
সারসংক্ষেপ:
ইসলামে নাবালিকার বিবাহ প্রসঙ্গে একটি সুপরিকল্পিত ভুল বর্ণনা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। ইসলামবিরোধীরা দাবি করেন যে ইসলাম শিশুবিবাহকে উৎসাহিত করে এবং মেয়েদের সম্মতিকে উপেক্ষা করে। এই লেখায় আমরা ওআইসি-র আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিকহ একাডেমির সর্বশেষ রেজোলিউশন, ক্লাসিক ফিকহের দলিল এবং হাদিসের আলোকে প্রমাণ করব যে ইসলামের মূল অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং মানবাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
✦ ✦ ✦
ভূমিকা:
ইসলামের বিরুদ্ধে পরিচালিত আধুনিক সমালোচনার মধ্যে অন্যতম প্রধান বিষয় হলো নাবালিকার বিবাহ। পশ্চিমা মিডিয়া থেকে শুরু করে দেশীয় সেকুলারপন্থী মহল পর্যন্ত একটি একমাত্রিক বর্ণনা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে: 'ইসলাম শিশুবিবাহকে ধর্মীয় স্বীকৃতি দেয়।' কিন্তু এই দাবিটি ইসলামি আইনশাস্ত্রের সূক্ষ্ম ও বহুস্তরীয় ঐতিহ্যকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে।
একজন সত্যান্বেষী পাঠক হিসেবে আমাদের দেখতে হবে; ইসলামের মূল উৎস — কুরআন, সুন্নাহ এবং সম্মিলিত ইজমা — আসলে কী বলে। এই বিশ্লেষণের কেন্দ্রে থাকবে ২০১৮ সালে মদিনায় অনুষ্ঠিত ওআইসি-র আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিকহ একাডেমির ২৩তম অধিবেশনের রেজোলিউশন নং ২১৭ (১/২৩)।
আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিকহ একাডেমি: পরিচয় ও কর্তৃত্ব:
আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিকহ একাডেমি (IIFA) হলো ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (OIC)-র অন্তর্ভুক্ত বিশ্বের সর্বোচ্চ সম্মিলিত ফিকহি প্রতিষ্ঠান। এতে বিশ্বের ৫৭টি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের প্রতিনিধি ও শীর্ষস্থানীয় ফকিহগণ অংশগ্রহণ করেন। এই সংস্থার রেজোলিউশনসমূহ আধুনিক মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে প্রামাণিক সম্মিলিত ফিকহি দলিল হিসেবে বিবেচিত।
২০১৮ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বর, মদিনা মুনাওয়ারায় অনুষ্ঠিত ২৩তম অধিবেশনে 'নাবালিকার বিবাহ: অভিভাবকের অধিকার, মেয়ের কল্যাণ এবং রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের সীমা' বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণাপত্র উপস্থাপন ও আলোচনার পর নিম্নলিখিত রেজোলিউশন গৃহীত হয়।
রেজোলিউশন ২১৭-এর সম্পূর্ণ বাংলা অনুবাদ:
মূল সূত্র: IIFA, Resolution No. 217 (1/23), 23rd Session, Madinah, October–November 2018.
IIFA-র সরকারি ইংরেজি প্রকাশনার ভিত্তিতে সম্পূর্ণ বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে। প্রতিটি ধারার সাথে মূল ইংরেজি পাঠ সংযুক্ত রাখা হয়েছে যাচাইয়ের সুবিধার জন্য।
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। আমাদের নবী, শেষ নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর উপর, তাঁর পরিবারবর্গের উপর এবং সকল সাহাবায়ে কেরামের উপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিকহ একাডেমির পরিষদ মদিনা মুনাওয়ারায় ২৩তম অধিবেশনে মিলিত হয়েছে এবং বিস্তারিত আলোচনা শেষে নিম্নলিখিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে:
ধারা ১: নাবালিকার সংজ্ঞা:
নাবালিকা হলো সেই মেয়ে যে বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছায়নি। ইসলামি ফকিহগণের নির্ধারণ অনুযায়ী এবং এর উপযুক্ততার বিবেচনায় বিবাহের স্বাভাবিক বয়স পনেরো থেকে ষোলো বছর।
“A young girl is someone who has not reached the age of puberty and the appropriate age for marriage from fifteen to sixteen years old due to its suitability and as determined by Islamic jurists.”
বিশ্লেষণ: ইসলামে সাধারণভাবে বয়ঃসন্ধিতে না পৌঁছানো মেয়েকে বিবাহের উপযুক্ত ধরা হয় না। তবে যদি কোন কারনে ১৫-১৬ বছর বয়সেও বয়ঃসন্ধির কোনো আলামত না মেলে, তথাপি ফিকহের বিধান অনুযায়ী তাকে বালিগাহ (প্রাপ্তবয়স্কা) গণ্য করা হয়। অর্থাৎ ১৫-১৬ বছর হলো বয়ঃসন্ধির অনুপস্থিতিতে বালিগাহ হওয়ার ফিকহি ন্যূনতম বয়সসীমা।
ধারা ২: শরিয়াহয় নির্দিষ্ট বয়সসীমার অনুপস্থিতি:
ইসলামি শরিয়াহ বিবাহ চুক্তির জন্য কোনো নির্দিষ্ট বয়সসীমা নির্ধারণ করেনি। বিবাহের বয়স এমন একটি বিষয় যা সময়, স্থান এবং বিবাহ ও পরিবার গঠনের জন্য উভয় পক্ষের সক্ষমতার পরিপ্রেক্ষিতে নির্ধারিত হয়।
মূল ইংরেজি: “Islamic law did not set up a particular age for the marriage contract. The age of marital act is one of the things which are determined according to the circumstances of time and place, and to the capacity of both parties in the contract for marriage and establishing a family.”
বিশ্লেষণ: ইসলামি আইনের এই নমনীয়তা দুর্বলতা নয়, বরং এটি সব যুগ ও সমাজের জন্য প্রযোজ্য একটি শাশ্বত বিধানের প্রমাণ। এই নমনীয়তাকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্র প্রয়োজনে বয়সসীমা নির্ধারণ করতে পারে।
ধারা ৩: বাবার অভিভাবকত্ব: শর্ত ও সীমা:
মেয়ের প্রতি বাবার মমতা ও দয়া এবং তার কল্যাণের প্রতি বাবার দায়িত্বের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাবা আদালতের বিচারকের অনুমতি সাপেক্ষে তার মেয়েকে বিবাহ দেওয়ার অধিকার রাখেন। তবে বিবাহ যদি তার ক্ষতির কারণ হয়, তাহলে বাবার জন্য তাকে বিবাহ দেওয়া নিষিদ্ধ। আর যদি আইনগত অভিভাবক বাবা না হন, তাহলে তিনি নাবালিকা মেয়েকে প্রথম ধারায় উল্লিখিত বয়সে না পৌঁছানো পর্যন্ত বিবাহ দিতে পারবেন না।
মূল ইংরেজি: “Considering the mercy and compassion owed by the father towards his daughter, and his obligation to take care of her welfare, he has the right to get his daughter married, after taking the judge's permission. If the marriage causes her damage, the father is forbidden to get her married. If the legal guardian is not the father, he is not allowed to get the young girl married until she reaches the age of puberty mentioned in paragraph I.”
বিশ্লেষণ: এই ধারাটি অভিভাবকের স্বেচ্ছাচারিতার পথ বন্ধ করে দেয়। বিচারকের অনুমতির শর্ত একটি প্রাতিষ্ঠানিক বিচারিক তদারকি ব্যবস্থা নিশ্চিত করে।
বিশেষ সংযোজন: অভিভাবকের জুলুমের ক্ষেত্রে ইসলামের প্রতিকারমূলক বিধান
অভিভাবক কর্তৃক জুলুম বা অন্যায় সংঘটিত হলে ইসলাম কাজি (বিচারক) বা খলিফাকে এর প্রতিবিধান করার সুযোগ ও ক্ষমতা দিয়েছে। যদি কোনো অভিভাবক তার দায়িত্বের বাইরে গিয়ে মেয়ের ক্ষতির কারণ হন বা জুলুম করেন, তাহলে সেই অভিভাবক অভিভাকত্বের যোগ্যতা হারান। এক্ষেত্রে ফিকহের সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান হলো:
অভিভাবক না থাকলে অথবা জালিম প্রমাণিত হলে বিচারক (কাজি) বা উলিল আমর (রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ) অভিভাবকত্ব গ্রহণ করবেন এবং মেয়ের স্বার্থ রক্ষা করবেন।
ইসলামি ফিকহে এই মূলনীতি সুপ্রতিষ্ঠিত: 'আস-সুলতানু ওয়ালিয়্যু মান লা ওয়ালিয়্যা লাহু' — অর্থাৎ, যার কোনো অভিভাবক নেই, রাষ্ট্রই তার অভিভাবক।
বিচারক কেবল পাশে দাঁড়ানোর ভূমিকাই পালন করেন না, প্রয়োজনে জুলুমকারী অভিভাবকের স্থলে অভিভাবকত্ব পরিচালনারও দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন।
এই বিধানটি ইসলামি বিচার ব্যবস্থার মধ্যে একটি শক্তিশালী সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। এটি প্রমাণ করে যে ইসলামে অভিভাবকত্ব কোনো নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নয়, বরং এটি একটি শর্তযুক্ত আমানত যা জবাবদিহিতার আওতায়।
ধারা ৪: বিচারিক অনুমতি ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব:
নাবালিকা মেয়ের বিবাহের বয়স নির্ধারণ বিচারকের অনুমতির উপর নির্ভরশীল হবে। প্রতিটি দেশের আইনগত অভিভাবককে বিবাহের বয়স নির্ধারণের ক্ষমতা অর্পণ করা হবে — যা সময়, স্থান ও বয়সের পরিস্থিতি এবং সকল পক্ষের কল্যাণ নিশ্চিত করে নির্ধারিত হবে।
মূল ইংরেজি: “Determining the age of young girl marriage should be calculated with the judge's permission, and permission should be entrusted to the legal guardian of every country which chooses marriage age based on the circumstances of time, place, and age, as well as what realizes the welfare of all parties.”
বিশ্লেষণ: রাষ্ট্রীয় আইনের মাধ্যমে বয়সসীমা নির্ধারণকে ইসলামি কর্তৃপক্ষ বৈধ বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। এটি একটি যুগান্তকারী স্বীকৃতি।
ধারা ৫: মেয়ের কল্যাণের অগ্রাধিকার:
বিবাহ প্রক্রিয়ায় মেয়ের কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
মূল ইংরেজি: “The girl's welfare should be taken into consideration in the marriage process.”
বিশ্লেষণ: এই সংক্ষিপ্ত ধারাটির তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। এটি স্পষ্ট করে যে ইসলামি আইনে মেয়ের কল্যাণই মূল মানদণ্ড, অভিভাবকের ইচ্ছা বা সামাজিক প্রথা নয়।
ধারা ৬: অভিভাবকত্ব কল্যাণের সাথে শর্তযুক্ত:
নাবালিকা মেয়ের উপর বাবা বা অন্য যেকোনো ধরনের অভিভাবকত্ব তার কল্যাণ নিশ্চিত হওয়ার সাথে শর্তযুক্ত।
মূল ইংরেজি: “The father's guardianship or other types of guardianships on the young girl is tied to the realization of her welfare.”
বিশ্লেষণ: অভিভাবকত্ব একটি আমানত, অধিকার নয়। কল্যাণ নিশ্চিত না করলে অভিভাবকত্বের বৈধতা থাকে না।
ধারা ৭: মেয়ের সম্মতি — ফরজ ও অপরিহার্য:
মেয়ের সম্মতি নেওয়া ফরজ। নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর হাদিস অনুযায়ী — 'কুমারী মেয়েকে বিবাহের ব্যাপারে অনুমতি চাইতে হবে, আর তার অনুমতি হলো তার চুপ থাকা; এবং যে নারী ইতিপূর্বে বিবাহিত ছিলেন তিনি তার অভিভাবকের চেয়ে নিজের ব্যাপারে বেশি হকদার' — তার সম্মতি ও সন্তুষ্টি ছাড়া বিবাহ দেওয়া জায়েজ নয়। তার সম্মতি ছাড়া বিবাহ হলে সে বিবাহ বাতিল করার অধিকার রাখে।
মূল ইংরেজি: “Getting the girl's approval for marriage is an obligation. It is not permissible to get her married without her consent and satisfaction as per the hadith of the Prophet ﷺ. If she has been married without her consent, she has the right to get an annulment of marriage.”
বিশ্লেষণ: এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারা। নাবালিকা হোক বা বালিগা — সম্মতি সর্বক্ষেত্রেই ফরজ। সম্মতিহীন বিয়ে বাতিলযোগ্য।
ধারা ৮: রাষ্ট্রের বয়স নির্ধারণ ও শাস্তি প্রবর্তনের অধিকার:
প্রতিটি দেশের মেয়ে, পরিবার ও সমাজের কল্যাণের দৃষ্টিকোণ থেকে উপযুক্ত বিবাহের বয়স নির্ধারণের অধিকার রয়েছে। বিচারকের অনুমতি ছাড়া কোনো নাবালিকাকে বিবাহে বাধ্য করলে তার জন্য উপযুক্ত শাস্তি নির্ধারণের অধিকারও প্রতিটি দেশের রয়েছে।
মূল ইংরেজি:“Each country has the right to determine the appropriate marriage age, according to what it sees as realizing the welfare of the girl, family, and community, and each country has the right to determine an appropriate punishment for whoever forces a young girl into marriage without the judge's permission.”
বিশ্লেষণ: জোরপূর্বক বিবাহকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা স্বীকৃত হয়েছে।
ধারা ৯: স্বাস্থ্যগত মানদণ্ড বাধ্যতামূলক:
নাবালিকা মেয়ের বিবাহে স্বাস্থ্যগত মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে এবং ন্যূনতম বয়স ১৫ থেকে ১৬ বছর রাখতে হবে। এই মানদণ্ড পূরণ ছাড়া কোনো নাবালিকাকে বিবাহে সহায়তা করা বা বাধ্য করা জায়েজ নয়। উপযুক্ত চিকিৎসকদের দ্বারা এই মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে।
“Health criteria should be implemented for young girl marriage, with a minimum age of 15 to 16 years old. It is not permissible to assist or force a young woman into marriage without these criteria. Reliable doctors should estimate these criteria.”
বিশ্লেষণ: ইসলামি ফিকহকে আধুনিক জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। চিকিৎসাগত যোগ্যতার শর্ত একটি বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করেছে।
وَاللَّهُ أَعْلَمُ — আর আল্লাহই সর্বজ্ঞ
✦ ✦ ✦
মূল দলিল: কুরআন ও হাদিস:
সম্মতির হাদিস:
"কুমারী মেয়েকে বিবাহ দেওয়ার আগে তার অনুমতি নিতে হবে। সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন: তার অনুমতি কীভাবে বোঝা যাবে? তিনি বললেন: সে চুপ থাকলেই তার সম্মতি।"
সহিহ বুখারি: ৫১৩৬ | সহিহ মুসলিম: ১৪১৯
"হযরত খানসা বিনতে খিদাম আল-আনসারিয়া (রা.) জানান যে তার বাবা তার অসম্মতিতে বিবাহ দেওয়ার পর তিনি নবী ﷺ-এর কাছে গেলে নবী ﷺ সেই বিবাহ বাতিল করে দেন।"
সহিহ বুখারি: ৫১৩৮ | সুনান আবু দাউদ: ২০৯৬
কুরআনের দলিল:
সূরা তালাক (৬৫:৪) — “যারা এখনো ঋতুমতী হয়নি তাদের ইদ্দতের বিধান দেওয়া হয়েছে। এই আয়াতটি নাবালিকা বিবাহের বাস্তবতাকে আইনি কাঠামোর আওতায় এনেছে, কিন্তু একে উৎসাহিত করেনি।”
সূরা নিসা (৪:৬) — “যতক্ষণ না তারা বিবাহযোগ্য বয়সে পৌঁছায়।' ইবনে শুবরুমা এই আয়াত থেকে যুক্তি দেন যে বুদ্ধিমত্তা পরিপক্ক না হলে বিবাহও দেওয়া উচিত নয়।”
✦ ✦ ✦
সমালোচনা ও শরিয়াহসম্মত জবাব:
ইসলামবিরোধী সমালোচনা
ইসলামের প্রকৃত অবস্থান ও জবাব
"ইসলাম শিশুবিবাহকে বৈধ করে"
ইসলামে বয়ঃসন্ধির আগে মেয়েকে বিবাহের উপযুক্ত ধরা হয় না। বয়ঃসন্ধির প্রমাণ না মিললেও ১৫-১৬ বছরে ফিকহের বিধানে মেয়েকে বালিগাহ গণ্য করা হয়। IIFA রেজোলিউশন ২১৭ এই বিধানকেই আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে এবং রাষ্ট্রকে আরও উচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণের অধিকার দিয়েছে।
"মেয়েদের সম্মতির কোনো মূল্য নেই"
রেজোলিউশনের ৭ নং ধারায় সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে: সম্মতি নেওয়া ফরজ, সম্মতিহীন বিয়ে বাতিলযোগ্য।
"আয়েশা (রা.)-এর বিবাহই প্রমাণ যে ইসলাম শিশুবিবাহ সমর্থন করে"
এই বিবাহ একটি বিশেষ ঐশীভাবে পরিচালিত ঘটনা। বিবাহের বিস্তারিত বিধান তখনো নাজিল হয়নি। আল্লাহর বিশেষ ইলম ও অনুমোদনে এই বিয়ে সংঘটিত হয়েছিল। এটি উম্মতের জন্য সাধারণ দৃষ্টান্ত নয়। এখানে আরো একটি বিষয় উল্লেখ্য যে , আয়েশা (রা.)-এর বিয়ের সময়ে তার বয়েস কত এ নিয়ে সিরাত বিশেষঙ্ দের ভিতর মত পার্থক্য আছে আমরা আলোচনার সুবার্থে সবচেয়ে কম বয়স অর্থাত ৬ বছর ধরে আলোচনা করেছি ।
"অভিভাবক জোর করে বিয়ে দিতে পারেন"
রেজোলিউশনের ৩ নং ধারা বলে: ক্ষতির কারণ হলে বাবার জন্যও বিয়ে দেওয়া নিষিদ্ধ। বিচারকের অনুমতি বাধ্যতামূলক। অভিভাবক জালিম প্রমাণিত হলে কাজি বা উলিল আমর অভিভাকত্ব গ্রহণ করেন।
"ইসলামি আইনে কোনো বয়সসীমা নেই"
IIFA ন্যূনতম ১৫-১৬ বছর নির্ধারণ করেছে এবং স্বাস্থ্যগত মানদণ্ড পালনকে বাধ্যতামূলক করেছে।
"মুসলিম দেশগুলো এ বিষয়ে নীরব"
৫৭টি মুসলিম দেশের প্রতিনিধিত্বকারী OIC-র ফিকহ একাডেমি ২০১৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এই রেজোলিউশন গ্রহণ করেছে।
"মেয়ের সম্মতি নেওয়া ফরজ। তার সম্মতি ও সন্তুষ্টি ছাড়া বিয়ে দেওয়া জায়েজ নয়। সম্মতি ছাড়া বিয়ে হলে সে বিয়ে বাতিল করার অধিকার রয়েছে।"
— IIFA রেজোলিউশন ২১৭, ধারা ৭ · মদিনা মুনাওয়ারা, ২০১৮
✦ ✦ ✦
মাকাসিদুশ শরিয়াহর আলোকে বিশ্লেষণ:
ইসলামি আইনের পাঁচটি মূল উদ্দেশ্য (মাকাসিদ) হলো: জীবন রক্ষা, বুদ্ধি রক্ষা, বংশ রক্ষা, সম্পদ রক্ষা এবং দ্বীন রক্ষা। নাবালিকার বিবাহ প্রশ্নে এই মাকাসিদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
জীবন রক্ষা (হিফযুন নাফস): অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিবাহ তার শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে — বিশেষত গর্ভধারণের ক্ষেত্রে। IIFA-র রেজোলিউশনের ৯ নং ধারায় স্বাস্থ্যগত মানদণ্ড পালনের কথা বলা হয়েছে ঠিক এই কারণেই।
বুদ্ধি রক্ষা (হিফযুল আকল): সম্মতি দেওয়ার জন্য যথেষ্ট মানসিক পরিপক্কতা প্রয়োজন। ইবনে শুবরুমার মতে, বুদ্ধিমত্তা পরিপক্ক না হওয়া পর্যন্ত বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাই নেই।
বংশ রক্ষা (হিফযুন নাসল): সুস্থ পরিবার গঠনের জন্য উভয় পক্ষের প্রস্তুতি অপরিহার্য। অপরিপক্ক বিবাহ পরিবার প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে।
✦ ✦ ✦
আয়েশা (রা.)-এর বিবাহ:
বিবাহের সময় আায়েশা রা এর প্রকৃত বয়স :
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.)-এর বিয়ের সময় বয়স কত ছিল, তা নিয়ে সিরাত বিশেষজ্ঞ ও ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। মূল মতপার্থক্যগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. প্রথাগত বা সর্বাধিক প্রচলিত মত (৬-৯ বছর):
সহীহ বুখারি (hadith 5134) ও সহীহ মুসলিমের বেশ কিছু বর্ণনায় এসেছে যে, আয়েশা (রা.)-এর বিয়ে হয়েছিল ৬ বছর বয়সে এবং হিজরতের পর মদিনায় সংসার শুরু (বাসর) হয়েছিল ৯ বছর বয়সে।
ঐতিহ্যবাহী সিরাতবিদরা এই বর্ণনাগুলোকে প্রধান্য দেন।
২. ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ ও গবেষণাধর্মী মত (১৪-১৯ বছর):
আধুনিক অনেক গবেষক (যেমন: আল্লামা শিবলী নোমানী, সোলায়মান নদভী, মোহাম্মদ আলী, এবং আধুনিক সীরাত গবেষক) আয়শা (রা.)-এর বড় বোন আসমা (রা.)-এর বয়সের হিসাব বিশ্লেষণ করে ভিন্ন মত পোষণ করেন।
যুক্তিসমূহ: আসমা (রা.) আয়েশা (রা.)-এর চেয়ে ১০ বছরের বড় ছিলেন। ঐতিহাসিক তথ্যানুযায়ী, হিজরতের সময় আসমার বয়স ছিল ২৭ বছর। তাহলে, হিজরতের সময় (বিয়ের পর) আয়েশার বয়স হওয়ার কথা ছিল ১৭ বছর।
কেউ কেউ বলেন, বিয়ে হিজরতের আগে হলেও বাসর হয় হিজরতের পর, তখন তার বয়স ছিল ১৬-১৯ বছরের মধ্যে।
আরেকটি যুক্তি হলো, আয়েশা (রা.) ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম ২০ জনের একজন ছিলেন, যা ৬০০-৬১০ সালের দিকে ইঙ্গিত করে, যদি ৯ বছর বয়স ধরা হয় তবে তার জন্ম ইসলাম গ্রহণের পরে হওয়ার কথা। মতপার্থক্যের কারণ:
হাদিসের ধরন: প্রথাগত হাদিস বিশারদরা সরাসরি আয়শা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসকে (৬-৯ বছর) 'সহীহ' ও অকাট্য মনে করেন।
ইতিহাস ও সময়ের ক্রম: আধুনিক গবেষকরা হাদিস বর্ণনার পাশাপাশি সেই সময়ের অন্যান্য ঐতিহাসিক ঘটনা, বোন আসমার বয়স, উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের বয়স এবং তৎকালীন আরবের বিয়ে সংক্রান্ত প্রথা বিশ্লেষণ করে বয়স বেশি হওয়ার যুক্তি দেন। [1, 2, 3]
উপরের আলোচনা থেকে প্রতিয়মান হয় যে , সহীহ বুখারি ও মুসলিমের বর্ণনায় ৯ বছর বয়সে বাসর হওয়ার কথা বলা হয়েছে, আধুনিক গবেষক ও ঐতিহাসিকদের একটি অংশ অন্যান্য ঐতিহাসিক তথ্যের আলোকে এই বয়স নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এখানে আমরা সবচেয়ে কম বয়স ছয় বছরে বিয়ে ও নয় বছরে বাসর সত্য ধরে আলোচনা করেছি ।
বিবাহের বিস্তারিত বিধান তখনো নাজিল হয়নি:
ইসলামবিরোধীদের সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত অস্ত্র হলো আয়েশা (রা.)-এর বিবাহের বিষয়টি। কিন্তু এই প্রসঙ্গে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও শরিয়াহগত সত্য সম্পূর্ণ উপেক্ষিত থাকে: আয়েশা (রা.)-এর বিবাহের সময় ইসলামে বিবাহের বিস্তারিত বিধান তখনো নাজিল হয়নি।
বিবাহ বিধানের নাজিলের কালক্রম:
মক্কি যুগ (নবুওয়তের ১ম-১৩তম বছর): আয়েশা (রা.)-এর বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল মক্কায়, নবুওয়তের প্রাথমিক পর্বে। এই পর্বে মূলত তাওহীদ, আখিরাত ও নৈতিকতার আয়াত নাজিল হচ্ছিল। বিবাহের সুনির্দিষ্ট শর্ত, মোহর, সম্মতি, নিষিদ্ধ সম্পর্ক — এসব বিস্তারিত বিধান তখনো আসেনি।
মদিনায় হিজরত (হিজরি ১ম বছর): মদিনায় হিজরতের পর আয়েশা (রা.) রাসূল ﷺ-এর গৃহে আসেন। এই সময়ই সূরা বাকারায় তালাক, ইদ্দত ও পুনর্বিবাহের বিধান নাজিল হতে শুরু করে।
হিজরি ৩-৪ সাল (সূরা নিসা): বিবাহের সবচেয়ে বিস্তারিত বিধান নাজিল হয় সূরা নিসায় — মোহর বাধ্যতামূলক করা, একাধিক বিবাহের শর্ত, মাহরামের তালিকা। এটি নাজিল হয়েছে আয়েশা (রা.)-এর বিবাহের বহু বছর পরে।
হিজরি ৫-৬ সাল (সূরা নূর): যিনা থেকে সুরক্ষা, পর্দার বিধান ও বিবাহের সামাজিক কাঠামো সূরা নূরে বিস্তারিতভাবে আসে।
মূল সত্য: আয়েশা (রা.)-এর বিবাহ হয়েছিল ইসলামের প্রাথমিক পর্বে, যখন বিবাহের বিস্তারিত শরিয়াহ বিধান পর্যায়ক্রমে নাজিল হচ্ছিল। তাই এই বিবাহকে পরবর্তীতে সম্পূর্ণ বিকশিত শরিয়াহ বিধানের মানদণ্ডে বিচার করা ইতিহাসের সাথে অসততা।
আয়েশা (রা.)-এর বিবাহ: একটি বিশেষ ঐশী ব্যবস্থাপনা:
আয়েশা (রা.)-এর বিবাহ সাধারণ বিবাহের মতো নয় — এটি একটি বিশেষ বিবাহ, যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার বিশেষ অনুগ্রহ ও তত্ত্বাবধানে সংঘটিত হয়েছিল। এই বিবাহে লক্ষণীয় বেশ কিছু বিষয় রয়েছে:
যদিও তখনো বিবাহের বিস্তারিত শরিয়াহ বিধান পূর্ণাঙ্গভাবে নাজিল হয়নি, তথাপি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহে ইসলামি বিবাহের সমস্ত মৌলিক শর্ত — সম্মতি, পরিপক্কতা ও সুরক্ষা — বাস্তবিকভাবে পূরিত হয়েছিল।
আয়েশা (রা.) এই বিবাহের ফলে কোনো শারীরিক বা মানসিক ক্ষতির শিকার হননি; বরং তিনি ইসলামের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মহিলা আলিম হয়ে উঠেছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে তিনি এ বিবাহের জন্য কোনো দিক থেকেই অপরিপক্ক ছিলেন না।
আল্লাহ তা'আলা — যিনি সকল অবস্থা ও অন্তরের খবর রাখেন — জানতেন যে আয়েশা (রা.) এই বিবাহের জন্য সম্পূর্ণভাবে উপযুক্ত। তাঁর এই বিশেষ জ্ঞানের ভিত্তিতেই এই বিবাহ সংঘটিত হয়েছিল।
আমাদের কাছে বর্তমানে ওহীর সরাসরি জ্ঞান নেই। তাই উম্মতের জন্য এ পদ্ধতি অনুসরণীয় নয়। আধুনিক যুগে আমরা কোনো শিশুর ভেতরকার অবস্থা সেই নিশ্চিততার সাথে জানতে পারি না যেভাবে আল্লাহ জানতেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা: এই বিশেষ বিবাহকে উপরে উল্লিখিত IIFA রেজোলিউশন বা ইসলামের সাধারণ বিবাহ বিধানের বিরুদ্ধে ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। বিশেষ ঘটনা সাধারণ নিয়মকে বাতিল করে না।
সংক্ষেপে: আয়েশা (রা.)-এর বিবাহ ছিল একটি অনন্য ঐশী ব্যবস্থা, সর্বকালের সর্বজনীন বিধান নয়। ইসলামের সাধারণ বিবাহ বিধানের ভিত্তি হলো IIFA রেজোলিউশন ২১৭-এর মতো সম্মিলিত ইজতিহাদ, কোনো বিশেষ ঘটনার একপেশে ব্যাখ্যা নয়।
আয়েশা (রা.)-এর বিবাহে শারীরিক সক্ষমতার শর্ত পালিত হয়েছিল:
ইবনে বাত্তাল (রহ.) শরহে সহীহ বুখারী গ্রন্থে উল্লেখ করেন: উলামাদের ইজমা রয়েছে যে পিতার জন্য অল্পবয়সী কন্যাদের বিবাহ দেওয়া জায়েজ, কিন্তু স্বামীর জন্য তার সাথে মিলন জায়েজ নয় যতক্ষণ পর্যন্ত সে সহবাসের উপযুক্ত না হয়। এই শর্তটি আয়েশা (রা.)-এর ক্ষেত্রেও পালিত হয়েছিল।
আয়েশা (রা.) বলেন: আমার মা আমাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সংসারে পাঠাতে চাচ্ছিলেন বিধায় আমার দৈহিক পরিপুষ্টির জন্য চিকিৎসা করাতেন। কিন্তু তা কোনো উপকারে আসলো না। অবশেষে আমি তাজা খেজুরের সাথে শসা মিশিয়ে খেলাম এবং উত্তমরূপে দৈহিক পরিপুষ্টি লাভ করলাম।
— সুনান ইবনে মাজাহ: ৩৩২৪
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট: আয়েশা (রা.)-কে শারীরিকভাবে সক্ষম করার পরেই রাসূল ﷺ-এর গৃহে পাঠানো হয়েছিল। যদি অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায়ই সহবাস বৈধ হতো, তাহলে এই প্রস্তুতির প্রয়োজনই হতো না।
একটি বিবাহকে সমগ্র শরিয়াহর প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করা বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা:
ইসলামবিরোধীরা আয়েশা (রা.)-এর বিবাহকে ইসলামের সামগ্রিক বিবাহ আইন বলে উপস্থাপন করেন। এটি একটি মৌলিক যুক্তিগত ভুল। কারণ:
এই বিবাহ হয়েছিল বিবাহের বিস্তারিত বিধান সম্পূর্ণ নাজিল হওয়ার আগে।
এটি ছিল আল্লাহর বিশেষ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত একটি অনন্য ঘটনা, উম্মতের জন্য সাধারণ আইনি দৃষ্টান্ত নয়।
শরিয়াহর বিধান নির্ধারিত হয় কুরআন ও সুন্নাহর সামগ্রিক দলিল থেকে, একটি বিশেষ ঘটনা থেকে নয়।
IIFA রেজোলিউশন ২১৭ সহ সমস্ত আধুনিক ইসলামি আইনি কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে সম্মতি ও শারীরিক সক্ষমতাকে অপরিহার্য শর্ত হিসেবে নির্ধারণ করেছে।
সপ্তম শতাব্দীর আরব সমাজে এই বিবাহ সাংস্কৃতিকভাবে স্বাভাবিক ছিল এবং ইসলামের শত্রুরাও তখন এটি নিয়ে কোনো আপত্তি তোলেনি।
✦ ✦ ✦
ইসলামে বিবাহের মূলনীতি: বিস্তারিত দলিলভিত্তিক বিশ্লেষণ:
ইসলামে বৈধ ও উত্তম বিবাহের চারটি মূলনীতি কুরআন, হাদিস ও ফিকহ গ্রন্থের দলিল সহ নিচে উপস্থাপন করা হলো।
মূলনীতি ১: প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া (বুলুগ):
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন: তোমরা ইয়াতীমদেরকে পরীক্ষা কর যতক্ষণ না তারা বিবাহের বয়সে পৌঁছে। সুতরাং যদি তোমরা তাদের মধ্যে বিবেকের পরিপক্কতা দেখতে পাও, তবে তাদের ধন-সম্পদ তাদেরকে দিয়ে দাও।
—(সূরা নিসা: ৬)
এই আয়াতে নিকাহ শব্দ দ্বারা প্রাপ্তবয়স্কতা বোঝানো হয়েছে। ইমাম ইবনে কাসির, তাবারী, জালালাইন সহ সকল তাফসিরকারকের মতে প্রাপ্তবয়স্কতার আলামত হলো — পুরুষের ক্ষেত্রে: স্বপ্নদোষ, পিউবিক চুল, অথবা ১৫ বছর পূর্ণ হওয়া। নারীর ক্ষেত্রে: ঋতুস্রাব শুরু, গর্ভধারণক্ষমতা, অথবা ১৫ বছর পূর্ণ হওয়া।
গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি বিধান: যদি ১৫ বছর বয়সেও বয়ঃসন্ধির কোনো আলামত না মেলে, তথাপি ফকিহগণ তাকে বালিগ/বালিগাহ গণ্য করেন। এটি ইসলামি আইনের একটি সুনির্দিষ্ট ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থা।
মূলনীতি ২: সহবাসের শারীরিক সক্ষমতা:
রাসূল ﷺ বলেছেন: “ হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহ করার সামর্থ্য রাখে তারা যেন বিবাহ করে। ”
—(সহিহ বুখারি: ৫০৬৬)
ইমাম মালিক, শাফেয়ি ও আবু হানিফা (রহ.) একমত যে স্বামী কেবল তখনই স্ত্রীর সাথে বাসর করতে পারবেন যখন তার সহবাসের সক্ষমতা প্রমাণিত হবে — বয়স নির্বিশেষে। বয়স নয়, শারীরিক সক্ষমতাই হলো বাসরের মূল মানদণ্ড।
মূলনীতি ৩: মেয়ের সম্মতি — ফরজ:
নবী ﷺ বলেছেন: “কোনো বিধবা নারীকে তার সম্মতি ব্যতীত বিয়ে দেয়া যাবে না এবং কুমারী মহিলাকে তার অনুমতি ছাড়া বিয়ে দিতে পারবে না। তার চুপ থাকাটাই হচ্ছে তার অনুমতি।”
—(সহিহ বুখারি: ৫১৩৬ | সহিহ মুসলিম: ১৪১৯)
একজন কুমারী মেয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে অভিযোগ করল যে তার পিতা তার অসম্মতিতে বিয়ে দিয়েছে। রাসূল ﷺ তাকে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার প্রদান করলেন।
—(সূনানে আবুুুুুুুুুুুুুুুুুুুু দাউদ: ২০৯৬)
IIFA রেজোলিউশন ২১৭, ধারা ৭: মেয়ের সম্মতি নেওয়া ফরজ। সম্মতি ছাড়া বিবাহ হলে সে বিবাহ বাতিল করার অধিকার রয়েছে।
মূলনীতি ৪: অভিভাবকের সম্মতি (ওলায়েত):
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: যে নারীকে তার অভিভাবক বিবাহ দেয়নি তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল, তার বিবাহ বাতিল।
—(সূনানে ইবনে মাজাহ: ১৮৭৯)
IIFA রেজোলিউশন ২১৭-এর ৬ নং ধারা অনুযায়ী — অভিভাবকত্ব তার কল্যাণ নিশ্চিত হওয়ার সাথে শর্তযুক্ত। অর্থাৎ অভিভাবকত্ব একটি দায়িত্ব ও আমানত, কোনো নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব নয়।
বিবাহযোগ্য বয়স: সার্বজনীন কোনো সংখ্যা নেই — কারণ ও যুক্তি:
বিবাহের বয়স সর্বজনীনভাবে নির্দিষ্ট নয় — এটি শুধু ইসলামের বৈশিষ্ট্য নয়, বরং বিশ্বব্যাপী একটি স্বীকৃত বাস্তবতা। অস্ট্রেলিয়ান স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী মেয়েদের বয়ঃসন্ধিকাল শুরু হয় ৮ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে। NICHD-এর তথ্য অনুযায়ী এটি ৮ থেকে ১৩ বছর। ইউরোপের ১৭টিরও বেশি দেশে যৌন সম্মতির বয়স ১৪ থেকে ১৫ বছর। ইউরোপের ১৬টি দেশে বৈধ বিবাহের বয়স ১৫ থেকে ১৬ বছর।
তাই ইসলাম কোনো সুনির্দিষ্ট সংখ্যাগত বয়স না দিয়ে শারীরিক পরিপক্কতাকে মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করেছে — যা সময়, স্থান ও ব্যক্তিভেদে পরিবর্তনশীল। IIFA রেজোলিউশন আধুনিক বিজ্ঞান ও বাস্তবতার আলোকে ন্যূনতম ১৫-১৬ বছর নির্ধারণ করে এই মানদণ্ডকে আরও সুনির্দিষ্ট করেছে।
সারসংক্ষেপ: ইসলামে বৈধ ও উত্তম বিবাহের জন্য চারটি শর্ত একত্রে পূরণ হতে হবে — প্রাপ্তবয়স্কতা, শারীরিক সক্ষমতা, মেয়ের সম্মতি এবং অভিভাবকের সম্মতি। IIFA রেজোলিউশন ২১৭ এই চারটি শর্তকেই আধুনিক বিশ্বের প্রেক্ষাপটে পুনরায় সুস্পষ্টভাবে নিশ্চিত করেছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: ন্যায়সংগত মূল্যায়ন:
সমালোচকরা প্রায়ই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট উপেক্ষা করেন। সপ্তম শতাব্দীর আরবে এবং বিশ্বের অধিকাংশ সমাজে অল্প বয়সে বিয়ে একটি সাধারণ প্রথা ছিল। রোমান আইনে বিবাহের বয়স ছিল ১২ বছর; ইউরোপের মধ্যযুগেও একই চিত্র। ইসলাম সেই প্রেক্ষাপটে এসে অভিভাবকের ক্ষমতায় লাগাম টানল, সম্মতির বিধান প্রবর্তন করল এবং মেয়ের কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিল — এটি সেই যুগের বিচারে ছিল একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ।
আধুনিক যুগে ইসলামি ইজতিহাদ এই বিধানকে আরও সুনির্দিষ্ট করেছে। IIFA-র রেজোলিউশন সেই ধারাবাহিকতারই প্রমাণ।
উপসংহার:
ইসলামের বিরুদ্ধে নাবালিকার বিবাহ-সংক্রান্ত সমালোচনা মূলত তিনটি ভুলের উপর দাঁড়িয়ে: (১) ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের অজ্ঞতা, (২) ফিকহি ঐতিহ্যের বৈচিত্র্য উপেক্ষা করা, এবং (৩) আধুনিক মুসলিম আইনি চিন্তাধারাকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া।
IIFA-র রেজোলিউশন ২১৭ স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ইসলামি আইনবিদরা: মেয়ের সম্মতিকে ফরজ বলেছেন, ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ করেছেন, রাষ্ট্রীয় আইনের বৈধতা স্বীকার করেছেন এবং জোরপূর্বক বিবাহকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন।
বিশেষ সংযোজন: ইসলামে নাবালিকার বিবাহ — একটি বিশেষ বিধান, সাধারণ নিয়ম নয়
এই আলোচনার সমাপ্তি-বিন্দুতে একটি মৌলিক নীতি স্পষ্টভাবে রেখাংকন করা প্রয়োজন: ইসলামে নাবালিকার বিবাহ কোনো সাধারণ বা উৎসাহিত বিধান নয়। এটি একটি বিশেষ বিধান (রুখসত), যা কেবল বিশেষ পরিস্থিতিতে, নির্দিষ্ট শর্তাবলি পূরণ সাপেক্ষে এবং সংশ্লিষ্ট সকলের কল্যাণ নিশ্চিত করে প্রযোজ্য হতে পারে। এই বিধানের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
বিশেষ পরিস্থিতি-নির্ভর: এই বিধান কেবল তখনই বিবেচনায় আসে যখন বিশেষ কোনো প্রয়োজনীয়তা বা পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকে, সাধারণ অবস্থায় নয়।
শর্ত-সাপেক্ষ: IIFA রেজোলিউশন ২১৭-এ উল্লিখিত শর্তসমূহ — বিচারকের অনুমতি, স্বাস্থ্যগত মানদণ্ড, মেয়ের সম্মতি এবং কল্যাণ নিশ্চিতকরণ — কঠোরভাবে পালনীয়।
কল্যাণমুখী: এই বিধানের মূল উদ্দেশ্য মেয়ের ক্ষতি করা নয়, বরং বিশেষ পরিস্থিতিতে তার সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা।
সাধারণ বিধান নয়: এটি ইসলামের সাধারণ বিবাহ বিধান নয়। ইসলাম সাধারণভাবে পরিপক্ক, সক্ষম ও সম্মত উভয় পক্ষের বিবাহকেই উৎসাহিত করে।
যে সমাজে এই বিশেষ বিধানের প্রয়োগ হয়, সেখানেও বিচারব্যবস্থা, অভিভাবকত্ব ও চিকিৎসাগত মানদণ্ড — এই তিনটি স্তরের তদারকি থাকা অপরিহার্য। এই স্তরগুলো অনুপস্থিত থাকলে এই বিধানের প্রয়োগ বৈধ নয়।
অতএব, ইসলামের বিরুদ্ধে 'শিশুবিবাহ সমর্থন'-এর অভিযোগ কেবল অজ্ঞতা বা অসদুদ্দেশ্য থেকেই উৎসারিত হতে পারে। ইসলামের প্রকৃত অবস্থান হলো:
মেয়ের কল্যাণ, তার সম্মতি এবং তার সুরক্ষা — এই তিনটিই অপরিহার্য।
✦ ✦ ✦
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স:
International Islamic Fiqh Academy (IIFA). Resolution No. 217 (1/23) on Young Girls Marriage. 23rd Session, Madinah, October–November 2018. https://iifa-aifi.org/en/6252.html .
সহিহ আল-বুখারি, হাদিস নং ৫১৩৬ — কুমারীর সম্মতির বিধান। ইমাম মুহাম্মাদ বিন ইসমাঈল আল-বুখারি (র.)।
সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৪১৯ — বিবাহে সম্মতির আবশ্যকতা। ইমাম মুসলিম বিন আল-হাজ্জাজ (র.)।
সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং ২০৯৬ — সম্মতিহীন বিয়ে বাতিলের ঘটনা। ইমাম আবু দাউদ আস-সিজিস্তানি (র.)।
আল-কাসানি, আলাউদ্দিন। বাদাই'উস সানাই'। কিতাবুন নিকাহ — হানাফি বিবাহ বিধান।
ইবনে কুদামা, মুওয়াফফাকুদ্দিন। আল-মুগনি। কিতাবুন নিকাহ — হাম্বলি মাযহাবের বিবাহ বিধান।
আন-নাওয়াওয়ি, ইয়াহইয়া বিন শারাফ। মিনহাজুত তালিবিন। শাফেয়ি মাযহাবের পারিবারিক আইন।
ইবনে আশুর, মুহাম্মাদ তাহের। মাকাসিদুশ শরিয়াহ আল-ইসলামিয়্যা। দারুস সালাম, ২০০৬।
আয-যুহাইলি, ওয়াহবা। আল-ফিকহুল ইসলামি ওয়া আদিল্লাতুহ, খণ্ড ৯। দারুল ফিকর, দামেস্ক।
সূরা আত-তালাক (৬৫:৪) — নাবালিকার ইদ্দত প্রসঙ্গ ও তাফসীর। আল-কুরআনুল করিম।
সূরা আন-নিসা (৪:৬) — এতিমের সম্পদ প্রসঙ্গ ও তাফসীর । আল-কুরআনুল করিম, তাফসীর আল জালালাইন , তাফসীরে ইবনে কাসীর ম তাফসিরে রুহুল মাআনী , তাফসীরে বাহারুল মুহীত ।
✦ ✦ ✦
মন্তব্য