরেরা বললো"। মোট কথা নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা দিতে গিয়েও এবং অনুবাদ করতে গিয়েও একজন ঈশ্বর লিখে রেখেছে। আর মনে করলাম যীশু যদি তখন ঈশ্বরের সাথেও থাকতো আর যীশু যদি ঈশ্বর হতো তাও আদিপুস্তকে ঈশ্বর না বরং লেখা থাকতো "ঈশ্বরেরা"। সেক্ষেত্রে বলা যায় ঈশ্বর, যীশুকে ঈশ্বর পদে দাড়ানোর নমিনেশন দেয় নি।

বলে রাখি, আদি পুস্তক হচ্ছে ইহুদিদের তাওরাতের অংশ। যা ঈসা বা তথাকথিত ঈশ্বর পুত্রের জন্মের বহু আগের জিনিস। তখন ঈসা (আঃ) এর কোনো অস্তিত্ব ছিল না ফলে ১:২৬ এ ঈসা (আঃ) এর থাকার কথা নয়। যদি এক্ষেত্রে খ্রিষ্টানরা বলতে চান যে, যীশু তখন ঈশ্বরের ডান পাশে আগে থেকেই বসে ছিল, তাহলে একটু বিস্তারিত বলা যাক।

ইংরেজি বাক্য : I have a pen এর বাংলা কি হবে?

  1. আমি আছে একটি কলম।
  2. আমার আছে একটি কলম।

বাংলা বাক্য : আমার একটি কলম আছে। এর ইংরেজি কি হবে?

  1. I have a pen.
  2. My have a pen.

যদিও ইংরেজিতে i মানে আমি তবু থাকা অর্থে বাক্যে i এর অর্থ "আমার"।

চীনা ভাষায় 我 (উয়ো) মানে আমি। কিন্তু যখন লিখতেছি " 我的名字是拉胡尔侯赛因 (উয়ো দি মিংজি শি রাহুল হুসাইন) = আমার নাম রাহুল হুসাইন। তখন 我 (উয়ো) "আমি"র বদলে আমার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

বহু ভাষায় এরকম আছে। He is better than me (me মানে আমাকে কিন্তু এখানে my এর কাজ করে) তেমনি হিব্রু ভাষারও বৈশিষ্ট্য অনুসারে এলোহিম একটি একবচন। যখন আপনি এলোহাকে বেশি সম্মান দিবেন, তখন এলোহার জায়গায় এলোহিম লিখতে হয়।

আদিপুস্তক ১:২৬ মূল হিব্রু
וַיֹּ֣אמֶר אֱלֹהִ֔ים נַֽעֲשֶׂ֥ה אָדָ֛ם בְּצַלְמֵ֖נוּ כִּדְמוּתֵ֑נוּ וְיִרְדּוּ֩ בִדְגַ֨ת הַיָּ֜ם וּבְע֣וֹף הַשָּׁמַ֗יִם וּבַבְּהֵמָה֙ וּבְכָל־הָאָ֔רֶץ וּבְכָל־הָרֶ֖מֶשׂ הָֽרֹמֵ֥שׂ עַל־הָאָֽרֶץ׃

בראשית ১:২৬ תנ"ך
এখানে: וַיֹּ֣אמֶר אֱלֹהִ֔ים נַֽעֲשֶׂ֥ה אָדָ֛ם בְּצַלְמֵ֖נוּ
וַיֹּ֣אמֶר (ওয়ায়য়োমের) = এবং বললো
אֱלֹהִ֔ים (এলোহিম) = ঈশ্বর
נַֽעֲשֶׂ֥ה (না'আশেহ্) = তৈরি করা যাক
אָדָ֛ם (আদম) = মানুষ
בְּצַלְמֵ֖נוּ (বেছালমেনু) = আমাদের মতো

i] মূল হিব্রুতে আমাদের মতো বা בְּצַלְמֵ֖נוּ মানে আমাদের শরীর যেরকম সেরকম বোঝায় না। এটির অর্থ "আমাদের যেরকম ইচ্ছা হয় সেরকম বা আমাদের কল্পনা অনুসারে। "

ii] বাংলা বাইবেলে এটার অনুবাদ করা হয়েছে "আমাদের প্রতিমূর্তিতে ও আমাদের সাদৃশ্যে" যা হিব্রু টেক্সটে নেই। যদি נראה כמו הצורה שלנו (looks like our shape) লেখা থাকতো তাহলে তার অর্থ হতো যে "আমাদের প্রতিমূর্তি ও আমাদের সাদৃশ্যে।"

iii] ইংরেজি বাইবেলে অনুবাদ করা হয়েছে: 

Genesis 1:26 KJV
And God said, Let us make man in our image, after our likeness: and let them have dominion over the fish of the sea, and over the fowl of the air, and over the cattle, and over all the earth, and over every creeping thing that creepeth upon the earth.

▪︎ যদি এলোহিম মানে বহু ঈশ্বর হতো, তাহলে এখানে লেখা থাকতো "And Gods said (ঈশ্বরেরা বললো)" যা কোথাও নেই। এটা যেহেতু ইহুদি ধর্মের তাওরাতের অংশ এবং ইহুদিদের ব্যাখ্যা এখানে ঈশ্বর কথা বলছেন দেবদূত বা ফেরেশতাদের সাথে।

হিব্রু ব্যাখ্যা :
המילה "אלוהים" היא ריבוי של המילה
אלוה, לדוגמא: אלוהים אדירים"

▪︎ এখানে ঈশ্বর দেখতে বহুবচন যদিও একজন। উদাহরণ: אלוהים אדירים "এলোহিম আদিরিম" ঈশ্বর সর্বশক্তিমান।

উইকিপিডিয়া : In the Hebrew Bible elohim (Hebrew: אֱלֹהִים‎ (Elohim), although plural in form, usually refers to a single deity.

শুধু এই টেক্সট নয়। বাইবেলের ৮০% অনুবাদ একটি থেকে অন্যটি আলাদা।

এলোহিম (אֱלֹהִ֔ים) হচ্ছে হিব্রু শব্দ। আরবি শব্দ الله (আল্লাহ) থেকে এলোহা শব্দ এসেছে। আপনারা হয়তো মনে করবেন আল্লাহ থেকে এলোহা কিভাবে আসে?

মূলত الله (আল্লাহ/ܐܠܠܗ) শব্দ আঞ্চলিক বিবর্তিত হয়ে সিরিয়াক বা সুরিয়ানীতে হয় আলাহা (ܐܠܗܐ) এবং কেনান (বর্তমান ফিলিস্তিন ও মিশরের কিছু অঞ্চল) ও মিশরীয় অঞ্চলে এলাহা হয়। মিশর অঞ্চলে আরবি ا (আ) ধ্বনি হয় "এ" এর মতো। আপনারা হয়তো খেয়াল করবেন "আলহামদুলিল্লাহ" কে মিশরীয়রা "এলহামদুলিল্লাহ" উচ্চারণ করে। আরবি ال ( আল) মিশরের দিকে "এল" উচ্চারিত হয়। এবং হিব্রু ভাষার জন্ম কিন্তু এই মিশরীয় কেনান অঞ্চলে। যার ফলে "আ" ধ্বনি হিব্রুতে "এ" এর মতো।

ছোট একটা উদাহরণ দেই -
হিব্রু শব্দ לא (লো) মানে "না"।
এখানে দুটি হিব্রু অক্ষর আছে ל (লাম/ ل) এবং א (আলেফ/ ا) ল + আ = "লা" না হয়ে হয় "লো"।
আরবিতেও لا (লা) মানে "না"।
এভাবে আরবি শব্দ আঞ্চলিক কারণে বিবর্তিত হয়ে হিব্রু শব্দ গঠন হয়েছে কিছুটা বিকৃতি হয়ে।

এলোহিমের এলোহা হিব্রু শব্দ হলেও শেষের "ইম" কিন্তু হিব্রু শব্দ নয়। এটি উগারিতীয় শব্দ। বাংলায় যেমন বে (ফার্সি) + আদব (আরবি) = বেয়াদব (বাংলা) শব্দ, তেমনি এলোহা (হিব্রু) + ইম (উগারীতিয়) = এলোহিম। তবে এটি এখন হিব্রু শব্দ হিসেবে পরিচিত পেয়ে স্থান দখল করেছে।

হিব্রুতে শেষে ים (ইম) থাকলে বহুবচন মনে হলেও এটি মূলত একবচন বোঝায়। এটি হিব্রু ভাষার বৈশিষ্ট্য। শুধু এলোহিম নয়; আরো যেমন חַיִים (হাইম) মানে জীবন। শেষে "ইম" থাকলেও এটি একবচন। এর অর্থ "জীবনগুলো" না। এটি একটি "জীবন" বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। এই জন্য এলোহিমকে দেখতে বহুবচন মনে হলেও এটি মূলত এক বচন হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। একটি হিব্রু বাক্য দিলে বুঝতে সহজ হবে : אלוהים ואלים (এলোহিম ই'আলিম) এর অর্থ "ঈশ্বর এবং ঈশ্বরগণ।" বাক্যে ঈশ্বর বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে "এলোহিম" আর ঈশ্বরগণ বা কয়েকজন ঈশ্বর বোঝাতে লিখতে হয় "আলিম"।

ত্রিত্ববাদের কথা যেহেতু বাইবেলে নেই এবং এটার জন্য খ্রিষ্টানগণ রাত দিন পরিশ্রম করতেছেন। 

লেখক: ΖΩΝΤΑΝΟΣ ΘΡΥΛΟΣ

Share this:

More articles

কুরআনের কিছু আয়াত দেখিয়ে নাস্তিকরা দাবী করে যে আল্লাহর ইচ্ছায় তারা পথভ্রষ্ট নাস্তিক হয়ে গেছে।যদিও তারা সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করে না,তবুও নিজেদের কুকর্মের জন্য সৃষ্টিকর্তাকেই দায়ী করে।অনেক মুসলিমের মনেও এ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরী হয়।তারা মনে করে যে মানুষের স্বাধীন কোনো ইচ্ছা নেই।এই লেখায় তাদের ভ্রান্ত ধারণা খন্ডন করে সত্য উন্মোচন করা হবে ইনশাআল্লাহ। অভিযোগকৃত আয়াতগুলো নিম্নরূপ: مَنۡ  یَّشَاِ اللّٰہُ  یُضۡلِلۡہُ ؕ وَ مَنۡ یَّشَاۡ  یَجۡعَلۡہُ  عَلٰی  صِرَاطٍ مُّسۡتَقِیۡمٍ–আল্লাহ যাকে চান, তাকে পথভ্রষ্ট....
15 Min read
Read more
অজ্ঞতা : ইসলামে তালাকের অধিকার শুধু পুরুষদের দেয়া হয়েছে। নারীকে তালাক দেয়ার অধিকার দেয়া হয়নি।নারীর ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন মূল্য নাই এই ধর্মে। অজ্ঞতার জবাব: ইসলামে নারীরা ও তালাক দিতে পারে: তালাক শব্দের অর্থ হচ্ছে বিয়ে বিচ্ছেদ। আর ইসলামি শরিয়তে তালাক নিকৃষ্ট কাজ বলে সাব্যস্ত করা হয়েছে। রাসূল সা: এক হাদিসে বলেন , “তালাক হচ্ছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট হালাল কাজ।” আর তালাক দেওয়ার ক্ষমতা শর্ত সাপেক্ষে নারী পুরুষ উভয়কে দেওয়া হয়েছে।  নারী পুরুষের তালাক দেওয়ার ক্ষমতার মাঝে পার্থক্যের পেছনে অনেক হিকমত আছে। জ্ঞানী নার....
5 Min read
Read more
পবিত্র কোরআনে চাঁদের আলো সম্পর্কে কী বলা হয়েছে? এটার কী নিজস্ব আলো আছে নাকি নেই? আসুন এ সম্পর্কে কিছু তথ্য জানা যাক: প্রাচীন সভ্যতাগুলো বিশ্বাস করত যে, চাঁদ নিজেই নিজের আলো ছড়ায় কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান আজ আমাদের বলে যে, চাঁদের নিজস্ব কোন আলো নেই বরং চাঁদের যে আলো তা হলো প্রতিফলিত আলো অর্থাৎ (Reflection Light)। আর মহিমান্বিত ঐশীগ্রন্থ পবিত্র আল কোরআন ১৪০০+ বছর আগে থেকেই এই ধ্রুবক সত্য বৈজ্ঞানিক তথ্যটি আমাদের কে জানিয়ে দিয়েছে ২৫ নং সূরা আল ফুরকান (الفرقان), আয়াত: ৬১-তে মহান আল্লাহ্ এরশাদ করেছেন:- ت....
7 Min read
Read more
আমরা কিভাবে আল্লাহর রাসূল ﷺ এর আনুগত্য করব? কী দিয়ে তাঁর আনুগত্য করব? কিভাবে তাঁর অনুসরণ করব? পবিত্র কোরআন যথেষ্ট হলে সহীহ হাদিসের কী প্রয়োজন? আমরা কী এটা মানতে বাধ্য? তাহলে আসুন এ সম্পর্কে কিছু আলোচনা করা যাক ইনশাআল্লাহু তাআলা। আল্লাহর রাসূল ﷺ ভবিষ্যদ্বাণী করে বলে গেছেন যে, "জেনে রাখো! তোমাদের পূর্ববর্তী আহলে কিতাব বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছে এবং এ উম্মাত অদূর ভবিষ্যতে তিয়াত্তর দলে বিভক্ত হবে। এর মধ্যে বাহাত্তর দল জাহান্নামে যাবে এবং একটি জান্নাতে যাবে। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! সে দল ....
36 Min read
Read more
মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ সুবাহানাহু ওয়াতা'আলা সকল মানবজাতির হেদায়েতের জন্য অর্থাৎ সত্য ও শাশ্বত পথ নির্দেশনা দানের জন্য মহান একটা গ্রন্থ পাঠিয়েছেন সকল যুগের উপযোগী করে, যাতে রয়েছে জ্ঞানের দিক থেকে পরিপূর্ণ সত্য বাণী, আদেশ-নিষেধ, উপদেশ, উপমা আর নিদর্শন সমূহ। এটা নির্দিষ্ট ভাবে নয় কোন বিজ্ঞান অথবা ভূগোল গ্রন্থের ন্যায় কোন বই। বরং এটা হলো পরিপূর্ণ হেদায়েত গ্রন্থ। তো মহান আল্লাহর প্রতিটি কথাই সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাবেই উত্তম বাণী এবং বহুত গভীর ও তাৎপর্যময়। তিনি একটি অক্ষর, শব্দ, বাক্যের মাধ্যমে বহু কিছুই....
37 Min read
Read more
নাস্তিকসহ কিছু মডারেট মুসলিমদেরকেও বলতে শুনা যায় যে, ইসলামে গান-বাজনা কেন নিষিদ্ধ! গান-বাজনা শুনতে সমস্যা কোথায়! এই লেখাটিতে গান-বাজনার ক্ষতিকর দিক, ইসলামে গান-বাজনা হারাম হওয়ার রেফারেন্স এবং কেন গান-বাজনা হারাম তা তুলে ধরা হয়েছে।  আল-কোরআনে গান-বাজনা হারাম  ● মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا ۚ أُولَٰئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُهِينٌ একশ্রেণীর লোক আছে যারা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে গোমরাহ কর....
17 Min read
Read more