কুরআন

কুরানের সুরা মায়েদা ৫:৩৮ আয়াত অনুযায়ী কি তাওবা করলে চোরের হাত কাঁটার শাস্তি মাফ হয়ে যাবে ?

AA
Abdullah Al Asif
৩ আগ, ২০২৫ · 4 মিনিট
চোরের শাস্তি ও তাওবার বিধান:

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহﷻ তা'আলা বলেন,

আল-মায়িদাহ ৫:৩৮-৪০

(৩৮) وَٱلسَّارِقُ وَٱلسَّارِقَةُ فَٱقْطَعُوٓا۟ أَيْدِيَهُمَا جَزَآءًۢ بِمَا كَسَبَا نَكَٰلًا مِّنَ ٱللَّهِۗ وَٱللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ

(৩৯) فَمَن تَابَ مِنۢ بَعْدِ ظُلْمِهِۦ وَأَصْلَحَ فَإِنَّ ٱللَّهَ يَتُوبُ عَلَيْهِۗ إِنَّ ٱللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

(৪০) أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ ٱللَّهَ لَهُۥ مُلْكُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلْأَرْضِ يُعَذِّبُ مَن يَشَآءُ وَيَغْفِرُ لِمَن يَشَآءُۗ وَٱللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَىْءٍ قَدِيرٌ

(৩৮) আর পুরুষ চোর ও নারী চোর — তাদের উভয়ের হাত কেটে দাও, তাদের অর্জনের প্রতিদান ও আল্লাহর পক্ষ থেকে শিক্ষণীয় আযাবস্বরূপ। আর আল্লাহ মহা পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

(৩৯) অতঃপর যে তার যুলমের পর তাওবা করবে এবং নিজকে সংশোধন করবে, তবে নিশ্চয় আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

(৪০) তুমি কি জান না যে, নিশ্চয় আল্লাহ — তাঁর জন্যই আসমানসমূহ ও যমীনের রাজত্ব। তিনি যাকে ইচ্ছা আযাব দেন এবং যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। আর আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।


আয়াতের তাৎপর্য বিশ্লেষণ:

এখানে (৫:৩৮ এ) আল্লাহﷻ বলেন — কেউ চুরি করলে তার হাত কেটে দাও। আর এটা:

  1. তাদের অর্জনের প্রতিদান।
  2. আল্লাহﷻর পক্ষ থেকে আযাব।

তারপর তাওবার সাধারণ মূলনীতি উল্লেখ করে (৫:৩৯ এ) আল্লাহﷻ বলেন যে, যুলম করার পর যে তাওবা করবে ও নিজেকে সংশোধন করবে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন।

কিন্তু এই আয়াতে আল্লাহ কোথাও "চোর যদি তাওবা করে তবে তোমরা তাকে ক্ষমা করো" — এমন কোনো নির্দেশনা কুরআনের কোথাও দেননি।

এখানে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন — "যেখানে আল্লাহﷻ ক্ষমা করছেন, সেখানে আমরা কেন ক্ষমা করব না?"

এমন প্রশ্নের জবাবে বলা হবে:

প্রথমত:

আমরা অন্তর্যামী নই, আমাদের কাছে ওহিও আসে না, আর আমরা গায়েবও জানি না। কাজেই আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না যে, এই চোরের তাওবা আল্লাহ কবুল করেছেন কিনা, অথবা সে আন্তরিকভাবে তাওবা করেছে কিনা।

দ্বিতীয়ত

তাওবা কবুলের একমাত্র অধিকার আল্লাহﷻর। একইভাবে বিধান প্রণয়নের একমাত্র এখতিয়ারও আল্লাহﷻর। আল্লাহﷻ যেখানে তাওবার কারণে বিচারককে ক্ষমা করার আদেশ অথবা এখতিয়ার দিয়েছেন, কেবল সেখানেই বিচারক ক্ষমা করতে পারেন।


তুলনামূলক আয়াত: যেখানে বিচারককে ক্ষমার এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে:

উদাহরণস্বরূপ, নিচের আয়াতে আল্লাহﷻ বলেন,

আন-নিসা ৪:১৬

وَٱلَّذَانِ يَأْتِيَٰنِهَا مِنكُمْ فَـَٔاذُوهُمَاۖ فَإِن تَابَا وَأَصْلَحَا فَأَعْرِضُوا۟ عَنْهُمَآۗ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ تَوَّابًا رَّحِيمًا

আর তোমাদের মধ্য থেকে যে দু'জন অপকর্ম (সমকামিতা) করবে, তাদেরকে তোমরা শাস্তি দাও। অতঃপর যদি তারা তাওবা করে এবং শুধরিয়ে নেয়, তবে তোমরা তাদের (শাস্তি দেওয়া) থেকে বিরত থাক। নিশ্চয় আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, দয়ালু।

এখানে সমকামীরা তাওবা করলে আল্লাহﷻ বিচারককে তাদের ক্ষমা করার আদেশ দিয়েছেন। কিন্তু আলোচ্য (৫:৩৯) নং আয়াতে বিচারককে এমন কোনো নির্দেশ আল্লাহﷻ দেননি।

একইভাবে সূরা আন-নূরের ৪ ও ৫ নং আয়াতে আল্লাহﷻ বিধান দিয়েছেন — যারা সচ্চরিত্র নারীদের বিরুদ্ধে অপবাদ দেবে কিন্তু উপযুক্ত সাক্ষী পেশ করতে পারবে না, তাদেরকে ৮০টি বেত্রাঘাত করতে হবে এবং তাদের সাক্ষ্য আজীবনের জন্য বাতিল হয়ে যাবে। তবে তারা তাওবা করে সংশোধিত হলে আল্লাহﷻ ক্ষমা করবেন — কিন্তু এখানে বিচারকের ক্ষমা করার অনুমতি নেই।

অনুরূপভাবে এর পরবর্তী (২৪:৬-১০) আয়াতগুলোতে বিধান রয়েছে — শুধুমাত্র স্বামী/স্ত্রী কর্তৃক ব্যভিচারের অভিযোগে অভিযুক্ত স্বামী/স্ত্রী যদি লিয়ান করে, তবে তাদের উপর বিচারকের হুদুদ প্রয়োগের এখতিয়ার নেই। কিন্তু তারা মিথ্যাচার করলে আল্লাহﷻ তাদের শাস্তি দেবেন।

অথচ আলোচ্য আয়াতে (৫:৩৮,৩৯,৪০) আল্লাহﷻ বিচারককে কেবল শাস্তিদানের আদেশ করছেন, কিন্তু তাওবা কবুলের এখতিয়ার নিজের ﷻ কাছে সংরক্ষিত রেখেছেন।


হাদীস ও ফিকহের আলোকে সিদ্ধান্ত:

হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ, সাহাবী রাঃ এবং সম্মানিত ইমামগণের ফিকহ থেকেও আমরা এই সিদ্ধান্তই পেয়েছি —

"যে কেউ নিসাব পরিমাণ চুরি করলে এবং চুরি প্রমাণিত হলে, তাওবার কারণে তার শাস্তি মাফ হবে না। এরপর সে আন্তরিক তাওবা করলে আল্লাহﷻ তার তাওবা কবুল করবেন।"

যেমন নিচের হাদীসে এসেছে:

হিলাল ইবন 'আলা (রহঃ) ... সাফওয়ান ইবন উমাইয়া (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি কা'বা শরীফ তাওয়াফ করলেন ও সালাত আদায় করলেন। তারপর তিনি তাঁর চাদর ভাঁজ করে মাথার নিচে রেখে শুয়ে পড়লেন। চোর এসে চাদর টান দিলে তিনি চোরকে ধরে ফেললেন এবং তাকে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট নিয়ে আসলেন এবং বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই ব্যক্তি আমার চাদর চুরি করেছে। তিনি চোরকে জিজ্ঞাসা করলেন: তুমি কি চাদর চুরি করেছ? সে বলল: হ্যাঁ। তিনি বললেন: একে নিয়ে যাও এবং তার হাত কেটে দাও। তখন সাফওয়ান বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার এই নিয়্যত ছিল না যে, মাত্র একটি চাদরের জন্য তার হাত কাটা যাবে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: আমার নিকট বিচার আনার পূর্বে যদি তুমি ক্ষমা করতে, তবে হতো; এখন আর হবে না।

গ্রন্থ: সুনান নাসাঈ (ইফাঃ)অধ্যায়: ৪৭ — চোরের হাত কাটা (كتاب قطع السارق)হাদিস নম্বর: ৪৮৮১তাহক্বীক: সহীহ।


উল্লেখিত হাদীসসহ সকল প্রকার হাদীসের কোথাও আমরা দেখি না যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ চুরির পর চোর তাওবা করবে কিনা — তা জিজ্ঞেস করেছেন।

এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, নিসাব পরিমাণ চুরি করলে তার শাস্তি হাত কেটে দেওয়া। এরপর যদি সে তাওবা করে বা সংশোধিত হয়, তাহলে আল্লাহﷻ তাকে ক্ষমা করে দেবেন।


এবং আল্লাহ ভালো জানেন।

বিনীত,

আব্দুল্লাহ আল আসিফ

২০ মে, ২০২৩

মন্তব্য

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন।