Are you sure?

বিজ্ঞান »  ইসলাম ও বিজ্ঞান কুরআন »  ফিকহ হাদিস »  ফিকহ

ইসলামি ফিকহ ও আধুনিক বিতর্ক নাবালিকার বিবাহ: ইসলামের প্রকৃত অবস্থান ও সমালোচনার শরিয়াহসম্মত জবাব


সারসংক্ষেপ:

ইসলামে নাবালিকার বিবাহ প্রসঙ্গে একটি সুপরিকল্পিত ভুল বর্ণনা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। ইসলামবিরোধীরা দাবি করেন যে ইসলাম শিশুবিবাহকে উৎসাহিত করে এবং মেয়েদের সম্মতিকে উপেক্ষা করে। এই লেখায় আমরা ওআইসি-র আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিকহ একাডেমির সর্বশেষ রেজোলিউশন, ক্লাসিক ফিকহের দলিল এবং হাদিসের আলোকে প্রমাণ করব যে ইসলামের মূল অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন — এবং  মানবাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বিতর্কের প্রকৃতি:

ইসলামের বিরুদ্ধে পরিচালিত আধুনিক সমালোচনার মধ্যে অন্যতম প্রধান বিষয় হলো নাবালিকার বিবাহ। পশ্চিমা মিডিয়া থেকে শুরু করে দেশীয় সেকুলারপন্থী মহল পর্যন্ত একটি একমাত্রিক বর্ণনা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে: "ইসলাম শিশুবিবাহকে ধর্মীয় স্বীকৃতি দেয়।" কিন্তু এই দাবিটি ইসলামি আইনশাস্ত্রের সূক্ষ্ম ও বহুস্তরীয় ঐতিহ্যকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে।

একজন সত্যানুসন্ধানী পাঠক হিসেবে আমাদের দেখতে হবে; ইসলামের মূল উৎস — কুরআন, সুন্নাহ এবং সম্মিলিত ইজমা — আসলে কী বলে।  এই বিশ্লেষণের কেন্দ্রে থাকবে ২০১৮ সালে মদিনায় অনুষ্ঠিত ওআইসি-র আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিকহ একাডেমির ২৩তম অধিবেশনের রেজোলিউশন নং ২১৭ (১/২৩)।

✦ ✦ ✦


আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিকহ একাডেমি: পরিচয় ও কর্তৃত্ব:

আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিকহ একাডেমি (IIFA) হলো ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (OIC)-র অন্তর্ভুক্ত বিশ্বের সর্বোচ্চ সম্মিলিত ফিকহি প্রতিষ্ঠান। এতে বিশ্বের ৫৭টি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের প্রতিনিধি ও শীর্ষস্থানীয় ফকিহগণ অংশগ্রহণ করেন। এই সংস্থার রেজোলিউশন সমূহ আধুনিক মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে প্রামাণিক সম্মিলিত ফিকহি দলিল হিসেবে বিবেচিত।

২০১৮ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর, মদিনা মুনাওয়ারায় অনুষ্ঠিত ২৩তম অধিবেশনে নাবালিকার বিবাহ: অভিভাবকের অধিকার, মেয়ের কল্যাণ এবং রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের সীমা বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণাপত্র উপস্থাপন ও আলোচনার পর নিম্নলিখিত রেজোলিউশন গৃহীত হয়।

নিচে আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিকহ একাডেমির রেজোলিউশন নং ২১৭ (১/২৩)-এর সম্পূর্ণ ও বিশ্বস্ত বাংলা অনুবাদ উপস্থাপন করা হলো। IIFA-এর সরকারি ইংরেজি প্রকাশনার ভিত্তিতে এই অনুবাদ করা হয়েছে এবং সুবিধার জন্য প্রতিটি ধারার সাথে মূল ইংরেজি পাঠও সংযুক্ত করা হয়েছে।

 

রেজোলিউশন নং ২১৭ (১/২৩) — সম্পূর্ণ বাংলা অনুবাদ:

আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিকহ একাডেমি (IIFA) · OIC · মদিনা মুনাওয়ারা · ১৯–২৩ সফর ১৪৪০ হি. / ২৮ অক্টোবর – ১ নভেম্বর ২০১৮ খ্রি.

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে

সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। আমাদের নবী, শেষ নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর উপর, তাঁর পরিবারবর্গের উপর এবং সকল সাহাবায়ে কেরামের উপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক।

ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিকহ একাডেমির পরিষদ মদিনা মুনাওয়ারায় ২৩তম অধিবেশনে মিলিত হয়েছে। পরিষদ "নাবালিকা মেয়ের বিবাহ: অভিভাবকের অধিকার, মেয়ের কল্যাণ এবং শরিয়াহর দৃষ্টিকোণ থেকে তা প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সীমা" বিষয়ে জমা দেওয়া গবেষণাপত্রগুলো পর্যালোচনা করেছে এবং বিষয়টির উপর বিস্তারিত আলোচনা শ্রবণ করেছে। অতঃপর নিম্নলিখিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে:


১.নাবালিকার সংজ্ঞা :
নাবালিকা হলো সেই মেয়ে যে বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছায়নি। ইসলামি ফকিহগণের নির্ধারণ অনুযায়ী এবং এর উপযুক্ততার বিবেচনায় বিবাহের স্বাভাবিক বয়স পনেরো থেকে ষোলো বছর।

মূল ইংরেজি:  "A young girl is someone who has not reached the age of puberty and the appropriate age for marriage from fifteen to sixteen years old due to its suitability and as determined by Islamic jurists."


২. শরিয়াহয় নির্দিষ্ট বয়সসীমার অনুপস্থিতি:
ইসলামি শরিয়াহ বিবাহ চুক্তির জন্য কোনো নির্দিষ্ট বয়সসীমা নির্ধারণ করেনি। বিবাহের বয়স এমন একটি বিষয় যা সময়, স্থান এবং বিবাহ ও পরিবার গঠনের জন্য উভয় পক্ষের সক্ষমতার পরিপ্রেক্ষিতে নির্ধারিত হয়।

মূল ইংরেজি: "Islamic law did not set up a particular age for the marriage contract. The age of marital act is one of the things which are determined according to the circumstances of time and place, and to the capacity of both parties in the contract for marriage and establishing a family."


৩. বাবার অভিভাবকত্ব:
শর্ত ও সীমামেয়ের প্রতি বাবার মমতা ও দয়া এবং তার কল্যাণের প্রতি বাবার দায়িত্বের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাবা আদালতের বিচারকের অনুমতি সাপেক্ষে তার মেয়েকে বিবাহ দেওয়ার অধিকার রাখেন। তবে বিবাহ যদি তার ক্ষতির কারণ হয়, তাহলে বাবার জন্য তাকে বিবাহ দেওয়া নিষিদ্ধ।

আর যদি আইনগত অভিভাবক বাবা না হন, তাহলে তিনি নাবালিকা মেয়েকে প্রথম ধারায় উল্লিখিত বয়সে না পৌঁছানো পর্যন্ত বিবাহ দিতে পারবেন না।

মূল ইংরেজি: "Considering the mercy and compassion owed by the father towards his daughter, and his obligation to take care of her welfare, he has the right to get his daughter married, after taking the judge's permission. If the marriage causes her damage, the father is forbidden to get her married. If the legal guardian is not the father, he is not allowed to get the young girl married until she reaches the age of puberty mentioned in paragraph I."
৪. বিচারিক অনুমতি ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বে নাবালিকা মেয়ের বিবাহের বয়স নির্ধারণ :

 বিচারকের অনুমতির উপর নির্ভরশীল হবে। প্রতিটি দেশের আইনগত অভিভাবককে বিবাহের বয়স নির্ধারণের ক্ষমতা অর্পণ করা হবে — যা সময়, স্থান ও বয়সের পরিস্থিতি এবং সকল পক্ষের কল্যাণ নিশ্চিত করে নির্ধারিত হবে।

মূল ইংরেজি: "Determining the age of young girl marriage should be calculated with the judge's permission, and permission should be entrusted to the legal guardian of every country which chooses marriage age based on the circumstances of time, place, and age, as well as what realizes the welfare of all parties."


৫.মেয়ের কল্যাণের অগ্রাধিকার :

বিবাহ প্রক্রিয়ায় মেয়ের কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

মূল ইংরেজি: "The girl's welfare should be taken into consideration in the marriage process."


৬.অভিভাবকত্ব কল্যাণের সাথে শর্তযুক্ত :

নাবালিকা মেয়ের উপর বাবা বা অন্য যেকোনো ধরনের অভিভাবকত্ব তার কল্যাণ নিশ্চিত হওয়ার সাথে শর্তযুক্ত।

মূল ইংরেজি: "The father guardianship or other types of guardianships on the young girl is tied to the realization of her welfare."
৭.মেয়ের সম্মতি ফরজ বা অপরিহার্য: 
মেয়ের সম্মতি নেওয়া ফরজ। নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর হাদিস অনুযায়ী — "কুমারী মেয়েকে বিবাহের ব্যাপারে অনুমতি চাইতে হবে, আর তার অনুমতি হলো তার চুপ থাকা; এবং যে নারী ইতিপূর্বে বিবাহিত ছিলেন তিনি তার অভিভাবকের চেয়ে নিজের ব্যাপারে বেশি হকদার" — তার সম্মতি ও সন্তুষ্টি ছাড়া বিবাহ দেওয়া জায়েজ নয়। তার সম্মতি ছাড়া বিবাহ হলে সে এ বিবাহ বাতিল করার অধিকার রাখে।

মূল ইংরেজি: "Getting the girl's approval for marriage is an obligation. It is not permissible to get her married without her consent and satisfaction as per the hadith of Prophet Muhammad (peace and blessings be upon him) which stated: 'the virgin should be asked for permission about marriage, and her permission is her silence, and a woman who has been previously married has more right to her person than her guardian.' If she has been married without her consent, she has the right to get an annulment of marriage."


৮. রাষ্ট্রের বয়স নির্ধারণ ও শাস্তি প্রবর্তনের অধিকার:
প্রতিটি দেশের মেয়ে, পরিবার ও সমাজের কল্যাণের দৃষ্টিকোণ থেকে উপযুক্ত বিবাহের বয়স নির্ধারণের অধিকার রয়েছে। এবং বিচারকের অনুমতি ছাড়া কোনো নাবালিকাকে বিবাহে বাধ্য করলে তার জন্য উপযুক্ত শাস্তি নির্ধারণের অধিকারও প্রতিটি দেশের রয়েছে।

মূল ইংরেজি: "Each country has the right to determine the appropriate marriage age, according to what it sees is realizing the welfare of the girl, family, and community, and each country has the right to determine an appropriate punishment for whoever forces a young girl into marriage without the judge's permission."

৯.স্বাস্থ্যগত মানদণ্ড বাধ্যতামূলক: 
নাবালিকা মেয়ের বিবাহে স্বাস্থ্যগত মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে এবং ন্যূনতম বয়স ১৫ থেকে ১৬ বছর রাখতে হবে। এই মানদণ্ড পূরণ ছাড়া কোনো নাবালিকাকে বিবাহে সহায়তা করা বা বাধ্য করা জায়েজ নয়। উপযুক্ত চিকিৎসকদের দ্বারা এই মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে।

মূল ইংরেজি: "Health criteria should be implemented for young girl marriage, with a minimum age of 15 to 16 years old. It is not permissible to assist or force a young woman into marriage without these criteria. Reliable doctors should estimate these criteria."

وَاللَّهُ أَعْلَمُ
— আর আল্লাহই সর্বজ্ঞ —



✦ ✦ ✦

রেজোলিউশন ২১৭-এর ধাপগুলোর বিস্তারিত বিশ্লেষণ:


নাবালিকার সংজ্ঞা ও বিবাহযোগ্য বয়স নির্ধারণইসলামি ফিকহে "নাবালিকা" বলতে মূলত সেই মেয়েকে বোঝানো হয় যে এখনো বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছায়নি। ইসলামে সাধারণভাবে বয়ঃসন্ধিতে না পৌঁছানো মেয়েকে বিবাহের উপযুক্ত ধরা হয় না। তবে যদি কোনো মেয়ে ১৫ বা ১৬ বছর বয়সে পৌঁছানোর পরেও বয়ঃসন্ধির কোনো আলামত বা প্রমাণ না মেলে, তথাপি ফিকহের বিধান অনুযায়ী তাকেবালিগাহ (প্রাপ্তবয়স্কা)গণ্য করা হয়। অর্থাৎ ১৫-১৬ বছর হলো বয়ঃসন্ধির অনুপস্থিতিতে বালিগাহ হওয়ার ফিকহি ন্যূনতম বয়সসীমা।

বিশ্লেষণ: এই সংজ্ঞাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। IIFA-র নির্ধারিত ১৫-১৬ বছর কোনো স্বেচ্ছামূলক সংখ্যা নয় — এটি ক্লাসিক ফিকহের সেই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধানের প্রতিফলন যে বয়ঃসন্ধির প্রমাণ না মিললেও এই বয়সে মেয়েকে শরিয়াহর দৃষ্টিতে বালিগাহ ধরা হয়। অতএব নাবালিকার বিবাহ মানে মূলত বয়ঃসন্ধির আগে বা এই ন্যূনতম বয়সসীমার আগে বিবাহ।

শরিয়াহয় নির্দিষ্ট বয়সসীমা না থাকার কারণইসলামি আইন বিবাহের জন্য একটি নির্দিষ্ট বয়স নির্ধারণ করেনি। বিবাহের বয়স সময়, স্থান ও উভয় পক্ষের সামর্থ্যের উপর নির্ভরশীল একটি পরিবর্তনশীল বিষয়।

বিশ্লেষণ: ইসলামি আইনের এই নমনীয়তা দুর্বলতা নয়, বরং এটি সব যুগ ও সমাজের জন্য প্রযোজ্য একটি শাশ্বত বিধানের প্রমাণ। এই নমনীয়তাকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্র বয়সসীমা নির্ধারণ করতে পারে।

বাবার অভিভাবকত্ব: শর্তসাপেক্ষ ও দায়িত্বশীলবাবা মেয়ের প্রতি মমতা ও কল্যাণের বাধ্যবাধকতার আলোকে এবং বিচারকের অনুমতি নিয়ে মেয়েকে বিয়ে দিতে পারবেন। তবে বিয়ে মেয়ের ক্ষতির কারণ হলে বাবার জন্য তা নিষিদ্ধ। বাবা ছাড়া অন্য অভিভাবক নাবালিকাকে বয়ঃসন্ধি পর্যন্ত বিয়ে দিতে পারবেন না।

বিশ্লেষণ: এই ধারাটি অভিভাবকের স্বেচ্ছাচারিতার পথ বন্ধ করে দেয়। বিচারকের অনুমতির শর্ত একটি বিচারিক তদারকি ব্যবস্থা তৈরি করে।
৪-৬
বিচারিক তদারকি ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতানাবালিকার বিবাহের বয়স নির্ধারণ বিচারকের অনুমতির সাপেক্ষে হবে। প্রতিটি দেশ সময়, স্থান ও বয়সের প্রেক্ষিতে সকলের কল্যাণ নিশ্চিত করে বিবাহের বয়স নির্ধারণের অধিকার রাখে। এক্ষেত্রে মেয়ের কল্যাণের অগ্রাধিকার বাধ্যতামুলক , বিবাহ প্রক্রিয়ায় মেয়ের কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

 

বিশ্লেষণ: এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারা। রাষ্ট্রীয় আইনের মাধ্যমে বয়সসীমা নির্ধারণকে ইসলামি কর্তৃপক্ষ বৈধ বলে স্বীকৃতি দিয়েছে।

মেয়ের সম্মতি: ফরজ ও অপরিহার্যমেয়ের সম্মতি নেওয়াফরজ। তার সম্মতি ও সন্তুষ্টি ছাড়া বিয়ে দেওয়া জায়েজ নয় — নবী ﷺ-এর হাদিস অনুযায়ী। সম্মতি ছাড়া বিয়ে হলে সে বিয়ে বাতিল করার অধিকার রয়েছে।

বিশ্লেষণ: এটি সেই ধারা যা পূর্বের ক্লাসিক ফিকহি বিতর্ককে নিষ্পত্তি করে। নাবালিকা হোক বা বালিগা — সম্মতি সর্বক্ষেত্রেই ফরজ এবং সম্মতিহীন বিয়ে বাতিলযোগ্য।
৮-৯
স্বাস্থ্যগত মানদণ্ড ও রাষ্ট্রীয় দণ্ডনাবালিকার বিবাহে স্বাস্থ্যগত মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে এবং ন্যূনতম বয়স ১৫-১৬ হতে হবে। বিচারকের অনুমতি ছাড়া জোরপূর্বক বিবাহ দেওয়া যাবে না। প্রতিটি দেশ এর লঙ্ঘনে উপযুক্ত শাস্তি নির্ধারণ করতে পারবে।

বিশ্লেষণ: এই ধারা ইসলামি ফিকহকে আধুনিক জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে এবং আইন প্রয়োগের পথ খুলে দিয়েছে।
✦ ✦ ✦

মূল দলিল: কুরআন ও হাদিস :

কুরআনের দলিল :

 

সূরা আন-নিসা:  (৪:৬) — এতিমদের সম্পদ ফেরত দেওয়ার বিষয়ে বলা হয়েছে: "যতক্ষণ না তারা বিবাহযোগ্য বয়সে পৌঁছায়।" চার মাজহাবীর ইমাম ,  ইবনে শুবরুমা ও অপর তাফসীর কারক  এই আয়াত থেকে যুক্তি দেন যে বুদ্ধিমত্তা পরিপক্ক না হলে বিবাহও দেওয়া উচিত নয়।

 


সূরা আত-তালাক: (৬৫:৪) — যারা এখনো ঋতুমতী হয়নি তাদের ইদ্দতের বিধান দেওয়া হয়েছে। এই আয়াতটি নাবালিকা বিবাহের বাস্তবতাকে আইনি কাঠামোর আওতায় এনেছে, কিন্তু একে উৎসাহিত করেনি।

হাদীসের দলিল :

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "কুমারী মেয়েকে বিবাহ দেওয়ার আগে তার অনুমতি নিতে হবে।" সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন: তার অনুমতি কীভাবে বোঝা যাবে? তিনি বললেন: "সে চুপ থাকলেই তার সম্মতি।"—  ( সহিহ বুখারি: ৫১৩৬ | সহিহ মুসলিম: ১৪১৯ )

হযরত খানসা বিনতে খিদাম আল-আনসারিয়া (রা.) জানান যে তার বাবা তার অসম্মতিতে বিবাহ দেওয়ার পর তিনি নবী ﷺ-এর কাছে গেলে নবী ﷺ সেই বিবাহ বাতিল করে দেন।—  ( সহিহ বুখারি: ৫১৩৮ | সুনান আবু দাউদ: ২০৯৬ )


✦ ✦ ✦

সমালোচনা ও শরিয়াহসম্মত জবাব:

ইসলামবিরোধী সমালোচনা: ইসলামের প্রকৃত অবস্থান ও জবাব:
"ইসলাম শিশুবিবাহকে বৈধ করে" ইসলামে বয়ঃসন্ধির আগে মেয়েকে বিবাহের উপযুক্ত ধরা হয় না। বয়ঃসন্ধির প্রমাণ না মিললেও ১৫-১৬ বছরে ফিকহের বিধানে মেয়েকে বালিগাহ গণ্য করা হয়। IIFA রেজোলিউশন ২১৭ এই বিধানকেই আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে এবং রাষ্ট্রকে আরও উচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণের অধিকার দিয়েছে।
"মেয়েদের সম্মতির কোনো মূল্য নেই" রেজোলিউশনের ৭ নং ধারায় সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে: সম্মতি নেওয়া ফরজ, সম্মতিহীন বিয়ে বাতিলযোগ্য।
"আয়েশা (রা.)-এর বিবাহই প্রমাণ যে ইসলাম শিশুবিবাহ সমর্থন করে" এই বিবাহ একটি বিশেষ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ঘটেছিল। ইসলামি আইনবিদরা এটিকে সর্বকালের বিধান হিসেবে গণ্য করেন না; বরং সময় ও পরিস্থিতির ভিত্তিতে বিধান পরিবর্তনযোগ্য।
"অভিভাবক জোর করে বিয়ে দিতে পারেন" রেজোলিউশনের ৩ নং ধারা বলে: ক্ষতির কারণ হলে বাবার জন্যও বিয়ে দেওয়া নিষিদ্ধ। বিচারকের অনুমতি বাধ্যতামূলক।
"ইসলামি আইনে কোনো বয়সসীমা নেই" IIFA ন্যূনতম ১৫-১৬ বছর নির্ধারণ করেছে এবং স্বাস্থ্যগত মানদণ্ড পালনকে বাধ্যতামূলক করেছে।
"মুসলিম দেশগুলো এ বিষয়ে নীরব" "মেয়ের সম্মতি নেওয়া ফরজ। তার সম্মতি ও সন্তুষ্টি ছাড়া বিয়ে দেওয়া জায়েজ নয়। সম্মতি ছাড়া বিয়ে হলে সে বিয়ে বাতিল করার অধিকার রয়েছে।"
৫৭টি মুসলিম দেশের প্রতিনিধিত্বকারী OIC-র ফিকহ একাডেমি ২০১৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এই রেজোলিউশন গ্রহণ করেছে।


মাকাসিদুশ শরিয়াহর আলোকে বিশ্লেষণ:

ইসলামি আইনের পাঁচটি মূল উদ্দেশ্য (মাকাসিদ) হলো:  জীবন রক্ষা, বুদ্ধি রক্ষা, বংশ রক্ষা, সম্পদ রক্ষা এবং দ্বীন রক্ষা। নাবালিকার বিবাহ প্রশ্নে এই মাকাসিদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:

জীবন রক্ষা (হিফযুন নাফস):  অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিবাহ তার শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে — বিশেষত সহবাস ও গর্ভধারণের ক্ষেত্রে। IIFA-র রেজোলিউশনের ৯ নং ধারায় স্বাস্থ্যগত মানদণ্ড পালনের কথা বলা হয়েছে ঠিক এই কারণেই।

বুদ্ধি রক্ষা (হিফযুল আকল): সম্মতি দেওয়ার জন্য যথেষ্ট মানসিক পরিপক্কতা প্রয়োজন। ইবনে শুবরুমার মতে, বুদ্ধিমত্তা পরিপক্ক না হওয়া পর্যন্ত বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাই নেই।

বংশ রক্ষা (হিফযুন নাসল): সুস্থ পরিবার গঠনের জন্য উভয় পক্ষের প্রস্তুতি অপরিহার্য। অপরিপক্ক বিবাহ পরিবার প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে।

✦ ✦ ✦

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ন্যায়সংগত মূল্যায়ন:

সমালোচকরা প্রায়ই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট উপেক্ষা করেন। সপ্তম শতাব্দীর আরবে — এবং বিশ্বের অধিকাংশ সমাজে — অল্প বয়সে বিয়ে একটি সাধারণ প্রথা ছিল। রোমান আইনে বিবাহের বয়স ছিল ১২ বছর; ইউরোপের মধ্যযুগেও একই চিত্র। ইসলাম সেই প্রেক্ষাপটে এসে অভিভাবকের ক্ষমতায় লাগাম টানল, সম্মতির বিধান প্রবর্তন করল, এবং মেয়ের কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিল — এটি সেই যুগের বিচারে ছিল একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।

আধুনিক যুগে ইসলামি ইজতিহাদ এই বিধানকে আরও সুনির্দিষ্ট করেছে। IIFA-র রেজোলিউশন সেই ধারাবাহিকতারই প্রমাণ।

উপসংহার:
ইসলামের বিরুদ্ধে নাবালিকার বিবাহ-সংক্রান্ত সমালোচনা মূলত তিনটি ভুলের উপর দাঁড়িয়ে: (১) ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের অজ্ঞতা, (২) ফিকহি ঐতিহ্যের বৈচিত্র্য উপেক্ষা করা, এবং (৩) আধুনিক মুসলিম আইনি চিন্তাধারাকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া।

IIFA-র রেজোলিউশন ২১৭ স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ইসলামি আইনবিদরা: মেয়ের সম্মতিকে ফরজ বলেছেন, ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ করেছেন, রাষ্ট্রীয় আইনের বৈধতা স্বীকার করেছেন, এবং জোরপূর্বক বিবাহকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন।

অতএব, ইসলামের বিরুদ্ধে "শিশুবিবাহ সমর্থন"-এর অভিযোগ কেবল অজ্ঞতা বা অসদুদ্দেশ্য থেকেই উৎসারিত হতে পারে। ইসলামের প্রকৃত অবস্থান হলো: মেয়ের কল্যাণ, তার সম্মতি এবং তার সুরক্ষা — এই তিনটিই অপরিহার্য।

✦ ✦ ✦

তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স: 1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11

 


  1. ⇧ International Islamic Fiqh Academy (IIFA).Resolution No. 217 (1/23) on Young Girls Marriage.23rd Session, Madinah, October–November 2018.https://iifa-aifi.org/en/6252.html
  2. ⇧ সহিহ আল-বুখারি, হাদিস নং ৫১৩৬ — কুমারীর সম্মতির বিধান। ইমাম মুহাম্মাদ বিন ইসমাঈল আল-বুখারি (র.)।
  3. ⇧ সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৪১৯ — বিবাহে সম্মতির আবশ্যকতা। ইমাম মুসলিম বিন আল-হাজ্জাজ (র.)।
  4. ⇧ সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং ২০৯৬ — সম্মতিহীন বিয়ে বাতিলের ঘটনা। ইমাম আবু দাউদ আস-সিজিস্তানি (র.)।
  5. ⇧ আল-কাসানি, আলাউদ্দিন।বাদাই'উস সানাই'। কিতাবুন নিকাহ — হানাফি বিবাহ বিধান।
  6. ⇧ ইবনে কুদামা, মুওয়াফফাকুদ্দিন।আল-মুগনি। কিতাবুন নিকাহ — হাম্বলি মাযহাবের বিবাহ বিধান।
  7. ⇧ আন-নাওয়াওয়ি, ইয়াহইয়া বিন শারাফ।মিনহাজুত তালিবিন। শাফেয়ি মাযহাবের পারিবারিক আইন।
  8. ⇧ ইবনে আশুর, মুহাম্মাদ তাহের।মাকাসিদুশ শরিয়াহ আল-ইসলামিয়্যা। দারুস সালাম, ২০০৬।
  9. ⇧ আয-যুহাইলি, ওয়াহবা।আল-ফিকহুল ইসলামি ওয়া আদিল্লাতুহ, খণ্ড ৯। দারুল ফিকর, দামেস্ক।
  10. ⇧ সূরা আত-তালাক (৬৫:৪) — নাবালিকার ইদ্দত প্রসঙ্গ। আল-কুরআনুল করিম , আয়াত ও তাসফসীর ।
  11. ⇧ সূরা আন-নিসা (৪:৬) — এতিমের সম্পদ প্রসঙ্গ । আল-কুরআনুল করিম,। আয়াত ও তাসফসীর।