কুরআন বিজ্ঞানকুরআন ফিকহকুরআন ভাষা শৈলী

কুরআনে "জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি" প্রসঙ্গে নাস্তিকদের অভিযোগের জবাব !

ভূমিকা ও পটভূমি

কুরআনের একাধিক আয়াতে — সূরা আয-যারিয়াত (৫১:৪৯), সূরা ইয়াসিন (৩৬:৩৬), সূরা আয-যুখরুফ (৪৩:১২), সূরা আর-রা'দ (১৩:৩), সূরা আন-নাবা (৭৮:৮), সূরা ক্বাফ (৫০:৭) এবং আরও কয়েকটি স্থানে — আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে তিনি সৃষ্টিজগতে “জোড়া” (আরবি: زوج / أزواج) স্থাপন করেছেন। নাস্তিক ব্লগ ও ইসলাম-সমালোচক ওয়েবসাইটগুলোতে (যেমন ‘সংশয় — চিন্তার মুক্তির আন্দোলন’ নামক একটি প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত “প্রতিটি প্রাণী জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি?” শীর্ষক লেখায়) এই আয়াতগুলোকে কেন্দ্র করে একটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ-কাঠামো বারবার উপস্থাপিত হয়। সেই অভিযোগের মূল কাঠামোটি এরকম:

1. প্রথমে দাবি করা হয়, ক্লাসিক্যাল তাফসিরগ্রন্থ (যেমন তাফসীরে জালালাইন, তাফসীরে ইবনে কাসীর) থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বোঝানো হয় যে আয়াতের অর্থ আক্ষরিকভাবে “প্রতিটি প্রাণীকে নর ও নারী এই জোড়ায় সৃষ্টি করা হয়েছে”।

2. এরপর একগুচ্ছ জীববৈজ্ঞানিক উদাহরণ সাজিয়ে দেখানো হয় যেগুলোতে কথিতভাবে এই “আক্ষরিক নর-নারী জোড়া” নীতিটি খাটে না — যেমন ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, অ্যামিবা (অযৌন জনন), স্পঞ্জ, শামুক, সি-হেয়ার ও গভীর-সমুদ্রের অ্যারো-ওয়ার্মের মতো উভলিঙ্গ (hermaphrodite) প্রাণী।

3. সবশেষে সিদ্ধান্ত টানা হয় যে, যেহেতু আল্লাহ “সর্বজ্ঞ” হওয়ার দাবি করেন, অথচ এসব জীবের প্রজনন-পদ্ধতি আয়াতে প্রতিফলিত হয়নি, সুতরাং এটি একটি বৈজ্ঞানিক ভুল (নাউযুবিল্লাহ)।

এই সমন্বিত প্রবন্ধটির লক্ষ্য হলো — এই গোটা অভিযোগ-কাঠামোর প্রতিটি স্তরের একটি বিস্তারিত, সুনির্দিষ্ট ও তথ্যনির্ভর জবাব একত্রে উপস্থাপন করা। এখানে আমরা পরপর দেখব: (ক) আরবি زوج (زوج) শব্দের প্রকৃত ভাষাতাত্ত্বিক ব্যাপ্তি, (খ) ক্লাসিক্যাল তাফসিরের প্রকৃত বক্তব্য — যা অভিযোগকারীদের দাবির চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত, (গ) পদার্থবিজ্ঞান থেকে শুরু করে অণুজীববিজ্ঞান, উদ্ভিদবিজ্ঞান ও প্রাণিবিজ্ঞান পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রের সুনির্দিষ্ট উদাহরণ বিশ্লেষণ, এবং (ঘ) একটি স্বতন্ত্র অনুচ্ছেদে অভিযোগকারীদের উত্থাপিত প্রতিটি নির্দিষ্ট জীব (ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, অ্যামিবা, স্পঞ্জ, শামুক, সি-হেয়ার, অ্যারো-ওয়ার্ম) আলাদাভাবে পয়েন্ট-বাই-পয়েন্ট আলোচনা।

একটি বিষয় শুরুতেই স্পষ্ট করে নেওয়া জরুরি — বুদ্ধিবৃত্তিক সততার স্বার্থে এই লেখায় ইসলামি অ্যাপোলোজেটিক্সে প্রচলিত কিছু দুর্বল যুক্তি (যেমন তরঙ্গ-কণা দ্বৈততাকে বা প্রোটন-ইলেকট্রনকে সরাসরি “জোড়া”র প্রমাণ বলে দাবি করা) সচেতনভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে সবচেয়ে মজবুত ও যাচাইযোগ্য তথ্যসূত্রের উপর নির্ভর করা হয়েছে।

পর্ব ১: আয়াতগুলো বোঝার সঠিক পদ্ধতি

কুরআন একই সাথে ১৪০০ বছর আগের মানুষকেও শিক্ষা দিয়েছে এবং বর্তমান যুগের মানুষকেও শিক্ষা দিচ্ছে। তাই কুরআনের আয়াতের একটা সাধারণ অর্থ থাকে, একটা দার্শনিক অর্থ থাকে, আবার একটা বৈজ্ঞানিক অর্থও থাকতে পারে — এবং একেক মানুষ একেক বিষয় প্রাধান্য দিয়ে একেক সিদ্ধান্তে উপনীত হন।

“সবকিছুই জোড়ায় জোড়ায়” আয়াতগুলোকে সাধারণভাবে নিলে বোঝা যায় সৃষ্টিজগতে ব্যাপকভাবে দ্বৈততা বিদ্যমান। কিন্তু এর মানে এই নয় যে এতে কোনো ব্যতিক্রম নেই। যেমন কেউ যদি বলে “চীনের মানুষ দেখতে মঙ্গোলয়েড হয়”, তার মানে এই নয় যে প্রতিটা চীনা মানুষই আক্ষরিকভাবে মঙ্গোলয়েড গোত্রের — ব্যতিক্রম থাকতেই পারে, কিন্তু ব্যতিক্রম কোনো উদাহরণ মূল বক্তব্যকে অসত্য প্রমাণ করে না। বাক্যের অর্থ সাধারণভাবে এভাবেই ধরা পড়ে — এটি ভাষার একটি সর্বজনীন ও স্বীকৃত রীতি, কেবল আরবিতে নয়, প্রতিটি ভাষাতেই।

কিন্তু অভিযোগকারীরা এই আয়াতগুলোকে পরম (absolute) অর্থে নিয়ে, শুধুমাত্র জীববিজ্ঞানের গণ্ডিতে আটকে কুরআনের ভুল বের করার চেষ্টা করেন। প্রকৃতপক্ষে যদি আয়াতগুলোকে পরম অর্থে ধরতেই হয়, তাহলে এটা পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের আওতাতেও যাবে, জীববিজ্ঞানের একটা ক্ষুদ্র অংশে সীমাবদ্ধ থাকবে না — কারণ আয়াতে “প্রত্যেক বস্তু” বা “সবকিছু” বলা হয়েছে, কোনো নির্দিষ্ট বিজ্ঞান-শাখার কথা বলা হয়নি।

পর্ব ২: زوج (জাওজ) শব্দের প্রকৃত অর্থ — শুধুই কি “নর-নারী”?

অভিযোগের ভিত্তি মূলত একটি ভাষাতাত্ত্বিক অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে আছে — যে ক্লাসিক্যাল আরবিতে زوج মানে কেবল স্বামী-স্ত্রী বা নর-নারী, এটি কোনো সর্বজনীন (universal) দ্বৈততা বোঝায় না। বাস্তবে এটি একটি মৌলিক ভাষাতাত্ত্বিক ভুল ধারণা।

আয়াতগুলোতে ব্যবহৃত শব্দ زوج (জাওজ), এর দ্বিবচন زَوْجَيْنِ (জাওযাইন) ও বহুবচন أزواج (আযওয়াজ)। লিসানুল আরবসহ প্রামাণিক আরবি অভিধানে زوج শব্দের অর্থ দেওয়া হয়েছে — যে কোনো জোড়ার একটি অংশ, সঙ্গী, প্রকার, এবং দুটি জিনিস যা একসাথে মিলে একটা জোড়া গঠন করে, তা সেটা একই জাতের হোক বা বিপরীত জাতের। আরবি ভাষায় زوج শব্দটি জুতার এক পাটি, রঙের এক প্রকার, এমনকি বিমূর্ত ধারণার দ্বৈততা যেমন পাপ-পুণ্য, ভালো-মন্দ, রাত-দিন প্রভৃতি বোঝাতেও ব্যবহৃত হয় — কখনোই কেবল “নর-নারী” অর্থে সীমাবদ্ধ নয়।

সূরা আয-যারিয়াতের ৪৯ নং আয়াতে — وَمِن كُلِّ شَيْءٍ خَلَقْنَا زَوْجَيْنِ — এখানে مِن (মিন) অব্যয়টি ব্যাকরণবিদদের আলোচনায় তাবʿঈদিয়্যাহ (تبعيضية) অর্থাৎ আংশিকতা সূচক অর্থেও আসতে পারে, যার মানে দাঁড়ায় “সৃষ্ট জিনিসগুলোর মধ্য থেকে” — যা নিজেই ইঙ্গিত দেয় এটা একটা ব্যাপক সাধারণ নীতির কথা বলছে, প্রতিটি অণু-পরমাণু পর্যন্ত আক্ষরিকভাবে গণনা করার দাবি নয়।

আরবি অলংকারশাস্ত্রে একটি সুপরিচিত কৌশল আছে যাকে বলা হয় طباق (তিবাক) বা مقابلة (মুকাবালা) — অর্থাৎ একই বাক্যে বা কাছাকাছি প্রসঙ্গে একটা শব্দ ও তার বিপরীত শব্দ একসাথে নিয়ে আসা, যাতে শ্রোতার মনে একটা বৈপরীত্যের চিত্র ফুটে ওঠে এবং বক্তব্যের জোর বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। কুরআনে এই কৌশল বারবার ব্যবহৃত হয়েছে — “তিনিই জীবিত করেন ও মৃত্যু দেন”, “তিনিই হাসান ও কাঁদান”, আলো-অন্ধকার, রাত-দিন ইত্যাদি জোড়া উল্লেখ করে।

ক্লাসিক্যাল তাফসিরে زوج-এর প্রকৃত ব্যাপ্তি

এখানেই অভিযোগের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ধরা পড়ে। অভিযোগকারীরা যে তাফসীরে জালালাইন বা তাফসীরে ইবনে কাসীর থেকে “নর-নারী” অংশটুকু উদ্ধৃত করেন, সেই একই তাফসিরগ্রন্থগুলোতেই — প্রায়ই একই আয়াতের ব্যাখ্যায় — অনেক বিস্তৃত তালিকা দেওয়া আছে, যা থেকে নির্বাচিতভাবে শুধু একটি অংশ তুলে আনা হয়।

ইমাম আত-তাবারী (রহঃ) তাঁর তাফসিরে সূরা আয-যারিয়াতের ৪৯ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, অধিক গ্রহণযোগ্য মত হলো ইমাম মুজাহিদ (রহঃ)-এর মত — কুফরী-ঈমান, সুখ-দুঃখ, হেদায়েত-গোমরাহী, রাত-দিন, আসমান-জমিন, নারী-পুরুষ — কারণ আল্লাহ যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তার একটা প্রতিরূপ বা বিপরীত সৃষ্টি করেছেন, যাতে প্রতিটি জিনিস অন্যটির বিপরীত বা সমতুল্য হয়। এই বাক্যের মাধ্যমে আল্লাহ নিজের ক্ষমতার প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তিনি যা ইচ্ছা তা-ই সৃষ্টি করতে সক্ষম — এটাই মূলত আয়াতের বালাগী (অলংকারিক) উদ্দেশ্য, নিছক জীববিজ্ঞানের তথ্য দেওয়া নয়, বরং আল্লাহর কুদরতের প্রতি ইঙ্গিত করা।

ইমাম ইবনে কাসীর (রহঃ) একই আয়াতে আরও বিস্তৃত তালিকা দিয়েছেন — আসমান-জমিন, রাত-দিন, চন্দ্র-সূর্য, ভূমি-সমুদ্র, আলো-অন্ধকার, বিশ্বাস-অবিশ্বাস, জীবন-মৃত্যু, দুঃখ-সুখ, জান্নাত-জাহান্নাম, এমনকি জিন-মানুষ, নারী-পুরুষ এবং গাছপালা পর্যন্ত। তিনি বলেন, এর উদ্দেশ্য হলো মানুষ যেন জানতে পারে স্রষ্টা একজনই, যার কোনো শরিক নেই — এটিও একটি বালাগী/তাওহিদি যুক্তি, সংকীর্ণ জীববৈজ্ঞানিক দাবি নয়।

ইমাম আল-কুরতুবী (রহঃ) সূরা আর-রাʿদের ৩ নং আয়াতের তাফসিরে বলেন, زَوْجَيْنِ অর্থ দুই প্রকার বা দুই জাত। ইমাম আবূ উবায়দাহ (রহঃ)-এর মতে زوج শব্দটি এক বা একাধিক প্রকারকেও বোঝাতে পারে — যেমন টক-মিষ্টি, তাজা-শুকনো, সাদা-কালো, ছোট-বড়। ইবনে আতিয়্যাহ (রহঃ) আরও যোগ করেন যে এই আয়াত ইঙ্গিত করে প্রতিটা ফলের অন্তত দুটি প্রকার আছে — যদি কোনো নির্দিষ্ট ফলের দুটির বেশি প্রকার থাকে, তাহলেও আয়াতের অর্থ পরিবর্তিত হয় না, কারণ “ন্যূনতম দুই” বোঝানোই এখানে মূল লক্ষ্য, “ঠিক দুই, তার বেশি নয়” — এমন দাবি আয়াতে নেই।

সংক্ষেপে: زوج মানে “প্রকার”, আর زَوْجَيْنِ মানে “বিপরীত বা সমজাতীয় দুই প্রকারের একজোড়া” — যা ভাষাগত বালাগী দিক থেকেই নর-নারীর গণ্ডির বাইরে সীমাহীনভাবে প্রযোজ্য। যারা এই আয়াতকে শুধু জেন্ডার ও যৌনতায় আবদ্ধ করে ফেলেন, তারা আসলে শাব্দিক ও বালাগী — উভয় দিক থেকেই ক্লাসিক্যাল তাফসিরের মূলধারা থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েন।

“সবকিছু” মানে কি গাণিতিক ব্যতিক্রমহীনতা?

অভিযোগের মূলে আছে আরও একটি ভুল অনুমান — যে كل شيء (সবকিছু) বললে তার মানে আক্ষরিকভাবে প্রতিটি একক সত্তা, কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই, এমন হতে হবে। কিন্তু ভাষার সাধারণ ব্যবহার এভাবে কাজ করে না। আরবি ভাষায় كل (প্রতিটি/সব) প্রায়ই জোর দেওয়ার (mubālagha/তাকীদ) উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, যা প্রায় সব ভাষাতেই সাধারণ অলংকারিক রীতি। তবে এটি স্বীকার করা মানে এই নয় যে বক্তব্যটি মিথ্যা বা নিছক কাব্যিক অতিরঞ্জন — একটি বাক্য একই সাথে আরবি রীতি অনুযায়ী জোরালো-সাধারণীকৃত এবং বাস্তবে ব্যাপকভাবে সত্য, দুটোই হতে পারে।

পর্ব ৩: পদার্থবিজ্ঞান — শক্ত ও দুর্বল উদাহরণের পার্থক্য

১৯২৪ সালে ফরাসি পদার্থবিজ্ঞানী প্রিন্স লুই দ্য ব্রগলি (Louis de Broglie) বস্তুর প্রকৃতি সম্পর্কে একটি তত্ত্ব দেন — প্রকৃতি প্রতিসাম্যতা পছন্দ করে; আলো প্রকৃতিতে দ্বৈতধর্মী, কোনো অবস্থায় তরঙ্গের মতো আচরণ করে আবার অন্য অবস্থায় কণার মতো। এই ধারণার ভিত্তিতে তিনি বস্তুর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সূত্র দেন — λ = h/mv। ১৯২৯ সালে এই আবিষ্কারের জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তবে এটি সরাসরি বস্তুর জোড়া নয়, বরং বস্তুর অবস্থার দ্বৈততা — তাই এই উদাহরণটিকে দুর্বল ও সতর্কতার সাথে ব্যবহারযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

পদার্থবিজ্ঞানে এমন কিছু সত্যিকারের বস্তুগত জোড়ার শক্তিশালী উদাহরণ আছে যেখানে দ্বৈততা সত্যিই অবিচ্ছেদ্য:

• পল ডিরাকের ১৯২৮ সালের সমীকরণ পূর্বাভাস দেয় যে প্রতিটি কণার একটি প্রতি-কণা (antiparticle) থাকতে হবে; ১৯৩২ সালে কার্ল অ্যান্ডারসন পজিট্রন (ইলেকট্রনের প্রতি-কণা) আবিষ্কার করে এটি প্রমাণ করেন। উচ্চশক্তির ফোটন থেকে আক্ষরিক অর্থেই ইলেকট্রন-পজিট্রন জোড়া তৈরি হয় (pair production) — এক সত্তা থেকে সরাসরি দুই-এর জন্ম।

• মহাবিশ্বে আধান কখনো একলা থাকে না, সবসময় দুই মেরুতে বিভক্ত — এবং আধান সংরক্ষণের সূত্র অনুযায়ী এই দ্বৈততা ভাঙা যায় না।

• একটি চুম্বককে যতবারই দুই টুকরো করা হোক না কেন, প্রতিটি টুকরোয় আবার উত্তর ও দক্ষিণ — দুটি মেরুই থেকে যায়। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে পদার্থবিজ্ঞানীরা একক চৌম্বক মেরু (magnetic monopole) খুঁজেছেন, কিন্তু আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

• কোয়ান্টাম স্পিন: ইলেকট্রনের মতো কণার “স্পিন” পরিমাপ করলে তা সবসময় ঠিক দুটি মানের একটিতেই পাওয়া যায় — “স্পিন আপ” ও “স্পিন ডাউন”।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বোঝা দরকার — “জোড়া” মানে এই নয় যে প্রতিটি একক ইলেকট্রনের পাশে একটি নির্দিষ্ট সঙ্গী-ইলেকট্রন বাঁধা থাকতে হবে। বরং জোড়া এখানে কাজ করে “প্রকার”র পর্যায়ে — পূর্বে দেখানো ভাষাতাত্ত্বিক নীতির সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রতিটি কণা-প্রকারের একটি প্রতি-কণা প্রকার বিদ্যমান, প্রতিটি আধানের একটি বিপরীত আধান অনিবার্য, প্রতিটি চৌম্বক মেরুর বিপরীত মেরু সহাবস্থান করে। মজার বিষয় হলো, ম্যাটার-অ্যান্টিম্যাটারের মতো জোড়া মানুষ অনেক পরে জেনেছে — যা সূরা ইয়াসিনের সেই আয়াতের সাথে মিলে যায় যেখানে আল্লাহ বলেছেন তিনি এমন কিছু থেকেও জোড়া সৃষ্টি করেছেন “যা তোমরা জানো না”।

سُبْحَانَ الَّذِي خَلَقَ الْأَزْوَاجَ كُلَّهَا مِمَّا تُنبِتُ الْأَرْضُ وَمِنْ أَنْفُسِهِمْ وَمِمَّا لَا يَعْلَمُوْنَ — (সম্ভাব্য ভাবানুবাদ): পবিত্র সেই সত্তা, যিনি প্রতিটি জিনিস জোড়া-জোড়া সৃষ্টি করেছেন — ভূমি যা উৎপন্ন করে তাও, এবং তাদের নিজেদেরকেও, আর তারা যা এখনো জানে না তাও। — সূরা ইয়াসিন, ৩৬:৩৬

পর্ব ৪: অণুজীববিজ্ঞান — ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস

অভিযোগের একটি কেন্দ্রীয় অংশ হলো ব্যাকটেরিয়া। অভিযোগকারীরা বলেন, ব্যাকটেরিয়া একাই দ্বি-বিভাজনের মাধ্যমে বংশবিস্তার করে, এদের কোনো “নর-নারী জোড়া” নেই — সুতরাং “সবকিছু জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্ট” দাবিটি ভুল প্রমাণিত। কিন্তু প্রকৃত চিত্র এর চেয়ে অনেক জটিল ও কুরআনের ভাষাতাত্ত্বিক কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে দ্বি-বিভাজন (asexual fission) ছাড়াও “কনজুগেশন” (conjugation) নামে জিনগত উপাদান বিনিময়ের একটি প্রক্রিয়া বিদ্যমান, যেখানে একটি দাতা কোষ থেকে অপর একটি গ্রহীতা কোষে DNA স্থানান্তরিত হয়। জনপ্রিয় লেখায় প্রায়ই দাতা কোষকে “F+” বা “পুরুষ” এবং গ্রহীতা কোষকে “F−” বা “স্ত্রী” বলা হয়, কারণ দাতা কোষ “সেক্স পিলাস” তৈরি করে গ্রহীতার সাথে সংযুক্ত হয়, আর একে কখনো কখনো “ব্যাকটেরিয়াল মেটিং” বলা হয়।

তবে আধুনিক অণুজীববিজ্ঞানে নির্মোহভাবে বলতে গেলে এটি প্রকৃত পুরুষ-নারী নয়; এটি প্রকৃতপক্ষে যৌন জননও নয়, কারণ এখানে কোনো গ্যামেট মিলন ঘটে না এবং নতুন কোনো জীবেরও জন্ম হয় না — বরং একটি বিদ্যমান জীব রূপান্তরিত হয় মাত্র। প্রকৃত পার্থক্যটি হলো প্লাজমিড নামক একটি ক্ষুদ্র বৃত্তাকার DNA-খণ্ড (“F-ফ্যাক্টর” বা উর্বরতা-ফ্যাক্টর) থাকা বা না-থাকা — যার থাকে সে দাতা, যার নেই সে গ্রহীতা। তাই এখানে সঠিক জোড়াটি হলো লিঙ্গভেদ নয়, বরং দাতা-গ্রহীতা সম্পর্ক এবং দ্বি-বিভাজন বনাম জিন-বিনিময় — দুই ধরনের প্রজনন-কৌশলের জোড়া, যা “زوج মানে প্রকার” নীতির সাথেই সঙ্গতিপূর্ণ।

ভাইরাসের ক্ষেত্রে চিত্র ভিন্ন। ভাইরাস স্বাধীনভাবে বিপাকক্ষম নয়, এরা পোষক কোষের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে বংশবৃদ্ধি করে — তাই এদের আদৌ কোনো “লিঙ্গ” থাকার প্রশ্নই অবান্তর। তবে এখানেও দ্বৈততা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত নয় — যখন একই কোষে দুটি ভিন্ন ভাইরাস-জিনোম একসাথে সংক্রমণ ঘটায়, তখন ভাইরাল পলিমারেজ একটি টেমপ্লেট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্য টেমপ্লেটে স্থানান্তরিত হওয়ার মাধ্যমে জিনগত পুনর্বিন্যাস (recombination) ঘটাতে পারে, এবং খণ্ডিত-জিনোমবিশিষ্ট ভাইরাসে দুটি সংক্রামক প্রকারের জিনগত খণ্ড মিশ্রিত হয়ে নতুন বংশধর তৈরি হতে পারে — অর্থাৎ এখানেও দুই উৎসের জিনগত উপাদান মিলিত হওয়ার নীতি কাজ করে।

আরও গভীরে গেলে, প্রতিটি ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা কোষের বংশগতির মূল ভিত্তি — DNA-এর দ্বি-হেলিক্স গঠনই — মূলত পরিপূরক ক্ষারক-জোড়ার (base pairing: অ্যাডেনিন-থাইমিন, গুয়ানিন-সাইটোসিন) উপর দাঁড়িয়ে আছে। অর্থাৎ জীবনের আণবিক কোডই গভীরতম স্তরে একটি “জোড়া”র উপর নির্মিত — ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস কোনোটিই এই মৌলিক দ্বৈততার বাইরে নয়।

অ্যামিবা ও প্রোটোজোয়া — অযৌন জনন প্রসঙ্গ

অভিযোগে প্রায়ই অ্যামিবার উদাহরণ দেওয়া হয়, যা মূলত দ্বি-বিভাজনের মাধ্যমে অযৌনভাবে বংশবিস্তার করে। কিন্তু এখানেও একই নীতি প্রযোজ্য — কিছু অ্যামিবা প্রজাতিতে (যেমন স্লাইম মোল্ড-জাতীয় কিছু গোষ্ঠীতে) তিন বা ততোধিক “মেটিং টাইপ” পাওয়া যায়, যেখানে যে কোনো দুটি ভিন্ন টাইপ একে অপরের সাথে মিলিত হতে পারে কিন্তু নিজের টাইপের সাথে নয়। অর্থাৎ মেটিং-টাইপের সংখ্যা যত বেশিই হোক না কেন, প্রতিটি প্রকৃত মিলন-ঘটনায় (mating event) সবসময় ঠিক দুটি গ্যামেট বা দুটি জিনগত উৎসের মিলন ঘটে — কখনো একক বা ত্রিমুখী নয়। এই বিস্তারিত আলোচনা পরবর্তী “ছত্রাকের হাজারো মেটিং-টাইপ” অংশে আরও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, কারণ উভয় ক্ষেত্রেই একই বৈজ্ঞানিক নীতি কাজ করে।

পর্ব ৫: উদ্ভিদ — ফল ও পরাগায়ন

সূরা আর-রাʿদে (১৩:৩) বলা হয়েছে — وَمِن كُلِّ الثَّمَرَاتِ جَعَلَ فِيهَا زَوْجَيْنِ اثْنَيْنِ — প্রতিটি ফল থেকে তিনি জোড়া জোড়া (দুই দুই) সৃষ্টি করেছেন। লক্ষণীয়, ইমাম কুরতুবী (রহঃ) ইতিমধ্যেই এই আয়াতের ব্যাখ্যায় জোড়া বলতে বুঝিয়েছেন প্রকার/বৈচিত্র্য — টক-মিষ্টি, তাজা-শুকনো; ফুলের প্রজনন-জীববিজ্ঞান নয়। সুতরাং অভিযোগকারীরা যখন এই আয়াতকে সরাসরি উদ্ভিদের যৌন প্রজননের দাবি বলে ধরে নেন, তখনই তারা ক্লাসিক্যাল তাফসিরের বাইরে চলে যান।

তা সত্ত্বেও জীববিজ্ঞানের দিক থেকেও আপত্তি খতিয়ে দেখা যাক। অভিযোগ হলো, অনেক উদ্ভিদ স্বপরাগী (self-pollinating) এবং অনেকের পুরুষ-স্ত্রী অঙ্গ আলাদা থাকে না। বাস্তবতা হলো, স্বপরাগী ফুলেও (যেমন গম, ধান, টমেটো) একটি ফুলে যদি কার্যকর পুংকেশর ও গর্ভকেশর উভয়ই থাকে, তবে তাকে “পূর্ণাঙ্গ ফুল” (perfect flower) বলা হয় — অর্থাৎ স্বপরাগায়ন মানে পুরুষ-স্ত্রী অঙ্গের অনুপস্থিতি নয়, বরং একই ফুলে উভয় অঙ্গ একত্রে মিলিত হওয়া। ভুট্টা ও শসার মতো উদ্ভিদ “একগৃহী” (monoecious) — একই গাছে আলাদা পুরুষ ও স্ত্রী ফুল থাকে। আবার খেজুর গাছের মতো কিছু উদ্ভিদ সম্পূর্ণ “দ্বিগৃহী” (dioecious) — পুরুষ ও স্ত্রী ফুল সম্পূর্ণভাবে আলাদা গাছে জন্মায়।

আগ্রহোদ্দীপক বিষয় হলো, সপ্তম শতাব্দীর মদীনাবাসীরা এই দ্বিগৃহী খেজুর গাছের পরাগায়ন সম্পর্কে ব্যবহারিকভাবে অবগত ছিলেন — মদীনার আরবরা ফলন বাড়ানোর জন্য খেজুর গাছে কৃত্রিম পরাগায়ন (তাʿবীর) করতেন, এবং এই প্রসঙ্গেই নবী মুহাম্মদ (ﷺ)-এর সেই বিখ্যাত উক্তি এসেছে — “তোমরা তোমাদের পার্থিব বিষয়ে অধিক অবগত”। অর্থাৎ “জোড়া” ধারণা শুধু উট-ছাগল-ভেড়ার পর্যবেক্ষণ থেকে আসেনি — উদ্ভিদ-পরাগায়নের ব্যবহারিক জ্ঞানও সে যুগে বিদ্যমান ছিল।

পর্ব ৬: ছত্রাকের “হাজার হাজার সেক্স” — Schizophyllum commune প্রসঙ্গ

এটি সমালোচকদের সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি বলে মনে হয়। Split-gill mushroom (Schizophyllum commune) নামক একটি ছত্রাকে বিজ্ঞানীরা ২৩,০০০-এরও বেশি “মেটিং টাইপ” (mating type) চিহ্নিত করেছেন, যা কেউ কেউ “২৩,০০০ সেক্স” বলে প্রচার করে কুরআনের “জোড়া” ধারণার বিরোধী বলে দাবি করেন।

Schizophyllum commune-এ দুটি জিন-লোকাস (A ও B) রয়েছে, এবং প্রতিটি লোকাসে একাধিক উপ-লোকাস ও বহু রূপভেদ (allele) থাকায় — Aα-তে প্রায় ৯টি, Aβ-তে প্রায় ৩২টি, এবং Bα ও Bβ-তে প্রতিটিতে প্রায় ৯টি করে — সব মিলিয়ে আনুমানিক ২৩,৩২৮টি সম্ভাব্য “মেটিং টাইপ” হিসাব করা হয়েছে।

কিন্তু এই বৈচিত্র্যের পেছনের প্রক্রিয়াটা ভালোভাবে বুঝলে দেখা যায়, এটি বরং “জাওজ” ধারণাকেই সমর্থন করে। কারণ এই বিশাল সংখ্যাটি বোঝায় জিনগত পরিচয়ের বৈচিত্র্য — মানুষের রক্তের গ্রুপ বা HLA-টাইপের মতো — কিন্তু প্রকৃত মিলন-প্রক্রিয়া তখনও কঠোরভাবে দ্বিপক্ষীয় (pairwise)। এই ২৩,০০০+ সম্ভাব্য combination আসলে মাত্র দুটি জেনেটিক লোকাস — A ও B-তে ভিন্নতার ফল। মিলনের শর্ত হলো, দুটি ছত্রাকের A ও B — উভয় লোকাসেই ভিন্ন অ্যালিল থাকতে হবে। অর্থাৎ এটা মৌলিকভাবে এখনো একটা “দুই-ফ্যাক্টর” সিস্টেম, শুধু প্রতিটা ফ্যাক্টরে বহু সংস্করণ আছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো — প্রতিটা প্রকৃত মিলন-ঘটনায় (mating event) সবসময় ঠিক দুটি নিউক্লিয়াসের মিলন ঘটে, কখনো এক, তিন বা অসংখ্য নিউক্লিয়াস একসাথে মেশে না। এই ছত্রাক একসাথে নিজের জনসংখ্যার প্রায় ৯৯.৯৮% সদস্যের সাথে মিলিত হতে পারলেও, প্রতিটা মিলন-ঘটনায় ঠিক দুটি জীবই অংশ নেয়, কখনো তিন বা তার বেশি নয় — কেবল কাকে “ভিন্ন” বলে গণ্য করা হবে তার সংজ্ঞা অস্বাভাবিক রকম সমৃদ্ধ। এটি অনেকটা মানুষের জিনগত বৈচিত্র্যের সাথে তুলনীয়, অথচ স্বাভাবিক মানব প্রজনন তখনও মৌলিকভাবে এক পুরুষ-এক নারীর জোড়ায়ই সংঘটিত হয়। সুতরাং ছত্রাকের “হাজারো মেটিং টাইপ” আসলে জোড়ার সংখ্যা নয়, বরং জোড়া-গঠনের সম্ভাব্য সমন্বয়ের সংখ্যা — মূল দ্বৈত-মিলন কাঠামো অক্ষতই থেকে যায়।

শৈবাল ও অন্যান্য ছত্রাকের মধ্যে সত্যিকার অর্থেই অযৌন ও যৌন — দুই ধরনের জনন প্রক্রিয়া বিদ্যমান। অযৌন জননে এরা খণ্ডায়ন, বিভাজন বা মুকুলোদগমের মাধ্যমে বংশবৃদ্ধি করে, আবার যৌনজননে নেগেটিভ ও পজিটিভ জিনের আদান-প্রদানের মাধ্যমে দুটি গ্যামেটের প্রকৃত মিলন ঘটে। এখানেও যৌন-অযৌনের বিপরীত জোড় বিদ্যমান।

পর্ব ৭: প্রাণিজগৎ — অভিযোগকৃত প্রতিটি জীবের পয়েন্ট-বাই-পয়েন্ট জবাব

ইসলামবিরোধী পক্ষ থেকে যে নির্দিষ্ট জীবগুলোর তালিকা দিয়ে অভিযোগ করা হয় — ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, অ্যামিবা ইতিমধ্যেই উপরে আলোচিত হয়েছে। এখন আলোচনা করা যাক উভলিঙ্গ (hermaphrodite) প্রাণীদের নিয়ে, যাদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয় — স্পঞ্জ, শামুক, সি-হেয়ার (sea hare) ও গভীর-সমুদ্রের অ্যারো-ওয়ার্ম (arrow worm)।

স্পঞ্জ ও শামুক — উভলিঙ্গ প্রাণী

স্পঞ্জ ও শামুকের মতো প্রাণীর দেহে একসাথে পুরুষ ও স্ত্রী, দুই ধরনের প্রজনন অঙ্গ বিদ্যমান। অভিযোগ হলো, যেহেতু এদের পৃথক পুরুষ ও স্ত্রী ব্যক্তি (individual) নেই, তাই “নর-নারী জোড়া” নীতি এখানে খাটে না। কিন্তু লক্ষণীয়, এখানেও “দুই” বিদ্যমান — শুধু তার অবস্থান ভিন্ন: একই দেহের ভেতরেই দুই ধরনের জনন-তন্ত্রের সহাবস্থান নিজেই একটা জোড়া গঠন করে। আর স্ব-নিষেকের ক্ষেত্রেও পুরুষ গ্যামেট ও স্ত্রী গ্যামেটের পৃথক পৃথক ভূমিকা বজায় থাকে — অর্থাৎ নিষেক-প্রক্রিয়ার মৌলিক স্তরে দুই ধরনের গ্যামেটের মিলন অপরিহার্যই থেকে যায়। এছাড়া অনেক শামুক ও স্পঞ্জ প্রজাতিতে ক্রস-ফার্টিলাইজেশন (আন্তঃব্যক্তি নিষেক) দেখা যায়, যেখানে দুটি ভিন্ন ব্যক্তি একে অপরকে নিষিক্ত করে — সেক্ষেত্রেও দুই ব্যক্তির অংশগ্রহণ অপরিহার্য।

সি-হেয়ার (Sea Hare) — উভলিঙ্গ সামুদ্রিক শামুক

সি-হেয়ার (Aplysia গণের সামুদ্রিক শামুক) উভলিঙ্গ — একই দেহে পুরুষ ও স্ত্রী উভয় প্রজনন অঙ্গ থাকে। কিন্তু জীববিজ্ঞানের একটি সুপরিচিত তথ্য হলো, সি-হেয়ার সাধারণত স্ব-নিষেকের পরিবর্তে আন্তঃব্যক্তি মিলনে অংশ নেয়, এবং বিখ্যাতভাবে “মেটিং চেইন” গঠন করে — যেখানে একাধিক ব্যক্তি একসাথে শৃঙ্খল আকারে যুক্ত হয়ে, প্রতিটি ব্যক্তি একই সাথে তার সামনের সঙ্গীর প্রতি পুরুষ-ভূমিকা এবং পেছনের সঙ্গীর প্রতি স্ত্রী-ভূমিকা পালন করে। অর্থাৎ প্রতিটি একক মিলন-সংযোগে (mating link) ঠিক দুটি ভূমিকা — দাতা ও গ্রহীতা — কাজ করে, যত বড় শৃঙ্খলই গঠিত হোক না কেন। এটি ঠিক ছত্রাকের মেটিং-টাইপের মতোই — সামগ্রিক জনসংখ্যায় জটিলতা থাকলেও, প্রতিটি প্রকৃত মিলন-ইউনিটে দ্বৈততা অক্ষুণ্ণ থাকে।

গভীর-সমুদ্রের অ্যারো-ওয়ার্ম (Arrow Worm / Chaetognatha)

কিছু গভীর-সমুদ্রের অ্যারো-ওয়ার্ম প্রজাতি (Chaetognatha পর্ব) উভলিঙ্গ এবং স্ব-নিষেক সক্ষম। তবে এখানেও বৈজ্ঞানিক সাহিত্য দেখায় যে অধিকাংশ অ্যারো-ওয়ার্ম প্রজাতি ক্রস-ফার্টিলাইজেশনকেই প্রাধান্য দেয়, এবং দেহের ভেতরে পুরুষ ও স্ত্রী জনন-তন্ত্র শারীরবৃত্তীয়ভাবে সুস্পষ্টভাবে পৃথক থাকে (সামনের অংশে অণ্ডাশয়, পেছনের অংশে শুক্রাশয়) — অর্থাৎ একই দেহে “দুই ধরনের অঙ্গের জোড়া” একটি গঠনগত বাস্তবতা, নিষেক প্রক্রিয়ায় শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মৌলিক দ্বৈততাও অপরিবর্তিত থাকে।

সাধারণ নীতি — উভলিঙ্গ প্রাণীর ক্ষেত্রে

উপরের তিনটি উদাহরণ থেকে একটি সাধারণ প্যাটার্ন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। উভলিঙ্গতা মানে দ্বৈততার অনুপস্থিতি নয়, বরং দ্বৈততার একটি ভিন্ন বিন্যাস — হয় একই দেহে দুই অঙ্গতন্ত্রের সহাবস্থান হিসেবে, নয়তো মিলন-শৃঙ্খলে প্রতিটি সংযোগে পুরুষ-স্ত্রী দ্বৈত-ভূমিকা হিসেবে। ফার্টিলাইজেশনের মৌলিক জৈবরাসায়নিক স্তরে — শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলন — দ্বৈততা কখনোই অনুপস্থিত হয় না, এমনকি স্ব-নিষেকের ক্ষেত্রেও নয়, কারণ একই দেহ থেকে উৎপন্ন হলেও দুই ধরনের গ্যামেট পৃথকভাবেই উৎপন্ন হয় ও মিলিত হয়। এর ফলে এই প্রাণীগুলো “জাওজ” নীতির ব্যতিক্রম নয় বরং সেই একই সর্বজনীন দ্বৈত-মিলন কাঠামোর একটি ভিন্ন প্রকাশ মাত্র।

পার্থেনোজেনেসিস — পুরুষবিহীন প্রজনন

পুরুষবিহীন প্রজনন (parthenogenesis) নিয়ে অভিযোগ সবচেয়ে ঘন ঘন আসে। হুইপটেইল টিকটিকিকে (Cnemidophorus/Aspidoscelis গণ) প্রায়ই “পুরুষবিহীন প্রজাতি” হিসেবে দাবি করা হলেও, বাস্তবে এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য আছে যা প্রায়শই গোপন রাখা হয়। গবেষণা স্পষ্টভাবে দেখায় যে, সকল পার্থেনোজেনেটিক (পুরুষবিহীন) Whiptail প্রজাতিই মূলত দুটি স্বাভাবিক যৌন প্রজননকারী প্রজাতির আন্তঃপ্রজাতি হাইব্রিডাইজেশনের ফল। অর্থাৎ একটি প্রজাতির পুরুষ ও অন্য প্রজাতির স্ত্রীর মিলনে যে হাইব্রিড সন্তান জন্ম নেয়, সেই সন্তানই পরবর্তীতে ক্লোনালভাবে বংশবিস্তার শুরু করে। তাদের জিনোমেই স্থায়ীভাবে পুরুষ-পূর্বপুরুষের ডিএনএ সংরক্ষিত আছে (heterozygosity হিসেবে)।

সবচেয়ে গবেষিত প্রজাতি Cnemidophorus uniparens-এর মাতৃ-পূর্বপুরুষ হলো little striped whiptail (C. inornatus), আর পিতৃ-পূর্বপুরুষ হলো rusty-rumped whiptail (C. burti) — অর্থাৎ একটি পুরুষ ও একটি স্ত্রীর মিলনই এই প্রজাতির জন্মের কারণ। যেসব প্রজাতিতে শুধু স্ত্রী আছে, সেখানেও “ventral mount position” নামক ঘটনায় একটি স্ত্রী টিকটিকির মধ্যে হরমোনাল পরিবর্তনের ফলে সাময়িকভাবে পুরুষালি আচরণ প্রকাশ পায়, যা জনসংখ্যায় জেনেটিক বৈচিত্র্য বাড়ায়।

তাহলে Whiptail Lizard-এর ক্ষেত্রে অন্তত তিন স্তরে জোড়া স্পষ্ট: (১) উৎপত্তিগতভাবে পুরুষ ও স্ত্রীর হাইব্রিডাইজেশনের জোড়া, (২) প্রজাতির মধ্যে যৌন-প্রজননকারী ও পার্থেনোজেনেটিক উপগোষ্ঠীর জোড়া, এবং (৩) আচরণগতভাবে সাময়িক পুরুষালি ও স্বাভাবিক স্ত্রী ভূমিকার জোড়া। সুতরাং “এদের জোড়া কখনোই ছিল না” — এই দাবিটি বিজ্ঞানের সম্পূর্ণ বিপরীত একটি ভ্রান্ত উপস্থাপনা মাত্র।

পার্থেনোজেনেসিস কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; কোমোডো ড্রাগন, টার্কি, কিছু হাঙর প্রজাতি এবং পতঙ্গের একাধিক বর্গে (বিশেষত মেফ্লাই, ফড়িং, লাঠি-পোকা) এই “facultative parthenogenesis” দেখা যায় — যেখানে প্রজাতিটি সাধারণত যৌন জননে সক্ষম, কিন্তু মাঝে মাঝে অযৌনভাবেও বংশবৃদ্ধি করতে পারে। কোমোডো ড্রাগনের লিঙ্গ-নির্ধারণ পদ্ধতি ZW ধরনের। পুরুষ ছাড়া জন্ম নেওয়া কোমোডো ড্রাগনের ক্ষেত্রে ডিম থেকে WW বা ZZ — দুই ধরনের সমন্বয় হতে পারে, কিন্তু WW ডিম্বাণু কখনো জীবিত থাকে না, কেবল ZZ ডিম্বাণুই বাঁচে — ফলে “কুমারী জন্ম” থেকে শুধুই পুরুষ সন্তান জন্মায়। অর্থাৎ প্রকৃতি যখন সাময়িকভাবে “জোড়া” ভেঙে দেয়, তখনও সে এমনভাবে কাজ করে যাতে অনুপস্থিত লিঙ্গটিই পুনরুৎপাদিত হয় এবং জনসংখ্যা আবার স্বাভাবিক যৌন প্রজননে ফিরে যেতে পারে।

আরও গভীর একটি বৈজ্ঞানিক সত্য হলো, অধিকাংশ পার্থেনোজেনেসিসেই (যাকে automixis বলা হয়) সন্তানের কোষে দ্বিগুণ ক্রোমোজোম তথা ডিপ্লয়েড অবস্থা পুনরুদ্ধার করা আবশ্যক — ডিম্বাণুর নিউক্লিয়াসের সাথে তার দ্বিতীয় পোলার বডির মিলনের মাধ্যমে, অথবা মিয়োসিসের আগে বা পরে ক্রোমোজোম দ্বিগুণ করার মাধ্যমে এই ডিপ্লয়েডি পুনরুদ্ধার করা হয়। অর্থাৎ পিতা না থাকলেও, সন্তানের কোষে “জোড়া” ক্রোমোজোমের কাঠামো অক্ষুণ্ণ রাখতে প্রকৃতি বাধ্য — কোনো না কোনো স্তরে দ্বৈততা পার্থেনোজেনেসিসেও পরিহারযোগ্য নয়।

উপরের সব আলোচনা থেকে একটা গভীর সাধারণ সত্য বেরিয়ে আসে: জীবজগতে যত প্রকার মেটিং-সিস্টেমই থাকুক না কেন — দুই সেক্স, তিন মেটিং-টাইপ, বা ২৩,০০০ মেটিং-টাইপ — প্রকৃত fertilization বা জিনগত মিলন সবসময় ঠিক দুটি গ্যামেট বা দুটি জেনেটিক উৎসের মিলন, কখনো একক বা ত্রিমুখী নয়। এমনকি স্ব-নিষেককারী উভলিঙ্গ প্রাণীতেও একটা পুরুষ গ্যামেট ও একটা স্ত্রী গ্যামেটের প্রকৃত মিলন ঘটে — শুধু দুটোই এক দেহ থেকে উৎপন্ন হয়। অর্থাৎ “জোড়া” বা পেয়ারিং নীতিটা জীবজগতের প্রজনন প্রক্রিয়ার একটা সর্বজনীন (universal) বৈশিষ্ট্য, যা ঠিক কুরআনের ভাষাগত “জাওজ” ধারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

পর্ব ৮: ফেরেশতা ও জ্বিন — অদৃশ্য জগতের প্রসঙ্গ

অভিযোগের একটি ধরন হলো — ফেরেশতাদের লিঙ্গ নেই বলে আল্লাহর বাণী “নারীবাচক নাম দিয়ে থাকে ফেরেশতাদেরকে” (সূরা আন-নাজম, ৫৩:২৭) থেকে বোঝা যায় ফেরেশতাদের কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গ নেই — তাহলে এদের “জোড়া” কোথায়?

এখানে একটি প্রচলিত যুক্তিকে আরও সতর্কভাবে সংশোধন করা দরকার। “লিঙ্গহীন ফেরেশতা বনাম লিঙ্গযুক্ত জীব”-কে সরাসরি একটি “জোড়া” বলে দাবি করা যথাযথ নয়, কারণ এটি বিপরীত বৈশিষ্ট্যের প্রকৃত জোড়া নয় বরং একটি বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি-অনুপস্থিতির পার্থক্য মাত্র। এর বদলে দুটি অধিক যুক্তিসঙ্গত পথ আছে।

প্রথমত, হাদিসে এসেছে (সহীহ মুসলিম) — ফেরেশতাদের সৃষ্টি করা হয়েছে নূর (আলো) থেকে, আর জ্বীনদের সৃষ্টি করা হয়েছে ধোঁয়াবিহীন আগুনের শিখা থেকে। ইসলামি ঐতিহ্যে জ্বীনদের মধ্যে বিবাহ ও বংশবৃদ্ধির উল্লেখও পাওয়া যায় (যেমন ইবলিসের ذُرِّيَّة বা বংশধরের কথা কুরআনে এসেছে, সূরা কাহফ ১৮:৫০)। সুতরাং অদৃশ্য জগতেই একটি অর্থবহ জোড়া দাঁড় করানো যায় — আলো থেকে সৃষ্ট, আনুগত্যশীল, লিঙ্গহীন ফেরেশতা বনাম আগুন থেকে সৃষ্ট, স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন জ্বীন/শয়তান, যাদের মধ্যে প্রজনন ও পছন্দ-অপছন্দের ধারণা বিদ্যমান।

দ্বিতীয়ত, আরও সহজ পথ হলো — ফেরেশতাদের প্রতিটি আলাদা আলাদা “জোড়া”য় বিভক্ত করতে বাধ্য না হয়ে কেবল ৩৬:৩৬ আয়াতের নিজস্ব ভাষাতেই আল্লাহ বলেছেন তিনি জোড়া সৃষ্টি করেছেন এমন কিছু থেকেও “যা তোমরা জানো না”। ফেরেশতা গায়েবের (অদৃশ্য জগতের) অংশ, এবং তাদের প্রকৃত প্রকৃতি সম্পূর্ণভাবে মানুষের জ্ঞানের আওতায় নেই। আয়াতটি নিজেই মানুষকে প্রতিটি সৃষ্টিকে জোর করে একটি নির্দিষ্ট “জোড়া”র লেবেলে বেঁধে ফেলার বাধ্যবাধকতা দেয় না — বরং অজানার সম্ভাবনাকে আগে থেকেই জানিয়ে দেয়।

পর্ব ৯: আল্লাহ, জান্নাত-জাহান্নাম, সময়, শক্তি — “সবকিছু” কতদূর বিস্তৃত?

যদি كل شيء সত্যিই আক্ষরিক “প্রতিটি জিনিস” বোঝায়, তাহলে আল্লাহ, জান্নাত-জাহান্নাম, সময়, শক্তি — এদেরও কি জোড়া থাকা উচিত? প্রতিটি প্রশ্ন আলাদাভাবে দেখা যাক।

আল্লাহ প্রসঙ্গে

আয়াতের ক্রিয়াপদটিই (خَلَقْنَا — “আমি সৃষ্টি করেছি”) সমস্যাটির সমাধান দিয়ে দেয়। আয়াতগুলো বলছে আল্লাহ যা সৃষ্টি করেছেন তার মধ্যে জোড়া আছে — অর্থাৎ আলোচ্য বিষয়টি সৃষ্ট বস্তু (মাখলুক), স্রষ্টা (খালিক) নয়। আল্লাহ নিজেকে সৃষ্টি করেননি, তিনি সৃষ্টিকর্তা। এ ছাড়া সূরা আল-ইখলাসে (১১২:৩-৪) সরাসরি বলা হয়েছে, “তিনি জন্ম দেননি, তাঁকে জন্ম দেওয়া হয়নি, এবং তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই” — অর্থাৎ আল্লাহর কোনো জোড়া না থাকা কোনো ব্যতিক্রম নয়, বরং এটি ইসলামের তাওহীদ মতবাদেরই কেন্দ্রীয় ভিত্তি, যা “জোড়া” আয়াতগুলোর সাথে সাংঘর্ষিক নয় বরং পরিপূরক।

জান্নাত-জাহান্নাম প্রসঙ্গে

এটি সমস্যাই নয়, কারণ ইবনে কাসীরের তাফসির অনুযায়ী জান্নাত-জাহান্নাম নিজেরাই একে অপরের জোড়া হিসেবে ইতিমধ্যে তালিকাভুক্ত — দুটি বিপরীত গন্তব্য, পুরস্কার বনাম শাস্তি। এদের আলাদা করে নিজস্ব কোনো জোড়া দরকার নেই।

সময় ও শক্তি প্রসঙ্গে

কুরআনের আলোচ্য আয়াতগুলো মূলত সৃষ্ট জগতের (created entities) প্রসঙ্গে। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে সময় (Time) সাধারণত spacetime-এর একটি মাত্রা (dimension) হিসেবে এবং শক্তি (Energy) একটি সংরক্ষিত ভৌত রাশি (physical quantity) হিসেবে বিবেচিত হয়। এগুলোকে জীব বা দৃশ্যমান বস্তুসমূহের মতো স্বতন্ত্র শ্রেণির সৃষ্ট সত্তা হিসেবে আলোচনা করা হয় না। ফলে “Time-এর জোড়া কী?” বা “Energy-এর জোড়া কী?” — এ ধরনের প্রশ্ন আদৌ কুরআনের زوج সম্পর্কিত আয়াতগুলোর আলোচ্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত কি না, সেটিই প্রথমে প্রমাণ করা প্রয়োজন। বর্তমান ভাষাতাত্ত্বিক, তাফসীরগত ও বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে এ বিষয়ে কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না, তাই এই নিবন্ধে সময় ও শক্তিকে زوج ধারণার পক্ষে বা বিপক্ষে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি — একাডেমিক সততার স্বার্থে অনিশ্চিত বিষয়ে চূড়ান্ত দাবি না করাই শ্রেয়। তবে অনুমানমূলকভাবে এভাবেও জোড়া হতে পারে: Forward Time ও Backward Time, স্থিতিশক্তি (Potential Energy) ও গতিশক্তি (Kinetic Energy) ইত্যাদি। ভবিষ্যতে হয়তো এ বিষয়ে আরও ভালোভাবে জানা যাবে।

পর্ব ১০: পদ্ধতিগত প্রশ্ন — প্রাচীন পর্যবেক্ষণ, Post-hoc যুক্তি, নাকি নিছক অলংকার?

এই অংশের প্রশ্নগুলোই সবচেয়ে জটিল, কারণ এগুলো নির্দিষ্ট কোনো বিজ্ঞান নয়, বরং পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

এটা কি শুধু প্রাচীন পর্যবেক্ষণের সাধারণীকরণ?

সপ্তম শতাব্দীর আরবরা মানুষ-উট-ছাগল-ভেড়ার লিঙ্গভেদ দেখত, এবং (পূর্বে উল্লিখিত মতো) খেজুর-পরাগায়নও জানত। কিন্তু তারা কোনোভাবেই ব্যাকটেরিয়ার কনজুগেশন, ছত্রাকের mating-type locus, DNA-র ক্ষারক-জোড়া, পদার্থ-প্রতিপদার্থ, বা চৌম্বক মেরুর অবিচ্ছেদ্যতা জানতে পারত না। আয়াতের নিজস্ব ভাষাই (وَمِمَّا لَا يَعْلَمُوْنَ — “এবং যা তারা জানে না”, ৩৬:৩৬) এই সীমাবদ্ধতা আগে থেকেই জানিয়ে দেয় — এটি একটি বদ্ধ অভিজ্ঞতামূলক তালিকা নয়, বরং একটি খোলা নীতি যা ভবিষ্যতের আবিষ্কারের জন্য জায়গা রাখে।

তাহলে কি আধুনিক মুসলিমরা পরে কুরআনের সাথে বিজ্ঞান জোর করে মিলাচ্ছে?

এই অভিযোগের পেছনে একটি ঐতিহাসিক ভুল ধারণা আছে। সমালোচকরা মনে করেন প্রথমে زوج মানে শুধু নর-নারী বলা হতো, পরে অ্যান্টিম্যাটার আবিষ্কারের পর ব্যাখ্যা পাল্টানো হয়েছে। কিন্তু আগেই দেখানো হয়েছে, তাবারী (মৃত্যু ৯২৩ খ্রিস্টাব্দ) ও ইবনে কাসীর বহু শতাব্দী আগেই কুফর-ঈমান, সুখ-দুঃখ, রাত-দিনের মতো অ-জৈবিক জোড়ার কথা বলে গেছেন — পজিট্রন আবিষ্কারের (১৯৩২) এক হাজার বছরেরও বেশি আগে। অর্থাৎ “ব্যাপক জোড়া” ধারণাটি নতুন আবিষ্কার নয়; এটি ক্লাসিক্যাল তাফসিরেই প্রোথিত। নতুন যা ঘটেছে তা হলো — পুরনো, স্থিতিশীল সংজ্ঞার মধ্যে নতুন উদাহরণ শনাক্ত করা, ঠিক যেমন “যান” শব্দের পুরনো সংজ্ঞা গাড়ি-বিমান আবিষ্কারের পরও সংজ্ঞা পরিবর্তন ছাড়াই প্রযোজ্য থেকে যায়।

তবে এখানে সততার সাথে এটাও স্বীকার করা দরকার — প্রতিটি প্রস্তাবিত “মিল” সমান শক্তিশালী নয়। জনপ্রিয় ইসলামি লেখায় মাঝে মাঝেই দুর্বল সাদৃশ্য (যেমন এই লেখায় আগেই বাদ দেওয়া তরঙ্গ-কণা দ্বৈততা ও প্রোটন-ইলেকট্রন) অতি-উৎসাহে ব্যবহৃত হয়। প্রকৃত বুদ্ধিবৃত্তিক শৃঙ্খলা মানে দুর্বল উদাহরণ ছেঁটে ফেলে শক্ত উদাহরণ (পদার্থ-প্রতিপদার্থ, আধান, চৌম্বক মেরু, DNA ক্ষারক-জোড়া) ধরে রাখা — যা এই গোটা লেখায়ই করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, মুসলিম পণ্ডিতদের মধ্যেও এই প্রশ্নে আভ্যন্তরীণ বিতর্ক বিদ্যমান। ধর্মের বাইরের সমালোচকদের পাশাপাশি, মূলধারার ইসলামি পণ্ডিতরাও বৈজ্ঞানিক ইʿজাজ আন্দোলনের কিছু ব্যাখ্যা নিয়ে আপত্তি তুলেছেন; বৈজ্ঞানিক ইʿজাজের পদ্ধতি ইসলামি পণ্ডিতদের সর্বসম্মত অনুমোদন পায়নি এবং এটি এখনো চলমান বিতর্কের বিষয়। বস্তুত, “তাফসীর ইলমী” (যা বিজ্ঞানের আলোকে আয়াতের অর্থ বোঝার বিনীত প্রচেষ্টা — ইমাম রাযী, মুহাম্মদ আবদুহ, তানতাভী জাওহারীর মতো পণ্ডিতদের ধারা) আর “ইʿজাজ ইলমী” (যা সরাসরি দাবি করে কুরআন নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক তথ্য আগেভাগে বলে দিয়েছে) — এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি। এই লেখা ইচ্ছাকৃতভাবে প্রথমটির ঘরানায় থাকার চেষ্টা করেছে — অর্থাৎ “কুরআন কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান পূর্বাভাস দিয়েছে” নয়, বরং “কুরআনের বর্ণিত সাধারণ নীতি বিজ্ঞানের আবিষ্কারের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ”।

তাহলে কি এটা নিছক অলংকার (hyperbole), বৈজ্ঞানিক বিবৃতি নয়?

আগেই দেখানো হয়েছে, আরবি كل জোরালো-সাধারণীকরণের রীতিতে ব্যবহৃত হতে পারে। কিন্তু অলংকারিক হওয়া আর সত্য হওয়া পরস্পরবিরোধী নয় — একটি বাক্য একই সাথে আরবি ভাষারীতিতে জোরালো এবং বাস্তবে ব্যাপকভাবে সঠিক হতে পারে। বিনীততম ও সবচেয়ে রক্ষণযোগ্য দাবিটি হলো এটি: কুরআন কোনো বিজ্ঞানের পাঠ্যবই নয় (এর মূল উদ্দেশ্য হেদায়েত), কিন্তু সৃষ্টিজগতের মৌলিকভাবে দ্বৈত প্রকৃতি সম্পর্কে এর বর্ণনা পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞান স্বাধীনভাবে যা আবিষ্কার করেছে তার সাথে ব্যাপকভাবে সঙ্গতিপূর্ণ।

ক্লাসিক্যাল তাফসিরে তো অ্যান্টিম্যাটার-কণাপদার্থবিজ্ঞান ছিল না?

অবশ্যই ছিল না, এবং থাকার কথাও নয়। কিন্তু এতে কোনো সমস্যা নেই — তাবারী-ইবনে কাসীর যে ব্যাপক, স্পষ্ট কাঠামো (জোড়া = বহু ধরনের দ্বৈততা, শুধু লিঙ্গ নয়) প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, তা প্রতিটি যুগের পাঠকের জন্য নতুন নতুন উদাহরণ চিনে নেওয়ার পথ খোলা রাখে — এর জন্য ক্লাসিক্যাল পণ্ডিতদের প্রতিটি ভবিষ্যৎ উদাহরণ পূর্বানুমান করতে হয় না, তাদের কাঠামোটি যথেষ্ট ব্যাপক হলেই চলে।

পর্ব ১১: অভিযোগ ও জবাবের সংক্ষিপ্ত তালিকা

শংশয়সহ অন্যান্য সমালোচনামূলক লেখায় উত্থাপিত প্রতিটি নির্দিষ্ট জীব/বিষয়ের জবাব এক নজরে:

4. ব্যাকটেরিয়া — দ্বি-বিভাজনের পাশাপাশি কনজুগেশন প্রক্রিয়ায় দাতা-গ্রহীতা কোষের জোড়া বিদ্যমান; DNA-র ক্ষারক-জোড়াও একটি অপরিহার্য আণবিক দ্বৈততা।

5. ভাইরাস — “লিঙ্গ” ধারণা প্রযোজ্য না হলেও, জিনগত পুনর্বিন্যাসে দুই জিনোম-উৎসের মিলন এবং DNA/RNA-র ক্ষারক-জোড়া দ্বৈততার ভিত্তি গঠন করে।

6. অ্যামিবা ও প্রোটোজোয়া — অযৌন জননের পাশাপাশি বহু-মেটিং-টাইপ প্রজাতিতেও প্রতিটি প্রকৃত মিলন ঘটনায় ঠিক দুটি গ্যামেট/জীবের মিলন ঘটে।

7. স্পঞ্জ ও শামুক — উভলিঙ্গ হলেও একই দেহে পুরুষ-স্ত্রী উভয় জনন-তন্ত্রের সহাবস্থান এবং নিষেকে দুই ধরনের গ্যামেটের ভূমিকা একটি জোড়াই গঠন করে।

8. সি-হেয়ার — মেটিং চেইনের প্রতিটি সংযোগে দাতা-গ্রহীতা দ্বৈত-ভূমিকা পালিত হয়, ঠিক যেমন একটি জোড়ার মতোই কাজ করে।

9. গভীর-সমুদ্রের অ্যারো-ওয়ার্ম — দেহের ভেতরে শারীরবৃত্তীয়ভাবে পৃথক পুরুষ-স্ত্রী অঙ্গ এবং শুক্রাণু-ডিম্বাণুর মৌলিক দ্বৈততা অক্ষুণ্ণ।

10. Schizophyllum commune ছত্রাক — ২৩,০০০+ মেটিং টাইপ আসলে একটি দুই-লোকাস (A-B) ব্যবস্থার সমন্বয়ের ফল; প্রতিটি প্রকৃত মিলনে ঠিক দুটি নিউক্লিয়াসের মিলন ঘটে।

11. পার্থেনোজেনেটিক হুইপটেইল টিকটিকি — উৎপত্তিগতভাবে দুই প্রজাতির পুরুষ-স্ত্রী হাইব্রিডাইজেশনের ফল; ডিপ্লয়েডি পুনরুদ্ধারেও দ্বৈততা অপরিহার্য।

12. কোমোডো ড্রাগন — পার্থেনোজেনেসিসেও প্রকৃতি লিঙ্গ-দ্বৈততা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দিকেই কাজ করে (কেবল ZZ পুরুষ সন্তান জন্মায়, জনসংখ্যা আবার যৌন প্রজননে ফিরতে পারে)।

13. উভলিঙ্গ ও স্বপরাগী উদ্ভিদ — “পূর্ণাঙ্গ ফুল”এও পুংকেশর-গর্ভকেশরের পৃথক ভূমিকা বজায় থাকে; একগৃহী ও দ্বিগৃহী উদ্ভিদ উভয় ধরনের জোড়াই প্রদর্শন করে।

14. ফেরেশতা — লিঙ্গহীন হলেও আয়াতের নিজস্ব ভাষায় “যা তোমরা জানো না” শর্তের আওতায় পড়ে; বিকল্পভাবে ফেরেশতা-জ্বিন একত্রে একটি অর্থবহ জোড়া গঠন করে।

15. আল্লাহ — আয়াতের আলোচ্য বিষয় সৃষ্ট বস্তু, স্রষ্টা নয়; সূরা ইখলাসে আল্লাহর কোনো সমকক্ষ না থাকা সুস্পষ্টভাবে ঘোষিত।

উপসংহার

সংক্ষেপে: ভাষাতাত্ত্বিক ভিত্তি (زوج = প্রকার/দ্বৈততা, কেবল লিঙ্গ নয়) তাফসিরের একাধিক প্রামাণিক সূত্রে এক হাজার বছরেরও বেশি আগে থেকে প্রতিষ্ঠিত। পদার্থবিজ্ঞান থেকে অণুজীববিজ্ঞান, উদ্ভিদবিজ্ঞান থেকে প্রাণিবিজ্ঞান — প্রতিটি ক্ষেত্রেই যাচাই করে দেখা গেছে, দুর্বল সাদৃশ্য (তরঙ্গ-কণা দ্বৈততা, প্রোটন-ইলেকট্রন, ব্যাকটেরিয়ার আক্ষরিক “লিঙ্গ”) সরিয়ে ফেললেও শক্ত উদাহরণ (পদার্থ-প্রতিপদার্থ, চৌম্বক মেরু, DNA ক্ষারক-জোড়া, ডিপ্লয়েড ক্রোমোজোম পুনরুদ্ধার) অক্ষত থেকে যায়। আপাতদৃষ্টিতে “ব্যতিক্রম” মনে হওয়া উদাহরণ (পার্থেনোজেনেসিস, ছত্রাকের হাজারো mating type, উভলিঙ্গ স্পঞ্জ-শামুক-সি-হেয়ার-অ্যারো-ওয়ার্ম, ফেরেশতার লিঙ্গহীনতা) ঘনিষ্ঠভাবে পরীক্ষা করলে হয় মূল নীতির সাথেই সাযুজ্যপূর্ণ প্রমাণিত হয়, নয়তো আয়াতের নিজস্ব “যা তোমরা জানো না” শর্তের আওতায় পড়ে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা — দুর্বল যুক্তি চিহ্নিত করে বাদ দেওয়াটাই প্রকৃত বুদ্ধিবৃত্তিক সততা, দুর্বলতা নয়। যে অ্যাপোলোজেটিক্স প্রতিটি সম্ভাব্য সাদৃশ্যকে অন্ধভাবে আঁকড়ে ধরে, তা বরং সমালোচকদের “post-hoc rationalization” অভিযোগকেই শক্তিশালী করে। বিপরীতে, সচেতনভাবে কিছু জনপ্রিয় যুক্তি বাতিল করে কেবল মজবুত প্রমাণের উপর দাঁড়ানোই এই বিতর্কে সবচেয়ে রক্ষণযোগ্য অবস্থান।

وَاللَّهُ أَعْلَمُ — আল্লাহই সর্বজ্ঞ।

তথ্যসূত্র

1. সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:৪৯

2. সূরা আর-রা'দ, ১৩:৩

3. সূরা ইয়াসিন, ৩৬:৩৬

4. সূরা ক্বাফ, ৫০:৭

5. সূরা আন-নাবা, ৭৮:৮

6. সূরা আন-নাহল, ১৬:৭২

7. সূরা ফাতির, ৩৫:১১

8. সূরা আশ-শূরা, ৪২:১১

9. সূরা আন-নাজম, ৫৩:২৭

10. সূরা আলে ইমরান, ৩:৭

11. সূরা আল-ইখলাস, ১১২:৩-৪

12. সূরা আল-কাহফ, ১৮:৫০

13. তাফসীর আত-তাবারী, ২২/৪৩৯-৪৪০ (সূরা ৫১:৪৯-এর তাফসির)

14. তাফসীর ইবনে কাসীর, ৭/৪২৪; ৪/৪৩১; ৮/৩০২

15. তাফসীর আল-কুরতুবী, ১৭/৫৩; ৯/২৮০

16. তাফসীর ইবনে আতিয়্যাহ, ৫/১৮১; ৩/২৯৩

17. তাফসীর ইবনে জিযী, ২/৩১০

18. তাফসীর আস-সা'দী, পৃ. ৮০৪, ৯০৬

19. তাফসীরে জালালাইন ও তাফসীরে ইবনে কাসীর — সূরা ৫১:৪৯ ও ৩৬:৩৬-এর ব্যাখ্যা (শংশয়.com-এ উদ্ধৃত অংশসহ পূর্ণাঙ্গ প্রসঙ্গ)

20. IslamQA, ফতোয়া নং ২২৩৪৫৭ — “জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টির অর্থ”, islamqa.info/en/answers/223457/

21. Young, H. D., & Freedman, R. A. (2014). University Physics with Modern Physics (13th ed.), p. 1416 — de Broglie wave-particle duality

22. de Broglie Wavelength সূত্র সংক্রান্ত তথ্য, HyperPhysics: hyperphysics.phy-astr.gsu.edu/hbase/debrog.html

23. Wright, J.W. — Whiptail lizard hybrid origin গবেষণা, ScienceDirect Topics: “Cnemidophorus”

24. Crews, D. et al. — “Tracing the Evolution of Brain and Behavior Using Two Related Species of Whiptail Lizards”, ILAR Journal, Vol. 45, No. 1 (2004)

25. “Widespread failure to complete meiosis does not impair fecundity in parthenogenetic whiptail lizards”, Development, The Company of Biologists (2016)

26. “Post-meiotic mechanism of facultative parthenogenesis in gonochoristic whiptail lizard species”, eLife (2024)

27. Barley et al. — “The evolutionary network of whiptail lizards reveals predictable outcomes of hybridization”, Science (2022)

28. “Speciation by hybridization: the largest group of unisexual vertebrates”, BioScience, Oxford Academic (2025)

29. “Evolutionary insights into sexual behavior from whiptail lizards”, PMC

30. “Parthenogenesis, Reproduction, Adaptations”, Lizard, Encyclopaedia Britannica

31. Bacterial conjugation, F+/F- terminology — “Bacterial Conjugation,” ScienceDirect Topics

32. “Bacterial Conjugation - Definition, Principle, Process, Examples”, Microbe Notes

33. Schizophyllum commune, A ও B mating-type লোকাস — “Evidence for the Existence of Mating Subtypes Within the Schizophyllum commune”, PMC

34. “Why Nature Prefers Couples, Even for Yeast”, Scientific American (Quanta Magazine)

35. Volk, T. — “Schizophyllum commune, the split gill fungus”, Tom Volk's Fungus of the Month, Feb. 2000

36. লিসানুল আরব, মাদ্দাহ “ز و ج” (root ز-و-ج সংক্রান্ত আভিধানিক ব্যাখ্যা)

37. তাফসীর.অ্যাপ (Tafsir.app) — সূরা ১৩:৩, ৩৬:৩৬, ৪২:১১, ৪৩:১২, ৫০:৭, ৫১:৪৯ সংক্রান্ত তুলনামূলক তাফসির পাঠ

38. Sea hare (Aplysia) mating chain behavior — সামুদ্রিক প্রাণিবিজ্ঞান সংক্রান্ত প্রামাণিক জার্নাল নিবন্ধসমূহ

39. Chaetognatha (arrow worm) reproductive biology — সামুদ্রিক invertebrate জীববিজ্ঞান রেফারেন্স

মন্তব্য

  • এখনো কোনো মন্তব্য নেই