তুলনামূলক ধর্মতত্ব

গৌতম বুদ্ধ নাস্তিক ছিলেন নাকি আস্তিক?

গৌতম বুদ্ধের আস্তিক হওয়ার প্রমাণ

PF
Prince Frerase
৫ অক্টো, ২০২৬ · 6 মিনিট

গৌতম বুদ্ধ আস্তিক হওয়ার পক্ষে প্রমাণ

  • একটি নিরপেক্ষ ও যুক্তিসঙ্গত আলোচনা

গৌতম বুদ্ধ নাস্তিক ছিলেন নাকি আস্তিক ছিলেন?

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ

© প্রিন্স ফ্রেরাসে

এক নজরে পয়েন্ট

১. নাস্তিকতা আসলে কী?

২. ত্রিপিটক থেকে স্রষ্টার প্রমাণ

৩. গৌতম বুদ্ধের স্রষ্টাতে বিশ্বাসের প্রমাণ ত্রিপিটক থেকে

৪. দেবতাদের প্রমাণ ত্রিপিটক থেকে

৫. স্বর্গ ও পুনর্জন্মের প্রমাণ ত্রিপিটক থেকে

৬. কর্মফল বা নিয়তির প্রমাণ ত্রিপিটক থেকে

৭. গৌতমকে কেন নাস্তিক বলা হয়?

আমার পুরোনো আইডি নষ্ট হওয়ার কারণে এই বিষয়ে আগের লেখাটা শেষ হয়ে যায়। আর এই বিষয়ে অনেকে প্রশ্ন করেন এবং আমি অনেকের সঙ্গে তর্ক করেছি। তাই এই পয়েন্টগুলোতে একটা লিখিত পোস্ট রাখা গুরুত্বপূর্ণ মনে করে আবারও লেখা শুরু করলাম।

আমাদের সমাজে ৯০% মানুষ, এমনকি স্বয়ং বর্তমান বৌদ্ধদের বড় অংশ মনে করে যে ত্রিপিটকে স্রষ্টার কথা বলা হয়নি এবং গৌতম বুদ্ধও স্রষ্টাতে বিশ্বাস করতেন না! তাই আমি আজকে ত্রিপিটক থেকে স্রষ্টার প্রমাণ করব এবং আরও লেখাতে দেখাব যে গৌতম বুদ্ধ একজন আস্তিক ও ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন। এখন সেটাই প্রমাণ করে দেখাব, ইনশাআল্লাহ।

তো চলুন শুরু করা যাক।

পয়েন্ট-১

প্রথমে আসি, বর্তমানে নাস্তিক বলতে আসলে কী বোঝায়। এই বিষয়ে বাংলা ভাষায় নাস্তিকদের জনপ্রিয় ওয়েবসাইট "সংশয় ডট কম"-এ বলা হয়েছে যে—

«"নাস্তিক্যবাদ আসে যুক্তিবাদ থেকে। নাস্তিকতা কোনো ধর্ম নয়, বরঞ্চ বেশিরভাগ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের মৌলিক দাবি, অতিপ্রাকৃত সত্তার অস্তিত্বে অবিশ্বাস। যাবতীয় বিশ্বাস, ধর্মবিশ্বাস বা ধর্মতত্ত্বকে যাচাই-বাছাই এবং যুক্তিসঙ্গত উপায়ে বাতিলকরণ। 'মানবসভ্যতার ইতিহাসে ঈশ্বর আছেন বা কোনো অলৌকিক শক্তি আছে, তার কোনো উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ নেই।' এবং যেহেতু কোনো প্রমাণ নেই, তাই ঈশ্বরের এই দাবিকে নাস্তিক্যবাদ বাতিল করে এবং ভ্রান্ত বলে মনে করে।"»

তো এখান থেকে আমরা বর্তমানে নাস্তিক হওয়ার তিনটা বৈশিষ্ট্য পেলাম—

১. ধর্মের মৌলিক বিষয় বিশ্বাস করে না।

২. তারা ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না।

৩. অতিপ্রাকৃত কোনো বিষয়ে বিশ্বাস করে না।

আরেকটা বৈশিষ্ট্য হলো, এরা যুক্তি বা যাচাই করে!

এখন যদি কোনো মানুষের মধ্যে এই তিনটার কোনো একটির বিপরীত বিশ্বাস পাওয়া যায়, তাহলে নাস্তিকদের মতে উক্ত ব্যক্তি বা দল নাস্তিক নয়, বরং আস্তিক।

এখন আমরা দেখব যে গৌতম বুদ্ধ একজন স্রষ্টাকে মান্য করতেন এবং অতিপ্রাকৃত বিষয়েও স্বীকৃতি দিয়েছেন।

পয়েন্ট-২

তো আমরা প্রথমে ত্রিপিটকে দেখব যে ঈশ্বরের কথা বলা হয়েছে কি না বা সৃষ্টিকর্তার উল্লেখ আছে কি না।

এই বিষয়ে ত্রিপিটকে স্রষ্টা নিজ সম্পর্কে বলেন—

«"৪৯৫. মহাব্রহ্মা ভিক্ষুকে বলিলেন, 'হে ভিক্ষু, আমি ব্রহ্মা, মহাব্রহ্মা, বিজয়ী, অপরাজিত, সর্বদর্শী, সর্বশক্তিমান, ঈশ্বর, কর্তা, নির্মাতা, শ্রেষ্ঠ স্রষ্টা, ভূত ও ভব্যের শক্তিমান পিতা।'"»

(রেফারেন্স: ত্রিপিটক, সূত্রপিটক, দীর্ঘনিকায়, শীলস্কন্ধবর্গ, কেবট্ঠ সূত্র, শ্লোক নং-৪৫৯)

তো দেখুন, ত্রিপিটকে স্বয়ং ঈশ্বর (ব্রহ্মা/সৃষ্টিকর্তা) নিজেই নিজের পরিচয় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। তাই যেসব মূর্খ বলে ত্রিপিটকে স্রষ্টার ব্যাপারে বলা নেই, তারা কখনো বৌদ্ধশাস্ত্র (ত্রিপিটক) পড়েই দেখেনি বলে আমরা মনে করি।

এরকম আরও অসংখ্য প্রমাণ দেওয়া যাবে ত্রিপিটক থেকে স্রষ্টার ব্যাপারে, কিন্তু জ্ঞানীদের জন্য আমি এতটুকুই যথেষ্ট মনে করি।

পয়েন্ট-৩

তো এখন ত্রিপিটক থেকে দেখে নেব, গৌতম বুদ্ধ ঈশ্বরের সম্পর্কে কী বলেছেন।

গৌতম বুদ্ধ বলেন—

«"৩৩৯. তখন আমি মহাব্রহ্মা সোহংপতির আরাধনা বিদিত হইয়া জীবগণের প্রতি করুণাবশত বুদ্ধচক্ষু দ্বারা জীব-জগৎ বিলোকন করি। বুদ্ধ-দৃষ্টিতে বিশ্ব বিলোকন করিয়া আমি স্বল্পরজ, মহারজ, তীক্ষ্ণেন্দ্রিয়, মৃদু ইন্দ্রিয়, সু-আকারবান, সুবোধ এবং পরলোক ও দোষের প্রতি ভয়দর্শী হইয়া অবস্থানকারী কোনো কোনো সত্ত্বগণকে দেখিতে পাইলাম..."»

(রেফারেন্স: সূত্রপিটকে মধ্যমনিকায়, মধ্যম-পঞ্চাশ, ৪. রাজবর্গ, ১. ঘটিকার সূত্র, বোধি রাজকুমার সূত্র, বুদ্ধ-জীবনী (গৃহত্যাগ হইতে বুদ্ধত্ব প্রাপ্তি পর্যন্ত), শ্লোক-৩৩৯)

অনুবাদক: শ্রীমৎ ধর্মাধার মহাস্থবির।

লক্ষ্য করুন যে এখানে বৌদ্ধ কীভাবে বুদ্ধত্ব লাভ করেছে, তা নিজের মুখে বলছে। আর সে এটা প্রথমেই বলেছে যে সে মহাব্রহ্মা (ঈশ্বর)-এর মাধ্যমেই সত্য জ্ঞান লাভ করেছে।

অর্থাৎ গৌতম ঈশ্বরের মাধ্যমেই এই বুদ্ধত্ব লাভ করেন। তাই যেসব বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী দাবি করে যে গৌতম ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন না, তারা গোমরাহ বা পথভ্রষ্ট।

["বোধি রাজকুমার সূত্র, বুদ্ধ-জীবনী (গৃহত্যাগ হইতে বুদ্ধত্ব প্রাপ্তি পর্যন্ত)" আপনারা এই প্যারাটা পুরোটা পড়লে আরও স্পষ্ট বুঝতে পারবেন যে গৌতম বুদ্ধ পিওর ঈশ্বরে বিশ্বাসী ছিলেন এবং তিনি তাঁর প্রশংসাও করেছেন।]

এছাড়াও ত্রিপিটক থেকে আমরা এটাও বুঝতে পারি যে গৌতম যে ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন, তিনি নিরাকার (ত্রিপিটকের সূত্রপিটক, দীর্ঘনিকায়, তেবিজ্জ সূত্র, ব্রহ্মজ্ঞান, শ্লোক-৫২৩)।

[উল্লেখ্য যে, আমি চাইলে ত্রিপিটক থেকে এটাও প্রমাণ করে দেখাতে পারব যে ঈশ্বর সাকার।]

তো এরকমভাবে আমরা ত্রিপিটক থেকে ঈশ্বরের পক্ষে ১০০+ রেফারেন্স দাঁড় করাতে পারব, ইনশাআল্লাহ। আমি শুধু এখানে সংক্ষিপ্ত আকারে পয়েন্টে আলোচনা করার জন্য মাত্র এক-দু'টি রেফারেন্স ব্যবহার করেছি। আপনারা ত্রিপিটক পড়লে ঈশ্বর সম্পর্কে ভুরি ভুরি প্রমাণ পাবেন।

পয়েন্ট-৪

তো ঘটনা এখানেই শেষ নয়! ত্রিপিটকে দেবতার কথাও আছে। মানে, হিন্দুদের যেমন দেবতা আছে, তারা একেকজন একেক কাজে নিয়োজিত, তেমনি বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারীদের মধ্যেও দেবতা আছে এবং তারা একেক কাজে নিয়োজিত।

এখন আমরা এরকম একটা প্রমাণ পেশ করছি—

«"১৬৩. তখন অন্যতর মিথ্যাদৃষ্টিক মারপক্ষপাতী দেবতা জল হতে উঠে এসে মৃগলণ্ডিককে এরূপ বলতে লাগল: 'সাধু, সাধু, সৎপুরুষ! তোমার অনেক লাভ হয়েছে, তোমার বহু সুলব্ধ হয়েছে। তোমার দ্বারা অনেক পুণ্য সঞ্চিত হয়েছে, কারণ তুমি অতীর্ণদেরকে তীরে পার করে দিয়েছ, দুঃখ হতে নিষ্কৃতি দিয়েছ।'"»

(বিনয়পিটকে তৃতীয় পারাজিকা, শ্লোক নং-১৬৩)

দেবতাদের ব্যাপারেও আরও বলা আছে এবং বিভিন্ন দেবতা সম্পর্কেই উল্লেখ আছে। সংক্ষিপ্তভাবে শেষ করার জন্য আমি একটা রেফারেন্স দিলাম।

পয়েন্ট-৫

তো এই ঐচ্ছিক পয়েন্টে কিছু আলাদা বিষয় নিয়ে আলোচনা করব।

এখন আসি বৌদ্ধ ধর্মে পুনর্জন্ম বা পূর্বজন্ম এবং স্বর্গের রেফারেন্স নিয়ে। আমি শুধু এখানে রেফারেন্স পেশ করছি। আপনারা ত্রিপিটক চেক করে দেখতে পারেন।

রেফারেন্স:

"বিনয়পিটকে পারাজিকা, বৈরঞ্জ অধ্যায়, শ্লোক-১২" এখানে পুনর্জন্মের কথা বলা হয়েছে।

এবং আরও দেখুন: "দীর্ঘনিকায়, শীলস্কন্ধবর্গ, শ্রামণ্যফল সূত্র, শ্লোক-১৬৮।"

বৌদ্ধ ধর্মে স্বর্গের কথা বলা হয়েছে—"বিনয়পিটক, তৃতীয় পারাজিকা, শ্লোক-১৬৬-১৬৭।"

এখন নাস্তিকদের কাছে আমার প্রশ্ন, যে ধর্মে স্বর্গ, পূর্বজন্ম ইত্যাদির কথা বলা আছে এবং যে এগুলোতে বিশ্বাস করে, সে বা তার ধর্ম কি নাস্তিক নাকি আস্তিক?

পয়েন্ট-৬

বৌদ্ধ ধর্মের কর্মফল বা নিয়তির কথাও বলা আছে। এই ব্যাপারে জানতে দেখুন—"ত্রিপিটকের সূত্রপিটক, দীর্ঘনিকায়, শীলস্কন্ধবর্গ, শ্রামণ্যফল সূত্র, শ্লোক-১৬৮।"

তো আমরা বুঝতে পারলাম যে বৌদ্ধ ধর্মে এবং গৌতম বুদ্ধও নিয়তির কথা স্বীকার করেছেন। আর তাঁর অনেক অনুসারী নাস্তিকদের সঙ্গে সুর মিলিয়ে নিজ ধর্মকে আধুনিক ও যুক্তিবাদী ধর্ম প্রমাণ করতে গিয়ে বলে যে বৌদ্ধ ধর্মে নাকি এগুলো নেই! যা হাস্যকর দাবি ছাড়া কিছুই নয়।

তো আমার এই পয়েন্টের আলোচনার মাধ্যমে এটা প্রমাণিত হলো যে গৌতম বুদ্ধের ধর্মেও অতিপ্রাকৃত বিষয় আছে (নাস্তিকদের মতে যেগুলোর প্রমাণ নেই)। তাই তাদের উচিত হবে না গৌতমকে নাস্তিক বলা।

পয়েন্ট-৭

এখন প্রশ্ন আসতে পারে যে, গৌতম বুদ্ধ বা তাঁর ধর্ম আস্তিক হলে তাঁকে নাস্তিক কেন বলা হয়?

তো এর জবাবে আমাকে বলতে হবে যে, গৌতম ঈশ্বরে বিশ্বাস করলেও এবং এর সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় অলৌকিক বিষয়গুলোতে বিশ্বাস করার পরও তাঁকে নাস্তিক বলার কারণ হলো, তিনি তাঁর সময়ে ব্রাহ্মণ ও তাঁদের বেদের বিরোধিতা করেছেন।

আর হিন্দু শাস্ত্র অনুসারে নাস্তিক (মনুসংহিতা-২/১১-১৩; সামবেদ-১৩৪৩)। আর সনাতন (হিন্দু) আর্য পণ্ডিত দয়ানন্দ সরস্বতীও বলেছেন যে বেদবিরোধী ব্যক্তি নাস্তিক (সত্যার্থপ্রকাশ-৩/৫১; ১১/২৮৪)।

আর গৌতম বুদ্ধ সে সময় বেদের বিপক্ষে যাওয়ার কারণেই তাঁকে নাস্তিক আখ্যায়িত করা হয়েছে, স্রষ্টাকে অস্বীকার করার জন্য তাঁকে নাস্তিক বলা হয়নি।

আশা করি বুঝতে পেরেছেন।

তো এই ছিল সংক্ষিপ্ত একটা পর্যালোচনা। আশা করি এই বিষয়ে অনেকের তেমন জানা ছিল না বা জানা থাকলেও রেফারেন্স জানা ছিল না, অথবা রেফারেন্স জানা থাকলেও যুক্তি, তথ্য উপস্থাপন করার বিষয় জানা ছিল না। তো যারা জানেন না, তাঁদের জন্যই এই পোস্ট!

[উল্লেখ্য যে, লেখাটা আগে নিজের মতো করে লিখেছিলাম। তো যারা পোস্টের শিরোনামের বিষয়টা শুধু জানতে চান, তাদের জন্য পরে এখন পয়েন্ট ভাগ করে দিলাম। আপনারা তৃতীয় পয়েন্ট দেখুন। আর একটু জানতে চাইলে দ্বিতীয় পয়েন্টও দেখুন।]

যাই হোক, সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন।

লেখক: মোঃ মেহেদী হাসান ✍️

আল্লাহ হাফেজ।

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

Prince Frerase -

মন্তব্য

এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন।