হাদিস

সমান অধিকার কাকে বলে?

নারীবাদ ও ইসলামি আইন

GB
Great Beard
২৬ সেপ, ২০২৬ · 4 মিনিট

আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, হুনাইন যুদ্ধের গনিমতের মাল বন্টনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিছু লোককে প্রাধান্য দিলেন। তিনি আকরা বিন হাবেসকে একশত উঁট দিলেন এবং উয়াইনা বিন হিসনকেও তার অনুরূপ দিলেন। অনুরূপ আরবের আরো কিছু সম্ভ্রান্ত মানুষকেও সেদিন দিলেন এবং গনিমতের সম্পদ বণ্টনে তাদেরকে অন্যদের উপর প্রাধান্য দিলেন। এক লোক তখন বলল, আল্লাহর কসম! এই বন্টনে ইনসাফ করা হয়নি এবং এতে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের কামনা করা হয়নি! ইবনে মাসউদ বলেন, আমি বললাম, আল্লাহর কসম! নিশ্চয় আমি এই সংবাদ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেবো। অতএব আমি তাঁর কাছে এসে কথাটি জানিয়ে দিলাম। ফলে তাঁর চেহারা পরিবর্তিত হয়ে লালবর্ণধারণ করলো। অতঃপর তিনি বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যদি ইনসাফ না করেন, তাহলে আর কে ইনসাফ করবে? অতঃপর তিনি বললেন, আল্লাহ মূসার উপর রহম করুন, তাঁকে এর চেয়ে বেশী কষ্ট দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি ধৈর্য ধারণ করেছেন।অবশেষে আমি মনে মনে বললাম যে, আমি এর পরে কোনো কথা তাঁর কাছে পৌঁছাবো না।[1]

নারীবাদীদের থেকে আজকাল সমান অধিকারের বেশ স্লোগান শোনা যায়। এই হাদিস থেকে সমান অধিকারের ব্যাপারে কিছু ধারণা পরিষ্কার হবে বলে মনে হল।

এখানে "আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল যদি ন্যায়বিচার না করেন, তবে কে করবে?" - একটি আলঙ্কারিক প্রশ্ন। এর প্রকৃত অর্থ হলো—আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের চেয়ে অধিক ন্যায়বিচারক আর কেউ হতে পারে না। এখানে আল্লাহর নাম উল্লেখ করার মাধ্যমে এটি বোঝানো হয়েছে যে, নবী ﷺ আল্লাহর নির্দেশই পালন করছেন, তাই আল্লাহর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ন্যায়বিচার।

ন্যায়বিচার বনাম সমান বণ্টন: ন্যায়বিচার হলো 'কিসত' (Qist), অর্থাৎ পরিস্থিতি ও যোগ্যতা অনুযায়ী অধিকার প্রদান করা; এটি 'সামা' (Sama) বা অন্ধভাবে সমান ভাগে ভাগ করা নয়। এই হাদিসে মুশরিক নেতাদের ইসলামে আকৃষ্ট করার জন্য তাদের বেশি সম্পদ দেওয়া ছিল একটি বৈধ 'মাসলাহাত' (জনকল্যাণমূলক উদ্দেশ্য)।

তাই বলা যেতে পারে যে, অনেক ক্ষেত্রেই ইসলামের 'সমান অধিকার' বা ন্যায়বিচারের ধারণাটি পরিমাণগত সমতা (Quantitative Equality) নয়, বরং এটি হলো আনুপাতিক ন্যায়বিচার (Proportional Justice)—যেখানে প্রতিটি ব্যক্তি তার অবস্থান, প্রয়োজন এবং পরিস্থিতির ভিত্তিতে তার প্রাপ্য অধিকার লাভ করে। A Theory of Justice (1971) বইয়ে জন রল্স Difference Principle উল্লেখ করেন: সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যগুলো ন্যায় বিচার হবে শুধুমাত্র তখন, যখন সেগুলো সমাজের সবচেয়ে কম সুবিধাপ্রাপ্ত সদস্যদের সর্বোচ্চ উপকারে আসে।

মানে, জন রলসের দৃষ্টিতে, বৈষম্য কখনও কখনও ন্যায়বিচার বা ইনসাফ হতে পারে।

আদল ≠ মুসাওয়াহ

আরবী শব্দগুলোর মাঝে সূক্ষ্ম পার্থক্য নিচে দেয়া হল-

শব্দ

মূল অর্থ

ইসলামী অর্থে ব্যবহার

‘আদল (ع‑د‑ل)

সোজা/সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া

প্রত্যেককে তার যোগ্যতা‑অনুযায়ী অধিকার‑দানের কাজ

কিস্‌ত (ق‑س‑ط)

মাপা, পরিমাপ করে বিতরণ

অধিকার ও দায়িত্বের ন্যায়সঙ্গত বণ্টন

মুসাভা (س‑و‑ى)

সমতল, এক সমান হওয়া

সাম্য – পরিস্থিতি বিবেচনা না করেই সমান‑সদৃশ আচরণ

আমি একথা বলছি না যে, ইসলামে সাদা ব্যক্তির অধিকার বেশি; কিংবা ২ রাকাআত সালাতে পুরুষের চেয়ে নারীর নেকি কম লেখা হয়; বরং তাক্বওয়া-ই ইসলামে মুখ্য। আমি বলছি যে, নারীবাদীদের কল্পিত পরিমাণগত সমতা আসলে আধুনিক যুগেও অনেক সময় প্রয়োগ করা হয় না বা অযৌক্তিক। যেমনঃ

“আধুনিক সংবিধানিক আইনে (যেমন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৪তম Amendment‑এর Equal Protection Clause অথবা ইইউ চ্যার্টারের বৈষম্য‑বিরোধী ধারা), সরকার কোনও গোষ্ঠীকে ভিন্নভাবে আচরণ করতে পারে, যদি সেই পার্থক্যপূর্ণ আচরণের যুক্তিসঙ্গত ভিত্তি থাকে এবং তা একটি বৈধ সরকারি স্বার্থ রক্ষা করে।”

লিবারালদের সাথে বিরোধ কোথায়?

এখানে লিবারেলদের সাথে ইসলামের একটি মৌলিক বিরোধ আছে। লিবারেলরা সামগ্রিক কল্যাণের কথা চিন্তা করে না। তারা ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বার্থপরতার চিন্তা করে। ‘এটা-সেটা অন্যায়, আমি সমান অংশ পাইনি’‑এমন অভিযোগ liberal-individualist কাঠামোর ফলাফল: অধিকার এখানে ব্যক্তিকেন্দ্রিক (atomistic) এবং তাদের চোখে ন্যায়বিচার মানে সমান ব্যক্তিদের সমান আচরণ করা।

কিন্তু ইসলাম দ্বীনের সার্বিক কল্যাণ, telos বা ইসলামের প্রকৃত লক্ষ্যের কথা বিবেচনা করে রায় দেয়। ইসলামের চোখে যুলুম হচ্ছে, কোন কিছুকে তার যথা স্থানে না রাখা (نظام كل شيء)। যেহেতু নারীবাদীরা ইসলামের প্রকৃতের লক্ষ্যের বিরোধিতা করে সেহেতু লিবারেল নারীবাদের সাথে ইসলামের বিরোধ হওয়া স্বাভাবিক।

কিন্তু বৈষম্য কি সর্বদা খারাপ?

কমিউনিটেরিয়ান

নবী সাঃ এর উত্তর কমিউনিটেরিয়ান কাঠামোর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ (আলাসডেয়ার ম্যাকইন্টায়ার, মাইকেল স্যান্ডেল‑এর মত): অধিকার সামাজিক সম্পর্কের সাথে সংযুক্ত, এবং ন্যায়বিচার মানে হল সমাজের সামষ্টিক টেলোস (উদ্দেশ্য) পূরণ করা। হুনাইন যুদ্ধে সমষ্টির টেলোস ছিল নিরাপত্তা এবং সম্প্রসারণ — এবং অসম বিতরণ সেই টেলোসকে পূরণ করেছিল।

কান্টীয় দৃষ্টিভঙ্গি

আবার কান্টীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, নবী সাঃ এর কাজটি সর্বজনীনভাবে প্রয়োগযোগ্য: ‘একজন নেতা সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য সম্পদ ভিন্নভাবে বণ্টন করতে পারে’‑এই সর্বজনীন নিয়ম কোনো বিরোধের সৃষ্টি না করেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে। এটি স্বেচ্ছাচারী পক্ষপাত নয় (যা সর্বজনীনতার পরীক্ষায় ফেল করবে)।

কনসিকুয়েনশিয়ালিস্ট

অসম বণ্টন সমষ্টিগত কল্যাণ বৃদ্ধি করেছিল:

  • ব্যয়: কিছু সাথী “সমান অংশ” থেকে কম পেয়েছিলেন।

  • সুবিধা: গোষ্ঠীীয় নেতা বিশ্বস্ত মিত্রে রূপান্তরিত হল, ফলে ভবিষ্যৎ যুদ্ধ ও সংঘর্ষ রোধ, বাণিজ্যিক রুটের নিরাপত্তা, এবং সম্প্রদায়ের সম্প্রসারণ সম্ভব হল।

মোটের উপর, উপযোগিতা ব্যাপকভাবে ইতিবাচক ছিল। এই যুক্তি আধুনিক সরকারগুলোও ব্যবহার করে কৌশলগত অর্থনৈতিক সুবিধা বৈধতা দেয়ার জন্য (যেমন, কোনো সীমান্ত ঘেঁষা রাজ্যকে এমন শর্ত দেয়া, যাতে তা শত্রুর সঙ্গে জোট বাঁধে না)।

যাই হোক, পোস্টের উদ্দেশ্য হল, সমতার বিষয়টা এত সোজাসাপ্টা চিন্তা করলে হবে না। আপনাকে কিছু কম দিলেই অবিচার হয়েছে এমনটা না-ও হতে পারে। তাই সরাসরি প্রশ্নের আঙুল না তুলে শান্তভাবে ভেবে দেখা উচিত।

  1. [⇧]

    https://dorar.net/hadith/sharh/140552

মন্তব্য

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন।

GB
Great Beard
45 আর্টিকেল

আমি খুব সাধারণ মানুষ। বিজ্ঞান, দর্শন আর ইসলাম নিয়ে দু-চার কথা লিখি। বিবর্তন, স্রষ্টাতত্ত্ব আর কুরআন নিয়ে আমার অনেক আগ্রহ। আমি তেমন কিছু জানি না। লোকে প্রশ্ন করলে, সেটা নিয়ে ঘাটাঘাটি করি। এভাবে কিছু জ্ঞান অর্জন করেছি মাত্র। খুব খুশি হব, যদি আমাকে কিছু প্রশ্ন করেন। চেষ্টা করব জবাব দেয়ার।